ট্যুরিং টেস্ট – মানুষ বনাম কম্পিউটার

ছোটবেলায় কমিকস্‌ পড়ার সময় প্রায়ই একটা লেখা চোখে পরত, “চাচা চৌধুরীর মগজ কম্পিউটারের চেয়েও প্রখর” । চোর-ডাকু, বড় বড় ক্রিমিনাল সবাই উনার বুদ্ধির কাছে কাবু। তখন মনে করতাম, হ্যাঁ চাচাজীর তো আসলেই অনেক বুদ্ধি! কিন্তু  কম্পিউটার কি আসলেই মানুষের থেকে বুদ্ধিমান? অথবা আদৌ কি তার কোন বুদ্ধি আছে? একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।

১৯৯৭ সালের কথা। ডিপ ব্লু (Deep Blue) নামের এক সুপার কম্পিউটার দাবা খেলায় হারিয়ে দিয়েছিল বিশ্বসেরা দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভ (Garry Kasparov) সাহেবকে। মানব মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের যুদ্ধে কম্পিউটার জয়ী। তাহলে কি এখন আমরা বলবো, যে মানুষের থেকে কম্পিউটারের বুদ্ধি বেশি?

বুদ্ধির দাঁড়িপাল্লাঃ
মানুষের বুদ্ধিমত্তা মাপার জন্য যেমন আইকিউ (IQ) পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, তেমনি কোন যন্ত্রের চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিমত্তা আছে কিনা, সেটা মাপার জন্য রয়েছে ট্যুরিং টেস্ট (Turing Test) নামক একটি পদ্ধতি। এক কথায় ট্যুরিং টেস্ট হচ্ছে এমন একটি পরীক্ষা যার মাধ্যমে জানা যায় কোন যন্ত্রের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে কিনা। যদি কোন যন্ত্র এই পরীক্ষায় পাশ করে যায়, তাহলে বলা যায় যন্ত্রটির চিন্তাশক্তি আছে বা বুদ্ধিমত্তা আছে।

অনেক আগে থেকেই মানুষের মনে কৌতুহল ছিল যে কোনো যন্ত্র কি পারবে মানুষের মত চিন্তা করতে এবং সেই চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে?

১৬৩৭ সালে রেনে ডে কার্তে নামক একজন বিজ্ঞানী বলেছিলেন যে মানুষ হয়ত বুদ্ধিমান ঘুর্ণন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবে, কিন্তু মানুষের মত বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এটির পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না।
কিন্তু বিজ্ঞান তো মানুষের কথা শুনে বসে থাকার জিনিস না। বিজ্ঞানীরা শুরু করলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশেষে ইংরেজ গণিতবিদ এবং গবেষক অ্যালান ট্যুরিং (Alan Turing) যন্ত্রের চিন্তাশক্তি নির্ণয়ের এক পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন যার নাম হল ট্যুরিং টেস্ট।

Alan_Turing_photo১৯৫০ সালে অ্যালান ট্যুরিং তাঁর গবেষণাপত্র “Computer Machinery & Intelligence”-এ প্রথম Turing Test এর কথা বলেন। তাঁর এই গবেষণাপত্রটি মূলত Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল-এর প্রধান সম্মাননা “ট্যুরিং পুরষ্কার” তাঁর নামে। এই পুরষ্কারকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কারও বলা হয়ে থাকে।

অ্যালান ট্যুরিং-এর মজার পরীক্ষাঃ
আলান ট্যুরিং তাঁর গবেষণা পত্রে একটি মজার পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। সেই পরীক্ষাটির নাম ছিল ইমিটেশন গেম (Imitation Game)। গেমটিতে মনে করা যাক, দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বদ্ধ ঘরে একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে আছে। একজন তৃতীয় ব্যক্তিকে বের করতে হবে কোন ঘরে ছেলে আছে এবং কোন ঘরে মেয়ে।

মেয়ে নাকি ছেলে?
মেয়ে নাকি ছেলে?

অনেকের মনে হতে পারে, ধুর এটা কোন ব্যাপার হলো নাকি। কণ্ঠস্বর শুনেই তো বলে দেয়া যাবে কে ছেলে আর কে মেয়ে। কিন্তু ট্যুরিং স্যারের শর্ত ছিল তৃতীয় ব্যক্তিকে ছেলেটি এবং মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে লিখিত আকারে এবং ছেলেটিকে এবং মেয়েটিকেও তৃতীয় ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করতে হবে লিখিত আকারে। তৃতীয় ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করবে লিখিত আকারে এবং ছেলে ও মেয়েটি লিখিত আকারে সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিবে। প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করে তৃতীয় ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিবে কোন ঘরে ছেলে আছে এবং কোন ঘরে মেয়ে। যেহেতু এখানে তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার আছে, তাই এখানে বাহ্যিক বুদ্ধিমত্তার দরকার। এটি মূলত ট্যুরিং টেস্ট এর প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপে তৃতীয় ব্যক্তিকে একই পদ্ধতিতে যন্ত্র এবং মানুষকে আলাদা করতে হয়। যদি পরীক্ষার্থী যন্ত্রটি গ্রহণযোগ্য যুক্তি দিয়ে মানুষ এবং যন্ত্রকে আলাদা করতে পারে তাহলেই বলা যাবে যন্ত্রটির বুদ্ধিমত্তা আছে।

যন্ত্র নাকি মানুষ?
যন্ত্র নাকি মানুষ?

ট্যুরিং টেস্টের ফলাফলঃ
কিছুদিন আগে রাশিয়ার তৈরি Eugene Goostman সুপার কম্পিউটার ট্যুরিং টেস্টে একজন ১৩ বছরের বালকের সমান বুদ্ধির প্রমাণ দেয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় এই সুপার কম্পিউটার ‘ট্যুরিং টেস্টে’ ৩৩ শতাংশ সময় বিচারকদের কাছে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়৷ ট্যুরিং টেস্টে কোন যন্ত্রের সাফল্য এই প্রথম।বিজ্ঞানীরা এই সাফল্যকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।

এদিকে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার স্টিফেন হকিং বলছেন ভিন্ন কথা। উনার ধারণা মতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ঘটানোর তৎপরতা মানবজীবনের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বুদ্ধিমান যন্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষকে। জৈব বিবর্তনের দিক থেকে ধীর গতির মানুষ এ সব যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত যন্ত্র মানুষকে অতিক্রম করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা সত্যি কী না, তার জন্য আমাদের আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।

– তামান্না নিশাত রিনি

Facebook Comments

One thought on “ট্যুরিং টেস্ট – মানুষ বনাম কম্পিউটার”

Leave a Reply