আলফাগো বনাম লি সেডল – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষ

ডিপ ব্লু-এর পর এবার আলফাগো। আবারো কম্পিউটারের সঙ্গে খেলে মানুষের হার! ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে। গুগলের ডিপমাইন্ড ইউনিটের তৈরি “গো” খেলার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম “আলফাগো” পরপর তিনবার হারিয়ে দিলো ৩৩ বছর বয়সি পেশাদার কিংবদন্তী  “গো” খেলোয়ার লি সিডলকে। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চারটিতেই জিতেছে “আলফাগো”। পরপর তিনবার হারার পর চতুর্থ ম্যাচে এসে জয় পান লি সিডল। এই একটিমাত্র জয়কে তিনি “অমূল্য” হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রথম গেমটিতে হারার পর লি সাংবাদিকদের বলেনঃ “আমি খুবই অবাক হয়েছি। আমি হারবো এটা কখনো ভাবিনি। আলফাগো এত ভাল খেলবে এটা আশা করিনি।”

গো অথবা ষোলগুটি বা বাঘবন্দিঃ

“গো” নামক কয়েক হাজার বছরের পুরানো গেমের উদ্ভব হয় চীনে। খেলাটি অনেকটা আমাদের দেশের ষোলগুটি বা বাঘবন্দি খেলার মত। একটি নির্দিষ্ট বোর্ডে সাদা এবং কালো গুটি নিয়ে দুইপক্ষকে খেলতে হয়। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের গুটি আটকে বোর্ডের দখল নেয়া। যে বোর্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকা দখল করতে পারবে, সেই বিজয়ী। দাবা খেলার সাথে এই খেলার বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে অসংখ্য সম্ভাবনাময় চাল থাকে। কেবলমাত্র গাণিতিক হিসাব করে সম্ভাব্য চাল বের করা অসম্ভব।

“গো” খেলার জন্য গুগল ডিপমাইন্ড “আলফা-গো” কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে। এটির অ্যালগোরিদম মেশিন লার্নিং এবং ট্রি সার্চিং প্রযুক্তি সমন্বয়ে করা হয়েছে। এতে পলিসি এবং ভ্যালু নেটওয়ার্ক হিসেবে দুইটি নিউরাল নেটওয়ার্ক আছে। পলিসি নেটওয়ার্কটি সম্ভাব্য সেরা চালটি দ্রত হিসাব করতে পারে এবং ভ্যালু নেটওয়ার্কটি প্রতিটি চালের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় চালগুলো বাদ দিয়ে সম্ভাব্য চালের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে।মানুষের এই “অপ্রয়োজনীয়” চাল বাদ দেয়ার সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে অবশেষে ভাগ বসালো আলফাগো। আলফাগো-এর প্রাথমিক পর্যায়ে, একে বিভিন্ন এক্সপার্ট গেমারের ঐতিহাসিক গেমের চালগুলো মনে রাখতে বলা হয়েছিল, ৩০ মিলিয়ন চালের একটি ডাটাবেস থেকে। পরবর্তীতে একটি নির্ধারিত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের পর রি-ইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এর সাহায্যে আলফা-গো-এর সক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যে এটি নিজে নিজে খেলার দক্ষতা অর্জন করে।

আলফাগো বনাম লি সেডলঃ

আলফাগো বনাম লি সেডল-এর “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ ম্যাচ” সিওলে ৯ মার্চ-এ শুরু হয়ে ১৫ মার্চ শেষ হয়। প্রথম ম্যাচটিতে আলফাগো জয়লাভ করে যদিও পুরো ম্যাচের বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল লি-এর আধিপত্য। কিন্তু শেষ ২০ মিনিটে আলফাগো আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচ জিতে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খেলার প্রথমদিকে লি  আলফাগো-এর ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ বড়সড় একটি ভুল করে বসেন। সেই ভুলের উত্তরে আলফাগো-এর চালটি ছিল একেবারে নিখুঁত এবং কার্যকরী।

চতুর্থ ম্যাচ, যেটিতে লি জয়লাভ করে মানবজাতির মানসম্মান রক্ষা করে, সেখানেও ৭৮ নাম্বার চাল পর্যন্ত আলফাগো-এর জিতে যাওয়ার সম্ভবনা ছিল ৭০%। কিন্তু ৭৯ নাম্বার চালে ভুল করে ফেলার কারণে আলফাগো বঞ্চিত হয় লি সেডলকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ থেকে।

১৮টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী পেশাদার গো খেলোয়ার লি সেডল ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন যে শুরুর দিকে তিনি আলফাগো-এর খেলোয়াড়ি দক্ষতাকে অবজ্ঞা করেছিলেন। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস বলেন, এ পরাজয় মূল্যবান। কারণ, এ থেকে আমরাও আমাদের প্রোগ্রামের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারবো। “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ”-এর বিজেতা হিসেবে আলফাগো এক মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার জিতে নিয়েছে। ডিপমাইন্ড-এর বিবৃতি অনুযায়ি এই পুরষ্কারের অর্থ ইউনিসেফ, গো অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। ম্যাচ শেষে “সাউথ কোরিয়া গো অ্যাসোসিয়েশন” আলফাগো-কে “গো গ্র্যান্ডমাস্টার” পদবী প্রদান করে।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যান্ড্রুর উপদেশ

অ্যান্ড্রু এংগ (Andrew Ng) আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক। আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে তাঁর মেশিন লার্নিংয়ের ওপর অনলাইন কোর্সটি আমি করেছিলাম। সাস্টে জাফর ইকবাল স্যার যেভাবে ডিসক্রিট ম্যাথ কিংবা ফাইবার অপটিকস্ পড়ান, অ্যান্ড্রুও মেশিন লার্নিংয়ের কোর্স অনেকটা সেভাবেই পড়িয়েছেন। তিনি কোর্সেরা (Coursera)-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে চীনা সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট বাইডুর রিসার্চ সেকশনের প্রধান বিজ্ঞানী। এছাড়া তিনি বিশ্ববিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সম্প্রতি কোরা (Quora)-তে তিনি কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্য একটি উত্তর আমি অনুবাদ করে দিলাম। আশাকরি এটা অনেকের কাজে লাগবে।

n-ANDREW-NG-628x314

প্রশ্ন: শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার উপদেশ কী?
কোন জিনিসের পেছনে ছুটবে, কী কাজে তোমার মূল্যবান সময় ব্যায় করবে – এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমি তোমাকে দুটো জিনিস বিবেচনা করতে বলব –
১) তুমি যেটা করছ বা করতে যাচ্ছ, সেটা সমাজে, কিংবা মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনবে কী না।
২) কাজটি করে তুমি কতটুকু শিখতে পারবে।

এমনকী এখনও আমি কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই দুটো জিনিস বিবেচনা করি।
আমাদের সমাজে অসংখ্য সমস্যা রয়েছে আর তাই সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য অনেক কিছু করার আছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক সহজে কোনো আইডিয়া কিংবা পন্য অনেকের কাছে পৌঁছানো যায়। সঠিক পরিকল্পনা ও সেটার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে একজন মানুষের পক্ষে অনেক অনেক মানুষকে সাহায্য করা সম্ভব। আর এখন তো গণ্ডিটা কেবল নিজের গ্রাম, শহর বা দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব।

তাই নিজেকে প্রশ্ন কর: তুমি যা করার চিন্তা করছ কিংবা স্বপ্ন দেখছ, সেটি যদি সত্যিই সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, এটি কি অনেক মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে? অনেক মানুষকে সাহায্য করবে? উত্তর যদি না হয়, তবে অন্য কিছু করার চিন্তা কর। নয়ত তুমি তোমার মাঝে যে অমিত সম্ভাবনা আছে, তার সঠিক ব্যবহার করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, যখন তুমি তরুণ, নিজের শিক্ষার ব্যাপারে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। আর হ্যাঁ, আমার কাছে “তরুণ”-এর সংজ্ঞা হচ্ছে যার বয়স ১০০ বছরের কম।

যা কিছুই তুমি আজকে শিখবে, সেটা বাকী জীবনে তোমার অনেক কাজে আসবে। কিন্তু এটি খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে তুমি যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তখন কোনো কিছু শেখার পেছনে সময় ব্যায় করে খুব দ্রুত কোনো ফল পাবে না। তোমার সামনে কোনো পরীক্ষা থাকবে না কিংবা কোনো শিক্ষকও তোমাকে পড়ার জন্য তাড়া দেবে না। কিন্তু তুমি যদি নিজেই নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে পার, পড়ার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাও, নতুন আইডিয়া নিয়ে চিন্তা কর, অন্য মানুষদের সাথে আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহন কর (যাদের কাছ থেকে তুমি কিছু শিখতে পার), তাহলে তুমি যে বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছ, কয়েক বছরের মধ্যেই সে বিষয়ে তুমি দক্ষ হতে পারবে। লক্ষ কর, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস নয়, কয়েক বছর।
আমার নিজের কথা যদি বলি, আমি পড়তে পছন্দ করি। আমার কিন্ডেলে (ইবুক পড়ার যন্ত্র) এক হাজারেরও বেশি বই আছে। আমি প্রতি রাতে এবং সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে বই পড়ার পেছনে প্রচুর সময় দেই। একাডেমিক রিসার্চ পেপার, ব্যবসা পরিকল্পনা, ইনোভেশন, জীবনী – আরো অনেক রকমের বই পড়ি। মাঝে মাঝে অনলাইন কোর্স করি। এছাড়া পুরনো কিংবা নতুন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেও অনেক ভালোবাসি এবং তাদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারি।

শিক্ষা গ্রহনের প্রক্রিয়াটাও তোমাকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে সাহায্য করবে যে কী নিয়ে তুমি কাজ করবে। যখন তুমি এমন অনেক উদাহরণ দেখবে যে অন্যরা কীভাবে সমাজ বদলাচ্ছে, তুমি নিজেও অনেক আইডিয়া পাবে যে তুমি কীভাবে দিন বদলের সংগ্রামে যোগ দিতে পার।

আমার বক্তব্যের সারকথা যদি বলি: নিজের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে (সেটা সময় বিনিয়োগ হতে পারে কিংবা অর্থ), এমনকী কষ্ট হলেও সেটা করতে হবে। আর সবসময় সুযোগের সন্ধান করতে হবে যে কীভাবে তুমি এমন কাজ করতে পার যা অন্যকে সাহায্য করবে, সমাজকে বদলে দিবে, পৃথিবীকে বদলে দিবে।

সার্গেই ব্রিন

বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন “গুগল” এর নাম কে না জানে! “গুগল” ও সার্চ ইঞ্জিন আজ সমার্থক শব্দ। এই সার্চ ইঞ্জিন গুগলের অন্যতম কারিগর এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতার নাম সার্গেই ব্রিন। যাকে দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা “নবজাগরনের দূত (Enlightened Men)” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

googleio20111291_610x407

সার্গেই মিখাইলোভিচ্‌ ব্রিন ১৯৭৩ সালের ২১ আগস্ট রাশিয়ার মস্কো শহরে  ইহুদী দম্পতি মিখালি ব্রিন এবং ইউজেনিয়া ব্রিনের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। সার্গেই ব্রিনের বাবা মিখালি ব্রিন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক এবং মা ইউজেনিয়া ব্রিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসায় গবেষক হিসেবে কর্মরত।

সার্গেই ছোটবেলার কিছুসময় মস্কো শহরে বেড়ে উঠেন। রাশিয়া অর্থাৎ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ইহুদীদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়। ইহুদীদের উপর চলমান নির্যাতন এড়াতে ব্রিন পরিবার ১৯৭৯ সালে আমেরিকার মেরীল্যান্ডে চলে আসেন। যদিও আমেরিকায় আসার ব্যাপারে সার্গেই ব্রিনের মায়ের মত ছিলো না।

মেরিল্যান্ডের মন্টেসেরী স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষার সময় সার্গেই ছবি আঁকার শাখায় ভর্তি হন। স্কুলের পড়ার পাশাপাশি গণিতবিদ বাবার উৎসাহে তিনি বাসায় গণিত চর্চা চালিয়ে যান এবং পরিবারের অন্যান্যদের সহায়তায় নিজের মাতৃভাষা রাশিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার পর সার্গেই মেরিল্যান্ডের ইলেনর রুজভেল্ট হাই স্কুলে ভর্তি হন।

বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন
বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন

হাই স্কুল পাশ করার পর ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সার্গেই ব্রিন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিত বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।

স্নাতক শেষ করার পর ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ নিয়ে  সার্গেই ব্রিন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৯৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সার্গেই এর সাথে পরিচয় হয় আরেক জিনিয়াস ল্যারি পেজ-এর। প্রথম প্রথম সার্গেই এবং ল্যারি দুজন কখনোই কোন বিষয়ে  একমত হতে পারতেন না, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেন। দুই বন্ধু মিলে পরবর্তীতে একটি পেপার লেখেন যার শিরোনাম ছিলঃ

“দ্যা এনাটমি অফ অ্যা লার্জ স্কেল হাইপার টেক্সচুয়্যাল ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন।”

এই পেপারটি আজও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তম একটি প্রকাশনা।

দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)
দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)

সার্গেই যখন স্ট্যানফোর্ডে পড়েছিলেন, তখনি ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ডাটা–মাইনিং এবং প্যাটার্ন–এক্সট্রাকসনের উপর তিনি একাধিক পেপার লিখে ফেলেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি সফটওয়ার তৈরী করেন যা টেক্স ফরম্যাটে লেখা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ওয়েব পেইজে রূপান্তর করতে পারে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের বিশাল লিংক ভান্ডার এবং কনটেন্ট নিয়ে পেজ এবং সার্গেই ব্রিন একটি গবেষণা প্রজেক্ট করেন যার নাম দেন ব্যাকরাব (BackRub)। তাঁরা দুইবন্ধু মিলে “পেজ র‍্যাঙ্ক” এ্যালগোরিদম উদ্ভাবন করেন এবং বুঝতে পারেন যে এই এ্যালগোরিদম ব্যবহার করে উচ্চতর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব।

সার্গেই ব্রিন বন্ধু ল্যারি পেজকে সাথে নিয়ে এর পর নেমে গেলেন স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা প্রকল্প হিসেবে সার্চ ইঞ্জিন তৈরির কাজে। ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগলো ল্যারি পেজের ডরমেটরী কক্ষটি। তাঁরা বিভিন্ন সস্তা কম্পিউটারের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ দিয়ে বিভিন্ন ডিভাইস তৈরি করা শুরু করেন। সেই ডিভাইসগুলো দিয়ে তাঁরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের সাথে তাঁদের সার্চ ইঞ্জিনের সংযোগ স্থাপন করেন।

যন্ত্রপাতি তৈরি করতে করতে একসময় ল্যারি পেজের ঘর যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি হয়ে গেল। তাই দুইবন্ধু পেজ এবং ব্রিন এবার চলে এলেন সার্গেই ব্রিনের ডরমেটরিতে। ব্রিনের ডরমেটরি পরিণত হয় তাঁদের অফিস এবং প্রোগ্রামিং সেন্টারে যেখানে তাঁরা তাঁদের সার্চ ইঞ্জিন ওয়েবে কেমন ফলাফল  দিচ্ছে সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিন স্ট্যানফোর্ডের ব্যবহারকারিদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

গাণিতিক ধারণা “গোগোল” এর নাম থেকে ব্রিন-পেজ তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিনের নাম দেন “গুগল”। ১৯৯৪ সালে তাঁদের এক বন্ধুর ব্যক্তিগত গ্যারেজে প্রতিষ্ঠিত হয় গুগলের সার্ভার। ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে “গুগল”-এর প্রাথমিক সংস্করণ সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হলেও নতুন একটি কোম্পানি শুরু করার মত অর্থ দুই বন্ধুর কাছে ছিলো না। ব্রিন এবং পেজ তখন নেমে গেলেন অর্থ যোগানের কাজে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ মিলিয়ন ডলার যোগার করে ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু মিলে তাঁদের কোম্পানি “গুগল ইনকর্পোরেট” শুরু করেন। গুগলের সার্চ রেজাল্ট ঐ সময়ের সার্চ ইঞ্জিনগুলোর চেয়ে ভাল অবস্থান করে ফেলে। সেই থেকে গুগল হয়ে উঠে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন যেটির গড় সার্চ রেট দিনপ্রতি এখন ৫.৯ বিলিয়ন।

গুগল ছাড়াও সার্গেই ব্রিন অন্যান্য কাজের সাথে যুক্ত থাকতে পছন্দ করেন। Google.org এর মাধ্যমে সার্গেই ব্রিন পৃথিবীর পরিবেশ এবং শক্তির রূপান্তর সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন গুগল গ্লাস এবং চালকবিহীন গুগল গাড়ি প্রকল্পের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

২০০৬ সালে সার্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজের গুগল কোম্পানি ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয়।

২০০৭ সালে সার্গেই ব্রিন বায়োটেক বিশেষজ্ঞ এবং উদ্যোক্তা অ্যান উজেকেকি-কে বিয়ে করেন। অ্যানের স্বাস্থ্য  সংক্রান্ত তথ্যের উপর বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি এবং সার্গেই ব্রিন দুজনে মিলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এসব তথ্য ব্যবহার আরো সহজ করার জন্য কাজ করেন। “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট”-এ কাজ করা গবেষকদের মধ্যে ব্রিন এবং অ্যান এর নাম অন্যতম। জেনেটিক, কম্পিউটিং সমস্যা এবং ডাটাবেজে দুইজনের সমান আগ্রহ থাকায় এই দম্পতি “23AndMe” নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।

স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন
স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন

অ্যান এবং ব্রিন দম্পতির সাত বছরের একটি ছেলে এবং চার বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে এই দম্পতি আলাদা বসবাস করছেন।

২০০৮ সালে সার্গেই মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন যেখানে তাঁর মা পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ব্রিন “23AndMe” এর সেবা গ্রহণ করে জানতে পারলেন পারকিনসন্স বংশগত কোন রোগ না হলেও তিনি এবং তাঁর মা ইউজেনিয়া LRRK2 জিনের একটি মিউটেশন বহন করছেন যেটার কারণে ভবিষ্যতে তাঁর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২০%-৮০% । দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা তাঁদেরসম্পাদকীয়তে এ সম্পর্কে লিখেছিলঃ

“ব্রিন মনে করেন LRRK2 এর মিউটেশন হচ্ছে তাঁরব্যক্তিগত কোডের একটি বাগ এবং অন্যান্য কম্পিউটার প্রোগ্রামের বাগের মত একজন গুগল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি প্রতিদিনই এই বাগটি ঠিক করে যাচ্ছেন।”

সার্গেই ব্রিন যৌথভাবে ল্যারি পেজের সাথে দুইটি বোয়িং জেটের মালিক। বিমান দুটিতে পরীক্ষালব্ধ উপাত্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নাসা স্থাপন করে দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাটলসে বর্তমানে সার্গেই ব্রিন বসবাস করছেন। স্নাতকোত্তর পড়া শেষ হবার পর যদিও তিনি পিএইচডি করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু সেই পিএইচডি তাঁর শেষ করা হয়ে উঠেনি। ২০০৮ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে বিরতি গ্রহন করছেন। ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালে ফোর্বস্‌ সাময়িকী যৌথভাবে তাঁকে পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ টিআর১০০ এর ঘোষণা অনুযায়ী ৩৫ বছরের কম বয়সী ১০০ জন আবিষ্কারকের তালিকায় আসেন। ২০১৪ সালে ব্যক্তিগত ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্পত্তির মালিক হিসেবে ফোর্বস্‌ সাময়িকি সার্গেই ব্রিনকে বিশ্বের ২০তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।