রিচার্ড স্টলম্যান – মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের অগ্রনায়ক

আশির দশকের শুরুর দিকের কথা। তখন তথ্য-প্রযুক্তি বিশ্বে শুরু হলো সফট্‌ওয়ার নিয়ে ব্যবসা। কমার্শিয়াল সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো হাত করা শুরু করলো আর্টেফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ল্যাবের বাঘা বাঘা সব প্রোগ্রামারদের। লুকাছাপা শুরু হলো সফটওয়্যারের সোর্স কোড নিয়ে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের সাধ্যের বাইরে চলে গেল দরকারী সব সফটওয়্যার। সফটওয়্যার হয়ে গেল বন্দি। তখন রিচার্ড স্টলম্যান নামের একজন এগিয়ে এলেন সফটওয়্যারের মুক্তির দাবি নিয়ে। তিনি চাইলেন সফটওয়্যার হবে উন্মুক্ত, সবার ব্যবহারের উপযোগী। আজকের এই লেখায় আমরা জানবো মুক্ত সফটওয়্যার ধারণার প্রবর্তক “রিচার্ড স্টলম্যান” সম্পর্কে।

রিচার্ড স্টলম্যান
রিচার্ড স্টলম্যান

তাঁর পুরো নাম রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান। তিনি ১৯৫৩ সালের ১৬ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল স্টলম্যান ছিলেন নিউ ইয়র্কের একটি ছাপাখানার এজেন্ট এবং মা এ্যালিস লিপম্যান ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর কম্পিউটার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির অভ্যাস ছিল। কৈশোরে প্রবেশের আগেই তিনি একবার সামার ক্যাম্পে আইবিএম ৭০৯৪ (IBM 7094)-এর জন্য ম্যানুয়্যাল পড়েন। হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে প্রথম কম্পিউটারের সাথে তাঁর পরিচয় হয় আইবিএম নিউ ইয়র্ক সায়েন্টিফিক সেন্টারে। ১৯৭০ সালে তারা তাদের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে কাজ করার জন্য স্টলম্যানকে নেন। সেখানে তাঁর কাজ ছিল ফোরটার্ন (Fortran) দিয়ে সাংখ্যিক বিশ্লেষণের (নিউমেরিক্যাল অ্যানালাইসিস) একটি প্রোগ্রাম তৈরি করা। রিচার্ড স্টলম্যান মাত্র দুই সপ্তাহে এই কাজটি শেষ করেন এবং গ্রীষ্মকালীন অবসরের বাকি সময়টুকু ব্যয় করেন এপিএল (APL) দিয়ে একটি টেক্স এডিটর এবং আইবিএম-এর জন্য একটি প্রি-প্রসেসর তৈরির কাজে। সেই সময়ে তিনি রকেফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান বিভাগের ভলান্টিয়ার হিসেবেও কাজ শুরু করেন। যদিও তাঁর ধ্যানজ্ঞান গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানকে ঘিরেই ছিলো।

তরুণ স্টলম্যান
তরুণ স্টলম্যান

১৯৭১ সালের জুন মাসে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারে একজন প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। একজন হ্যাকার হিসেবেও তাঁর হাতেখড়ি হয় সেখানেই। তখন কম্পিউটার এবং এর নিরাপত্তা সম্পর্কে যারা খুব দক্ষ ছিলেন তাদেরকে হ্যাকার বলা হতো। হ্যাকিংয়ের যাত্রা শুরু এমএইটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারেই। স্টলম্যান “RMS” নামে খুব অল্প দিনের মাঝে এমআইটি-র হ্যাকার সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, “RMS” তার পুরো নাম রিচার্ড(R) ম্যাথু(M) স্টলম্যান(S)-এর আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি করা সংক্ষিপ্ত রূপ। হ্যাকার হিসেবে তার বেশ কিছু আলোচিত ঘটনাও আছে। ১৯৭৭ সালে এমএইটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারে প্রত্যেক ছাত্রকে কম্পিউটারে লগইন করার জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। স্টলম্যানের এই পাসওয়ার্ডের গঠন মোটেও পছন্দ হয় নি। তিনি পাসওয়ার্ড হ্যাক করে সবার পাসওয়ার্ড তুলে দিয়ে সেই খবর সবাইকে ই-মেইলে জানিয়ে দিলেন। হার্ভার্ডে প্রথম বর্ষে পড়াকালীন সময়ে গণিতের সুপার জিনিয়াস হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
“আমি অনেক আনন্দিত হই, যখন জীবনে প্রথমবারের মত আমি বুঝতে পারি হার্ভার্ডে আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি জায়গা হয়েছে।”

স্টলম্যান- এমআইটির আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ল্যাবে
স্টলম্যান- এমআইটির আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ল্যাবে

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। স্টলম্যান এমআইটি-তে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলেও কিছুদিন পর সেটা বাদ দিয়ে এমআইটির ল্যাবে গবেষণার কাজে তিনি মনোনিবেশ করেন।
এমআইটিতে গ্যারি স্যাসম্যানের সাথে রিসার্চ এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সময় ১৯৭৭ সালে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর একটি পেপার প্রকাশ করেন। পেপারটির শিরোনাম ছিলো , “ডিপেন্ডেন্সি ডাইরেক্টেড ব্যাকট্রাকিং”। ২০০৩ সালে গ্যারি এবং স্টলম্যান এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইন্টেলিজেন্স ব্যাকট্রাকিং পদ্ধতিটিকে আরো সমৃদ্ধ করেন যেটি এখন ইন্টেলিজেন্স ব্যাকট্রাকিং এর সবচেয়ে শক্তিশালি ধরণ হিসেবে গৃহীত।
উজ্জীবিত হ্যাকার সংস্কৃতির মধ্যে কাটছিলো স্টলম্যানের দিনকাল। আশির দশকের শুরুর দিকে এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকলো।প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে সফটওয়্যার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যারের সোর্স কোড বিতরণ করা বন্ধ করে দিতে থাকে এবং একই সাথে কপিরাইটের মাধ্যমে সফটওয়্যাররের কপি বিতরণ করা থেকে ব্যবহারকারীদের বিরত করতে থাকে। এই সময়ে রিচার্ড স্টলম্যানের একদিন জরুরি কিছু কাগজ প্রিন্ট করার সময় জেরক্স ৯৭০০ মডেলের প্রিন্টারে কিছু সমস্যা হয় । প্রিন্টারটি ছিল এর নির্মাতা সংস্থা থেকে বিনামূল্যে পাওয়া। স্টলম্যান প্রিন্টারের উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রিন্টার সফটওয়্যারের সোর্স কোডে কিছু পরিবর্তন করতে চাইলেন, কিন্তু প্রিন্টার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি অনুসারে এমআইটির এআই ল্যাব সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই ঘটনার ফলে তাঁর উপলব্ধি দৃঢ়তর হয় যে, প্রত্যেক ব্যবহারকারীর সফটওয়্যার পরিবর্তন করার অধিকার থাকা উচিত। সেই থেকে মুক্ত সফট্‌ওয়্যার আন্দোলনের শুরু। ১৯৮৩ সালে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের জন্য ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন (এফএসএফ) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি এমআইটির প্রোগ্রামের চাকুরি ছেড়ে শুরু করেন গনু (GNU) প্রকল্পের কাজ।
১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে গনু প্রকল্পের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকাশিত হয় গনু প্রকল্পের ইশতেহার। সেখানে জানানো হয় ইউনিক্সের মত একটি মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম তৈরির করা কথা যেটার সোর্স কোড বিতরণ এবং পরিবর্তন করা যাবে। মুক্ত সফটওয়্যারের বিতরণ এবং রূপান্তর যেন কপিরাইটের হুমকির মুখে না পড়ে সেজন্য স্টলম্যান এক নতুন ধারণার জন্ম দেন যার নাম “কপিলেফ্‌ট”।
নব্বই দশকের শুরুর দিকে গনু অপারেটিং সিস্টেম যখন উন্মুক্ত হবার জন্য অপেক্ষা করছে, তখন দেখা গেলে এর বড় অংশের কাজটিই অসম্পূর্ণ। সেটি হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল তৈরির জটিল অংশের কাজটি সহজ করে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসেন ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিনুস টরভালডস্‌। ইউনিক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম “মিনিক্স” নিয়ে শখের বশে কাজ করতে করতে ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে লিনুস তৈরি করে ফেলেন একটি অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। ফলে গনু অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল হিসেবে একেই বেছে নেয়া হয়। জন্ম নেয় মুক্ত সফটওয়্যার যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র- “লিনাক্স”। লিনাক্স আসার পরপরই মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়। উন্মুক্ত সোর্সকোড ভিত্তিক এই অপারেটিং সিস্টেম কম্পিউটার ব্যবহারকারী এবং প্রোগ্রামারদের সামনে নতুন দ্বার উন্মোচন করে।
ব্যক্তিগত জীবনে রিচার্ড স্টলম্যান অত্যন্ত সাধাসিধে জীবন যাপন করেন। প্রোগ্রামিং, গণিত, পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি এই বিজ্ঞানীর রয়েছে রান্নাবান্না করার শখ। পিডিপি-10 (PDP-10) নামক তাঁর একটি কম্পিউটার আছে। তিনি বলে থাকেন তিনি তাঁর এই কম্পিউটারের সাথে ১০ বছর বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন। তবে ১৯৯৫ সালে মেলিয়েন্ডা রেইড নামক এক তরুণীর প্রেমে তিনি পড়েছিলেন। কিন্তু নানাবিধ কারণে মেলিয়েন্ডার সাথে তাঁর ঘর বাঁধা হয়ে উঠে নি। তিনি বলেনঃ “মেলিয়েন্ডাকে আমি ১৯৯৫ সালে একটি কনফারেন্সে প্রথম দেখতে পাই। সেটি ছিল আমার প্রথম দেখায় প্রেম।”
খৃষ্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি নিজে কোন ধর্মের অনুসারী নন। তাই ২৫শে ডিসেম্বর তিনি ক্রিসমাস পালন না করে গ্র্যাভমাস পালন করেন যা পুরনো ধারার ক্যালেন্ডার অনুসারে স্যার আইজ্যাক নিউটনের জন্মদিন।

স্টলম্যান মাঝে মাঝে কাজ শেষে তিনি তাঁর অফিসেই ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর নেই কোন মোবাইল ফোন। ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে তাঁর কিছুই নেই। তাঁর কোঁকড়া লম্বা চুল এবং সম্মোহিত সবুজ চোখের কারণে তাঁকে “রাসপুটিনের মত” বলা হয়ে থাকে।

ম্যাসাচুসেট ইন্সটিউট অফ টেকনোলজির দশম তলায় তাঁর অফিস এবং সেখানেই তিনি বসবাস করছেন বর্তমানে। ২০১৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে। ঢাকায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশন‍-বাংলাদেশ আয়োজিত “একটি মুক্ত ডিজিটাল সমাজ” শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করেন তিনি। সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেয়ার পর তিনি বলেনঃ “হ্যাপি হ্যাকিং”।

ওয়্যারড ম্যাগজিন তাঁকে বর্তমান কালের জীবিত প্রোগ্রামারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

Facebook Comments

Leave a Reply