সফটওয়্যার ডেভেলাপার কোথায় পাব

শাহাদাত স্যারের সাথে আমার পরিচয় বছর পাঁচেক আগে। মাঝে-মধ্যে উনার সাথে দেখা সাক্ষাত হয়, কথা হয়। এবং অন্য অনেক মানুষের মতোই উনি বিনা কারণে আমাকে পছন্দ করেন। উনি আবার মুনির হাসান স্যারের বন্ধু। ক্যারিয়ার শুরু করেন বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)-এ শিক্ষকতার মাধ্যমে। পরে কানাডায় পিএইচডি শেষ করে আইবল নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৩ বা ২০০৪ সালে সেটির বাংলাদেশ অফিস খোলেন এবং ২০১০-এ উনি বাংলাদেশে চলে আসেন। এখন কাজ করছেন উনার অপেক্ষাকৃত নতুন কোম্পানী শিওরক্যাশ নিয়ে।

শিওরক্যাশের আগে অফিস ছিল মহাখালী ডিওএইচএস-এ। সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়ে ভালোমন্দ খেয়েছি। কীভাবে কীভাবে যেন আমার যাওয়াটা এমন সময়ে হতো যে আমাকে না খাইয়ে বিদায় করাটা ভালো দেখাত না। তো একবার দেখি খাওয়ার টেবিলে একজন বেশ উৎসাহ নিয়ে আমাকে খাবার পরিবেশন করছে। সে অফিসের টুকটাক অফিশিয়াল কাজ করত, যেমন ব্যাংকে দৌড়াদৌড়ি করা, খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা, ছোটখাট অফিস ম্যানেজমেন্টের কাজ, কিছুদিন আগে দেখলাম অফিশিয়াল ইভেন্টে ছবিও তোলে। তো প্রথম পরিচয় হওয়ার সময় সে আমাকে বলেছিল, স্যার, আপনাকে দেখে চিনতে পেরেছি, আমি আপনার বই পরে প্রোগ্রামিং শিখি। জানতে পারলাম সে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তার প্রোগ্রামিং শেখা, তাও আমার বই পড়ে – বিষয়টা বেশ ভালো লেগেছিল।

তো শাহাদাত স্যার তাঁর শিওরক্যাশের জন্য ব্যাপক পরিমান বিদেশি বিনিয়োগ যোগাড় করেছেন। সেই সাথে বনানীতে নতুন অফিসও নিয়েছেন। সেই অফিসের উপরের তলায় একটা নতুন রেস্টুরেন্ট হয়েছে, সেটার উদ্বোধন উনি করলেন একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে। শনিবার দুপুর বেলা দাওয়াত, আমি তো মহা উৎসাহে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি দেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির হর্তাকর্তাদের একাংশ উপস্থিত! কনা সফটওয়্যারের সিআইও, রিভ সিস্টেমসের সিইও-সহ আরো অনেকে। আমার ব্যাবসায়িক পার্টনার মুক্তসফটের সিইও মাহমুদও চলে এসেছে। তো কাবাব ধরণের একটা খাবার পরিবেশন করা হলো। তারপর অপেক্ষা করছি, লাঞ্চ শুরু হচ্ছে না কেন। বুঝতে পারলাম সবাই কোনো একজনের জন্য অপেক্ষা করছে। বেশ অনেকক্ষণ পরে উপস্থিত হলেন কায়কোবাদ স্যার। সাথে বুয়েটের আরেক শিক্ষক মোস্তফা আকবর স্যার। স্যারদের দেখে আমি মহা খুশি। নিশ্চয়ই এখন খানা শুরু হবে!

IMG_3770
তো খাওয়া-দাওয়ার মাঝে কায়কোবাদ স্যার বিভিন্ন গল্প করছিলেন। হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সুবিন, ইন্ডিয়ার সাথে খেলা দেখছ নাকি?”, আমি জবাব দিলাম, “কোন খেলা স্যার?” উনি আর কথা বাড়ালেন না। আসলে খাওয়া-দাওয়ার সময় আমি সেই ম্যাচের কথা আমি মনে করতে চাচ্ছিলাম না। যাই হোক, ভরপেট খাওয়া হলো।

খাওয়ার পরে আমরা বসলাম আড্ডা দিতে। মূল বিষয়, বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা (মানে দূরবস্থা আর কী)। বিভিন্ন কোম্পানীর শীর্ষ পদের লোকজন – সবারই এক কথা, ভালো প্রোগ্রামার তো পাই না। তো সবার কথাই শুনছিলাম। দেশে এত এত সিএস গ্রাজুয়েট, কিন্তু ভালো প্রোগ্রামার নাই। মনে পড়ে গেল, মুনির হাসান স্যারের ডায়লগ। একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সুবিন, বল তো ‘Water water everywhere, but nor any drop to drink’ এটা কে বলে?” জবাব দিলাম, এটা তো Ancient Mariner-এ কবি Coleridge লিখেছেন। মুনির স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু এটা কে বলে? আমি বললাম, কে বলে? উনি জবাব দিলেন, থাক আমি আর জবাবটা এখানে লিখলাম না। তো যাই হোক, আরো বেশ কিছু আলোচনা হলো। এমন সময় শাহাদাত স্যার আমাকে ধরলেন। সুবিন, তুমি তো কিছু বলছ না। তোমার কাছ থেকে এবার শুনতে চাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “স্যার, চা-কফি’র ব্যবস্থা নাই?” ততক্ষণে দই ও রসমালাই খাওয়া শেষ। পেঁপেঁও ছিল কিন্তু সেটা আর আমার খাওয়া হয়ে ওঠে নাই।

IMG_3797
তো আলোচনা শেষে শিওরক্যাশের অফিস ঘুরে দেখলাম। তারপর সবাই একে একে বিদায় নিচ্ছিল। শাহাদাত স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, কেউ কফি খাবেন? আমি বললাম, স্যার আমি। তো সবার তাড়া ছিল, চলে গেল। কিন্তু আমার কোনো তাড়া নাই। তাই স্যারের সাথে বসে কফি খেলাম, গল্পও হলো অনেক। স্যার বললেন, “সুবিন, শিওরক্যাশের জন্য আমার বিভিন্ন লেভেলের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দরকার। অনেক ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে ফেলেছি। টিম বড় করতে হবে, অনেক কাজও আছে।” আমার মজা করে বলতে ইচ্ছা করছিল, স্যার, প্রতি প্রোগ্রামার এক লাখ টাকা রেফারাল ফি দেন আমাকে, আমি যোগাড় করে দেই। কিন্তু মজা করে বলি নাই এটা। কারণ এটা বললে স্যার সত্যি সত্যি যদি রাজি হয়ে যেতেন, আমি পড়তাম মহা বিপদে। ভালো সফটওয়্যার ডেভেলাপার কোথায় পাব?

Facebook Comments

Leave a Reply