কোন পথে যে চলি

কম্পিউটার সায়েন্সের গ্রাজুয়েশন শেষ বা শেষের পথে। তখন সবারই চিন্তা-ভাবনা থাকে চাকরী নিয়ে। আমার একজন ক্লাসমেট ও বন্ধু খুব ভাল মোটর সাইকেল চালাতো। প্রায়ই তার মোটর সাইকেলে চড়ে এদিক-সেদিক যেতাম। তার আবার এমনিতেই টেনশন একটু বেশি, সিরিয়াস টাইপের ছেলে তো। তো ফোর্থ ইয়ারে যখন পড়ি, তখন একদিন তার মোটরসাইকেলের পিছনে বসে ভার্সিটি থেকে শহরে যাচ্ছিলাম। তখন তার টেনশনের পরীক্ষা নিতে আমি পিছনে বসে কথা শুরু করলাম। “দোস্ত, চাকরির অবস্থা তো খুবই খারাপ, দেশে সফটওয়্যার কোম্পানী ছাড়া আমাদের অপশন নাই, আবার সফটওয়্যার কোম্পানীও বেশি নাই। বেতনও খুব কম। আর প্রাইভেট ভার্সিটিরও যে টিচার হব, সেই জিপিএ কী আমাদের আছে”। ঠাস করে সে ব্রেক কষল। তারপরও সামনের রিকশার সাথে ধাক্কাটা এড়াতে পারল না। জীবনে প্রথমবার আমি তাকে দেখলাম যে সে মোটর সাইকেল চালাতে কোনো ভুল করল।

confusion-311388_640

তো এখন আমি যেটা দেখি, সবাই একটা বিষয় নিয়ে খুব দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। পিএইচপি নাকি জাভা? এন্ড্রয়েড অ্যাপ নাকি পাইথন? আবার অনেকের ধারণা, ডট নেটে কাজ করতে না পারলে তার জীবন ব্যর্থ। এরকম কনফিউশন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না, বরং খুবই স্বাভাবিক। কয়েকদিন আগে সরকারের একটা প্রজেক্ট FTFL (Fast Track Future Leader)-এর শেষ সপ্তাহে প্রোগ্রামিং ট্রেনিং দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক মাসের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং (কমিউনিকেশন স্কিল, আদব-কায়দা, সফট স্কিল ও একটু প্রোগ্রামিং স্কিল) শেষে সবার জন্য বিভিন্ন ট্র্যাক দেওয়া হল। আগ্রহ ও দক্ষতার বিচার করে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ট্র্যাকে দেওয়া হলো। সেই ট্র্যাকের উপর ৩ মাসের প্রশিক্ষণ হবে। ট্র্যাকগুলো ছিলো ডট নেট, পিএচইপি (লারাভেল ফ্রেমওয়ার্ক), মোবাইল অ্যাপস্ (অ্যান্ড্রয়েড), জাভা ইত্যাদি। শিক্ষার্থীদের মাঝে এই ট্র্যাক নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক টেনশন! কয়েকজন আমার সাথে কথা বলল, ভাইয়া অমুক ট্র্যাক নিচ্ছি, ভুল করছি না তো?

সত্যি কথা হলো, এখানে আসলে ভুল করার কিছু নাই। সবগুলো সেক্টরেই দক্ষ লোকের প্রচুর চাহিদা। আর বেতনও নির্ধারিত হয় দক্ষতার ভিত্তিতে। ব্যাপারটা এমন না যে পাইথন ডেভেলাপারের বেতন জাভা ডেভেলাপারের চেয়ে বেশি। আসলে যারা কম্পিউটার সায়েন্স পড়ছে বা সদ্য পাস করেছে, তাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত প্রোগ্রামিং নিয়ে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং ভাষা (programming language) বা টেকনোলজি নিয়ে না। দুই বছর পিএচইপিতে কাজ করার পরে হয়ত তার পাইথনে কাজ করতে হতে পারে, কিংবা অ্যান্ড্রয়েডে এক বছর কাজ করার পরে আইফোন অ্যাপ বানানোর কাজও করতে হতে পারে। এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই যাদের সারাজীবন শেখার মানসিকতা নাই, তারা মানে মানে কেটে পড়তে পারে।

আমরা যখন একজন সদ্য পাস করা কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্টের ইন্টারভিউ নেই, আমরা তাকে কীভাবে যাচাই করি? প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক জ্ঞান তার আছে কী না, সে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করেছে কী না, সে ভার্সিটিতে কী কী প্রজেক্ট করেছে এবং সেগুলো নিজে করেছে কী না, অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিংয়ে তার ধারণা ঠিকঠাক আছে কী না, খুব সাধারণ গাণিতিক বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে কী না, ডাটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদম বিষয়ে ধারণা কেমন, অপারেটিং সিস্টেম ও কম্পিউটার আর্কিটেকচার পড়েছে কী না, এসব। আর এসব বিষয় তার ভার্সিটির সিলেবাসেরই অন্তর্গত। কারণ যেই ছেলেটার বা মেয়েটার বেসিক জ্ঞান শক্ত এবং যথেষ্ট প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করেছে (হয় অনেক কনটেস্ট করেছে অথবা প্রজেক্ট করেছে) সে অনায়াসেই নতুন কিছু শিখে নিতে পারবে। পরিশ্রম করার মানসিকতা, ধৈর্য্য ও সাহসটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ারের প্রথম চাকরিতে পার্ল (Perl) প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করতে হত। কিন্তু আমি এই চাকরি নেওয়ার আগে পার্ল জানতাম না। আর ইন্টারভিউতে আমাকে পার্ল নিয়ে কোনো প্রশ্নও করা হয় নি, বরং আমি কী জানতাম, সেটার উপরই প্রশ্ন হয়েছে। তেমনি দ্বিতীয় চাকরিতে মূল কাজ ছিল পিএচইপি ও জাভা স্ক্রিপ্ট। কিন্তু পিএচইপি ও জাভা স্ক্রিপ্টে আমার জ্ঞান ছিল একেবারে সামান্য। তাতে কিন্তু ইন্টারভিউ ফেস করতে কোনো সমস্যা হয় নি। আবার ওই অফিসে এক বছর পিএচইপিতে কাজ করার পরে হঠাৎ আমি (এবং আরো কয়েকজন) নতুন প্রজেক্টে ঢুকে গেলাম যেখানে মূল ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল একশন স্ক্রিপ্ট (action script)। কিছুই পারতাম না, কিন্তু সেটা শিখে নিতে সময় লাগে নি। আমি চাইলে পিএচইপি ছাড়া আমি বাঁচবো না বলে জানালা দিয়ে লাফ দিতে পারতাম, কিন্তু সেটা দেই নাই। আমার অন্য কলিগরাও দেয় নাই। আমার মতো সাধারণ মেধার মানুষেরও ক্যারিয়ার এমন সহজ হওয়ার কারণ ছিল আমি ভার্সিটিতে কয়েক হাজার ঘণ্টা কোড করেছিলাম। আর এখন আমার বেশিরভাগ কাজই পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষায়।

তাই তোমাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে আজকে অমুক ল্যাঙ্গুয়েজ, কালকে তমুক ল্যাঙ্গুয়েজ, জানুয়ারি মাসে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, ফেব্রুয়ারি মাসে এইচটিএমএল না শিখে তোমার বেসিক শক্ত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া। ভার্সিটির ফার্স্ট থেকে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করা, অনেক প্রবলেম সলভ করা। থার্ড ও ফোর্থ ইয়ারে ভালো কয়েকটা প্রজেক্ট করা। এছাড়া বিভিন্ন একটিভিটিতে (activity) জড়িত থাকা, সেটা খেলাধূলা হোক, গানবাজনা কিংবা অন্যকিছু, যেটা তোমার ভালো লাগে।

বেসিক জ্ঞান শক্ত কর, আত্মবিশ্বাসী হও, আচার-আচরণে ভদ্র হও। তোমাদের জন্য শুভকামনা।

অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (২)

অনুপম শ্যাম -এর ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় (ও শেষ) অংশ।

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করতে হবে।

দ্বিতীয় পর্ব :

anupom

সুবিন : ডিজনীর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানীতে কাজ করেছেন, সেখানের অভিজ্ঞতা কেমন? আর স্টার্টআপে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
অনুপম : ডিজনী তে আমি গেমিং ডিভিশন এ কাজ করতাম। ডিজনী বড় কোম্পানি তাই সব কিছুই বড়, অনেক স্তর বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান । আমার ডিজনী তে সর্বশেষ প্রজেক্ট “Star Wars Commander” গেম এ একশ এর কাছাকাছি লোক কাজ করেছে। এভারনোটে মনে হয় প্রায় সব মিলিয়ে ৩৫০ জন কর্মী। আমি ডিজনীর সিইও কে কখনই সামনা সামনি দেখিনি। এভারনোটে আমি প্রায় প্রতিদিন ই সিইও কে দেখি, এমন কি মাঝে মাঝে সে আমাদের জন্য চা কফি ও বানায়।

সুবিন : বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপ তৈরি হচ্ছে, অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চাচ্ছে, যদিও হতে চাওয়া লোকদের তুলনায় হতে পারার লোক বেশ কম। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ কালচার কি ঢাকার তরুণদের প্রভাবিত করছে?
অনুপম : আমার মনে হয় না ব্যাপারটা খারাপ। হয়ত কাজ করার মত ভালো কোম্পানি কম, তাই সবাই নিজেরাই কোম্পানি খুলছে। আবার এখন বাংলাদেশে সবার কাছে ইন্টারনেট, সফটওয়্যার এর মাধ্যমে অনেক সমসার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে, তাই এখনই খুব ভালো সময় স্টার্টআপ এর জন্য। সমস্যা হচ্ছে স্টার্টআপ এর জন্য যে স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম এর প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো নেই। শুরুটা একটু এবড়ো-থেবড়ো হবেই, যেরকম হচ্ছে। যারা এর মধ্যেও যারা চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। দুই-একটা প্রাথমিক সাফল্য আসলে আমার মনে হয় আস্তে আস্তে ইকো সিস্টেমও হয়ে যাবে।
একটা বিষয় হচ্ছে যেটা আমার মনে হয় খুব একটা ভালো ফল নিয়ে আসবে না, তা হচ্ছে ফ্রীলান্সিং কে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্রীলান্সিং তো বড় মাত্রায় ইন্ডাস্ট্রি করার ব্যাপার না, এতে বরং হিতে বিপরীত হবে । বরং সরকারের উচিত হবে আই টি পার্ক, স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর এই গুলার জন্য কাজ করা।

সুবিন : আপনি তো বই লিখেছেন। বইটের নাম এবং বই লেখার অভিজ্ঞতা যদি পাঠকদের সাথে শেয়ার করতেন। ভবিষ্যতে আরো বই লেখার ইচ্ছা আছে?
অনুপম : বই এর নাম CakePHP Application Development, প্রকাশ হয় Packt Publication, UK থেকে ২০০৭ এ। বই লেখাটা যে এত কষ্টকর হবে তা জানলে হয়ত বই লেখা শুরু করতাম না। কিন্তু একবার যেহেতু বেল তলায় গেছি, ইচ্ছা আছে আরেকবার যাবার, তবে কম্পিউটার সম্পর্কিত বই নাও হতে পারে।

সুবিন : যেই ছেলেটি বা মেয়েটি সবে মাত্র কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে (বা কাছাকাছি কোনো বিষয়ে) ভর্তি হল, সে আপনার কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে আপনি কী বলবেন?
অনুপম : কম্পিউটার বিজ্ঞান অনেক বড় বিষয়, তার মধ্যে কিছু জিনিস আমাদের ভালো লাগবে, আর কিছু খুব বেশি ভালো লাগবে না। কিন্তু কোনো একটা বিষয়ে ভালো দখল রাখতে হলে গভীরতা এবং চত্তড়াই (Depth এন্ড Breadth) দুটোই দরকার। যে গুলো ভালো লাগবে ওগুলো তে পুরো গভীরে যাও, যা খুব একটা ভালো লাগবে না তাও ভালো করে জেনে রাখো, এক সময় দেখবে ওটাও কাজে লাগবে। সবগুলো বিষয়ই কিন্তু আসলে একই সুতোয় গাঁথা, এটা প্রথম দিকে খুব একটা স্পষ্ট নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই আসলে ভাবতে শুরু করা উচিত তুমি পাস করে কি করতে চাও, এটা জানা থাকলে নিজেকে তার জন্য তৈরি করাটা অনেক সহজ হবে। এই প্রশ্নের উত্তর বের করা টাও কিন্তু বেশ কঠিন, তার জন্য আসলে সবার আগে জানতে হবে তোমার সামনে কি কি করার মতো বিকল্প আছে। তুমি পাশ করে বাইরে এসে মাস্টার্স করতে পারো, তারপর চাইলে একাডেমিয়া তে রিসার্চ করতে পারো, দেশের কোন ভালো সফটওয়্যার কোম্পানিতেও চাকরি করতে পারো, আবার নিজেই কোন সফটওয়্যার ফার্ম দিতে পারো। অনেকে চাকরি নিয়ে সরাসরি বাইরের গুগল, মাইক্রোসফট এর মতো বড় বড় কোম্পানি তে চলে আসছে, সফটওয়্যারে চাকরির বাজার এখন পুরোই আন্তর্জাতিক, চাইলে সেটাও করতে পারো। এরকম আরও অনেক কিছুই করার মতো আছে। এটা ঠিক করে নিলে তুমি কোনটাকে প্রাধান্য দিবে সেটা বের করা সহজ হয়ে যায়।
আমি যখন পড়েছি তখন কিন্তু এতো কিছু বুঝিনি, পরে ঠেকে শিখেছি। Generalized পরামর্শ দেয়া টা আসলে কঠিন। এই পরামর্শ গুলো আমি তখনকার আমাকে ভেবেই দিলাম, হয়তো এখনকার কারো কাজে লাগবে।

সুবিন : ছোটবেলায় কোন কোন স্কুল ও কলেজে পড়েছেন?
অনুপম : ব্লু বার্ড হাই স্কুল সিলেট (প্রাইমারি), সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (এস.এস.সি. পর্যন্ত) তারপর এম.সি. কলেজ সিলেট ।

সুবিন : ভার্সিটিতে লেখাপড়া কেমন লাগত?
অনুপম : ভার্সিটিতে প্রথম দুই/তিন সেমিস্টার এর পর লেখাপড়া খুব একটা করা হয় নি । তৃতীয় সেমিস্টার থেকে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করা শুরু করি, তারপর থেকে পড়ালেখা পুরোটাই নিম্নগামি। পড়ালেখার বেপারে আরেকটু সিরিয়াস হলে মনে হয় ভালো হত।

সুবিন : প্রোগ্রামিং হচ্ছে করার জিনিস, মানে একটা স্কিল। যেটা শিখে করতে হয়। কিন্তু আমরা তো স্কুল-কলেজে আসলে তেমন কিছু শিখি না, বই মুখস্থ করা ছাড়া। এ বিষয়ে আপনার কী মন্তব্য?
অনুপম : বই মুখস্থ করে জিপিএ ফাইভ আর গোল্ডেন এ পাওয়া যায় কিন্তু আসলে দীর্ঘমেয়াদে এতে নিজেদের কোনো লাভ হচ্ছে না। পাঠক্রমের বাইরের বিষয়াদি তে ছেলেমেয়েদের উত্সাহী করলে হয়ত আমরা বড় ছবিটা ছোট থেকেই দেখতে শেখবো । স্কুল-কলেজের সমান্তরালে যে ম্যাথ/ফিজিক্স অলিম্পিয়াড হচ্ছে, সেগুলো খুব ভালো উদ্যোগ। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মত প্রতিষ্ঠান ও এই ক্ষেত্রে খুব ভালো ভুমিকা রাখছে। আমাদের এই ভালো জিনিস গুলো আরো ছড়িয়ে দিতে হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটাই তরুণ। এদের একটা ক্ষুদ্র অংশকেও যদি আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আকৃষ্ট করতে পারি, আমরা অনেকদূর এগিয়ে যাব। সেটা কিভাবে সম্ভব?

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

অনুপম : আমার মনে হয় আমাদের সহজ পথ না খুঁজে লং টার্ম প্ল্যান করতে হবে। আরো বেশি বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে হবে। শুধু quantity বৃদ্ধি করে আসলে খুব একটা লাভ হবে না, আমাদের high quality resource তৈরী করতে হবে large scale এ। এর জন্য মনে হয় ভালো বিশ্ব মানের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের বিকল্প নেই। তিন – চার মাসের ট্রেনিং দিয়ে সেটা করা সম্ভব না। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা এমনিতেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উত্সাহী , আমেরিকার মত না। ঠিক মত প্লাটফর্ম পেলে আমরা অনেক দূর যাব।

অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (১)

অনুপম শ্যাম হচ্ছেন আমি যাদের সাথে সরাসরি কাজ করেছি, তাদের মধ্যে সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের অন্যতম। ট্রিপার্ট ল্যাবে আমরা সহকর্মী ছিলাম। বর্তমানে অনুপম সিলিকন ভ্যালীতে থাকেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে অনুপমদা’র একটি ইন্টাভিউ যদি নেওয়া যায়, তাহলে আমাদের দেশের তরুন শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারবে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ইন্টারভিউটি থেকে আমি নিজেই অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আরেকটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে উনি একটু লাজুক স্বভাবের হওয়ায় ইন্টারভিউ’র জন্য রাজি করাতে আমার পাঁচ মিনিট সময় খরচ করতে হয়েছে। ইন্টারভিউটা একটু বড়, তাই দুটি অংশে ভাগ করেছি। আজকে প্রথম অংশ প্রকাশ করলাম।

anupom

সুবিন : আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
অনুপম : আমি এখন কাজ করছি এভারনোট নামের একটা স্টার্টআপ এ। এভারনোট একটি ক্লাউড বেসড ওয়ার্কস্পেস এপ্লিকেশন/সার্ভিস।

সুবিন : কোন টেকনোলজিতে কাজ করছেন?
অনুপম : আমি কাজ করি প্লাটফর্ম টীম এ, আমাদের কাজ হচ্ছে এভারনোট এর ব্যাকএন্ড প্লাটফর্ম এর স্ক্যালাবিলিটি, স্টাবিলিটি, সিকিউরিটি, আর পারফর্মেন্স নিয়ে। টেকনোলজি মূলত জাভা, কাউচবেস, মাইসিকুয়েল, লুসিন, হাডুপ।

সুবিন : প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করলেন কবে?
অনুপম : ১৯৯৮ সালে । ক্লাস ৭/৮ এ থাকতে মামার বাসায় কিছু কম্পিউটার সম্পর্কিত বই/ম্যাগাজিন পাই, তখন যা হাতের কাছে পেতাম তাই পড়তাম। ওখান থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে আগ্রহের শুরু। পরে এস.এস.সি পরীক্ষার পর কম্পিউটার ক্লাস এ ভর্তি হই, “সি” এর বই কিনি (Teach Yourself C – Herbert Schildt) আর নিজে নিজেই শখের বশে বই পরে প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি।

সুবিন : প্রফেশনাল প্রোগ্রামিংয়ে কবে থেকে যুক্ত হলেন?
অনুপম : ২০০৪ এর দিকে কিছু ছোট খাটো ফ্রিল্যান্স কাজ দিয়ে। তখন আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে স্ফুরণ টেক নামএ একটা স্টার্টআপ শুরু করি। আমরা শুরুতে মোবাইল এর জন্য এপ্লিকেশন/গেম বানাতাম। ওই সময় আমরা বাংলা তে এস.এম.এস. করার জন্য ও একটা সফটওয়্যার বানাই।

সুবিন : ওইসময়ে স্টার্টআপ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অনুপম : আমাদের কে কেউ পাত্তা দিত না। এই পিচ্চি রা আবার কি করবে এই রকম অবস্থা। আর তখন সবার এত তথ্যপ্রযুক্তি/স্টার্টআপ এই বিষয়ে ধারণা ও ছিল না। তো একবার আমরা ২০০৪ এ একটা সফটওয়্যার বিক্রি করার জন্য প্রেজেন্টেশন দিতে যাই তখনকার সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি তে। প্রথম দিকে সবাই তো অবাক এত ছোট ছোট ছেলেপেলেরা কি করতে আসছে এইখানে। পরিচালক পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন ওই মিটিং এ। মনে আছে প্রেজেন্টেশন শেষে কোনো এক উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হাত তালি দিয়ে বলেছিলেন “You guys are young guns, I am really impressed” । এক ধাক্কায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক উপরে উঠে যায় উনার ওই কথায়। তো ভালো খারাপ মিলিয়ে খুবই এক কথায় খুবই দু: সাহসিক ছিল পুরো ব্যাপারটা সেই সময়ের জন্যে।

সুবিন : সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে হলে কি কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে?
অনুপম : ছোট উত্তর: সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে কম্পিউটার সাইন্স পড়তে হবে না। বড় উত্তর : কেউ যদি জানে যে সে সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে চায় তাহলে অন্য কোনো সাবজেক্ট না পড়ে কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে পড়তে পারলেই ভালো। তাতে সময় এর ভালো ব্যবহার হবে, অন্য বিষয়ে পড়লে সেই শেখাটা যদি বাস্তবিক ভাবে কোনো কাজে লাগানো না হয় তাহলে তো সেটার খুব একটা অর্থপূর্ণ প্রয়োগ হলো না। কেউ যদি অন্য কোনো বিষয় এ পড়ে তাহলে তাকে কষ্ট অনেক বেশি করতে হবে, যদিও প্রচন্ড আগ্রহ থাকলে সেটা কোনো ব্যাপার না। নিজে থেকে কোনো কিছু শেখা টা খুবই অনানুষ্ঠানিক আর অসংঘটিত, যে কারনে শেখার মাঝখানে ফাঁক থেকে যেতে পারে। এখন অনেক কোর্স ই অনলাইন এ সুলভ, কেউ যদি চায় তাহলে নিজেই কোনো একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এর সিলেবাস অনুসরণ করে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। শুধু প্রোগ্রামিং লেঙ্গুয়েজ শিখেই কিন্তু সফটওয়্যার ডেভেলপ করা যায়। কিন্তু এলগরিদম , ডাটা স্ট্রাকচার, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটার আর্কিটেকচার, নেটওয়ার্কিং, ডাটাবেস, বিচ্ছিন্ন গণিত এগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে যেতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে কম্পিউটার সাইন্স এর ডিগ্রীধারী মনেও যে সে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার তা না। প্রবল ইচ্ছা আর আগ্রহ থাকা টাই জরুরী। মানে আগ্রহ থাকলে ডিগ্রী না থাকলেও চলবে, কিন্তু উল্টো টা সত্য না। আমার দেখা ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার এর মধ্যে কয়েকজন আছে যাদের কম্পিউটার সাইন্স এ কোনো আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই। কিন্তু এই ব্যাপারটা যে কোনো সাধারণ প্রবণতা না সেটা মনে রাখতে হবে।

সুবিন : ট্রিপার্ট ল্যাবের ঢাকা অফিস প্রতিষ্ঠার গল্পটি শুনতে চাই।
অনুপম : গল্পটা একদম শুরু থেকে বলি। আমি তখন প্রোগ্রামিং বিষয়ক ব্লগিং করতাম মোটামোটি নিয়মিত ভাবে। ২০০৭ এর জানুয়ারী এর দিকে ব্লগ এর মাধ্যমে একটা মেসেজ পাই, সিলিকন ভ্যালি এর মেনলো পার্ক এর একটা স্টার্টআপ থেকে, ওরা তখন ওদের সদ্য শুরু করা স্টার্টআপ এর জন্য ডেভেলপার খুজছিল, অনলাইনে সার্চ এ কোনো ভাবে আমার ব্লগ পায়, ব্লগ পড়ে ওদের মনে হয় যে আমি কাজ করতে পারব। তো ওরা আমাকে বলে আমি আগ্রহী কিনা, তখন আমার পকেট এর অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, বাসা থেকে remotely কাজ করতে পারব, মার্কিন স্টার্টআপ টাকা পয়সা ভালোই দিবে, আমার দিক থেকে আগ্রহ না থাকার কোনো কারণ ই ছিল না, আমি জানাই সেটা। ওরা তখনই একটা ইন্টারভিউ দিতে বলে তো, আমার তখন বাজে রাত ১ টার মতো। যাই হউক ওদের সিটিও ইন্টারভিউ নেয়, আমি ঘুমকাতুরে অবস্থায় মশার কামর খেতে খেতে কিছু একটা ইন্টারভিউ দেই। এরপর ওরা ওই দিনই আমাকে কাজ শুরু করতে বলে, আমি ওই স্টার্টআপ এর প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এর পরদিন থেকেই কাজ শুরু করে দেই। প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ এ এটাকে বড় করার – প্রাথমিক ভাবে আরো কয়েকজন কে সাথে নেয়া আর দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ওখানে একটা অফিস প্রতিষ্ঠা করা। আমার শুরু করার মাস কয়েক পরেই বাংলাদেশ থেকে আমার সাথে যোগ দেয় আহসান ভাই, তার পরে হাসিন ভাই, মানজিল ভাই, তপু ভাই । শুরু তে আমাদের কোনো অফিস স্পেস ছিল না, আমরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে, কফি শপে মিটিং করতাম। ২০০৭ এর শেষ দিকে অথবা ২০০৮ এর শুরুর দিকে আমরা প্রথম অফিস স্পেস নেই উত্তরা তে, একটা ২ বেডরুম এর এপার্টমেন্ট, মনে আছে হাসিন ভাই আর অন্যরা খুব খেটেছিল ওই অফিস নেয়ার সময় । তখন বাংলাদেশ থেকে ট্রিপার্ট এ কাজ করে প্রায় ৭/৮ জন। এক বছর এর মধ্যেই সেই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৮ জনে, আমরা তখন পুরনো ছোট অফিস ছেড়ে আরেকটু বড় অফিস মানে বড় বাসায় উঠি। ব্যবসার দিক দিয়ে তখন ট্রিপার্ট ভালো করছিল, ওয়েব আর মোবাইল গেমস আর এপস গুলো মোটামোটি ভাবে সফল। ২০০৯ এর শুরুর দিকে আমরা আবার অফিস বদলাই, এবার প্রথম বারের মত সত্যিকারের অফিস স্পেসে উঠলাম। এই অফিস সেটআপ এর সময় মনে আছে আমি ডেইলি স্ক্রাম করতাম বাথরুম এর মিস্ত্রী, ইলেকট্রিসিয়ান, রং এর মিস্ত্রী এদের সাথে, সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ওই সময়কার অনেক মজার গল্প আছে যেগুলো অন্য সময় বলা যাবে। যাই হোক বাংলাদেশ থেকে তখন ট্রিপার্ট এ কাজ করে ৩২ জন এর মত। নতুন কাউকে নেয়ার ব্যাপারে আমরা খুবই খুঁতখুঁতে ছিলাম। আমাদের ইন্টারভিউ প্রসেস ও ছিল অন্যরকম , ওটার গল্পও আরেকদিন হবে। কালচারিলি ট্রিপার্ট ছিল অনন্য – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক সিডিউল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অল হ্যান্ডস মিটিং, যত খুশি তত ছুটি, ওপেন ওয়ার্কিং স্পেস, আউটিং – আরো অনেক কিছু যেগুলো তখনকার বাংলাদেশের কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির জন্য ছিলো অকল্পনীয়। যেকারণে আমরা তখন আরো বেশ ভালো কিছু মানুষ কেও পেয়ে যাই আমাদের সাথে। সুবিন ভাই (যিনি এখন আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন) তিনিও ছিলেন তখন আমাদের সাথে, উনার একটি বিশেষ নাম আছে এবং সেই নামের সার্থকতার কাহিনী উনার কাছ থেকেই আগ্রহীরা জেনে নিবেন । আমরা সবাই মিলেই আসলে একটা কালচার তৈরি করতে পেরেছিলাম যেখানে আমরা নিজেরা প্রত্যেক দিন কাজ করতে যেতে চাবো। সব কিছুর উপরে আমরা মনে রাখতাম যে আমরা আমাদের দেশ কে প্রতিনিধিত্ব করছি, অনেক রাজনৈতিক আর অবকাঠামোগত বাধা বিপত্তি ছিল, কিন্তু আমরা কখনো ওগুলো কে সমস্যা হিসেবে দেখাতাম না। ট্রিপার্ট ছিল একটা বড় পরিবারের মতো, এখনো আমরা আছি, যদিও এক এক জন একেক জায়গায়। ২০০৯ এর নভেম্বরে ট্রিপার্ট ল্যাব্স কে কেনে ফেলে প্লেডম নামের আরেকটি কোম্পানি। আসলে যখন কিছু ভালো লোক কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একসাথে কাজ করে তাহলে ভালো কিছুই হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলাপার এবং সিলিকন ভ্যালির সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের স্কিল ও প্রফেশনালিজমের মধ্যে তুলনা করলে আমরা কি পিছিয়ে আছি? যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে কীভাবে কাজ করলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব?
অনুপম : প্রোগ্রামিং স্কিলে আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই। আমরা কিছুটা “Tunnel vision” এ আক্রান্ত, সাধারণত একটু দূরদৃষ্টিহীন এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Myopic and short-term goal driven), যে কারণে অনেক সময়ই আমরা বড় ছবিটা (Big picture) দেখতে পাই না। আমার মনে হয় আমাদের কে বেশি করে “কেনো ?” এই প্রশ্ন টা করতে হবে এবং এর উত্তরটা জানতে হবে, তাহলেই হবে । সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসলে প্রোগ্রামিং স্কিল ছাড়াও আরো অনেক সফট স্কিলস এর দরকার হয়, যেগুলোতে আমরা আসলে খুব একটা জোর দেই না। আমরা যদি এর গুরুত্ব টা বুঝতে পারি তাহলেই অনেক দূর এগিয়ে যাব ।
প্রফেশনালিজমে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এটা আসলে আমাদের কে সম্মিলিতভাবে উন্নত করতে হবে। আমেরিকা তে প্রত্যেক বছর সামার এ ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কোম্পানি তে ইন্টার্নশীপ করে, এর বদলে ক্রেডিট পায় । আমার মনে হয় আমাদের দেশেও এটা চালু করা দরকার, এর জন্য সফটওয়্যার কোম্পানি গুলোরই প্রথমে এগিয়ে আসা উচিত, তাতে এদেরই লাভ বেশি । এতে চাকরি জীবন শুরু করার আগেই প্রফেশনাল এনভায়রনমেন্ট সম্পর্কে সবার একটা ধারণা হবে, অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দের কাছ থেকে পরামর্শ আর প্রশিক্ষণ পাবে । প্রাথমিক ভাবে হয়ত সবাই কে স্থান সঙ্কুলান করা সম্ভব হবে না, আমাদের হয়ত এত বেশি সফটওয়্যার কোম্পানি নেই, যত টুকু হবে তাতেই লাভ। তাছাড়াও আমার মনে হয় প্রফেশনালিজমের সজ্ঞাও আমাদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার না। প্রফেশনালিজম নিয়ে আমরা বেশি বেশি করে কথা বলতে পারি তাতে হয়ত সবার কাছে বেপারটা পরিষ্কার হবে। ট্রিপার্ট এ আমরা একটা কথা প্রায়ই বলতাম “নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড”, এটা দিয়ে আসলে আমরা Accountability, Efficiency, Ownership, Communicativeness এই গুলোই বোঝাতাম।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সিলিকন ভ্যালির সবাই যে বাংলাদেশ এর ডেভেলপারদের চেয়ে ভালো তা না। কিন্তু ওদের টপ ২০% আমাদের টপ ১০% থেকে গড়পরতায় ভালো। আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই, আমাদের গন্তব্য টা কে একটু উপরে তুলতে হবে, যেখানে আছি সেখানে বসে পড়লে হবে না।

পরবর্তি অংশ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করতে হবে।

কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে শুরু করব?

তোমাদের অনেকেরই এটি প্রশ্ন, ‘প্রোগ্রামিং শিখতে চাই, কোন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে শুরু করব’? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই এই পোস্ট।

তোমার বয়স যদি ১০-এর নিচে হয়, অর্থাৎ, তুমি যদি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী হও, তোমার জন্য বেশ কিছু অপশন রয়েছে। তার মধ্যে আমার মতে এমআইটি’র স্ক্রাচ একটা ভালো টুল, তোমার প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করার জন্য।

prog-lang

তুমি যদি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী হও, তাহলে তোমার জন্য দুইটা অপশন, সি অথবা পাইথন। পাইথন দিয়ে শুরু করা সহজ। এটি বেশ আধুনিক একটি ল্যাঙ্গুয়েজ। এটি শেখার পরে তুমি গুই (গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস) সমৃদ্ধ  ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন, গেমস (পাইগেমস), কিংবা ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পারবে। কাজগুলো করে বেশ মজাও পাবে। আর তুমি যদি বীজগণিতে বেশ পাকা হও, তুমি সি শিখতে পারো। সি শিখলে তুমি ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে পারবে (পাইথন সেখানে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না)। আবার কলেজে আইসিটি কোর্সে সি আছে, তাই সেটাও তোমার আগেভাগে করা হয়ে যাবে। তবে সি দিয়ে কিন্তু ডেস্কটপ অ্যাপ, গেমস কিংবা ওয়েব অ্যাপ বানানো খুব কষ্ট, তাই সেগুলা সহজে করা যাবে না। প্রোগ্রামিং করতে হলে যে সেগুলো করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। ইন্টারনেটে হাজার হাজার প্রোগ্রামিং সমস্যা আছে, যেগুলো তুমি সি দিয়ে সমাধান করতে পার। আর সেগুলোর সমাধান করতে করতে তিন-চার বছর কাটিয়ে দেওয়া কোনো ব্যাপারই না। আর বিশ্বমানের প্রোগ্রামার হতে হলে টুকটাক অ্যাপ, গেমস্ এসব তৈরি না করে প্রবলেম সলভিংয়েই জোর দেওয়া উচিত।

তুমি যদি কলেজের শিক্ষার্থী হও, তাহলে অবশ্যই সি শেখো। কারণ কলেজের আইসিটি কোর্সে এমনিতেই সি শিখতে হবে। তাই দুইটা ল্যাঙ্গুয়েজ একই সময়ে শেখার কোনো দরকার নাই।

তুমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী হও, তাহলে সি দিয়ে শুরু করাটাই ভালো। ভালোমতো সি শিখলে বুঝতে পারবে যে কম্পিউটার আসলে কিভাবে কাজ করে। এটা আমার নিজস্ব মতামত, কেউ কেউ অবশ্য পাইথন দিয়ে শুরু করার পক্ষে।

তুমি যদি কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী না হও, কিন্তু অন্য কোনো প্রয়োজনে কিংবা শখের বশে প্রোগ্রামিং শিখতে চাও, তাহলে আমি পাইথন শিখতে বলব।

কিছু দরকারি লিঙ্ক :

পাইথন শেখার ডিভিডি

সম্প্রতি পাইথন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শেখার ডিভিডি বের করেছে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল (http://dimikcomputing.com)।

 python-dvd

ডিভিডি পাওয়া যাচ্ছে হক লাইব্রেরি (নীলক্ষেত, ঢাকা), কম্পিউটার জগৎ (আইডিবি ভবন, আগারগাঁও, ঢাকা) ও রকমারি ডট কম-এ। এছাড়া যারা একসাথে বেশি সংখ্যক ডিভিডি কিনতে চান, তারা দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলে সরাসরি যোগাযোগ করুন (ফোন: 01913884948)।

ডিভিডি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য :

বিষয়বস্তুঃ
পাইথন বর্তমানে একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। প্রফেশনাল কাজে যেমন পাইথনের ব্যবহার বাড়ছে, তেমনি একাডেমিক সেক্টরেও এটিও জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। Coursera-তে বিভিন্ন অনলাইন কোর্সে প্রোগ্রামিং ভাষা হিসেবে পাইথনের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। পাইথন চলে লিনাক্স, ম্যাক ওএসএক্স ও উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে। গুগলের অফিসিয়াল প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজগুলোর একটি হচ্ছে পাইথন। এই কোর্সটিতে যারা মোটামুটি প্রোগ্রামিং জানে তাদেরকে পাইথনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। প্রোগ্রামিংয়ে যারা একেবারেই নতুন তাদের জন্য কোর্সটি উপযোগি নয়। যারা শৌখিন প্রজেক্ট কিংবা প্রফেশনাল প্রজেক্টে পাইথন ব্যবহার করতে চায় তারা এই কোর্সটি দিয়ে পাইথন শেখা শুরু করতে পারে। আর যারা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারাও পাইথনের সাথে পরিচিত হয়ে নিতে পারে এই কোর্সটি দিয়ে।

ডিভিডি কাদের জন্যঃ
যারা প্রোগ্রামিংয়ে একেবারেই নতুন, তাদের কোর্সটি বুঝতে সমস্যা হবে, আবার যারা পাইথনের সাথে ইতিমধ্যে পরিচিত, তাদের তেমন একটা লাভ হবে না কোর্সটি থেকে। কোর্সটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য যারা কমপক্ষে একটি প্রোগ্রামিং কোর্স ভালোভাবে শেষ করেছে। প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক জিনিসগুলোর ব্যাপারে দক্ষ হতে হবে।

সুচিপত্রঃ
ইউনিট ০১ : পাইথনের সূচনা ও কন্ট্রোল ফ্লো
০১.০১ সূচনা
০১.০২ পাইথন কি এবং কেনো?
০১.০৩ পাইথনের ভার্সন
০১.০৪ প্রথম ইউনিটের সিলেবাস
০১.০৫ ভ্যারিয়েবল
০১.০৬ স্ট্রিং – ১
০১.০৭ স্ট্রিং – ২
০১.০৮ লিস্ট
০১.০৯ কন্ডিশনাল লজিক
০১.১০ কন্ডিশনাল লজিক – ২
০১.১১ কন্ট্রোল ফ্লো – ১
০১.১২ কন্ট্রোল ফ্লো – ২
০১.১৩ প্রথম ইউনিটের সমাপ্তি

ইউনিট ০২ : ডাটা স্ট্রাকচার
০২.০১ পাইথনের ডাটা স্ট্রাকচার
০২.০২ ডাটা স্ট্রাকচার কি?
০২.০৩ লিস্ট ডাটা স্ট্রাকচার
০২.০৪ লিস্টের ব্যবহার
০২.০৫ স্ট্যাক ও কিউ হিসেবে লিস্ট
০২.০৬ টাপল ডাটা স্ট্রাকচার
০২.০৭ টাপলের ব্যবহার
০২.০৮ সেট ডাটা স্ট্রাকচার
০২.০৯ সেটের ব্যবহার
০২.১০ ডিকশনারি
০২.১১ ডিকশনারির ব্যবহার
০২.১২ দ্বিতীয় সপ্তাহের সমাপ্তি

ইউনিট ০৩ : পাইথনের মডিউল
০৩.০১ ফাংশন ও মডিউল
০৩.০২ ফাইল থেকে পাইথন স্ক্রিপ্ট চালানো
০৩.০৩ কিবোর্ড থেকে ইনপুট
০৩.০৪ প্যাকেজ ও মডিউল
০৩.০৫ ফাংশন লেখার নিয়ম
০৩.০৬ প্রথম ফাংশন : যোগ
০৩.০৭ ফাংশনের প্যারামিটার
০৩.০৮ ভ্যালু ও রেফারেন্স
০৩.০৯ প্যারামিটারের ডিফল্ট মান
০৩.১০ ফাংশনে একাধিক ভ্যালু রিটার্ন
০৩.১১ ইমপোর্ট
০৩.১২ ইমপোর্ট এর ব্যবহার
০৩.১৩ প্যাকেজ তৈরী করা
০৩.১৪ প্যাকেজের ব্যবহার
০৩.১৫ তৃতীয় সপ্তাহের সমাপ্তি

ইউনিট ০৪ : ইনপুট, আউটপুট ও এক্সেপশন হ্যান্ডলিং
০৪.০১ ইনপুট, আউটপুট, ফাইল ও এক্সেপশন
০৪.০২ স্প্লিট ও জয়েন
০৪.০৩ স্প্লিট ও জয়েনের ব্যবহার
০৪.০৪ স্ট্রিং ফরম্যাটিং
০৪.০৫ স্ট্রিং ফরম্যাটিং – ২
০৪.০৬ ফাইল অপারেশন
০৪.০৭ এক্সেপশন হ্যান্ডলিং
০৪.০৮ ট্রাই ও ক্যাচ
০৪.০৯ চতুর্থ সপ্তাহের সমাপ্তি

ইউনিট ০৫ : পাইথনে অবজেক্ট অরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং
০৫.০১ এই ইউনিটে যা শিখব
০৫.০২ ওওপি এর ধারনা
০৫.০৩ ক্লাস তৈরী করা
০৫.০৪ ক্লাস ও অবজেক্ট
০৫.০৫ অবজেক্ট ও ইনস্ট্যান্স
০৫.০৬ ইনহেরিটেন্স
০৫.০৭ ইনহেরিটেন্সের ব্যবহার
০৫.০৮ ওওপি এর আরো কিছু কথা
০৫.০৯ পঞ্চম ইউনিটের সমাপ্তি

ইউনিট ০৬ : পাইথনের কিছু টুকিটাকি
০৬.০১ এই ইউনিটে যা শিখব
০৬.০২ ইটারেটর
০৬.০৩ জেনারেটর
০৬.০৪ জেনারেটর এক্সপ্রেশন
০৬.০৫ রেগুলার এক্সপ্রেশন
০৬.০৬ পাইথনের বিল্ট-ইন
০৬.০৭ নতুন প্যাকেজ ইনস্টল করা
০৬.০৮ ওয়েব প্রোগ্রামিং

শিক্ষক পরিচিতিঃ
তামিম শাহ্‍রিয়ার সুবিন — শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। বাংলা ভাষায় ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামিং’ নামে একটি বই লিখেছেন (বইটির অনলাইন ভার্শন সবার জন্য উন্মুক্ত http://cpbook.subeen.com)। পাইথনের উপর তাঁর লেখা ব্লগ (http://love-python.blogspot.com/) বেশ জনপ্রিয়। মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড নামে একটি সফটওয়্যার কোম্পানী পরিচালনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে একজন একাডেমিক কাউন্সিলর (ভলান্টিয়ার) হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলের একজন প্রতিষ্ঠাতা।

ডিভিডিহে আর‌ যা যা রয়েছেঃ
– পাইথনের ইন্সটলার সফটওয়্যার।
– ভিডিও প্লে করার জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার।