তথ্যপ্রযুক্তিতে নারী – ২০১৮ সালের সেরা দশ

অন্যান্য পেশার মত প্রযুক্তি অঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকা সত্ত্বেও, পৃথিবীর কিছু নারী প্রকৌশলীর রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বর্নাঢ্য পদচারণা। নিজেদের পেশাজীবন সফল করার পাশাপাশি তাঁরা প্রতিনিয়ত তথ্যপ্রযুক্তিকে নিয়ে যাচ্ছেন কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কাছে। সেইসব নারীদের বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য প্রতিবছর “বিজনেস ইনসাইডার” পত্রিকা তাঁদের তালিকা প্রকাশ করে। তাহলে দেখে নেয়া যাক ২০১৮ সালে কারা স্থান করে নিয়েছেন সেই তালিকায়ঃ
১. গোয়েন শটওয়েলঃ
শ্রেষ্ঠ নারী প্রকৌশলীর তালিকার প্রথমে জায়গা করে নিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট এবং COO গোয়েন শটওয়েল। ২০০২ সালে স্পেসএক্স যাত্রা শুরুর সময় থেকেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে কর্মরত। ২০০৮ সালে তিনি এই কোম্পানির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান। ২০১২ সালের মধ্যে শটওয়েলের সহযোগিতায় স্পেসএক্স প্রথম বেসরকারি অর্থায়নে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস ষ্টেশনে মহাকাশযান প্রেরণের মাধ্যমে একটি মাইলফলকের সূচনা করে। তাঁরই নেতৃত্বে স্পেসএক্স প্রথমবারের মত একটি স্যাটেলাইট (বঙ্গবন্ধু-১) পাঠাতে সক্ষম হয়।
গোয়েন শটওয়েল প্রকৌশলীর হওয়ার প্রেরণা পান “সোসাইটি অফ ওম্যান ইঞ্জিনিয়ারস্‌”- এর একটি অনুষ্ঠানে পোশাক-আশাকে সুসজ্জিত একজন মেক্যানিকাল ইঞ্জিনিয়ারের বক্তৃতা শুনে। তখন তাঁর মাত্র ১৫ বছর বয়স। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, “তখন আমার মাত্র ১৫ বছর বয়স। অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তৃতা শুনে আমি যতটা না মুগ্ধ হই, তারচেয়ে বেশি পছন্দ করি তাঁর স্যুটটিকে। যদিও আমি এই ব্যাপারে কথা বলতে গেলে খুব লজ্জা পাই, তারপরেও বলতে পছন্দ করি এই কারনে যে, এই ঘটনাটির কারণেই আজকে আমি একজন সফল প্রকৌশলী হতে পেরেছি।”
২. প্রিয়া বালাসুব্রামানিয়ামঃ
অ্যাপলের আইফোন অপারেশন্স বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রিয়া বালাসুব্রামানিয়াম আছেন তালিকার  চতুর্থ অবস্থানে। তিনি আইফোন উৎপাদনের জন্য Supply Chain তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি আইফোনের মূল যন্ত্রাংশগুলোর গুণগতমান এবং ত্রুটি সংশোধনের কাজ পরিচালনা করে থাকেন। ২০০১ সাল থেকে অ্যাপলে কর্মরত এই প্রকৌশলী ২০১৭ সালেও এই তালিকায় ছিলেন।
গত বছর, ২০১৭ সালে তিনি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন, যেখান থেকে প্রিয়া ২০০১ সালে Supply Chain Management এর উপর এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। সেখানকার উদ্বোধনি বক্তৃতায় তিনি ক্যারিয়ার শুরুর দিকে তাঁর সংগ্রামের কথা বলেন। একবার এক কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দেয়ার সময় তাকে ম্যানাজার বলেছিল, “একটি ফ্যাক্টারি চালানো কোন মেয়ে মানুষের কর্ম নয়। মেয়েরা যা করতে পারে একটি ফ্যাক্টারি চালানো সেসব থেকে অনেক বেশিকিছু”। ভাগ্যিস! প্রিয়া সেইসব নিন্দুকদের কথা শোনেননি।
৩. ডায়ান ব্রায়ান্টঃ 
গুগল ক্লাউডের চিফ অপারেটিং অফিসার (COO) হিসেবে ডায়ান ব্রায়ান্ট যোগাদান করেন ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে। তিনি এর আগে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরেক টেকজায়ান্ট কোম্পানি ইনটেলের ডাটা সেন্টার গ্রুপে কর্মরত ছিলেন। ইনটেল ছেড়ে গুগলে যাবেন কী না, এই চিন্তা করার জন্য তিনি বেশ কিছুদিন ইনটেল থেকে ছুটি নিয়েছিলেন।
গুগলে তিনি এটিকে সর্ববৃহৎ ক্লাউড কম্পিউটিং সাইট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং Amazon এবং Microsoft এর উপরে স্থান দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। গৃহহীন কিশোরি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া এবং সেখান থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অন্যন্য উদাহরণ ডায়ান ব্রায়ান্ট।
৪. ডেনিশ ডুমাসঃ
ডেনিশ ডুমাস “রেড হ্যাট” এর অপারেটিং সিস্টেম প্ল্যাটফর্মের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত। রেড হ্যাট এন্টারপ্রাইজ লিনাক্স, লিনাক্সের সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক সংস্করণ হিসেবে বাজারে প্রচলিত। ডুমাসের টিম এই রেড হ্যাটের বর্তমান সংস্করণগুলোর হালনাগাদ এবং নতুন সংস্করণ তৈরির কাজ করে থাকে। একই সাথে সেই সংস্করণগুলো রেড হ্যাট কোম্পানি এবং কোম্পানির বাইরে ঠিকমত কাজ করছে কিনা সেটি নিশ্চিত করে থাকে।
ডেনিশ ডুমাস অনুপ্রেরণা পান একজন কর্মীকে নতুন কোন পরীক্ষামূলক কাজে সাহায্য করে এবং সেখান থেকে দ্রুত কোন আইডিয়া নিয়ে সেটিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে। অবসর সময়ে তিনি বাগান করতে খুব ভালবাসেন এবং নিজেকে “পাগলা মালী” হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
৫. আঞ্জুল ভামভ্রিঃ
এডোবের ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন আঞ্জুল ভামভ্রি। ৩০০ জনের একটি টিমের টিম লীডার হিসেবে তিনি  এডোবের ক্রেতাদের ক্লাউডে ডাটা রাখার মাধ্যমে তাদের ব্যবসায় সহায়তা করে থাকেন। এছাড়াও আঞ্জুলের টিম পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি যেমনঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করে।
নিজের কাজকে ভালবাসার পাশাপাশি আঞ্জুল কুকুর অনেক পছন্দ করেন। পোজো নামের তাঁর একটি পোষা ল্যাব্রাডর কুকুর আছে। পোজোর সাথে খেলাধুলা এবং হাঁটাহাঁটি করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিদিন নতুন করে কাজ করা প্রেরণা পান।
৬. জয় চিকঃ 
মাইক্রসফটের ক্লাউড এবং এন্টারপ্রাইজ গ্রুপের কর্পোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত জয় চিক জায়গা করে নিয়েছেন এই তালিকায়। তাঁর নেতৃত্বে মাইক্রসফটে তাঁর টিম অফিস ৩৬৫, এক্সবক্স, এজুরে, উইনডোজ এবং সারফেস-এ এর ব্যবহারকারীদের ডাটার নিরাপত্তার জন্য কাজ করে থাকে। ১৯৯৮ সালে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মাইক্রসফটে তিনি পা রাখেন। এরপর সেখান থেকে ধীরে ধীরে মাইক্রসফটের উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক এবং পরবর্তীতে কর্পোরেট ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান।
ভ্রমণপ্রিয় জয় চিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। তিনি এন্টার্টিকা মহাদেশ ছাড়া বাকি ৬টি মহাদেশের মোট ৬০ টি দেশে ভ্রমণ করেছেন।
৭. ক্যাথি উইন্টারঃ 
 ইনটেলের অটোমেটেড ড্রাইভিং সল্যুশন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাথি উইন্টার দখল করেছেন এই তালিকার ১৭ নম্বর স্থান। ক্যাথি উইন্টার ২০১৬ সালের শেষের দিকে ইনটেলের অটোমেটেড সল্যুশন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেন। তখন তিনি স্বয়ংক্রিয় গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের চিপ তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। এর আগে ডেলফিতে তিনি এই নতুন ধরণের কাজটির সাথে যুক্ত ছিলেন, যেখানে ক্যাথেরিন এবং তাঁর টিম স্বয়ংক্রিয় অর্থাৎ চালকবিহীন গাড়িতে চড়ে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্কে ৯ দিনের একটি ট্রিপ সম্পন্ন করেন।
ইনটেলে ক্যাথি এ্যাডভান্স ভেহিকেল ল্যাবের কাজ তত্ত্বাবধান করেন। এছাড়াও স্বয়ংক্রিয় গাড়ির পরীক্ষামূলক চালনার কাজ তিনি পরিচালনা করে থাকেন। ক্যাথি বলেন, “আমি ড্রাইভিং এর সময় নিরাপত্তাকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ির সুবিধা হলো, এটি চলার সময় বিভ্রান্ত হয় না, কাউকে টেক্সট মেসেজ পাঠায় না এবং উচ্চশব্দে গানও শুনতে পারে না।”
৮. আঁচল গুপ্তাঃ
ফেসবুকের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন আঁচল গুপ্তা, যেখানে তিনি একাধিক টিমের টিম লীডার হিসেবে ফেসবুককে সুরক্ষিত রাখার কাজ তদারক করেন। এছাড়াও তিনি ফেসবুকের কর্পোরেট অবকাঠামো সুশৃঙ্খল রাখার কাজও করে থাকেন।
আঁচলের সাইবার সিকিউরিটির উপর রয়েছে প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা। ফেসবুকে যোগদান করার আগে তিনি স্কাইপের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের চিফ ইনফরমেশন অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কাজের পাশাপাশি তিনি বৃহত্তর ইকো সিস্টেম সিকিউরিটি এবং গ্রেস হোপার রিভিউ কমিটির সক্রিয় সদস্য।
আঁচল গুপ্তা তাঁর টিমের নারীদের বিভিন্ন সভা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা, বক্তৃতা দেয়া এবং নিজেরদের গল্প অন্যদের শোনানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন , এসব থেকে অন্য মেয়েরাও ভাল কিছু করার অনুপ্রেরণা পায়।
৯. সোফিয়া ভেলাস্টেগুইঃ 
মাইক্রসফটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন পণ্য বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার সোফিয়া ভেলাস্টেগুই জায়গা করে নিয়েছেন এই তালিকায়। দক্ষিন কোরিয়ান নাগরিক সোফিয়ার রয়েছে জর্জিয়া টেক কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এ একাধিক পেটেন্ট এবং আসন। তিনি ২০১৭ সালে মাইক্রসফটে যোগদান করেন এবং সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিভিন্ন ধরণের পণ্য তৈরি এবং উন্নয়নের কাজ করে থাকেন।
মাইক্রসফটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন পণ্যের মধ্যে মাইক্রসফট ট্রান্সলেটর এবং মাইক্রসফট কর্টানা ডিজিটাল এ্যাসিস্ট্যান্ট অন্যতম। মাইক্রসফটে যোগদান ক্রয়ার আগে সোফিয়া স্মার্ট হেডফোন কোম্পানি ডপলার ল্যাব, নেস্ট, এ্যালফাবেট স্মার্ট হোম কোম্পানি এবং অ্যাপলে কর্মরত ছিলেন। তিনি মনে করেন, ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি একই পেশার অন্যান্য মানুষদের সাথে নেটওয়ার্কিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ইয়েল গার্টেনঃ 
অ্যাপলের সিরি ডাটা সায়েন্স এবং এ্যানালাইটিকের পরিচালক ইয়েল গার্টেন, যিনি অ্যাপলের ভয়েস এসিস্ট্যান্ট সিরির ডাটা প্রসেস করে সিদ্ধান্ত প্রদানে সাহায্য করে। ইয়েল এবং তাঁর টিম ডাটা ব্যবহার করে কিভাবে “সিরি”-এর উন্নয়ন এবং কিভাবে এই প্রোগ্রামটিতে আরো নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা যায় সেই কাজ করে থাকেন। ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁকে একজন বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে অ্যাপলে যোগদান করার আগে গার্টেন লিংকডইনের ডাটা সায়েন্স বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি ২০১১ সাল থেকে ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করে গেছেন। নিজের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজেই টেকনোলজি পৌঁছে দিতে পারাকেই নিজের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন ইয়েল গার্টেন।
লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি।