সার্গেই ব্রিন

বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন “গুগল” এর নাম কে না জানে! “গুগল” ও সার্চ ইঞ্জিন আজ সমার্থক শব্দ। এই সার্চ ইঞ্জিন গুগলের অন্যতম কারিগর এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতার নাম সার্গেই ব্রিন। যাকে দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা “নবজাগরনের দূত (Enlightened Men)” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

googleio20111291_610x407

সার্গেই মিখাইলোভিচ্‌ ব্রিন ১৯৭৩ সালের ২১ আগস্ট রাশিয়ার মস্কো শহরে  ইহুদী দম্পতি মিখালি ব্রিন এবং ইউজেনিয়া ব্রিনের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। সার্গেই ব্রিনের বাবা মিখালি ব্রিন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক এবং মা ইউজেনিয়া ব্রিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসায় গবেষক হিসেবে কর্মরত।

সার্গেই ছোটবেলার কিছুসময় মস্কো শহরে বেড়ে উঠেন। রাশিয়া অর্থাৎ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ইহুদীদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়। ইহুদীদের উপর চলমান নির্যাতন এড়াতে ব্রিন পরিবার ১৯৭৯ সালে আমেরিকার মেরীল্যান্ডে চলে আসেন। যদিও আমেরিকায় আসার ব্যাপারে সার্গেই ব্রিনের মায়ের মত ছিলো না।

মেরিল্যান্ডের মন্টেসেরী স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষার সময় সার্গেই ছবি আঁকার শাখায় ভর্তি হন। স্কুলের পড়ার পাশাপাশি গণিতবিদ বাবার উৎসাহে তিনি বাসায় গণিত চর্চা চালিয়ে যান এবং পরিবারের অন্যান্যদের সহায়তায় নিজের মাতৃভাষা রাশিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার পর সার্গেই মেরিল্যান্ডের ইলেনর রুজভেল্ট হাই স্কুলে ভর্তি হন।

বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন
বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন

হাই স্কুল পাশ করার পর ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সার্গেই ব্রিন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিত বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।

স্নাতক শেষ করার পর ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ নিয়ে  সার্গেই ব্রিন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৯৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সার্গেই এর সাথে পরিচয় হয় আরেক জিনিয়াস ল্যারি পেজ-এর। প্রথম প্রথম সার্গেই এবং ল্যারি দুজন কখনোই কোন বিষয়ে  একমত হতে পারতেন না, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেন। দুই বন্ধু মিলে পরবর্তীতে একটি পেপার লেখেন যার শিরোনাম ছিলঃ

“দ্যা এনাটমি অফ অ্যা লার্জ স্কেল হাইপার টেক্সচুয়্যাল ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন।”

এই পেপারটি আজও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তম একটি প্রকাশনা।

দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)
দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)

সার্গেই যখন স্ট্যানফোর্ডে পড়েছিলেন, তখনি ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ডাটা–মাইনিং এবং প্যাটার্ন–এক্সট্রাকসনের উপর তিনি একাধিক পেপার লিখে ফেলেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি সফটওয়ার তৈরী করেন যা টেক্স ফরম্যাটে লেখা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ওয়েব পেইজে রূপান্তর করতে পারে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের বিশাল লিংক ভান্ডার এবং কনটেন্ট নিয়ে পেজ এবং সার্গেই ব্রিন একটি গবেষণা প্রজেক্ট করেন যার নাম দেন ব্যাকরাব (BackRub)। তাঁরা দুইবন্ধু মিলে “পেজ র‍্যাঙ্ক” এ্যালগোরিদম উদ্ভাবন করেন এবং বুঝতে পারেন যে এই এ্যালগোরিদম ব্যবহার করে উচ্চতর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব।

সার্গেই ব্রিন বন্ধু ল্যারি পেজকে সাথে নিয়ে এর পর নেমে গেলেন স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা প্রকল্প হিসেবে সার্চ ইঞ্জিন তৈরির কাজে। ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগলো ল্যারি পেজের ডরমেটরী কক্ষটি। তাঁরা বিভিন্ন সস্তা কম্পিউটারের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ দিয়ে বিভিন্ন ডিভাইস তৈরি করা শুরু করেন। সেই ডিভাইসগুলো দিয়ে তাঁরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের সাথে তাঁদের সার্চ ইঞ্জিনের সংযোগ স্থাপন করেন।

যন্ত্রপাতি তৈরি করতে করতে একসময় ল্যারি পেজের ঘর যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি হয়ে গেল। তাই দুইবন্ধু পেজ এবং ব্রিন এবার চলে এলেন সার্গেই ব্রিনের ডরমেটরিতে। ব্রিনের ডরমেটরি পরিণত হয় তাঁদের অফিস এবং প্রোগ্রামিং সেন্টারে যেখানে তাঁরা তাঁদের সার্চ ইঞ্জিন ওয়েবে কেমন ফলাফল  দিচ্ছে সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিন স্ট্যানফোর্ডের ব্যবহারকারিদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

গাণিতিক ধারণা “গোগোল” এর নাম থেকে ব্রিন-পেজ তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিনের নাম দেন “গুগল”। ১৯৯৪ সালে তাঁদের এক বন্ধুর ব্যক্তিগত গ্যারেজে প্রতিষ্ঠিত হয় গুগলের সার্ভার। ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে “গুগল”-এর প্রাথমিক সংস্করণ সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হলেও নতুন একটি কোম্পানি শুরু করার মত অর্থ দুই বন্ধুর কাছে ছিলো না। ব্রিন এবং পেজ তখন নেমে গেলেন অর্থ যোগানের কাজে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ মিলিয়ন ডলার যোগার করে ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু মিলে তাঁদের কোম্পানি “গুগল ইনকর্পোরেট” শুরু করেন। গুগলের সার্চ রেজাল্ট ঐ সময়ের সার্চ ইঞ্জিনগুলোর চেয়ে ভাল অবস্থান করে ফেলে। সেই থেকে গুগল হয়ে উঠে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন যেটির গড় সার্চ রেট দিনপ্রতি এখন ৫.৯ বিলিয়ন।

গুগল ছাড়াও সার্গেই ব্রিন অন্যান্য কাজের সাথে যুক্ত থাকতে পছন্দ করেন। Google.org এর মাধ্যমে সার্গেই ব্রিন পৃথিবীর পরিবেশ এবং শক্তির রূপান্তর সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন গুগল গ্লাস এবং চালকবিহীন গুগল গাড়ি প্রকল্পের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

২০০৬ সালে সার্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজের গুগল কোম্পানি ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয়।

২০০৭ সালে সার্গেই ব্রিন বায়োটেক বিশেষজ্ঞ এবং উদ্যোক্তা অ্যান উজেকেকি-কে বিয়ে করেন। অ্যানের স্বাস্থ্য  সংক্রান্ত তথ্যের উপর বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি এবং সার্গেই ব্রিন দুজনে মিলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এসব তথ্য ব্যবহার আরো সহজ করার জন্য কাজ করেন। “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট”-এ কাজ করা গবেষকদের মধ্যে ব্রিন এবং অ্যান এর নাম অন্যতম। জেনেটিক, কম্পিউটিং সমস্যা এবং ডাটাবেজে দুইজনের সমান আগ্রহ থাকায় এই দম্পতি “23AndMe” নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।

স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন
স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন

অ্যান এবং ব্রিন দম্পতির সাত বছরের একটি ছেলে এবং চার বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে এই দম্পতি আলাদা বসবাস করছেন।

২০০৮ সালে সার্গেই মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন যেখানে তাঁর মা পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ব্রিন “23AndMe” এর সেবা গ্রহণ করে জানতে পারলেন পারকিনসন্স বংশগত কোন রোগ না হলেও তিনি এবং তাঁর মা ইউজেনিয়া LRRK2 জিনের একটি মিউটেশন বহন করছেন যেটার কারণে ভবিষ্যতে তাঁর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২০%-৮০% । দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা তাঁদেরসম্পাদকীয়তে এ সম্পর্কে লিখেছিলঃ

“ব্রিন মনে করেন LRRK2 এর মিউটেশন হচ্ছে তাঁরব্যক্তিগত কোডের একটি বাগ এবং অন্যান্য কম্পিউটার প্রোগ্রামের বাগের মত একজন গুগল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি প্রতিদিনই এই বাগটি ঠিক করে যাচ্ছেন।”

সার্গেই ব্রিন যৌথভাবে ল্যারি পেজের সাথে দুইটি বোয়িং জেটের মালিক। বিমান দুটিতে পরীক্ষালব্ধ উপাত্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নাসা স্থাপন করে দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাটলসে বর্তমানে সার্গেই ব্রিন বসবাস করছেন। স্নাতকোত্তর পড়া শেষ হবার পর যদিও তিনি পিএইচডি করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু সেই পিএইচডি তাঁর শেষ করা হয়ে উঠেনি। ২০০৮ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে বিরতি গ্রহন করছেন। ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালে ফোর্বস্‌ সাময়িকী যৌথভাবে তাঁকে পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ টিআর১০০ এর ঘোষণা অনুযায়ী ৩৫ বছরের কম বয়সী ১০০ জন আবিষ্কারকের তালিকায় আসেন। ২০১৪ সালে ব্যক্তিগত ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্পত্তির মালিক হিসেবে ফোর্বস্‌ সাময়িকি সার্গেই ব্রিনকে বিশ্বের ২০তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

Facebook Comments

1 thought on “সার্গেই ব্রিন”

Leave a Reply