অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (১)

অনুপম শ্যাম হচ্ছেন আমি যাদের সাথে সরাসরি কাজ করেছি, তাদের মধ্যে সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের অন্যতম। ট্রিপার্ট ল্যাবে আমরা সহকর্মী ছিলাম। বর্তমানে অনুপম সিলিকন ভ্যালীতে থাকেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে অনুপমদা’র একটি ইন্টাভিউ যদি নেওয়া যায়, তাহলে আমাদের দেশের তরুন শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারবে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ইন্টারভিউটি থেকে আমি নিজেই অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আরেকটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে উনি একটু লাজুক স্বভাবের হওয়ায় ইন্টারভিউ’র জন্য রাজি করাতে আমার পাঁচ মিনিট সময় খরচ করতে হয়েছে। ইন্টারভিউটা একটু বড়, তাই দুটি অংশে ভাগ করেছি। আজকে প্রথম অংশ প্রকাশ করলাম।

anupom

সুবিন : আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
অনুপম : আমি এখন কাজ করছি এভারনোট নামের একটা স্টার্টআপ এ। এভারনোট একটি ক্লাউড বেসড ওয়ার্কস্পেস এপ্লিকেশন/সার্ভিস।

সুবিন : কোন টেকনোলজিতে কাজ করছেন?
অনুপম : আমি কাজ করি প্লাটফর্ম টীম এ, আমাদের কাজ হচ্ছে এভারনোট এর ব্যাকএন্ড প্লাটফর্ম এর স্ক্যালাবিলিটি, স্টাবিলিটি, সিকিউরিটি, আর পারফর্মেন্স নিয়ে। টেকনোলজি মূলত জাভা, কাউচবেস, মাইসিকুয়েল, লুসিন, হাডুপ।

সুবিন : প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করলেন কবে?
অনুপম : ১৯৯৮ সালে । ক্লাস ৭/৮ এ থাকতে মামার বাসায় কিছু কম্পিউটার সম্পর্কিত বই/ম্যাগাজিন পাই, তখন যা হাতের কাছে পেতাম তাই পড়তাম। ওখান থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে আগ্রহের শুরু। পরে এস.এস.সি পরীক্ষার পর কম্পিউটার ক্লাস এ ভর্তি হই, “সি” এর বই কিনি (Teach Yourself C – Herbert Schildt) আর নিজে নিজেই শখের বশে বই পরে প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি।

সুবিন : প্রফেশনাল প্রোগ্রামিংয়ে কবে থেকে যুক্ত হলেন?
অনুপম : ২০০৪ এর দিকে কিছু ছোট খাটো ফ্রিল্যান্স কাজ দিয়ে। তখন আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে স্ফুরণ টেক নামএ একটা স্টার্টআপ শুরু করি। আমরা শুরুতে মোবাইল এর জন্য এপ্লিকেশন/গেম বানাতাম। ওই সময় আমরা বাংলা তে এস.এম.এস. করার জন্য ও একটা সফটওয়্যার বানাই।

সুবিন : ওইসময়ে স্টার্টআপ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অনুপম : আমাদের কে কেউ পাত্তা দিত না। এই পিচ্চি রা আবার কি করবে এই রকম অবস্থা। আর তখন সবার এত তথ্যপ্রযুক্তি/স্টার্টআপ এই বিষয়ে ধারণা ও ছিল না। তো একবার আমরা ২০০৪ এ একটা সফটওয়্যার বিক্রি করার জন্য প্রেজেন্টেশন দিতে যাই তখনকার সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি তে। প্রথম দিকে সবাই তো অবাক এত ছোট ছোট ছেলেপেলেরা কি করতে আসছে এইখানে। পরিচালক পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন ওই মিটিং এ। মনে আছে প্রেজেন্টেশন শেষে কোনো এক উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হাত তালি দিয়ে বলেছিলেন “You guys are young guns, I am really impressed” । এক ধাক্কায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক উপরে উঠে যায় উনার ওই কথায়। তো ভালো খারাপ মিলিয়ে খুবই এক কথায় খুবই দু: সাহসিক ছিল পুরো ব্যাপারটা সেই সময়ের জন্যে।

সুবিন : সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে হলে কি কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে?
অনুপম : ছোট উত্তর: সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে কম্পিউটার সাইন্স পড়তে হবে না। বড় উত্তর : কেউ যদি জানে যে সে সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে চায় তাহলে অন্য কোনো সাবজেক্ট না পড়ে কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে পড়তে পারলেই ভালো। তাতে সময় এর ভালো ব্যবহার হবে, অন্য বিষয়ে পড়লে সেই শেখাটা যদি বাস্তবিক ভাবে কোনো কাজে লাগানো না হয় তাহলে তো সেটার খুব একটা অর্থপূর্ণ প্রয়োগ হলো না। কেউ যদি অন্য কোনো বিষয় এ পড়ে তাহলে তাকে কষ্ট অনেক বেশি করতে হবে, যদিও প্রচন্ড আগ্রহ থাকলে সেটা কোনো ব্যাপার না। নিজে থেকে কোনো কিছু শেখা টা খুবই অনানুষ্ঠানিক আর অসংঘটিত, যে কারনে শেখার মাঝখানে ফাঁক থেকে যেতে পারে। এখন অনেক কোর্স ই অনলাইন এ সুলভ, কেউ যদি চায় তাহলে নিজেই কোনো একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এর সিলেবাস অনুসরণ করে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। শুধু প্রোগ্রামিং লেঙ্গুয়েজ শিখেই কিন্তু সফটওয়্যার ডেভেলপ করা যায়। কিন্তু এলগরিদম , ডাটা স্ট্রাকচার, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটার আর্কিটেকচার, নেটওয়ার্কিং, ডাটাবেস, বিচ্ছিন্ন গণিত এগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে যেতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে কম্পিউটার সাইন্স এর ডিগ্রীধারী মনেও যে সে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার তা না। প্রবল ইচ্ছা আর আগ্রহ থাকা টাই জরুরী। মানে আগ্রহ থাকলে ডিগ্রী না থাকলেও চলবে, কিন্তু উল্টো টা সত্য না। আমার দেখা ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার এর মধ্যে কয়েকজন আছে যাদের কম্পিউটার সাইন্স এ কোনো আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই। কিন্তু এই ব্যাপারটা যে কোনো সাধারণ প্রবণতা না সেটা মনে রাখতে হবে।

সুবিন : ট্রিপার্ট ল্যাবের ঢাকা অফিস প্রতিষ্ঠার গল্পটি শুনতে চাই।
অনুপম : গল্পটা একদম শুরু থেকে বলি। আমি তখন প্রোগ্রামিং বিষয়ক ব্লগিং করতাম মোটামোটি নিয়মিত ভাবে। ২০০৭ এর জানুয়ারী এর দিকে ব্লগ এর মাধ্যমে একটা মেসেজ পাই, সিলিকন ভ্যালি এর মেনলো পার্ক এর একটা স্টার্টআপ থেকে, ওরা তখন ওদের সদ্য শুরু করা স্টার্টআপ এর জন্য ডেভেলপার খুজছিল, অনলাইনে সার্চ এ কোনো ভাবে আমার ব্লগ পায়, ব্লগ পড়ে ওদের মনে হয় যে আমি কাজ করতে পারব। তো ওরা আমাকে বলে আমি আগ্রহী কিনা, তখন আমার পকেট এর অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, বাসা থেকে remotely কাজ করতে পারব, মার্কিন স্টার্টআপ টাকা পয়সা ভালোই দিবে, আমার দিক থেকে আগ্রহ না থাকার কোনো কারণ ই ছিল না, আমি জানাই সেটা। ওরা তখনই একটা ইন্টারভিউ দিতে বলে তো, আমার তখন বাজে রাত ১ টার মতো। যাই হউক ওদের সিটিও ইন্টারভিউ নেয়, আমি ঘুমকাতুরে অবস্থায় মশার কামর খেতে খেতে কিছু একটা ইন্টারভিউ দেই। এরপর ওরা ওই দিনই আমাকে কাজ শুরু করতে বলে, আমি ওই স্টার্টআপ এর প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এর পরদিন থেকেই কাজ শুরু করে দেই। প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ এ এটাকে বড় করার – প্রাথমিক ভাবে আরো কয়েকজন কে সাথে নেয়া আর দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ওখানে একটা অফিস প্রতিষ্ঠা করা। আমার শুরু করার মাস কয়েক পরেই বাংলাদেশ থেকে আমার সাথে যোগ দেয় আহসান ভাই, তার পরে হাসিন ভাই, মানজিল ভাই, তপু ভাই । শুরু তে আমাদের কোনো অফিস স্পেস ছিল না, আমরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে, কফি শপে মিটিং করতাম। ২০০৭ এর শেষ দিকে অথবা ২০০৮ এর শুরুর দিকে আমরা প্রথম অফিস স্পেস নেই উত্তরা তে, একটা ২ বেডরুম এর এপার্টমেন্ট, মনে আছে হাসিন ভাই আর অন্যরা খুব খেটেছিল ওই অফিস নেয়ার সময় । তখন বাংলাদেশ থেকে ট্রিপার্ট এ কাজ করে প্রায় ৭/৮ জন। এক বছর এর মধ্যেই সেই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৮ জনে, আমরা তখন পুরনো ছোট অফিস ছেড়ে আরেকটু বড় অফিস মানে বড় বাসায় উঠি। ব্যবসার দিক দিয়ে তখন ট্রিপার্ট ভালো করছিল, ওয়েব আর মোবাইল গেমস আর এপস গুলো মোটামোটি ভাবে সফল। ২০০৯ এর শুরুর দিকে আমরা আবার অফিস বদলাই, এবার প্রথম বারের মত সত্যিকারের অফিস স্পেসে উঠলাম। এই অফিস সেটআপ এর সময় মনে আছে আমি ডেইলি স্ক্রাম করতাম বাথরুম এর মিস্ত্রী, ইলেকট্রিসিয়ান, রং এর মিস্ত্রী এদের সাথে, সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ওই সময়কার অনেক মজার গল্প আছে যেগুলো অন্য সময় বলা যাবে। যাই হোক বাংলাদেশ থেকে তখন ট্রিপার্ট এ কাজ করে ৩২ জন এর মত। নতুন কাউকে নেয়ার ব্যাপারে আমরা খুবই খুঁতখুঁতে ছিলাম। আমাদের ইন্টারভিউ প্রসেস ও ছিল অন্যরকম , ওটার গল্পও আরেকদিন হবে। কালচারিলি ট্রিপার্ট ছিল অনন্য – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক সিডিউল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অল হ্যান্ডস মিটিং, যত খুশি তত ছুটি, ওপেন ওয়ার্কিং স্পেস, আউটিং – আরো অনেক কিছু যেগুলো তখনকার বাংলাদেশের কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির জন্য ছিলো অকল্পনীয়। যেকারণে আমরা তখন আরো বেশ ভালো কিছু মানুষ কেও পেয়ে যাই আমাদের সাথে। সুবিন ভাই (যিনি এখন আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন) তিনিও ছিলেন তখন আমাদের সাথে, উনার একটি বিশেষ নাম আছে এবং সেই নামের সার্থকতার কাহিনী উনার কাছ থেকেই আগ্রহীরা জেনে নিবেন । আমরা সবাই মিলেই আসলে একটা কালচার তৈরি করতে পেরেছিলাম যেখানে আমরা নিজেরা প্রত্যেক দিন কাজ করতে যেতে চাবো। সব কিছুর উপরে আমরা মনে রাখতাম যে আমরা আমাদের দেশ কে প্রতিনিধিত্ব করছি, অনেক রাজনৈতিক আর অবকাঠামোগত বাধা বিপত্তি ছিল, কিন্তু আমরা কখনো ওগুলো কে সমস্যা হিসেবে দেখাতাম না। ট্রিপার্ট ছিল একটা বড় পরিবারের মতো, এখনো আমরা আছি, যদিও এক এক জন একেক জায়গায়। ২০০৯ এর নভেম্বরে ট্রিপার্ট ল্যাব্স কে কেনে ফেলে প্লেডম নামের আরেকটি কোম্পানি। আসলে যখন কিছু ভালো লোক কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একসাথে কাজ করে তাহলে ভালো কিছুই হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলাপার এবং সিলিকন ভ্যালির সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের স্কিল ও প্রফেশনালিজমের মধ্যে তুলনা করলে আমরা কি পিছিয়ে আছি? যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে কীভাবে কাজ করলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব?
অনুপম : প্রোগ্রামিং স্কিলে আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই। আমরা কিছুটা “Tunnel vision” এ আক্রান্ত, সাধারণত একটু দূরদৃষ্টিহীন এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Myopic and short-term goal driven), যে কারণে অনেক সময়ই আমরা বড় ছবিটা (Big picture) দেখতে পাই না। আমার মনে হয় আমাদের কে বেশি করে “কেনো ?” এই প্রশ্ন টা করতে হবে এবং এর উত্তরটা জানতে হবে, তাহলেই হবে । সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসলে প্রোগ্রামিং স্কিল ছাড়াও আরো অনেক সফট স্কিলস এর দরকার হয়, যেগুলোতে আমরা আসলে খুব একটা জোর দেই না। আমরা যদি এর গুরুত্ব টা বুঝতে পারি তাহলেই অনেক দূর এগিয়ে যাব ।
প্রফেশনালিজমে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এটা আসলে আমাদের কে সম্মিলিতভাবে উন্নত করতে হবে। আমেরিকা তে প্রত্যেক বছর সামার এ ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কোম্পানি তে ইন্টার্নশীপ করে, এর বদলে ক্রেডিট পায় । আমার মনে হয় আমাদের দেশেও এটা চালু করা দরকার, এর জন্য সফটওয়্যার কোম্পানি গুলোরই প্রথমে এগিয়ে আসা উচিত, তাতে এদেরই লাভ বেশি । এতে চাকরি জীবন শুরু করার আগেই প্রফেশনাল এনভায়রনমেন্ট সম্পর্কে সবার একটা ধারণা হবে, অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দের কাছ থেকে পরামর্শ আর প্রশিক্ষণ পাবে । প্রাথমিক ভাবে হয়ত সবাই কে স্থান সঙ্কুলান করা সম্ভব হবে না, আমাদের হয়ত এত বেশি সফটওয়্যার কোম্পানি নেই, যত টুকু হবে তাতেই লাভ। তাছাড়াও আমার মনে হয় প্রফেশনালিজমের সজ্ঞাও আমাদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার না। প্রফেশনালিজম নিয়ে আমরা বেশি বেশি করে কথা বলতে পারি তাতে হয়ত সবার কাছে বেপারটা পরিষ্কার হবে। ট্রিপার্ট এ আমরা একটা কথা প্রায়ই বলতাম “নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড”, এটা দিয়ে আসলে আমরা Accountability, Efficiency, Ownership, Communicativeness এই গুলোই বোঝাতাম।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সিলিকন ভ্যালির সবাই যে বাংলাদেশ এর ডেভেলপারদের চেয়ে ভালো তা না। কিন্তু ওদের টপ ২০% আমাদের টপ ১০% থেকে গড়পরতায় ভালো। আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই, আমাদের গন্তব্য টা কে একটু উপরে তুলতে হবে, যেখানে আছি সেখানে বসে পড়লে হবে না।

পরবর্তি অংশ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করতে হবে।

Facebook Comments

One thought on “অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (১)”

Leave a Reply