পিপলওয়্যার – বই রিভিউ

গ্র্যাবে আমি বর্তমানে যেই চাকরি করছি, সেখানে আমার কাজ হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট (Engineering Management)। তো এই কাজটির সঙ্গে আমি একদমই অপরিচিত ছিলাম। তারপরও আমার স্বভাবসুলভ আলসেমি, মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও কমনসেন্স ব্যবহার করে কাজ চলে যাচ্ছে। আর এই ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করার পরে আমি বিভিন্ন রকম বইপত্র কেনা ও পড়া শুরু করি। সেসব বইয়ের অন্যতম হচ্ছে Peopleware: Productive Projects and Teams (3rd Edition) ।সম্প্রতি বইটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়ে শেষ করলাম। বইটি প্রথমবার পড়েছিলাম ২০১৫ সালের শেষ দিকে।

একটি টেকনোলজি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের সফলতা কিন্তু টেকনোলজির ওপর নির্ভর করে না, করে মানুষের ওপর – ওই প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করছে, তাদের ওপর। সেই প্রতিষ্ঠান কি গ্রাহকের সঠিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে, সেই সমস্যা কি সঠিকভাবে সমাধান করতে পারবে, নিত্যনতুন উদ্ভাবন করতে পারবে, বিভিন্নরকম সমাধানের মধ্যে সর্বোত্তমটি বেছে নিতে পারবে, দ্রুত ও নির্ভুল (বা কমভুল) প্রোডাক্ট বাজারে আনতে পারবে – এই সবকিছুই নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর। তাই হার্ডওয়্যার কিংবা সফটওয়্যারের চেয়ে পিপলওয়্যার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বইতে লেখকরা তাদের গবেষনালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে সেটিই সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।

বইতে মোট ছয়টি অংশে ৩৯টি অধ্যায় আছে। প্রথম অংশের শিরোনাম হচ্ছে Managing the Human Resource – মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। সেখানে মূলত সফটওয়্যার প্রজেক্টগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কীভাবে সফটওয়্যার তৈরির প্রক্রিয়া হার্ডওয়্যার তৈরির প্রক্রিয়ার চেয়ে আলাদা, সেখানে সফটওয়্যারের গুনগত মান নিশ্চিতকরণ কতটা জরুরী, এই বিষয়ে গ্রাহকদের দৃষ্টিভঙ্গী কী, ম্যানেজারের করণীয় কী – সেসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। নিম্নমানের সফটওয়্যার কেবল গ্রাহকদের জন্যই সমস্যার সৃষ্টি করে না, বরং সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের হতাশার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে তাই গুনগত মান নিশ্চিতকরণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই সাথে চ্যালেঞ্জিংও বটে। আর গুনগত মানের সঙ্গে যেই জিনিসটি অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত, তার নাম হচ্ছে প্রোডাক্টিভিটি (productivity) বা উৎপাদনশীলতা। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীর উৎপাদনশীলতা পরিমাপ করার প্রক্রিয়াটি কিন্তু বেশ অস্পষ্ট ও দুরুহ। সেই বিষয়টিও চমৎকারভাবে আলোচনা করেছেন লেখকদ্বয়।

দ্বিতীয় অংশের নাম হচ্ছে The Office Environment – অর্থাৎ অফিসে কাজের পরিবেশ। একটু আগেই বলেছি, সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের উৎপাদনশীলতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ – দুজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের একই সময় কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে রাখলে দুজনের কাছ থেকে কিন্তু একই আউটপুট পাওয়া যাবে না। অফিসের পরিবেশ কীভাবে প্রোগ্রামারদের কাজের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বইতে সুদীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে। সেসব নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার ভিত্তিতে চমকপ্রদ সব তথ্য বইতে হাজির করা হয়েছে। অফিসের চেয়ার-টেবিল, আলো-বাতাস, হৈ-চৈ, খোলা টেবিল বা বদ্ধ জায়গা, টেলিফোনের শব্দ – এসব কীভাবে একজন সফটওয়্যার নির্মাতার কাজে প্রভাব ফেলে, সেগুলো নিয়ে লেখকদের কিছু মতামত আছে, আর তা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।

তৃতীয় অংশ হচ্ছে The Right People বা সঠিক লোকবল। সফটওয়্যার তৈরি এখন আর কেবল ব্যক্তিবিশেষের মুন্সিয়ানা নয়, বরং এক বা একাধিক দলের ছন্দময় কাজের ফলাফল। তাই এখানে ব্যক্তির চেয়ে দলের ভূমিকা অনেক বেশি। একটি দল গড়ে ওঠে সেই দলের মানুষদের নিয়ে, তাই দলের জন্য সঠিক মানুষ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সেসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে বইয়ের এই অংশে। সঠিক মানুষ পাওয়ার পরে তাদের নিয়ে সেরা দল তৈরি করতে হয়। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার অনেকটা ফুটবল দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। দশজন সেরা প্রোগ্রামারকে এক দলে নিয়ে নিলে সেই দল আপনাআপনি ভালো কাজ করার সম্ভাবনা খুব কম। তাই বইয়ের চতুর্থ অংশে লেখকরা এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এই অংশের নাম – Growing Productive Team।

বইয়ের শেষ দুটি অংশের নাম হচ্ছে যথাক্রমে Fertile Soil এবং It’s Supposed to Be Fun to Work Here। উর্বর জমিতে যেমন সোনালী ফসল হেসে ওঠে, তেমনি সঠিক ও সুন্দর কাজের পরিবেশে প্রোগ্রামাররাও অনেক ভালোভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারে। আর এই পরিবেশ এমনি এমনি গড়ে ওঠে না, তার জন্য চাই সেই প্রতিষ্ঠানের সচেতন চেষ্টা। যদিও ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার একটি প্রতিষ্ঠানের মাঝারি পর্যায়ের মানুষ, তারপরও তার হাতে অন্তত তার নিজের দলের জন্য কিছু করার ক্ষমতা থাকে, অন্য দলগুলোকেও প্রভাবিত করার সম্ভাবনা থাকে। তাই সেই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কিছু উপায় বাতলে দেওয়া হয়েছে এই অংশগুলোর বিভিন্ন অধ্যায়ে।

বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি এখনও শিশু পর্যায়ে এবং আমরা অনেকদিন ধরেই শৈশবেই আছি। এর পরের ধাপে যেতে হলে আমাদের দরকার দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট। পিপলওয়্যার বইটি তাই আমাদের সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। বইটি পড়ে সবকিছু রাতারাতি বদলে দেওয়া যাবে না, কিন্তু বদলের প্রয়োজনীয়তাটুকু বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করা যাবে।

 

Facebook Comments

Leave a Reply