কোন পথে যে চলি

কম্পিউটার সায়েন্সের গ্রাজুয়েশন শেষ বা শেষের পথে। তখন সবারই চিন্তা-ভাবনা থাকে চাকরী নিয়ে। আমার একজন ক্লাসমেট ও বন্ধু খুব ভাল মোটর সাইকেল চালাতো। প্রায়ই তার মোটর সাইকেলে চড়ে এদিক-সেদিক যেতাম। তার আবার এমনিতেই টেনশন একটু বেশি, সিরিয়াস টাইপের ছেলে তো। তো ফোর্থ ইয়ারে যখন পড়ি, তখন একদিন তার মোটরসাইকেলের পিছনে বসে ভার্সিটি থেকে শহরে যাচ্ছিলাম। তখন তার টেনশনের পরীক্ষা নিতে আমি পিছনে বসে কথা শুরু করলাম। “দোস্ত, চাকরির অবস্থা তো খুবই খারাপ, দেশে সফটওয়্যার কোম্পানী ছাড়া আমাদের অপশন নাই, আবার সফটওয়্যার কোম্পানীও বেশি নাই। বেতনও খুব কম। আর প্রাইভেট ভার্সিটিরও যে টিচার হব, সেই জিপিএ কী আমাদের আছে”। ঠাস করে সে ব্রেক কষল। তারপরও সামনের রিকশার সাথে ধাক্কাটা এড়াতে পারল না। জীবনে প্রথমবার আমি তাকে দেখলাম যে সে মোটর সাইকেল চালাতে কোনো ভুল করল।

confusion-311388_640

তো এখন আমি যেটা দেখি, সবাই একটা বিষয় নিয়ে খুব দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। পিএইচপি নাকি জাভা? এন্ড্রয়েড অ্যাপ নাকি পাইথন? আবার অনেকের ধারণা, ডট নেটে কাজ করতে না পারলে তার জীবন ব্যর্থ। এরকম কনফিউশন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না, বরং খুবই স্বাভাবিক। কয়েকদিন আগে সরকারের একটা প্রজেক্ট FTFL (Fast Track Future Leader)-এর শেষ সপ্তাহে প্রোগ্রামিং ট্রেনিং দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক মাসের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং (কমিউনিকেশন স্কিল, আদব-কায়দা, সফট স্কিল ও একটু প্রোগ্রামিং স্কিল) শেষে সবার জন্য বিভিন্ন ট্র্যাক দেওয়া হল। আগ্রহ ও দক্ষতার বিচার করে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ট্র্যাকে দেওয়া হলো। সেই ট্র্যাকের উপর ৩ মাসের প্রশিক্ষণ হবে। ট্র্যাকগুলো ছিলো ডট নেট, পিএচইপি (লারাভেল ফ্রেমওয়ার্ক), মোবাইল অ্যাপস্ (অ্যান্ড্রয়েড), জাভা ইত্যাদি। শিক্ষার্থীদের মাঝে এই ট্র্যাক নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক টেনশন! কয়েকজন আমার সাথে কথা বলল, ভাইয়া অমুক ট্র্যাক নিচ্ছি, ভুল করছি না তো?

সত্যি কথা হলো, এখানে আসলে ভুল করার কিছু নাই। সবগুলো সেক্টরেই দক্ষ লোকের প্রচুর চাহিদা। আর বেতনও নির্ধারিত হয় দক্ষতার ভিত্তিতে। ব্যাপারটা এমন না যে পাইথন ডেভেলাপারের বেতন জাভা ডেভেলাপারের চেয়ে বেশি। আসলে যারা কম্পিউটার সায়েন্স পড়ছে বা সদ্য পাস করেছে, তাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত প্রোগ্রামিং নিয়ে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং ভাষা (programming language) বা টেকনোলজি নিয়ে না। দুই বছর পিএচইপিতে কাজ করার পরে হয়ত তার পাইথনে কাজ করতে হতে পারে, কিংবা অ্যান্ড্রয়েডে এক বছর কাজ করার পরে আইফোন অ্যাপ বানানোর কাজও করতে হতে পারে। এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই যাদের সারাজীবন শেখার মানসিকতা নাই, তারা মানে মানে কেটে পড়তে পারে।

আমরা যখন একজন সদ্য পাস করা কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্টের ইন্টারভিউ নেই, আমরা তাকে কীভাবে যাচাই করি? প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক জ্ঞান তার আছে কী না, সে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করেছে কী না, সে ভার্সিটিতে কী কী প্রজেক্ট করেছে এবং সেগুলো নিজে করেছে কী না, অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিংয়ে তার ধারণা ঠিকঠাক আছে কী না, খুব সাধারণ গাণিতিক বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে কী না, ডাটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদম বিষয়ে ধারণা কেমন, অপারেটিং সিস্টেম ও কম্পিউটার আর্কিটেকচার পড়েছে কী না, এসব। আর এসব বিষয় তার ভার্সিটির সিলেবাসেরই অন্তর্গত। কারণ যেই ছেলেটার বা মেয়েটার বেসিক জ্ঞান শক্ত এবং যথেষ্ট প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করেছে (হয় অনেক কনটেস্ট করেছে অথবা প্রজেক্ট করেছে) সে অনায়াসেই নতুন কিছু শিখে নিতে পারবে। পরিশ্রম করার মানসিকতা, ধৈর্য্য ও সাহসটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ারের প্রথম চাকরিতে পার্ল (Perl) প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করতে হত। কিন্তু আমি এই চাকরি নেওয়ার আগে পার্ল জানতাম না। আর ইন্টারভিউতে আমাকে পার্ল নিয়ে কোনো প্রশ্নও করা হয় নি, বরং আমি কী জানতাম, সেটার উপরই প্রশ্ন হয়েছে। তেমনি দ্বিতীয় চাকরিতে মূল কাজ ছিল পিএচইপি ও জাভা স্ক্রিপ্ট। কিন্তু পিএচইপি ও জাভা স্ক্রিপ্টে আমার জ্ঞান ছিল একেবারে সামান্য। তাতে কিন্তু ইন্টারভিউ ফেস করতে কোনো সমস্যা হয় নি। আবার ওই অফিসে এক বছর পিএচইপিতে কাজ করার পরে হঠাৎ আমি (এবং আরো কয়েকজন) নতুন প্রজেক্টে ঢুকে গেলাম যেখানে মূল ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল একশন স্ক্রিপ্ট (action script)। কিছুই পারতাম না, কিন্তু সেটা শিখে নিতে সময় লাগে নি। আমি চাইলে পিএচইপি ছাড়া আমি বাঁচবো না বলে জানালা দিয়ে লাফ দিতে পারতাম, কিন্তু সেটা দেই নাই। আমার অন্য কলিগরাও দেয় নাই। আমার মতো সাধারণ মেধার মানুষেরও ক্যারিয়ার এমন সহজ হওয়ার কারণ ছিল আমি ভার্সিটিতে কয়েক হাজার ঘণ্টা কোড করেছিলাম। আর এখন আমার বেশিরভাগ কাজই পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষায়।

তাই তোমাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে আজকে অমুক ল্যাঙ্গুয়েজ, কালকে তমুক ল্যাঙ্গুয়েজ, জানুয়ারি মাসে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, ফেব্রুয়ারি মাসে এইচটিএমএল না শিখে তোমার বেসিক শক্ত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া। ভার্সিটির ফার্স্ট থেকে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করা, অনেক প্রবলেম সলভ করা। থার্ড ও ফোর্থ ইয়ারে ভালো কয়েকটা প্রজেক্ট করা। এছাড়া বিভিন্ন একটিভিটিতে (activity) জড়িত থাকা, সেটা খেলাধূলা হোক, গানবাজনা কিংবা অন্যকিছু, যেটা তোমার ভালো লাগে।

বেসিক জ্ঞান শক্ত কর, আত্মবিশ্বাসী হও, আচার-আচরণে ভদ্র হও। তোমাদের জন্য শুভকামনা।

Facebook Comments

9 thoughts on “কোন পথে যে চলি”

  1. (বেসিক জ্ঞান শক্ত কর, আত্মবিশ্বাসী হও, আচার-আচরণে ভদ্র হও)
    আমার কাছে এই কথাটার অনেক মূল্য।

  2. Computer Science ছাড়া কি programming এ আশা যাবেনা? যদি programming এ আশা যায় তাহলে কেন তাদের নিয়ে কিছু বলেন না? আর যদি আশা না যায়, তাহলে যারা Computer Science ছাড়া programmer হিসেবে job করছে তাদের নিয়ে কিছু বলবেন please.

  3. Thank you for this nice article. I am not from CSC background. So,obviously I didn’t do any projects and also didn’t attend any programming contest. Now if I want to build my career in this sector, besides learning how should I prepare for the interview.

  4. “বেসিক জ্ঞান শক্ত কর, আত্মবিশ্বাসী হও, আচার-আচরণে ভদ্র হও” এই কথাটা সব থেকে বেশী ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ

  5. computer architecture, data structure & algorithm এই বিষয় গুলোর উপোর লেখা ভাল বই কি কি আছে আর কিভাবে ভাল ভাবে জানতে পারব জানালে খুশি হতাম। আগাম ধন্যাবাদ।

Leave a Reply