লিনাস টরভাল্ডস্

লিনাক্স– একটি শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য অপারেটিং সিস্টেমের নাম। ১৯৯১ সালে ইউনিক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম “মিনিক্স” নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র তৈরি করে ফেলে একটি অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। সেই ছাত্রের নাম লিনাস টরভাল্ডস্‌।

লিনুস টরভাল্ডস্‌
লিনাস টরভাল্ডস্‌

লিনাস বেনেডিক্ট টরভাল্ডস্‌ ১৯৬৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি শহরে  সাংবাদিক বাবা-মার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী তাত্ত্বিক রসায়নবিদ লিনাস পাউলিং এর নামানুসারে তাঁর নামকরণ করা হয় লিনাস। নিজের নাম রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ

 “আমার মনে হয় আমার নাম বিজ্ঞানী লিনাস এবং কার্টুন চরিত্র পিনাটস্‌ এই দুটো মিলিয়ে রাখা হয়েছে, যেটি আমাকে একই সাথে নোবলে পুরষ্কার বিজয়ী রসায়নবিদ এবং কম্বলবাহী কার্টুন চরিত্রে পরিণত করেছে।”

লিনাসের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই ছিলেন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত। লিনাসের বাবা নীলস্‌ টরভাল্ডস্‌ বেতার সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর মা অ্যানা টরভাল্ডস্‌ ফিনল্যান্ডের একটি সংবাদপত্রের অনুবাদক ও সংবাদ গ্রাফিক্সের সাথে যুক্ত ছিলেন। লিনাসের বাবা-মা দুজনেই ১৯৬০-এর দশকে হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বাবা-মা ছাড়াও লিনাসের দাদা ছিলেন ফিনল্যান্ডের একটি সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক এবং চাচা ছিলেন টিভি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। যদিও তাঁদের পরিবার ফিনল্যান্ডের সুইডিশ ভাষী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশ যারা ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যার মাত্র ৫.৫%।

আর দশটা বাচ্চার মতই আনন্দে কাটছিলো লিনাসের রঙিন শৈশব। তাঁর যখন দশ বছর বয়স তখন তাঁর বাবা-মার বিবাহবিচ্ছেদের কারণে তাঁর শৈশব কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর লিনাস মায়ের সাথে চলে আসেন তাঁর নানার বাড়িতে। সেই নানার বাড়িতেই ছোট্ট লিনাসের প্রথম পরিচয় হয় কম্পিউটারের সাথে।

লিনাসের নানা, হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের অধ্যাপক লিও টরেংভেস্ট, সেইসময় শিশু লিনাসের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে টরেংভেস্ট কমোডর ভিক-২০ নামক পারসোনাল কম্পিউটার কিনে নিয়ে আসেন। ছোট্ট লিনাস সেটি নিয়ে সময় কাটানো শুরু করে। কিন্তু খুব কম সংখ্যক প্রোগ্রাম থাকার কারণে লিনাসের সেই কম্পিউটারের প্রতি খুব দ্রত আগ্রহ উবে যায়। সেই সময় লিনাস চিন্তা করলেন, এই কম্পিউটারের জন্য কিছু নতুন প্রোগ্রাম বানালে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। বেসিক (BASIC) নামক প্রোগ্রামিং ভাষায় লিনাস কমোডর ভিক-২০ এর জন্য প্রথম সফল প্রোগ্রাম লিখে ফেললেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১১ বছর। তারপর লিনাস শুরু করলেন কঠিন কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী এ্যাসেম্বলি ভাষায় প্রোগ্রাম লেখার কাজ। সেই থেকে প্রোগ্রামিং এবং গণিত হয়ে উঠলো লিনাস টরভাল্ডস্‌ এর নেশা।

টরভাল্ডস্‌ এর শখ ছিল নিজের একটি কম্পিউটারের। নিজের শখ পূরণের জন্য ১৯৮৭ সালে তাঁর জমানো টাকা দিয়ে তিনি তাঁর প্রথম কম্পিউটার সিনক্লেয়ার কিউএল (Sinclair QL) কিনেন। কিন্তু এটির প্রতিও তিনি খুব দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কারণ এটি পুনরায় প্রোগ্রাম করা সম্ভব ছিলো না এবং এই কম্পিউটারের দরকারি সফট্‌ওয়্যারও ফিনল্যান্ডে সহজলভ্য ছিলো না।

ফিনল্যান্ডের স্কুল-কলেজের পড়াশোনার পার্ট শেষ করে, বাবা-মার পদাঙ্ক অনুসরণ করে লিনাস টরভাল্ডস্‌ ১৯৮৮ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিংকি-তে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথম বর্ষের পরই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় কিছুটা ছেদ পরে। ফিনল্যান্ডের প্রতিটি নাগরিকের মিলিটারি প্রশিক্ষণ নেয়া বাধ্যতামূলক হওয়ার  প্রথম বর্ষের পর ১৯৮৯ সালে লিনাস সেই প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ফিনিস আর্মির “উজিমা” ব্রিগেডে যোগদান করেন। ক্ষেপণাস্ত্র সম্পর্কীয় হিসাবের সাথে তিনি সেই ব্রিগেডে যুক্ত থেকে ১১ মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট পদ অর্জন করেন। সেই সময় লিনাস, প্রফেসর এ্যান্ড্রু ট্যানেনবামের লেখা অপারেটিং সিস্টেমঃ ডিজাইন এন্ড ইমপ্লিমেন্টেশন বইটি কিনে শখের বসে পড়া শুরু করেন। বইটিতে ইউনিক্স অপারেটিং সিস্টেমের ছোট্ট ভার্সন মিনিক্স নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছিলো। এই বইটি লিনাসের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। ইউনিক্সের খুঁটিনাটি জানতে পেরে তিনি মুগ্ধ হন।

যুবক লিনুস
যুবক লিনাস

১৯৯০ সালে লিনাস আবার কম্পিউটার বিজ্ঞানের একাডেমিক পড়াশোনায় ফিরে আসেন। তিনি হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। লিনাসের স্নাতকোত্তরের গবেষণার শিরোনাম ছিল লিনাক্স- অ্যা পোর্টেবল অপারেটিং সিস্টেম। ধারণা করা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

১৯৯১ সালের প্রথমদিক লিনাস আইবিএম এর ইন্টেল ৩৮৬ প্রসেসরসমৃদ্ধ একটি পারসোনাল কম্পিউটার ক্রয় করেন। ইন্টেলের আগের অন্য সব চিপস্‌ এর থেকে এটির চিপস্‌ অনবদ্য হওয়ার কারণে লিনাসের মনে জায়গা করে নেয় এই কম্পিউটারটি। এই কম্পিউটারের জন্য মিনিক্স কপি পাওয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ প্রিন্স অব পারসিয়া খেলে কাটান তিনি যেটি তাঁকে পরবর্তীকালে লিনাক্স নিয়ে কাজ শুরু করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এমএস ডস অপারেটিং সিস্টেম এই কম্পিউটারে থাকার  কারণে লিনাস হতাশ হন। তিনি ঠিক করেন ইউনিক্সের নতুন ভার্সন তৈরি করে তিনি তাঁর কম্পিউটারের জন্য ব্যবহার করবেন।

নতুন একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে যেয়ে লিনাস পড়লেন বিপদে। তিনি ৫০০০ ডলারের নিচে কোন অপারেটিং সিস্টেমের মূল অংশটুকুও পেলেন না। তখন লিনাস সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর নতুন অপারেটিং সিস্টেমটি হবে মিনিক্স এবং ইউনিক্সের মিশেলে তৈরি।

১৯৯১ সালে ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে লিনাস এবং মুক্ত সফট্‌ওয়্যার আন্দোলনের গুরু রিচার্ড স্টলম্যানের সাক্ষাৎ হয়। সেখান থেকেই লিনাস স্টলম্যানের গনু প্রকল্পে কাজ করা শুরু করেন। তাঁর লিনাক্স কার্নেল ভার্সনের জন্য তিনি স্টলম্যানের জেনারেল পাবলিক লাইসেন্স ব্যবহার করেন এবং গনু কম্পাইলার কালেকশনের সোর্স কোডও লেখেন।

১৯৯৭ সালে লিনাস ফিনল্যান্ড থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসেন। সেখানে ট্রান্সমেটা কর্পোরেশানে তিনি ২০০৩ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে তিনি ওপেন সোর্স ডেভেলপমেন্ট ল্যাবে যোগ দেন, যেটি পরে ফ্রি স্টান্ডার্ড গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে লিনাক্স ফাউন্ডেশনে রূপ নেয়।

এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ টিআর১০০ ১৯৯৯ সালে লিনাস টরভাল্ডস্‌-কে বিশ্বের ১০০ জন আবিষ্কারকের মধ্যে প্রথম হিসবে সম্মানিত করে।

২০০৫ সালের ৩ এপ্রিল লিনাস এবং লিনাক্স কার্নেলের ডেভেলপাররা মিলে “গিট” নামক ডিস্ট্রিবিউটেড রিভিশন কন্ট্রোল সিস্টেম উদ্ভাবন করেন।

১৯৯৩ সালে টভ নামের এক জাতীয় কারাটে চ্যাম্পিয়ানের সাথে লিনুসের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাঁরা বিয়ে করেন। বর্তমানে লিনাস এবং টভ তিন কন্যাসন্তানের জনক-জননী।

ব্যক্তিগত জীবনে লিনাস টরভাল্ডস্‌ নিরিবিলি থাকতেই পছন্দ করেন। তাই ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালি ছেড়ে পরিবার নিয়ে তিনি এখন বসবাস করেন পোর্টল্যান্ডে। তাঁর ভাষ্যমতে পোর্টল্যান্ডের পরিবেশ তাঁর শৈশবের হেলসিংকি শহরের মত।

লিনাসের ব্যাক্তিগত মাসকট হচ্ছে একটি পেঙ্গুইন যার ডাকনাম টাক্স, যেটি লিনাক্স কার্নেলের মাসকট হিসেবে লিনাক্স সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে।

অনেক ওপেন সোর্স আইকনের থেকে ভিন্নতাস্বরূপ লিনাস সব সময় নিজেকে আড়ালে রাখেন এবং অন্যান্য প্রতিযোগী সফটওয়্যার পণ্য নিয়ে মতামত দান থেকে সবসময় দূরে থাকেন। যদিও টোরভাল্ডস বিশ্বাস করেন যে “সফটওয়্যার তৈরির সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যার পদ্ধতি”। তারপরও মালিকানাভিত্তিক সফটওয়্যার হলেও তিনি কাজের জন্য সবথেকে ভাল টুলস ব্যবহার করেন । এজন্যই লিনাক্স কার্নেলে মালিকানাভিত্তিক ভার্সন কন্ট্রোল সফটওয়্যার বিটকিপার ব্যবহার এবং তার পক্ষাবলম্বনের জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন।  লিনুসের একটি হলুদ রঙের মার্সিডিজ গাড়ি আছে, যেটির পিছনে লেখা “মিঃ লিনাক্স কিং অফ গিকস্‌”।

লিনুসের গাড়ির লাইসেন্স প্লেট
লিনুসের গাড়ির লাইসেন্স প্লেট

অরিগনের ওপেন সোর্স ডেভেলপমেন্ট গবেষণাগারে লিনাক্স কার্নেল নিয়ে তাঁর গবেষণা করেই  কাটছে লিনুস টরভালডস্‌ এর  বর্তমান দিন।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

Facebook Comments

Leave a Reply