সোহেল তাসলিম – সাক্ষাৎকার

আমার ইন্টারভিউ প্রজেক্টের নতুন শিকার হচ্ছেন সোহেল তাসলিম – যিনি বর্তমানে জাপানে কর্মরত। উনার সাথে পরিচয়ের কথা এখানে বিস্তারিত লিখলাম না (ইন্টারভিউ নিয়ে যেই বইটি তৈরি করছি, সেখানে থাকবে)। তবে কীভাবে কীভাবে জানি অসাধারণ ও উদ্যমী সব মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়ে যায়। 🙂

taslim-sohel

সুবিন : সোহেল ভাই, আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
সোহেল : আমি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ইফিউশন এ কাজ করছি। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই কোম্পানির সঙ্গে আছি।

সুবিন : ইফিউশন সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলুন।
সোহেল : এটি জাপান অবস্থিত একটি আইটি কোম্পানী। স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, হোস্টিং, বই এবং গেইম প্রকাশনাসহ একটি পরিচিত স্মার্টফোন কোম্পানির গবেষণার কাজ এবং preinstalled অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টএর কাজ করে থাকে। নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকার কারনে স্মার্টফোন কোম্পানির নাম প্রকাশ করলামনা। আমি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট এর ডিভিসন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছি।

সুবিন : আপনার টিম-সাইজ কেমন? আপনাকে কী কী কাজ করতে হয়?
সোহেল : আমি দশ জনের কম একটি ছোট দল নিয়ে কাজকরি। প্রত্যেকেরই tech savvy, challenger, problem solver এবং cooperative। আমার দায়িত্ব ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং টিম ম্যানেজমেন্ট। আমি এমন একটি টিম তৈরি করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এর জন্য আমাকে বিগত ৩ বছর অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।

সুবিন : সম্প্রতি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে অফিসে বসে আর কাজ করবেন না। এরকম সিদ্ধান্তের কারণ কী?
সোহেল : ২০১১ এর সুনামির পরে আমাদের কোম্পানী বাসা থেকে রিমোটএ কাজ করার একটি নিয়ম শুরু করে।
বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এটি উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করে দেয়। সর্বত্র উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন যোগাযোগকে আরো সহজ করে দেয়াতে রিমোটে কাজ করা সহজ হয়ে এসেছে। তাই আমি আমার কাজের স্টাইলে একটু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। “Internet is my office not a physical place. So, I am at office at least when smartphone in my pocket.” যা আমার ভবিষ্যত ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে দিতে পারে এবং আমাদের কোম্পানীর নিজস্ব product development এ বিশেষ প্রভাব ফেলবে।

সুবিন : জাপানে আপনার মোট কত বছর কাজ করা হল? জাপানীদের কাজের সংস্কৃতি সম্পর্কে যদি পাঠকদের একটু ধারণা দিতেন।
সোহেল : আমি জাপানে কাজ করছি প্রায় 9 বছর হল।

জাপানি মানুষ খুব punctual এবং নিজ নিজ কাজ সম্পর্কে সিরিয়াস। প্রত্যেকের নিজ নিজ লক্ষ্যের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা রয়েছে। জাপানি কোম্পানি খুবই প্রফেশনাল হয় এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। যা প্রফেশনালিজমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সুতরাং, মানিয়ে নিতে পারলে কর্মজীবন এখানে ঝামেলামুক্ত ও নিরাপদ।

আপনার দক্ষতা কম হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানি আপনার পেছনে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে যদি আপনার ভাল কাজ করার আগ্রহ থাকে। তাই হয়ত সহজে কেউ চাকরি পরিবতন করেনা। সুতরাং, আপনি একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে এখানে বেড়ে উঠতে পারবেন শুরু থেকেই।

কিন্তু, আপনার যদি একটি ভাল ব্যবসায়িক আইডিয়া থাকে এবং বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন সেক্ষেত্রে জাপান ঠিক আপনার জন্য পারফেক্ট জায়গা নয়।

সুবিন : বাংলাদেশী সফটওয়্যার ডেভেলাপার আর জাপানী সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের মধ্যে টেকনিক্যাল স্কিল ও প্রফেশনালিজমের ব্যাপারে কোনো পার্থক্য কি আপনার চোখে পড়ে?
সোহেল : অন্য অন্য দেশের মত বাংলাদেশেও অনেক মেধাবী রযেছে। যেহেতু আমাদের জনসংখা অনেক বেশী সে হিসেবে মেধাবীর সংখাও আনুপাতিক হারে বেশী বলে আমি বিশ্বাস করি। এদের ভেতর থেকে যারা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসে তাদের টেকনিকাল স্কিল কোনো অংশে কম নয়। তবে জাপানী ডেভেলপারদের কিছু এটিচুড চোখে পড়ার মত। যেমন, “I want to do it.”। পারব কি পারবনা তা নিয়ে কখনই ভাবেনা। কার ব্যাকগ্রাউন্ড কি তা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নাই। আর কারো ফলাফলের অপেক্ষা করেনা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মনোভাবটা কম। সবসময় নিজে কতটুক আউটপুট দিল তা দেখে।

আমাদের প্রফেশনালিজমের যথেষ্ট কমতি রযেছে। এটা সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের একার সমস্যা নয়। এটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। এ চক্র থেকে বের হতে হলে আজ যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে তাকে গড়ে তোলার ভেতর দিয়ে শুরু করতে হবে। সুতরাং এটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা।

সুবিন : জাপানে তো বিশাল একটা সফটওয়্যার বাজার রয়েছে। আপনার কোম্পানী তো কিছু ছোট স্কেলের প্রজেক্ট বাংলাদেশে আউটসোর্স করে। বড় স্কেলের প্রজেক্ট আউটসোর্সিং করতে সমস্যা কোথায়? আর জাপানের আউটসোর্সিং বাজার ধরতে চাইলে বাংলাদেশি কোম্পানীগুলোর কী করা উচিত?
সোহেল : বড় স্কেলের প্রজেক্ট আউটসোর্স করতে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় কমুনিকেশন এবং কালচারাল ব্যবধান। ছোট প্রজেক্টের বেলাতেও একই সমস্যা রযেছে কিন্তু রিস্ক একটু কম যা রিকভারের সুযোগ রযেছে।

জাপানের আউটসোসিং বাজার ধরতে চাইলে, জাপানিজ পড়তে এবং লিখতে পারে এমন একজনকে নিযোগ দিয়ে শুরু করতে হবে। যে কিনা Bridge Engineer হিসেবে কাজকরবে। জাপানিজরা ইংরেজিতে কমুনিকেট করতে চায়না। যেহেতু এটা তার মাতৃভাষা নয় সেহেতু মিসকমুনিকেশানের কারণে কাজে ভুল হয়ে সময় ও শ্রম দুই নষ্ট হতে পারে, যা তারা খুবই অপছন্দ করে। যেটাকে আমি কমুনিকেশন সমস্যা বলেছি।

আর কাজের সাথে সংস্লিষ্ঠ কালচারাল ব্যবধান বলতে আমার কাছে মনেহয় প্রফেশনালিজমের অভাব। যেহেতু বহির বিশ্বের কাছে আমরা কর্ম দিয়ে পরিচিত নই সেহেতু ছোটো ছোটো প্রজেক্ট এর কাজ করে আমরা সে আস্থা তৈরী করতে পারি।

সুবিন : আরে যেসব সফটওয়্যার প্রকৌশলী কাজ করার জন্য জাপান যেতে চায়, তারা কিভাবে যেতে পারে?
সোহেল : বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে জাপানে দুবছরের “জাপানিস ভাষা শিক্ষা” কোর্স করতে অাসতে পারে। অথবা স্কলারশিপ নিয়ে এম.এস./পিএইচডি করতে আসতে পারে। কোর্স শেষ হবার আগেই অনেকে চাকরি পেয়ে যায়। সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের এখানে বেশ চাহিদা আছে। এখানে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীর সর্বনিম্ন প্রতি মাসে বেতন বাংলাদেশী দেড় লক্ষ টাকা!

সুবিন : আপনি তো নিজ উদ্যোগেও অ্যাপল স্টোরে আইওএস (iOS) অ্যাপ তৈরি করে পাবলিশ করেছেন। এবং বেশ সফলও হয়েছেন। সেই অ্যাপগুলোর ব্যাপারে একটু বলুন।
সোহেল : ২০০৯ থেকে আমি iOS অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের সাথে জড়িত। আমার যে অ্যাপটি আমাকে সব থেকে বেশী সফলতা এনে দিয়েছে তার নাম হচ্ছে “SYSTEM UTIL Dashboard”। এটি ২০১৩ সনের মার্চ মাসে Apple এর Overall Rank এ ৭৫ টি দেশে ১ নাম্বার ডাউনলোডেড এপ্লিকেশন হয়। Utilities বিভাগে ৯৮ টি দেশে ১ নাম্বার স্থান দখল করে। এছাড়া ২০১০ এ SYSTEM নামের অ্যাপটি জাপানিস App স্টোরে “Top ১০ Paid” অ্যাপ হিসেবে নির্বাচিত হয়। এবং ২০১১,২০১২ তে আমার ২টি করে ২০১৩ তে ১ টি এপ্লিকেশন “App Store BEST OF” হিসেবে নির্বাচিত হয়. যা আমাকে সবসময় উত্সাহিত করেছে পরবর্তী কাজের জন্য। আমার তৈরী একটি অ্যাপ নিয়ে ২০১৩ জানুয়ারীর ২৪ তারিখে “The New York Times” এ প্রতিবেদন ছাপা হয়।

system-util-ss

সুবিন : বাংলাদেশে বসে কেউ যদি নিজে নিজে অ্যাপল স্টোর বা প্লে স্টোরে অ্যাপ পাবলিশ করতে চায়, তাহলে তার সফল হবার সম্ভাবনা কতটুকু? অ্যাপগুলো কি লোকাল মার্কেটের কথা চিন্তা করে বানানো উচিত নাকি গ্লোবাল মার্কেট?
সোহেল : যদিও এ মার্কেট এখন অনেকটা পুরোনো হয়ে গেছে এবং বড় বড় কোম্পানি গুলোর সাথে কম্পিট করতে হচ্ছে তবুও যথেষ্ট সুযোগ রযেছে। Creative এবং Innovative টেক পিপলদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ যে তারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে সরাসরি বিশ্বের অনেক গুলো দেশের ক্রেতার কাছে তাদের কাজ পৌঁছে দিতে পারছে। আর ভালো অ্যাপস এর কদর সবসময়ই আছে। ভালো অ্যাপস তৈরীর পাশাপাশি তা পরিচিত করার জন্য প্রচারণার কাজটিও করতে হবে সমান গুরত্ব দিয়ে। লেগে থাকলে সফলতা বেশীদিন পালিয়ে থাকতে পারেনা। অ্যাপ এর প্রচারের অনেক টিপস এবং টিউটোরিয়াল রযেছে ইন্টারনেটে।

আর এমন একটা বড় সুযোগ থাকতে গ্লোবাল মার্কেটকে চিন্তা করে অ্যাপগুলো না বানানোর কোনো কারণ দেখিনা। US, Japan, Germany, Italy এর মত দেশে পেইড অ্যাপএর ক্রেতা এখনও অনেক বেশী। আবার ইন্টারনেটের ব্যবহার সর্বত্র থাকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ও এসব দেশ থেকে সর্বাধিক লাভবান হওয়া সম্ভব।


সুবিন : এবারে একটু পেছনে ফিরে যাই। ছোটবেলায় কোন কোন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন?
সোহেল : আমার স্কুল জীবন কাটে বাংলাদেশ রাইফেলসে।

সুবিন : কোন ভার্সিটিতে পড়েছেন? আপনার দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার পেছনে ভার্সিটির ভূমিকা কতটুকু?
সোহেল : ইনস্টিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনলজি (IST)। বিশেষ ভুমিকা রেখেছে বলে আমার মনেহয়না। তবে আমাকে একটা পরিবেশ দিয়েছে যেখানে আমি আমাকে তুলনা করার সুযোগ পেয়েছি এবং শিক্ষক ও বড় ভাইদের কাছ থেকে অনেক এডভাইস পেয়েছি।

সুবিন : যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ছে, তারা যদি দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে চায়, তবে করণীয় কী?
সোহেল : দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে দরকার প্রচুর অনুশীলন। তাই প্রথম সেমিস্টার থেকেই তা শুরু করতে হবে। পাঠ্যক্রমে যা আছে শুধু তার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকা যাবেনা। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের সাথে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপারের কোনো সম্পর্ক নাই। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য লেখা পড়া করার বাইরে অতিরিক্ত সময় বের করে প্রোগ্রামিং অনুশীলন করতে হবে।

সুবিন : অনেক শিক্ষার্থীই ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটে কাজ করছে, বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
সোহেল : পজেটিভে ভাবে দেখছি। যেহেতু তারা উন্নত দেশের কাজগুলো করছে সেহেতু মার্কেটে টিকে থাকতে তাদেরকে প্রফেশনাল হতে বাধ্য করছে। বিশ্ববাজার এ নিজের অবস্থানকে তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছে। যা তাদের এবং বাংলাদেশের ভবিষৎতের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনেকরি।

সুবিন : বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কী মনে হয় আপনার কাছে?
সোহেল : এক কথায় বললে অবকাঠামোর অভাব।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : আমরা কিভাবে সেটি অতিক্রম করতে পারি?
সোহেল : যেহেতু আমি ভালো বক্তা নই তাই সুন্দর করে বলতে পারছিনা। তবে আমার সহজসরল ভাষায়, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব। যার গুরুদায়িত্ব হলো সরকারের হাতে। যদিও এ সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে এ শিল্প কে অগ্রাধিকার দিয়ে। যথাযথ অবকাঠামো পেলে মেধাবী এবং entrepreneur রা তার সঠিক ব্যবহার করে থাকে। সফটওয়্যার শিল্পের বেলায় ও তাই। অবকাঠামো উন্নয়নে যে দুই-তিনটি বিষয় এ এখন খুব বেশী গুরুত্ব দেয়া দরকার বলে আমার মনে হয় :
১. সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎত নিশ্চিত করা
২. বিভাগীয় সহর গুলোর সর্বত্র সার্বক্ষণিক উচ্চগতীর ইন্টারনেট নিশ্চিত করা (ভুলে যেতে হবে ইন্টারনেট সংযোগ নাই বলে কোনো বিষয় আছে)
৩. কপিরাইট আইনের সঠিক বাস্তবায়ন (পাইরেসি)
৪. ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কিং কে আরো সহজ করা
৫. বড় বড় IT কোম্পানিগুলোর জন্য IT পার্ক করা এবং শহরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা

হয়ত সবই হবে, তবে যত তাড়াতাড়ি হবে তত আমরা তাড়াতাড়ি এগোব। আমি আমার দেশকে একটা সুন্দর জায়গায় দেখতে চাই। চাই আমার সন্তানরা যেন একটা শান্তির উন্নত দেশ পায়।

অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (২)

অনুপম শ্যাম -এর ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় (ও শেষ) অংশ।

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করতে হবে।

দ্বিতীয় পর্ব :

anupom

সুবিন : ডিজনীর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানীতে কাজ করেছেন, সেখানের অভিজ্ঞতা কেমন? আর স্টার্টআপে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
অনুপম : ডিজনী তে আমি গেমিং ডিভিশন এ কাজ করতাম। ডিজনী বড় কোম্পানি তাই সব কিছুই বড়, অনেক স্তর বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান । আমার ডিজনী তে সর্বশেষ প্রজেক্ট “Star Wars Commander” গেম এ একশ এর কাছাকাছি লোক কাজ করেছে। এভারনোটে মনে হয় প্রায় সব মিলিয়ে ৩৫০ জন কর্মী। আমি ডিজনীর সিইও কে কখনই সামনা সামনি দেখিনি। এভারনোটে আমি প্রায় প্রতিদিন ই সিইও কে দেখি, এমন কি মাঝে মাঝে সে আমাদের জন্য চা কফি ও বানায়।

সুবিন : বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপ তৈরি হচ্ছে, অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চাচ্ছে, যদিও হতে চাওয়া লোকদের তুলনায় হতে পারার লোক বেশ কম। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ কালচার কি ঢাকার তরুণদের প্রভাবিত করছে?
অনুপম : আমার মনে হয় না ব্যাপারটা খারাপ। হয়ত কাজ করার মত ভালো কোম্পানি কম, তাই সবাই নিজেরাই কোম্পানি খুলছে। আবার এখন বাংলাদেশে সবার কাছে ইন্টারনেট, সফটওয়্যার এর মাধ্যমে অনেক সমসার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে, তাই এখনই খুব ভালো সময় স্টার্টআপ এর জন্য। সমস্যা হচ্ছে স্টার্টআপ এর জন্য যে স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম এর প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো নেই। শুরুটা একটু এবড়ো-থেবড়ো হবেই, যেরকম হচ্ছে। যারা এর মধ্যেও যারা চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। দুই-একটা প্রাথমিক সাফল্য আসলে আমার মনে হয় আস্তে আস্তে ইকো সিস্টেমও হয়ে যাবে।
একটা বিষয় হচ্ছে যেটা আমার মনে হয় খুব একটা ভালো ফল নিয়ে আসবে না, তা হচ্ছে ফ্রীলান্সিং কে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্রীলান্সিং তো বড় মাত্রায় ইন্ডাস্ট্রি করার ব্যাপার না, এতে বরং হিতে বিপরীত হবে । বরং সরকারের উচিত হবে আই টি পার্ক, স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর এই গুলার জন্য কাজ করা।

সুবিন : আপনি তো বই লিখেছেন। বইটের নাম এবং বই লেখার অভিজ্ঞতা যদি পাঠকদের সাথে শেয়ার করতেন। ভবিষ্যতে আরো বই লেখার ইচ্ছা আছে?
অনুপম : বই এর নাম CakePHP Application Development, প্রকাশ হয় Packt Publication, UK থেকে ২০০৭ এ। বই লেখাটা যে এত কষ্টকর হবে তা জানলে হয়ত বই লেখা শুরু করতাম না। কিন্তু একবার যেহেতু বেল তলায় গেছি, ইচ্ছা আছে আরেকবার যাবার, তবে কম্পিউটার সম্পর্কিত বই নাও হতে পারে।

সুবিন : যেই ছেলেটি বা মেয়েটি সবে মাত্র কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে (বা কাছাকাছি কোনো বিষয়ে) ভর্তি হল, সে আপনার কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে আপনি কী বলবেন?
অনুপম : কম্পিউটার বিজ্ঞান অনেক বড় বিষয়, তার মধ্যে কিছু জিনিস আমাদের ভালো লাগবে, আর কিছু খুব বেশি ভালো লাগবে না। কিন্তু কোনো একটা বিষয়ে ভালো দখল রাখতে হলে গভীরতা এবং চত্তড়াই (Depth এন্ড Breadth) দুটোই দরকার। যে গুলো ভালো লাগবে ওগুলো তে পুরো গভীরে যাও, যা খুব একটা ভালো লাগবে না তাও ভালো করে জেনে রাখো, এক সময় দেখবে ওটাও কাজে লাগবে। সবগুলো বিষয়ই কিন্তু আসলে একই সুতোয় গাঁথা, এটা প্রথম দিকে খুব একটা স্পষ্ট নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই আসলে ভাবতে শুরু করা উচিত তুমি পাস করে কি করতে চাও, এটা জানা থাকলে নিজেকে তার জন্য তৈরি করাটা অনেক সহজ হবে। এই প্রশ্নের উত্তর বের করা টাও কিন্তু বেশ কঠিন, তার জন্য আসলে সবার আগে জানতে হবে তোমার সামনে কি কি করার মতো বিকল্প আছে। তুমি পাশ করে বাইরে এসে মাস্টার্স করতে পারো, তারপর চাইলে একাডেমিয়া তে রিসার্চ করতে পারো, দেশের কোন ভালো সফটওয়্যার কোম্পানিতেও চাকরি করতে পারো, আবার নিজেই কোন সফটওয়্যার ফার্ম দিতে পারো। অনেকে চাকরি নিয়ে সরাসরি বাইরের গুগল, মাইক্রোসফট এর মতো বড় বড় কোম্পানি তে চলে আসছে, সফটওয়্যারে চাকরির বাজার এখন পুরোই আন্তর্জাতিক, চাইলে সেটাও করতে পারো। এরকম আরও অনেক কিছুই করার মতো আছে। এটা ঠিক করে নিলে তুমি কোনটাকে প্রাধান্য দিবে সেটা বের করা সহজ হয়ে যায়।
আমি যখন পড়েছি তখন কিন্তু এতো কিছু বুঝিনি, পরে ঠেকে শিখেছি। Generalized পরামর্শ দেয়া টা আসলে কঠিন। এই পরামর্শ গুলো আমি তখনকার আমাকে ভেবেই দিলাম, হয়তো এখনকার কারো কাজে লাগবে।

সুবিন : ছোটবেলায় কোন কোন স্কুল ও কলেজে পড়েছেন?
অনুপম : ব্লু বার্ড হাই স্কুল সিলেট (প্রাইমারি), সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (এস.এস.সি. পর্যন্ত) তারপর এম.সি. কলেজ সিলেট ।

সুবিন : ভার্সিটিতে লেখাপড়া কেমন লাগত?
অনুপম : ভার্সিটিতে প্রথম দুই/তিন সেমিস্টার এর পর লেখাপড়া খুব একটা করা হয় নি । তৃতীয় সেমিস্টার থেকে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করা শুরু করি, তারপর থেকে পড়ালেখা পুরোটাই নিম্নগামি। পড়ালেখার বেপারে আরেকটু সিরিয়াস হলে মনে হয় ভালো হত।

সুবিন : প্রোগ্রামিং হচ্ছে করার জিনিস, মানে একটা স্কিল। যেটা শিখে করতে হয়। কিন্তু আমরা তো স্কুল-কলেজে আসলে তেমন কিছু শিখি না, বই মুখস্থ করা ছাড়া। এ বিষয়ে আপনার কী মন্তব্য?
অনুপম : বই মুখস্থ করে জিপিএ ফাইভ আর গোল্ডেন এ পাওয়া যায় কিন্তু আসলে দীর্ঘমেয়াদে এতে নিজেদের কোনো লাভ হচ্ছে না। পাঠক্রমের বাইরের বিষয়াদি তে ছেলেমেয়েদের উত্সাহী করলে হয়ত আমরা বড় ছবিটা ছোট থেকেই দেখতে শেখবো । স্কুল-কলেজের সমান্তরালে যে ম্যাথ/ফিজিক্স অলিম্পিয়াড হচ্ছে, সেগুলো খুব ভালো উদ্যোগ। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মত প্রতিষ্ঠান ও এই ক্ষেত্রে খুব ভালো ভুমিকা রাখছে। আমাদের এই ভালো জিনিস গুলো আরো ছড়িয়ে দিতে হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটাই তরুণ। এদের একটা ক্ষুদ্র অংশকেও যদি আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আকৃষ্ট করতে পারি, আমরা অনেকদূর এগিয়ে যাব। সেটা কিভাবে সম্ভব?

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

অনুপম : আমার মনে হয় আমাদের সহজ পথ না খুঁজে লং টার্ম প্ল্যান করতে হবে। আরো বেশি বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে হবে। শুধু quantity বৃদ্ধি করে আসলে খুব একটা লাভ হবে না, আমাদের high quality resource তৈরী করতে হবে large scale এ। এর জন্য মনে হয় ভালো বিশ্ব মানের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের বিকল্প নেই। তিন – চার মাসের ট্রেনিং দিয়ে সেটা করা সম্ভব না। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা এমনিতেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উত্সাহী , আমেরিকার মত না। ঠিক মত প্লাটফর্ম পেলে আমরা অনেক দূর যাব।

অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (১)

অনুপম শ্যাম হচ্ছেন আমি যাদের সাথে সরাসরি কাজ করেছি, তাদের মধ্যে সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের অন্যতম। ট্রিপার্ট ল্যাবে আমরা সহকর্মী ছিলাম। বর্তমানে অনুপম সিলিকন ভ্যালীতে থাকেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে অনুপমদা’র একটি ইন্টাভিউ যদি নেওয়া যায়, তাহলে আমাদের দেশের তরুন শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারবে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ইন্টারভিউটি থেকে আমি নিজেই অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আরেকটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে উনি একটু লাজুক স্বভাবের হওয়ায় ইন্টারভিউ’র জন্য রাজি করাতে আমার পাঁচ মিনিট সময় খরচ করতে হয়েছে। ইন্টারভিউটা একটু বড়, তাই দুটি অংশে ভাগ করেছি। আজকে প্রথম অংশ প্রকাশ করলাম।

anupom

সুবিন : আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
অনুপম : আমি এখন কাজ করছি এভারনোট নামের একটা স্টার্টআপ এ। এভারনোট একটি ক্লাউড বেসড ওয়ার্কস্পেস এপ্লিকেশন/সার্ভিস।

সুবিন : কোন টেকনোলজিতে কাজ করছেন?
অনুপম : আমি কাজ করি প্লাটফর্ম টীম এ, আমাদের কাজ হচ্ছে এভারনোট এর ব্যাকএন্ড প্লাটফর্ম এর স্ক্যালাবিলিটি, স্টাবিলিটি, সিকিউরিটি, আর পারফর্মেন্স নিয়ে। টেকনোলজি মূলত জাভা, কাউচবেস, মাইসিকুয়েল, লুসিন, হাডুপ।

সুবিন : প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করলেন কবে?
অনুপম : ১৯৯৮ সালে । ক্লাস ৭/৮ এ থাকতে মামার বাসায় কিছু কম্পিউটার সম্পর্কিত বই/ম্যাগাজিন পাই, তখন যা হাতের কাছে পেতাম তাই পড়তাম। ওখান থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে আগ্রহের শুরু। পরে এস.এস.সি পরীক্ষার পর কম্পিউটার ক্লাস এ ভর্তি হই, “সি” এর বই কিনি (Teach Yourself C – Herbert Schildt) আর নিজে নিজেই শখের বশে বই পরে প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি।

সুবিন : প্রফেশনাল প্রোগ্রামিংয়ে কবে থেকে যুক্ত হলেন?
অনুপম : ২০০৪ এর দিকে কিছু ছোট খাটো ফ্রিল্যান্স কাজ দিয়ে। তখন আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে স্ফুরণ টেক নামএ একটা স্টার্টআপ শুরু করি। আমরা শুরুতে মোবাইল এর জন্য এপ্লিকেশন/গেম বানাতাম। ওই সময় আমরা বাংলা তে এস.এম.এস. করার জন্য ও একটা সফটওয়্যার বানাই।

সুবিন : ওইসময়ে স্টার্টআপ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অনুপম : আমাদের কে কেউ পাত্তা দিত না। এই পিচ্চি রা আবার কি করবে এই রকম অবস্থা। আর তখন সবার এত তথ্যপ্রযুক্তি/স্টার্টআপ এই বিষয়ে ধারণা ও ছিল না। তো একবার আমরা ২০০৪ এ একটা সফটওয়্যার বিক্রি করার জন্য প্রেজেন্টেশন দিতে যাই তখনকার সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি তে। প্রথম দিকে সবাই তো অবাক এত ছোট ছোট ছেলেপেলেরা কি করতে আসছে এইখানে। পরিচালক পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন ওই মিটিং এ। মনে আছে প্রেজেন্টেশন শেষে কোনো এক উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হাত তালি দিয়ে বলেছিলেন “You guys are young guns, I am really impressed” । এক ধাক্কায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক উপরে উঠে যায় উনার ওই কথায়। তো ভালো খারাপ মিলিয়ে খুবই এক কথায় খুবই দু: সাহসিক ছিল পুরো ব্যাপারটা সেই সময়ের জন্যে।

সুবিন : সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে হলে কি কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে?
অনুপম : ছোট উত্তর: সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে কম্পিউটার সাইন্স পড়তে হবে না। বড় উত্তর : কেউ যদি জানে যে সে সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে চায় তাহলে অন্য কোনো সাবজেক্ট না পড়ে কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে পড়তে পারলেই ভালো। তাতে সময় এর ভালো ব্যবহার হবে, অন্য বিষয়ে পড়লে সেই শেখাটা যদি বাস্তবিক ভাবে কোনো কাজে লাগানো না হয় তাহলে তো সেটার খুব একটা অর্থপূর্ণ প্রয়োগ হলো না। কেউ যদি অন্য কোনো বিষয় এ পড়ে তাহলে তাকে কষ্ট অনেক বেশি করতে হবে, যদিও প্রচন্ড আগ্রহ থাকলে সেটা কোনো ব্যাপার না। নিজে থেকে কোনো কিছু শেখা টা খুবই অনানুষ্ঠানিক আর অসংঘটিত, যে কারনে শেখার মাঝখানে ফাঁক থেকে যেতে পারে। এখন অনেক কোর্স ই অনলাইন এ সুলভ, কেউ যদি চায় তাহলে নিজেই কোনো একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এর সিলেবাস অনুসরণ করে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। শুধু প্রোগ্রামিং লেঙ্গুয়েজ শিখেই কিন্তু সফটওয়্যার ডেভেলপ করা যায়। কিন্তু এলগরিদম , ডাটা স্ট্রাকচার, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটার আর্কিটেকচার, নেটওয়ার্কিং, ডাটাবেস, বিচ্ছিন্ন গণিত এগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে যেতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে কম্পিউটার সাইন্স এর ডিগ্রীধারী মনেও যে সে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার তা না। প্রবল ইচ্ছা আর আগ্রহ থাকা টাই জরুরী। মানে আগ্রহ থাকলে ডিগ্রী না থাকলেও চলবে, কিন্তু উল্টো টা সত্য না। আমার দেখা ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার এর মধ্যে কয়েকজন আছে যাদের কম্পিউটার সাইন্স এ কোনো আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই। কিন্তু এই ব্যাপারটা যে কোনো সাধারণ প্রবণতা না সেটা মনে রাখতে হবে।

সুবিন : ট্রিপার্ট ল্যাবের ঢাকা অফিস প্রতিষ্ঠার গল্পটি শুনতে চাই।
অনুপম : গল্পটা একদম শুরু থেকে বলি। আমি তখন প্রোগ্রামিং বিষয়ক ব্লগিং করতাম মোটামোটি নিয়মিত ভাবে। ২০০৭ এর জানুয়ারী এর দিকে ব্লগ এর মাধ্যমে একটা মেসেজ পাই, সিলিকন ভ্যালি এর মেনলো পার্ক এর একটা স্টার্টআপ থেকে, ওরা তখন ওদের সদ্য শুরু করা স্টার্টআপ এর জন্য ডেভেলপার খুজছিল, অনলাইনে সার্চ এ কোনো ভাবে আমার ব্লগ পায়, ব্লগ পড়ে ওদের মনে হয় যে আমি কাজ করতে পারব। তো ওরা আমাকে বলে আমি আগ্রহী কিনা, তখন আমার পকেট এর অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, বাসা থেকে remotely কাজ করতে পারব, মার্কিন স্টার্টআপ টাকা পয়সা ভালোই দিবে, আমার দিক থেকে আগ্রহ না থাকার কোনো কারণ ই ছিল না, আমি জানাই সেটা। ওরা তখনই একটা ইন্টারভিউ দিতে বলে তো, আমার তখন বাজে রাত ১ টার মতো। যাই হউক ওদের সিটিও ইন্টারভিউ নেয়, আমি ঘুমকাতুরে অবস্থায় মশার কামর খেতে খেতে কিছু একটা ইন্টারভিউ দেই। এরপর ওরা ওই দিনই আমাকে কাজ শুরু করতে বলে, আমি ওই স্টার্টআপ এর প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এর পরদিন থেকেই কাজ শুরু করে দেই। প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ এ এটাকে বড় করার – প্রাথমিক ভাবে আরো কয়েকজন কে সাথে নেয়া আর দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ওখানে একটা অফিস প্রতিষ্ঠা করা। আমার শুরু করার মাস কয়েক পরেই বাংলাদেশ থেকে আমার সাথে যোগ দেয় আহসান ভাই, তার পরে হাসিন ভাই, মানজিল ভাই, তপু ভাই । শুরু তে আমাদের কোনো অফিস স্পেস ছিল না, আমরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে, কফি শপে মিটিং করতাম। ২০০৭ এর শেষ দিকে অথবা ২০০৮ এর শুরুর দিকে আমরা প্রথম অফিস স্পেস নেই উত্তরা তে, একটা ২ বেডরুম এর এপার্টমেন্ট, মনে আছে হাসিন ভাই আর অন্যরা খুব খেটেছিল ওই অফিস নেয়ার সময় । তখন বাংলাদেশ থেকে ট্রিপার্ট এ কাজ করে প্রায় ৭/৮ জন। এক বছর এর মধ্যেই সেই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৮ জনে, আমরা তখন পুরনো ছোট অফিস ছেড়ে আরেকটু বড় অফিস মানে বড় বাসায় উঠি। ব্যবসার দিক দিয়ে তখন ট্রিপার্ট ভালো করছিল, ওয়েব আর মোবাইল গেমস আর এপস গুলো মোটামোটি ভাবে সফল। ২০০৯ এর শুরুর দিকে আমরা আবার অফিস বদলাই, এবার প্রথম বারের মত সত্যিকারের অফিস স্পেসে উঠলাম। এই অফিস সেটআপ এর সময় মনে আছে আমি ডেইলি স্ক্রাম করতাম বাথরুম এর মিস্ত্রী, ইলেকট্রিসিয়ান, রং এর মিস্ত্রী এদের সাথে, সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ওই সময়কার অনেক মজার গল্প আছে যেগুলো অন্য সময় বলা যাবে। যাই হোক বাংলাদেশ থেকে তখন ট্রিপার্ট এ কাজ করে ৩২ জন এর মত। নতুন কাউকে নেয়ার ব্যাপারে আমরা খুবই খুঁতখুঁতে ছিলাম। আমাদের ইন্টারভিউ প্রসেস ও ছিল অন্যরকম , ওটার গল্পও আরেকদিন হবে। কালচারিলি ট্রিপার্ট ছিল অনন্য – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক সিডিউল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অল হ্যান্ডস মিটিং, যত খুশি তত ছুটি, ওপেন ওয়ার্কিং স্পেস, আউটিং – আরো অনেক কিছু যেগুলো তখনকার বাংলাদেশের কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির জন্য ছিলো অকল্পনীয়। যেকারণে আমরা তখন আরো বেশ ভালো কিছু মানুষ কেও পেয়ে যাই আমাদের সাথে। সুবিন ভাই (যিনি এখন আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন) তিনিও ছিলেন তখন আমাদের সাথে, উনার একটি বিশেষ নাম আছে এবং সেই নামের সার্থকতার কাহিনী উনার কাছ থেকেই আগ্রহীরা জেনে নিবেন । আমরা সবাই মিলেই আসলে একটা কালচার তৈরি করতে পেরেছিলাম যেখানে আমরা নিজেরা প্রত্যেক দিন কাজ করতে যেতে চাবো। সব কিছুর উপরে আমরা মনে রাখতাম যে আমরা আমাদের দেশ কে প্রতিনিধিত্ব করছি, অনেক রাজনৈতিক আর অবকাঠামোগত বাধা বিপত্তি ছিল, কিন্তু আমরা কখনো ওগুলো কে সমস্যা হিসেবে দেখাতাম না। ট্রিপার্ট ছিল একটা বড় পরিবারের মতো, এখনো আমরা আছি, যদিও এক এক জন একেক জায়গায়। ২০০৯ এর নভেম্বরে ট্রিপার্ট ল্যাব্স কে কেনে ফেলে প্লেডম নামের আরেকটি কোম্পানি। আসলে যখন কিছু ভালো লোক কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একসাথে কাজ করে তাহলে ভালো কিছুই হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলাপার এবং সিলিকন ভ্যালির সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের স্কিল ও প্রফেশনালিজমের মধ্যে তুলনা করলে আমরা কি পিছিয়ে আছি? যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে কীভাবে কাজ করলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব?
অনুপম : প্রোগ্রামিং স্কিলে আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই। আমরা কিছুটা “Tunnel vision” এ আক্রান্ত, সাধারণত একটু দূরদৃষ্টিহীন এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Myopic and short-term goal driven), যে কারণে অনেক সময়ই আমরা বড় ছবিটা (Big picture) দেখতে পাই না। আমার মনে হয় আমাদের কে বেশি করে “কেনো ?” এই প্রশ্ন টা করতে হবে এবং এর উত্তরটা জানতে হবে, তাহলেই হবে । সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসলে প্রোগ্রামিং স্কিল ছাড়াও আরো অনেক সফট স্কিলস এর দরকার হয়, যেগুলোতে আমরা আসলে খুব একটা জোর দেই না। আমরা যদি এর গুরুত্ব টা বুঝতে পারি তাহলেই অনেক দূর এগিয়ে যাব ।
প্রফেশনালিজমে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এটা আসলে আমাদের কে সম্মিলিতভাবে উন্নত করতে হবে। আমেরিকা তে প্রত্যেক বছর সামার এ ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কোম্পানি তে ইন্টার্নশীপ করে, এর বদলে ক্রেডিট পায় । আমার মনে হয় আমাদের দেশেও এটা চালু করা দরকার, এর জন্য সফটওয়্যার কোম্পানি গুলোরই প্রথমে এগিয়ে আসা উচিত, তাতে এদেরই লাভ বেশি । এতে চাকরি জীবন শুরু করার আগেই প্রফেশনাল এনভায়রনমেন্ট সম্পর্কে সবার একটা ধারণা হবে, অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দের কাছ থেকে পরামর্শ আর প্রশিক্ষণ পাবে । প্রাথমিক ভাবে হয়ত সবাই কে স্থান সঙ্কুলান করা সম্ভব হবে না, আমাদের হয়ত এত বেশি সফটওয়্যার কোম্পানি নেই, যত টুকু হবে তাতেই লাভ। তাছাড়াও আমার মনে হয় প্রফেশনালিজমের সজ্ঞাও আমাদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার না। প্রফেশনালিজম নিয়ে আমরা বেশি বেশি করে কথা বলতে পারি তাতে হয়ত সবার কাছে বেপারটা পরিষ্কার হবে। ট্রিপার্ট এ আমরা একটা কথা প্রায়ই বলতাম “নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড”, এটা দিয়ে আসলে আমরা Accountability, Efficiency, Ownership, Communicativeness এই গুলোই বোঝাতাম।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সিলিকন ভ্যালির সবাই যে বাংলাদেশ এর ডেভেলপারদের চেয়ে ভালো তা না। কিন্তু ওদের টপ ২০% আমাদের টপ ১০% থেকে গড়পরতায় ভালো। আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই, আমাদের গন্তব্য টা কে একটু উপরে তুলতে হবে, যেখানে আছি সেখানে বসে পড়লে হবে না।

পরবর্তি অংশ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করতে হবে।

ইন্টারভিউ | গোলাম কাওসার বিলাশ

বিলাশ ভাইয়ের পুরো নাম গোলাম হাক্কানী কাওসার। উনি সাস্টে আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। তবে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার কারণে আমাদের মাঝে বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। উনি সাস্টের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই দারুণ প্রোগ্রামার ছিলেন। পরে উনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মাস্টার্স করেন, তারপর মাইক্রোসফটে যোগ দেন। বিলাশ ভাইয়ের সাথে আমার দুই ঘণ্টার আলাপচারিতা, আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য।

bilash_bhai

Tamim Shahriar
বিলাশ ভাই, কেমন আছেন?
Golam Kawsar
ভালো আছি। অনেকেই অবশ্য আমার নাম যে তালব্য শ দিয়ে লিখি সেটা জানে না।
Tamim Shahriar
আমি আবার সবার নামের ব্যাপারে সচেতন, এই যেমন শেহাব, সিহান ভাই, এই বানানগুলো আমি সচেতনভাবেই ঠিকঠাক লিখি।
Golam Kawsar
মানুষের নামের বানান ঠিক করে করলে তাদের সুদৃষ্টিতে পরার প্রথম অংশটা হয়ে যায়। 🙂
Tamim Shahriar
আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
Golam Kawsar
আমি এখন Selerity নামের একটা স্টার্টআপ কোম্পানিতে কাজ করছি। ওয়েবসাইট : http://www.seleritycorp.com/
Tamim Shahriar
এটা কী ধরণের কোম্পানী? কী কাজ হয়?
Golam Kawsar
এটা একটা সফটওয়ার কোম্পানি। আমরা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কম্পিউটারকে দিয়ে নিউজ পড়াই। এরপর নিউজ পার্সিং করে যে মেটাডেটা পাই সেটা বিভিন্ন কম্পানীর কাছে বিক্রি করি। প্লাস আমরা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে নিউজ পার্সিং করি, অন্য কোনো কম্পানী আমাদের আগে নিউজ পার্সিং করে মেটাডেটা বের করে ক্লায়েন্টদের কাছে দিতে পারেনা।
Golam Kawsar
সরি আমি এতক্ষন আমার নতুন কেনা ম্যাক ব্যবহার করছিলাম।
এখন উইন্ডজে ফিরে আসছি।
ম্যাকে বাংলা ঠিক মতো আসছিলোনা।
Tamim Shahriar
আপনার নতুন ম্যাকের কনফিগারেশনটা কী পাঠকদের জন্য বলবেন? আমি অবশ্য জানি। 🙂
Golam Kawsar
হাহা।
আমি বিগ ডেটা নিয়ে কাজ করি। আমার অনেক স্পিড আর মেমরি দরকার হয়ঃ ৮ কোর আই ৭, ৩২ গিগা র‍্যাম, ১ টেরা হার্ড ডিস্ক।
Tamim Shahriar
বিগ ডেটার কথা প্রায়ই শুনি। আসলে কাজটা কী?
Golam Kawsar
বিগ ডেটা এক ধরণের বাজওয়ার্ড বলতে পারো। বেসিক্যালি যখন কেউ অনেক ডেটা নিয়ে কাজ করে তখনি তাকে বিগ ডেটা বলে। এই বিগ ডেটা সাধারণত আনস্ট্রাকচার্ড ডেটার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।
অর্থ্যাৎ, ডেটা এমনভাবে আছে যে সরাসরি ব্যবহার করার উপায় নাই।
তখন বিভিন্ন এলগরিদম ব্যবহার করে সেই ডেটা থেকে নানা তথ্য উপাত্ত বের করা হয়।
Tamim Shahriar
এই অ্যালগরিদমগুলো কি মেশিন লার্নিং ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের সাথে সম্পর্কিত?
Golam Kawsar
বেশির ভাগ সময় মেশিন লার্নিং আর ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এগুলো ছাড়াও শুধু পরিসংখ্যান, লিনিয়ার এলজেবরা, কিংবা স্ট্রিং প্রসেসিং করেও অনেক তথ্য উপাত্ত বের করে ফেলা যায়।
তবে হ্যাঁ, মেশিন লার্নিং প্রায় সব ডেটা সায়েন্সের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।
Tamim Shahriar
আপনি এর আগে কোথায় কাজ করতেন?
Golam Kawsar
এটা আসলে আমার ৪ নম্বর চাকুরী আমেরিকাতে 🙂 আমার চাকুরী জীবন শুরু হয় মাইক্রোসফটে। এরপর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক গোল্ডম্যান স্যাক্স, এবং তারপর ফ্যাক্টসেট নামের আরেকটা কম্পানী। এবং সর্বশেষ সেলেরিটিতে।
Tamim Shahriar
আপনি তো আমেরিকাতে মাস্টার্স করেছেন? সেটা কি আপনাকে মাইক্রোসফটের চাকরি পেতে সাহায্য করেছে? কিংবা অন্যান্য চাকরিগুলোর ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে?
Golam Kawsar
হ্যাঁ এখানে এসে মাস্টার্স করেছি। মাস্টার্স থাকায় ইম্প্রেশন কিছুটা ভালো হয়েছে মনে হয়। কিন্তু আমি আসলে মাইক্রোসফটের চাকুরী পেয়েছি মাস্টার্স শেষ করার প্রায় এক বছর আগে! বলতে পারো আমার সাস্ট এর ব্যাচেলর ডিগ্রির উপর ভিত্তি করেই আমি মাইক্রোসফটে চাকুরী পেয়েছি।
ডিগ্রির কথা যখন বলছো, মাইক্রোসফটে আমার প্রথম বস সম্ভবত ব্যাচেলরও কমপ্লিট করেনি!
Tamim Shahriar
প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আমাকে প্রশ্ন করে, বিশেষ করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সময়। অমুক ভার্সিটিতে সিএসই পড়লে চাকরি বেশি নাকি তমুক ভার্সিটিতে? মানে ক্যারিয়ারের জন্য কোনটা ভালো? আপনি এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবেন?
Golam Kawsar
অনেকদিন দেশে না থাকায় দেশের চাকুরীদাতাদের বর্তমান মনোভাব খুব একটা জানিনা। তবে আমার মনে হয় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকুরী পাবার ক্ষেত্রে স্কিল সেট হচ্ছে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। প্রোগ্রামিং এবং সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিলস ভালো থাকলে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই পড়লেও চাকুরী পেতে তো অসুবিধা হবার কথা না। তবে তুলনামূলকভাবে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে একটা ভালো প্রাথমিক ইম্প্রেশন হতেই পারে। কিন্তু এই ইম্প্রেশনের পর ইন্টারভিউতে ভালো না করলে সেই একই ইম্প্রেশন আবার তার বিরুদ্ধে যাবে! কারণ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বাজে ইন্টারভিউ দেওয়া মানে তুমি তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টাকে কোনো কাজে লাগাওনি।

Tamim Shahriar
আপনি ক্যারিয়ার শুরু করেছেন মাইক্রোসফটের মতো বিশাল এবং বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। আর এখন কাজ করছেন স্টার্টআপে। মাঝখানে গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর মতো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে। এগুলোতে কাজের ধরন, পরিবেশ ও সংস্কৃতির যদি একটু তুলনা করতেন।
Golam Kawsar
বড় কম্পানী এবং ছোট স্টার্ট-আপ কম্পানীর কালচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আর টেক কম্পানী এবং ফাইনানশিয়াল কম্পানীর কালচারও অনেক ভিন্ন।
মাইক্রোসফট হচ্ছে সফটওয়ার নিয়ে যারা কাজ করতে চায় তাদের জন্যে স্বর্গ রাজ্য। সফটওয়ারের এমন কোনো দিক নাই যেটা নিয়ে তারা কাজ করেনা। প্লাস ওখানে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কেউ বেশি কাজ করতে চাইলে অসুবিধা নাই, কিন্তু কেউ বেশি এবং দ্রুত কার করার জন্যে চাপাচাপি করবে না। সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টের নানান দিক শেখার জন্যে মাইক্রোসফট একটা চমৎকার জায়গা।
গোল্ডম্যান স্যাক্স হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নামকরা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক। ওরা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার হ্যান্ডল করে। ওখানে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়াররা হচ্ছে এক ধরণের টুল। ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ হচ্ছে ফাইনানশিয়াল ডিপার্টমেন্টগুলোকে সাপোর্ট দেওয়া। যদিও ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ওরা একদিনও চলতে পারবেনা, তবুও ট্রেডিং এর সাথে জড়িত ইঞ্জিনিয়াররা ছাড়া বাকি সবাইকে কস্ট সেন্টার ধরা হয়। মানে লস খাত। প্লাস কাজের অনেক প্রেশার। ওরা মনে করে সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার!
এবার আসি স্টার্ট-আপ কালচারে। আজকে যে গুগল বা ফেইসবুক দেখছো, এগুলো কিছুদিন আগেও স্টার্ট-আপ ছিলো।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই কোম্পানীগুলো কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বিশ্বখ্যাত কোম্পানীতে পরিণত হয়েছে!
স্টার্ট-আপ কোম্পানীর মূল বিষয় হচ্ছে এটাকে তুমি নিজের কোম্পানীর মতো ট্রিট করবা। এরপর নিজের সব মেধা এবং শ্রম দিয়ে এটাকে আস্তে আস্তে বড়ো করতে থাকবা।
ওদের কাজের একটা মন্ত্র প্রায়ই থাকে “break fast, fix fast”। অর্থাৎ, দরকার হলে সিস্টেম এর একটু ক্ষতি হোক, কিন্তু নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকো!
Tamim Shahriar
নিয়মিত চাকরির কাজের বাইরে আপনি আর কী কী করেন?
Golam Kawsar
করার তো ইচ্ছা অনেক কিছু, কিন্তু আমাদের ছেলে হওয়ার পর থেকে আর খুব বেশি কিছু করা হয় না। আমি নিজে নিজে কিছু সফটওয়ার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করি। আশা করছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে একটা/দুইটা সফটওয়ার রিলিজ করতে পারবো। মাঝে মাঝে github এ কিছু কোড আপলোড করি। মাঝে মাঝে প্রোগ্রামিং ব্লগ লিখি। কখনো কখনো বাংলা ব্লগ লিখি। জিম করি। আমার চৌদ্দ মাস বয়সী ছেলের সাথে খেলি। এবং সবচেয়ে বেশি যেটা করি সেটা হচ্ছে প্রচুর পড়ি!
Tamim Shahriar
আমি আপনাকে প্রায়ই শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিভিন্ন আর্টিকেল শেয়ার করতে দেখি। এমনকী আপনি নিজেও মাঝে মাঝে লিখেন এসব নিয়ে। বিষয়টা কী এতই গুরত্বপূর্ণ?
Golam Kawsar
হ্যাঁ। বিষয়টা অসম্ভব গুরুত্মপূর্ণ!
Tamim Shahriar
কেন? আমরা তো এসব কিছু করি না। ভালোই তো আছি। 🙂
Golam Kawsar
তুমি কখনো শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা দূর্বল মানুষকে জীবনে সফল হতে দেখেছো?
আসলে কি আমরা সবাই ভালো আছি? আমি আমার কাছাকাছি বয়সের অনেক বন্ধুবান্ধবকে দেখি একটা নধর ভূড়ি নিয়ে ঘুরতে। আরেকটু বয়স হলে এদের অনেকের ডায়াবেটিস ধরা পড়বে (আল্লাহ না করুক), কিংবা স্বাস্থগত অন্যান্য জটিলতা ধরা পড়বে। তখন কি এরা ইয়াং বয়সের মতো কাজে কর্মে প্রোডাক্টিভ থাকতে পারবে?
আর একটা বয়সের ভারে দূর্বল জনগোষ্ঠিকে বসে বসে খাওয়ানো বা পরানোর মতো অবস্থা কি আমাদের দেশের আছে?
আমেরিকাতে আমি দেখি আশি নব্বই বছর বয়সের মানুষেরা নিজের কাজ নিজে করে, বাড়ির সামনের লনের ঘাস কাটে, ড্রাইভ করে, রান্না করে।
শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলেই তারা এগুলো করতে পারে।
শরীর সুস্থ আর শক্ত থাকলে আমাদের ব্রেইনও সুস্থ আর শক্ত থাকে। আর ব্রেইন হচ্ছে আমাদের প্রডাক্টিভিটি সেন্টার! ব্রেইন সুস্থ না থাকা মানে হচ্ছে মানসিক ব্যাধি!
আরো অনেক কিছু বলা যায়। ইন ফ্যাক্ট আমার একটা বই লেখার ইচ্ছা আছে এটা নিয়ে। 🙂
Tamim Shahriar
কিন্তু আমরা তো সময় পাই না, এগুলো নিয়ে ভাবার কিংবা কিছু করার। আপনারা এত সময় পান কীভাবে?
Golam Kawsar
হাহা, শুধু ফেইসবুকের নিইজফিডের দিকে তাকিয়ে থাকলেই দেখবা আমাদের কতো সময় আছে 🙂
সিরিয়াসলি বললে, সময় বের করে নিতে হবে। আমি সারাদিন অফিস শেষ করে জিমে যাই। জিমে যেয়ে আড়াইশ পাউন্ড ওজনের ডেডলিফট করি। জিম শেষ করার পর আমার শরীরে সব ভালো ভালো হরমোন কাজ করা শুরু করে দেয়। আর তাতে আমার সারা দিনের সব ক্লান্তি চলে যেয়ে শরীর মন সতেজ হয়ে যায়। এটা যেকোনো মানুষের জন্যেই সত্যি! পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাগের নাম হচ্ছে ব্যায়াম। মানুষের জৈবিক এবং সভ্যতাগত বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখবা  চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করার ব্যাপারটি একেবারেই নতুন। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা ঘর থেকে বের হয়ে সারা দিন কাজ করতো, দৌড়াদৌড়ি করে খাবার সংগ্রহ করতো। আমাদের শরীর বসে থাকার মতো করে তৈরি হয়নি। ব্যায়াম আমাদেরকে আমাদের সত্যিকারের জৈবিক ফর্মে নিয়ে যায় এবং শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখে।
Tamim Shahriar
সকালে ব্যায়াম করা ভালো নাকি সন্ধ্যায়?
Golam Kawsar
যে কোনো সময় ব্যায়াম করা একই ফল দেয়। আমি আগে সকালে করতাম অফিসে যাওয়ার আগে। কিন্তু আমার ছেলে সকালে আমাকে আটকে রাখে বলে বিকেলে/সন্ধ্যায় যাওয়া শুরু করেছি।
Tamim Shahriar
আপনি আরেকটা বিষয় বললেন যে প্রচুর বই পড়েন? কী ধরণের বই?
ইবুক বেশি পড়েন নাকি হার্ডকপি?
Golam Kawsar
আসলে আমি বলেছি আমি প্রচুর পড়ি – সেটা বই হতে পারে আবার নানা ধরণের আর্টিকল হতে পারে। আগে হার্ড কপি পড়তাম বেশি। এখন ইবুক/পিডিএফ বেশি পড়ি। আমার অফিসে যাওয়া আসা ট্রেইনে, তাই ওই সময় পড়ার জন্যে একটা দারুণ সময়!
আমি সাধারনত নন-ফিকশন বেশি পড়ি। সায়েন্স, টেকনলজি, ইত্যাদি বিষয়ে আমার চরম কৌতুহল। পলিটিক্স, অর্থনীতি, ধর্ম, দর্শনও বাদ যায় না।
Tamim Shahriar
আমি নিজেও প্রচুর আর্টিকেল পড়ি। তবে আমি লক্ষ্য করেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্টিকেল পড়লে নিজের তথ্যাভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, কিন্তু deep insight তৈরির ক্ষেত্রে মনে হয় বই পড়ার বিকল্প নাই। আপনার কী এরকম কিছু মনে হয়?
Golam Kawsar
কিছুটা ঠিক। কিন্তু আমি যখন কোনো বিষয়ে আর্টিকেল পড়ি তখন সাধারণত অনেক লেখকের অনেকগুলো আর্টিকেল পড়ি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। তবে বই যেহেতু অনেক দীর্ঘ, সেটাতে insight অবশ্যই বেশি হবে।
Tamim Shahriar
এবারে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি কোন কোন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন?
Golam Kawsar
আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি নোয়াখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম বললে কেউ চিনবেনা। স্কুলের নাম হরি কৃষ্ণপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটা নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নে অবস্থিত। হাই স্কুলে পড়েছি ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। কলেজ নটর ডেম।
Tamim Shahriar
ভার্সিটিতে পড়ার সময় এবং পরবর্তি সময়ের কর্মজীবনে স্কুলের লেখাপড়ার প্রভাব কেমন?
Golam Kawsar
স্কুলের লেখাপড়ার প্রভাব বলার চেয়ে স্কুলজীবনের প্রভাব বলাটা মনে হয় বেশি যুক্তিসঙ্গত। স্কুলজীবনে ছেলেমেয়েদের কৌতুহল তৈরি হয়, বাবা-মা এবং বন্ধুবান্ধব থেকে তারা সেই কৌতুহল মেটায়। শুধু পড়ালেখার প্রভাব আমার মনে হয় খুব বেশি না।
Tamim Shahriar
কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার কারণ কী?
Golam Kawsar
এক কথায় বললে কারণ এটা আমাদের সময় একটা হট সাবজেক্ট ছিলো ।:-) কিন্তু পড়তে শুরু করার পর অবশ্য আমি কম্পিউটার সায়েন্সকে ভালোবাসতে শুরু করি। যদিও আমার আসলে পদার্থবিজ্ঞান পড়ার ইচ্ছা ছিলো।
Tamim Shahriar
ভার্সিটিতে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তার নিয়মিত লেখাপড়ার বাইরে আর কী কী করতে পারে?
Golam Kawsar
কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে যে তার সাবজেক্টে কাজ করার জন্যে শুধু একটা কম্পিউটার হলেই যথেষ্ট।
আর যাদের থিওরেটিকাল দিক নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা তারা বাদের প্রায় সবারই প্রোগ্রামিং করে খেতে হবে। তাই প্রোগ্রামিং এ খুব ভালো হবার জন্যে প্র্যাকটিস করে যেতে হবে।
আর পড়ালেখার বাইরে যেকেনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রেম করা উচিৎ। যে কারণেই হোক, বিপরীত লিঙ্গের মানুষের কাছে থাকলে আমরা কাজে কর্মে একটু বেশি উদ্দীপ্ত হই। 🙂 ভালোবাসার মানুষটির কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্যেও অনেকে অনেক অসম্ভব কাজ করে ফেলে!
Tamim Shahriar
কোনো সন্দেহ নাই যে আপনার সাফল্যের রহস্য কোথায়। 🙂 আচ্ছা, প্র্যাকটিস কীভাবে করা যায়? আর ভালো সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়ার জন্য কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিংয়ের গুরুত্ব কতটুকু (যাকে আমরা এসিএম প্রোগ্রামিং বলে থাকি)?
Golam Kawsar
প্র্যাকটিস করার জন্যে কয়েক লক্ষ আইডিয়া আছে। 🙂 নিজে নিজে একটা ছোট ফেইসবুক এর মতো সোশাল নেটওয়ার্ক সাইট বানাতে পারে, একটা ছোট সার্চ ইঞ্জিন বানাতে পারে, একটা ই-কমার্সের ওয়েবসাইট বানাতে পারে, কতো রকম অ্যাপ বানানো যায়!
এসিএম প্রোগ্রামিং এর ব্যাপারটা এভাবে বলা যায়ঃ এসিএম প্রোগ্রামিং এ ভালো হলে প্রায় সব সময়েই ভালো সফটওয়ার প্রকৌশলী হওয়া যায়, কিন্তু ভালো সফটওয়ার প্রকৌশলী হওয়ার জন্যে সব সময় এসিএম প্রোগ্রামিং লাগে না!
Tamim Shahriar
বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে মুক (MOOC) একটি বাজওয়ার্ড। মুক বিষয়ে আপনার মতামত কী?
Golam Kawsar
MOOC আমার মনে হয় একটা চমৎকার জিনিস। আমি নিজে কোর্সেরা থেকে কয়েকটি কোর্স করেছি। আমি কখনো স্ট্যানফোর্ডে চান্স পাই নাই, কিন্তু MOOC এর কল্যাণে স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসরদের ক্লাস বিনামূল্যে করার সুযোগ পেয়েছি!
Tamim Shahriar
অনলাইন কোর্স থেকে আসলে কতটুকু শেখা যায়?
Golam Kawsar
সত্যি কথা বলতে কি শেখার ব্যাপারটা অনেকটাই শিক্ষার্থীর কাছে। আমি নিজে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খুব কম ক্লাশই খুব মনোযোগ দিয়ে করেছি। যা শেখার পরে নিজে বাসায় এসে পড়েছি! ক্লাশে ভালো শিক্ষক পাওয়া এবং তার সাথে ইন্টারএকশন করে ভালো করে কিছু শেখা আসলে সবসময় হয়ে ওঠেনা।
কিন্তু যারা অনলাইনে কিছু শিখতে যাবে তারা আগ্রহ আছে বলেই যাবে। সেই আগ্রহ থেকেই শেখার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।
তাই শেখার সম্ভাবনাটাও বেশি।
Tamim Shahriar
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও এর সম্ভাবনা নিয়ে আপনার কী মনে হয়? প্রশ্নটা একটু সুনির্দিষ্ট করে বলি। বাংলাদেশে কম্পিউটার সায়েন্স এডুকেশন, সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের সুযোগ, বিভিন্ন সেক্টরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এসব বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?
Golam Kawsar
সত্যি কথা বলতে কি গতো বিশ বছর ধরে তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে যেরকম উৎসাহ-উদ্দীপনা বিভিন্ন ভাবে তৈরি হয়েছে সেভাবে এটা এখনো একটা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেনি আমাদের দেশে। বিশ বছর একটা বড় সময়। বিশ বছর ধরেই এই খাত এখনো “উদীয়মান” খাত হিসেবে রয়ে গেছে। এখনো একটা পরিপূর্ণ শিল্প হয়ে উঠেনি।
আমার মনে হয় এর একটা বড় কারণ আমাদের কম্পিটার সায়েন্স শিক্ষা ব্যবস্থা। আমি নিজের চোখে আমার বন্ধুদের প্রোগ্রাম মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পেতে দেখেছি! কম্পিউটার বিজ্ঞান একটা ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট, এখানে ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার দিয়ে কাজ করানো শিখতে হয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়ই ছেলেমেয়েরা শুধু ভালো গ্রেইডের জন্যে পড়ালেখা করে। অনেকেই আসলে জানেনা একটা কম্পিউটার ঠিক কিভাবে কাজ করে।
দ্বিতীয় কারণ আমাদের দেশে সফটওয়ারের ব্যবহার খুবই কম। এটা ঠিক সফটওয়ারের আন্তর্জাতিক বাজার অনেক বড়, কিন্তু একটা মোটামুটি সাইজের দেশীয় বাজার থাকলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা সহজেই দেশীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সফটওয়ার লেখার সুযোগ পেতো। যেটার জন্যে তারা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ইন্ডিয়া, চায়না, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতাদি দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
এরপর আছে সরকার। দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সরকার। সরকার যদি বিপুলভাবে সফটওয়ার ব্যবহার করতো তাহলেও আমাদের দেশে একটা দেশীয় সফটওয়ার বানানোর উদ্দ্যোগ শুরু হতো।
আর একটা ব্যাপার হচ্ছে আমাদের ইংরেজী জ্ঞান। ইংরেজীতে ভালো না হলে সফটওয়ার কেনো কোনো কিছুতেই আন্তর্জাতিক বাজার ধরা যায়না। আজকে যদি আমাদের গার্মেন্টস কর্মীদের ইংরেজী জানতে হতো তাহলে আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কোনোভাবেই এতো ভালো পর্যায়ে আসতে পারতো না।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

Tamim Shahriar
প্রযুক্তির প্রাথমিক পাঠ যদি আমরা বাংলায় নিতাম, তাহলে কি আমরা আরো বেশি সংখ্যক প্রযুক্তি কর্মী তৈরি করতে পারতাম না? কিংবা প্রথমবার প্রোগ্রামিং বা ডাটা স্ট্রাকচার শেখার সময় আমরা যদি বাংলা বইয়ের সাহায্য নেই, তাহলে কি সেটা আমাদের জন্য ভালো ব্যাপার হবে?
Golam Kawsar
সোজা কথায় বললে, না! উত্তরটা হ্যাঁ হতো যদি আমাদের প্রায় সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বই ইংরেজীতে হতো। যেমনটা চীনের ক্ষেত্রে ঘটছে। ওদের সবকিছু ওদের ভাষায়। আমাদের একটা দুইটা বই বাংলায় হলে উল্টো আমাদের ক্ষতি হবে। কয়েকটা কন্সেপ্ট বাংলায় আর বাকিগুলোর জন্যে ইংরেজী বই নিয়ে দৌড়াদৌড়ি খুব একটা ভালো জিনিস না নতুন জিনিস শেখার ক্ষেত্রে!
Tamim Shahriar
সবকিছু বাংলায় হলে কি ভালো হবে? মানে সবাইকে মোটামুটি মানের ইংরেজি শেখানো সহজ হবে নাকি প্রযুক্তির জ্ঞানকে বাংলা ভাষায় নিয়ে আসাটা বেশি সহজ হবে আমাদের জন্য?
Golam Kawsar
আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব বই বাংলায় থাকলে আমাদের তো আর ইংরেজী খুব বেশি জানার দরকার হবে না। শুধু বিদেশীদের সাথে কমিউনিকেশনের জন্যে যা দরকার সেটা লাগবে। লক্ষ করো আমি বলেছি সব বই। মানে সব ধরণের ইঞ্জিনিয়ারিং – ইলেক্ট্রিকাল, মেকানিকাল, সিভিল, সব ধরণের বিজ্ঞান – পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি। চীনারা ঠিক এটাই করে। ওদের এতো বেশি অধ্যাপক এবং গবেষক আছে যে ওরা অসংখ্য বই নিজেরা নিজেদের ভাষায় লিখে ফেলে। বাইরের বিখ্যাত বইগুলো চাইনিজ ভাষায় অনুবাদ করে নেয়। তায় ওদের প্রায় সব পড়ালেখাই চাইনিজ ভাষায়। আমাদের যেহেতু সেই রকম অবস্থা নাই, তাই আমার মনে হয় আমরা ইংরেজীতে সব করলেই আমাদের জন্যে ভালো হবে।
Tamim Shahriar
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এত সময় দেওয়ার জন্য।
Golam Kawsar
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ আমার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্যে!

সাক্ষাৎকার : আল-মামুন সোহাগ

আল-মামুন (সোহাগ) সাস্টে আমার ক্লাসমেট ছিলো। এসিএম প্রতিযোগিতায়ও আমরা বেশ কিছুদিন একই দলে ছিলাম। সাস্টের সিএসই বিভাগ থেকে পাশ করার পরে আস্তে আস্তে গেম প্রোগ্রামিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাংলাদেশের যেই অল্প কয়েকজন প্রোগ্রামাদেরকে আমি চিনি, তাদের মধ্যে সোহাগ হচ্ছে সেরা গেম প্রোগ্রমার। তাই আমার ব্লগের পাঠক, বিশেষ করে যারা গেম তৈরিতে আগ্রহী, তাদের জন্যই সোহাগের একটি সাক্ষাৎকার নিলাম। সোহাগ খুব বেশি ব্যস্ত থাকায় এটি চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে না নিয়ে ইমেইলের মাধ্যমে নিতে হয়েছে। তাতে এর প্রাণ একটু কমে গেলেও গেম তৈরিতে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা সোহাগ বলেছে।

al-mamun

সুবিন : বর্তমান কাজ কোথায় এবং কী নিয়ে?
আল-মামুন : আমি বর্তমানে কানাডা তে অবস্থান করছি। Ratrod Studio, Inc এ Senior গেম ডেভেলপার হিসাবে দায়িত্বরত আছি। প্রধানত আমি গেম ডেভেলপার, মোবাইল ডিভাইস এর জন্য গেম বানাই। iOS/Android/Windows8/Windows Phone এবং Console এর জন্য sports/racing টাইপ এর গেম গুলোই বর্তমান কোম্পানি তৈরি করে থাকে।

সুবিন : গেম তৈরিতে আগ্রহী হওয়ার কারণ কী?
আল-মামুন : আমি গেম ডেভেলপার হবো, এই বিষয়টা Aim in Life রচনায় কখনও লিখি নাই। তবে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা ছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কম্পিউটারে টাচ করেছিলাম। এর আগে শুধু TV আর সিনেমাতে কম্পিউটার দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর একটা কোম্পনি তে ইন্টারভিউ দেই, ওরা বাংলাদেশে AAA ধরনের গেম বানাতে ডেভেলপার খুঁজছিল কিন্তু কাউকে পাচ্ছিল না। আমি গেম ডেভেলপার হিসাবে ইন্টারভিউ দেই, পরে ওরা আমাকে সিলেক্ট করে। যদিও আমি ইন্টারভিউ এর পরে একটা ছোট একটা গেম এর ডেমো বানিয়ে দেই দুই দিনে। হয়ত ওইটা ওদের আমাকে পছন্দ করার কারণ।

সুবিন : এখন পর্যন্ত বানানো সেরা গেম?
আল-মামুন : এখন পর্যন্ত অনেক গেমই বানিয়েছি। সব সেরা গেমগুলোই মোবাইল ডিভাইসের জন্য। যদিও ফেইসবুক সহ অনেক প্লাটফর্মে আমার বানানো গেম আছে। আমার বেস্ট কিছু গেম নিচের লিঙ্ক পাওয়া যাবেঃ
https://itunes.apple.com/us/artist/ratrod-studio-inc./id355894663
https://play.google.com/store/search?q=ratrod%20studio%20inc

সুবিন : সোশ্যাল গেম, ডেস্কটপ গেম এবং মোবাইল গেম, সব প্ল্যাটফর্মেই কাজ করা হয়েছে। এগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কোনটার কেমন?
আল-মামুন : এক একটা প্লাটফর্ম এ এক এক রকম ফান এন্ড চ্যালেঞ্জে। সোশ্যাল গেম এর ইউজার casual গেম খেলতে পছন্দ করে, তাই সিম্পল কিন্তু addicting করা লাগে। দুনিয়াতে সিম্পল কিছু করা সবচে কঠিন কাজ, কারণ এক এক জন এক একটা ব্যাপারে simplicity খুঁজে পায়। ডেস্কটপ আর কনসোল হলো গেমারদের সবচেয়ে প্রিয়। সব Next Gen technology সবার প্রথমে এই ২ টা তে আসে। AAA গেম এখনও বানানোর সৌভাগ্য হয় নাই। ওইটার জন্য অনেক বড় বাজেট এবং টিম লাগে। আমি সবচে বেশি কাজ করেছি মোবাইল প্ল্যাটফর্মে। এই প্লাটফর্মটা এখন সব থেকে প্রমিজিং। তার অবশ্য অনেক কারণ আছে। এখন সবার হাতে মোবাইল, সবাই এটাকে এন্টারটেইনিং ডিভাইস হিসাবে নিয়েছে। মোবাইল ডিভাইসগুলো দিন দিন পাওয়ার হাউস এ পরিণত হচ্ছে। তার পরেও মেমোরি, গ্রাফিক্স এবং ফিজিক্স গণনা অনেক চিন্তা ভাবনা করে করতে হয়। বর্তমানএ আমি শুধু গেম নিয়ে আর কাজ করছি না, অ্যাড সিস্টেম, মনেটাইজেশন এবং নেটিভ সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন নিয়ে কাজ করছি।

সুবিন : একটা বড় গেম তৈরি করতে কী ধরনের লোক দরকার হয়? খরচই বা কেমন?
আল-মামুন : আমরা যদি ডেস্কটপ অর কনসোল গেমের কথা বলি তাহলে ওইটার হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। একটা ডেস্কটপ অর কনসল গেম বানাতে মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। NFS টাইপ এর একটা গেম বানাতে অন্তত ২ থেকে ৩ বছর ডেভেলপমেন্ট টাইম ধরতে হবে, যেখানে ২০০ থেকে ৩০০ প্রোগ্রামার, আর্টিস্ট, প্রডিউসাররা কাজ করবে। মোবাইল এর জন্য একটা ত্রিমাত্রিক গেম বানাতে ৬ মাস থেকে ১ বছর সময় লাগে, কিন্তু সব কিছুই নির্ভর করবে ডিজাইন এর উপর। কোন প্রোফেশনাল গেম বানানোর খরচ ৩০,০০০ – ৫০,০০০ ডলার এর নিচে হয় না (সবকিছুই নির্ভরশীল ডিজাইন এর উপর)। আবার ছোট 2D গেম ৪০০০ থেকে ৫০০০ ডলার এ করা যায়।

সুবিন : বাংলাদেশের একটা ছেলে বা মেয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন করার পরে কীভাবে গেম ডেভেলাপমেন্ট-এ আসতে পারে? দেশে এবং বিদেশে কাজের সুযোগ কেমন?
আল-মামুন : গেম ডেভেলপার হওয়ার জন্য গ্রাজুয়েশন করতে হবে এমন কোনো কথা নাই। একজন ভালো গেম ডেভেলপার হওয়ার জন্য আগে ভালো গেমার হওয়া দরকার। আমরা সবাই গেম খেলতে চাই বা পছন্দ করি, কিন্তু কয়জন এটা কিভাবে করা হয়েছে বা কিভাবে কাজ করছে সেটা নিয়া চিন্তা করছি? যে মানুষগুলা এটা নিয়ে আনালাইসিস করে, তারা আস্তে আস্তে এর কোনো একটা পার্টে কাজ করা শুরু করে। কেউ ডেভেলপার, কেউ আর্টিস্ট আর কেউ ডিজাইনার হয়। প্রত্যেকটা গ্রুপ আবার অনেক ভাগে বিভক্ত। যেমন, কেউ গ্রাফিক্স প্রোগ্রামার, কেউ UI প্রোগ্রামার, কেউ গেম প্লে প্রোগ্রামার। বাইরে এটা হল নরমাল পাথ, গেম ডেভেলপমেন্ট এ আসার। অনেকেই হাই স্কুলের পরে আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করে নাই।

এখন আসি কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন করার পরে কীভাবে গেম ডেভেলাপমেন্ট-এ আসা যায়। আমি যেমন গেমার থেকে ডেভেলপার হই নাই, তাই অনেক কিছু আস্তে আস্তে নিজের চেষ্টায় শিখতে হইছে। তেমনি, যার প্রোগ্রামিং লজিক আছে, কোড করতে জানে, ডাটা স্ট্রাকচার জানে, এলগরিদম জানে, সে গেম প্রোগ্রামর হতে পারে। বেসিকটা হল সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে গেম ডেভেলপার করতে হলে, অসম্ভব ইচ্ছা দরকার। তাছাড়া গেম হতে হবে ১০০% পরিপূরণ প্রোডাক্ট। একটা ওয়েবসাইট অথবা একটা সফটওয়ারে বানিয়ে কিছু ফিচার পরেও দেওয়া যায়, কিন্তু গেম এর ক্ষেত্রে তা করা সম্ভব না। প্রতিটা কাজ ১০০% সম্পন্ন হতে হবে। তাছাড়া একটা গেম এর কাজ এ অনেকগুলা স্কিল এর লোকের দরকার হয়। যেমন প্রোগ্রামার, আর্টিস্ট, ডিজাইনার। তাই খুব passion না থাকলে টিকে থাকা কঠিন।

কাজের সুযোগ দেশে বিদেশে এ সব জায়গায় আছে। বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক কোম্পানি 2D এবং 3D গেম বানাচ্ছে। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে কারণ মানুষ তার মোবাইল ডিভাইস শুধু কথা বলার জন্য ব্যবহার করেনা, এটা এখন বিনোদনের যন্ত্র। আর বিনোদনের অন্যতম অংশ হচ্ছে গেম। কেও যদি যেকোনো একটা পার্ট এ এক্সপার্ট হয়, প্রোগ্রামিং অথবা ডিজাইন অথবা মডেলিং, তাহলে তার জব নিয়া চিন্তা করতে হবে না। তবে এক্সপার্ট হতে গেলে নিষ্ঠার সাথে পরিশ্রম করতে হবে।

সুবিন : যারা এখনও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী, তারা ভবিষ্যতে গেম তৈরির কাজে আসতে চাইলে এখন থেকেই কি তাদের কোনো প্রস্তুতির দরকার আছে? যদি থাকে, তাহলে সেগুলো কী কী?
আল-মামুন : গেম ডেভেলপমেন্টে আসতে হলে সবার আগে বের করতে হবে, সে গেম এর কোন বিষয়ে নিজেকে এক্সপার্ট হিসাবে দেখতে চায়। এক এক জন এক একটা ব্যাপারে আনন্দ খুঁজে পায়। তারপর সেই বিষয়ের উপরই ধ্যান-জ্ঞান করতে হবে। যেমন, গেম প্রোগ্রামার হওয়ার জন্য সবার আগে একটা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ জানতে হবে। কোন ল্যাঙ্গুয়েজ তা ব্যাপার না, জানতে হবে কিভাবে লজিক দাঁড় করতে হয়। যে ধরেনের গেম খেলতে পছন্দ করে, সেগুলা নিয়া টেকনিকাল এনালাইসিস করতে হবে। বুঝতে হবে, কী ভাবে কাজগুলা হয়, আর্ট পাইপ লাইন বুঝতে হবে। আর্টিস্ট এর সাথে কমিউনিকেট করতে জানতে হবে। টুলস সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর নিজে নিজে ডেমো বানাতে হবে। চেষ্টা করতে হবে একটা প্রোডাক্ট বানানোর। কেউ যদি এই স্টেপ ফলো করে তাহলে নিজের চাকরি নিয়া কখনো চিন্তা করতে হবে না, চাকরি তার কাছে চলে আসবে। ধরা যাক একটা ছেলে বা মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার আগে একটা Angry Bird টাইপ এর একটা গেম বানিয়ে তার প্রোফাইল হিসাবে দেখালো, তাহলে কোনো কোম্পানি তাকে নিতে দ্বিধা বোধ করবে না।

সুবিন : বাংলাদেশে গেমিং ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা কেমন?
আল-মামুন : আমরা এই ইন্ডাস্ট্রির তে পদার্পণ করছি, তাও মোবাইল ডিভাইসে। আমাদের কমিউনিটি এর অভাব। যদিও আমি জানি আমরা সেই জায়গায় এক সময় পৌঁছে যাব। আমাদের অনেক প্রোগ্রামার আছে, কিন্তু শুধু গেম ডেভেলপার হিসাবে যদি কাওকে খুঁজি তাহলে হাতে গোনা কয়েকজনকে পাওয়া যাবে। কমিউনিটির কথা বললাম কারণ এইটা গেম ডেভেলপার, গেম আর্টিস্ট তৈরি করবে। যখন ডেভেলপার, আর্টিস্ট পাওয়া যাবে, ভালো কমেউনিটি থাকবে, তখন বড় বড় কোম্পানি বাংলাদেশে ব্রাঞ্চ ওপেন করতে চাইবে। যদিও অনেক কোম্পানি ছোট পরিসর এ কাজ শুরু করেছে। ইন্ডাস্ট্রি একদিনে তৈরি হয়না, আস্তে আস্তে হয়। তবে সেটা শুরু হয়ে গেছে। যদিও আমার ভুল হতে পারে কারণ আমি দেশের বাইরে, তাই পুরা চিত্রটা বলতে পারব না।

সুবিন : বাংলাদেশি কোনো কোম্পানী যদি আমেরিকা-কানাডার কোম্পানীর জন্য গেম তৈরি করতে চায়, তাহলে তাদের করণীয় কী? সেখানে প্রতিযোগিতা কেমন?
আল-মামুন : আমেরিকা-কানাডার কোম্পানি প্রফেশনাল কাজ দেখতে চায়, সেইটা করতে পারলেই হবে। আমাদের পাশের দেশ ভারত অনেক এগিয়ে গেছে, কারণ তারা অনেক আগে কাজ শুরু করছে। ওরা এখন প্রফেশনাল গেম বানায়, ওদের অনেক ভালো কমিউনিটি আছে। বাইরের কোম্পানি এর কাজ করতে হলেঃ
=> পারসোনাল স্কিল বাড়াতে হবে
=> টেকনিকাল লেভেল বাড়াতে হবে
=> সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল ম্যানেজমেন্ট লেভেল বাড়াতে হবে। আমরা টাইম, টাস্ক আর কস্ট ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী না।

সুবিন : গেমিং সেক্টরে ফ্রিল্যান্স কাজের সুযোগ কেমন?
আল-মামুন : ফ্রিল্যান্সিং একটা কঠিন কাজ। একজন ফ্রিল্যান্সারকে নিজে প্রোডাক্ট ডেভেলপ করতে হয়, ম্যানেজমেন্ট করতে হয় আবার যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। গেম এর কাজ একা একা সব করতে পারা খুব কঠিন, একা ডেভেলপার আবার ডিজাইনার আবার আর্টিস্ট হওয়া কঠিন, তাই সব সমই গ্রুপ করে চলতে হয়। ভালো নেটওয়ার্ক থাকলে অবশই অনেক কাজ করা সম্ভব। ওডেস্কে সার্চ দিলে দেখা যায়, টপ লেভেল গেম ডেভেলপার ঘণ্টায় ৪০ ডলার বা তারো বেশি আয় করে। তবে এটা একদিনে হয় নাই, কেউ যদি লেগে থাকে তবে অনেক কাজ করা সম্ভব। তবে ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপারটা ওয়েব ডেভেলপার এর জন্য যত সহজ, গেম ডেভেলপার এর জন্য তত সহজ না। কিন্তু একবার কেউ যদি তার পারসোনাল লেভেল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তাহলে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না।

সুবিন : এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। কোন কোন স্কুল ও কলেজে লেখাপড়া করা হয়েছে? [আমি এই প্রশ্নটা সবাইকেই করছি, যাদের ইন্টারভিউ নিচ্ছি। এর একটা কারণ আছে।]
আল-মামুন : আমার স্কুল এর নাম রাওতরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আমি জানি আমার পরিচিত কেউ এই নাম শুনে নাই। শোনার কথাও না। ঢাকা থেকে ৩০০ কিমি. দুরের একটা গ্রাম এর স্কুল। উচ্চ মাধ্যমিক অবশ্য মাগুরা গভ কলেজে করেছি। সাকিব আল হাসান এর মাগুরা, তাই সারা দেশ নামটা জানে।

সুবিন : ভার্সিটিতে লেখাপড়া শুরুর সময় তো হঠাৎ করেই আমাদের সব বই ইংরেজিতে পড়তে হয়। এতে যারা বাংলা মাধ্যম থেকে আসে, তাদের সবারই কম-বেশি অসুবিধা হয়। এ বিষয়ে তোর মন্তব্য কী?
আল-মামুন : আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। স্কুল ও কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করেছি, ইংরেজি সাবজেক্টে অনেক দখল ছিল, তা নয়। ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হওয়ার পর বেশ প্রব্লেম হত, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে ব্যাপারগুলা ঠিক হতে শুরু করে। ভালো ইংরেজি জানা থাকলে ভালো, কিন্তু সেটা আবশ্যক কিছু না।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : ভালো প্রোগ্রামার হতে গেলে তো লজিকে ভালো হতে হয়। এ বিষয়ে স্কুলগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে?
আল-মামুন : প্রোগ্রামিং মানে হল সঠিক ভাবে সাজানো। সঠিক মানে কি? লজিক তৈরি করে সাজাতে পারা মানেই সঠিক ভাবে সাজানো। কেউ যদি লজিকে ভালো না হয় অথবা লজিক নিয়া কাজ না করতে চায়, তাহলে প্রোগ্রামর হওয়ার প্রশ্নই আসে না। স্কুল হল সব কিছুর শুরু, যাকে আমরা বলি সুতিকাগার। স্কুল যদি কাউকে লজিক নিয়া খেলাধূলা শিখিয়ে দেয়, তা হলে তাকে আর GPA নিয়া চিন্তা করতে হবে না। লাইফে এমন কিছু নাই যে সে করতে পারে না। শুধু প্রোগ্রামিং না, সে যে দিকেই যাক না কেন, কোন কিছুই তার কাছে সমস্যা মনে হবে না। আমাদের স্কুলগুলো GPA এর জোর না দিয়ে, যদি গণিত ও যুক্তির উপর জোর দিত, তা হলে কত কিছু যে change হয়ে যেত!

সাক্ষাৎকার : রুহুল আমীন সজীব

রুহুল আমিন সজীব – শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের এসিস্টেন্ট প্রফেসর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। সাস্টে শিক্ষক থাকাকালীন কিছু আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব প্রজেক্ট সে হাতে নিয়েছে এবং সাফল্য লাভ করেছে। সজীব আমার ভার্সিটির এক ব্যাচ জুনিয়র। গুগল টকে নক করলাম, ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়ে গেলো। আশা করি তাঁর চিন্তা, কথা ও কাজ থেকে আমাদের তরুণরা অনুপ্রাণিত হবে।

সজীব (বামে)
সজীবের (ছবির দিকে তাকালে বামে) সাথে আমি, পিপীলিকা টিমের একটি অনুষ্ঠানে।

সুবিন : সজীব, কী খবর?
সজীব : এই তো সুবিন ভাই। খবর সব কিছু মিলিয়ে ভালই। আপনি কেমন আছেন?

সুবিন : আমি ভালো আছি। তুমি এখন কোথায় পড়াশোনা করছ? (যদিও আমি জানি, পাঠকরা তো জানে না।)
সজীব : আমি এখন স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি করছি। আমার পিএইচডি এর প্রথম দিকে আমি বায়োইনফরমেটিক্স নিয়ে কাজ করছি।

সুবিন : শুনলাম এক বিখ্যাত প্রফেসরের সাথে কাজ করছ?
সজীব : আমি কাজ করছি স্টিভেন স্কিইনা এর সাথে। উনি এলগরিদম আর ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্কিইনা তো আমাদের পরিচিত। মানে তাঁর Algorithm Design Manual বইটি আমরা অনেকেই পড়েছি। তিনি লোক কেমন?
সজীব : স্কিইনা খুবি মজার লোক। উনি এখানে এলগরিদম এর সেমিনার পরিচালনা করেন। স্টোনি ব্রুক সিএস এর এসিএম এর গ্রুপগুলি দেখাশোনা করেন।

সুবিন : স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে কিভাবে? আমাদের যেসব শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, তারা নিজেদের কিভাবে প্রস্তুত করবে?
সজীব : প্রথমত, বাইরে পড়াশোনা করার জন্য সব থেকে যেটা বেশী দরকার তা হল তা হল গবেষণা করার আগ্রহ, অথবা খুব ভালো অর্গানাইজেশনে কাজ করার আগ্রহ; যেমন সিলিকন ভ্যালির কোন কোম্পানি। দ্বিতীয়ত, আন্ডারগ্রেডে একটু ভালো করে প্রোগ্রামিং এবং ম্যাথ করাটা জরুরী। খুব ভালো গবেষনা অনেক সময় আমাদের দেশে হয় না তাই আমি এর উপর জোর দিব না। তবে সুযোগ মত প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট বা সফটওয়্যার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করার উপর জোর দিতে বলব। আমি এই কথা গুলি বলছি মূলত মাঝারি মানের ছাত্র-ছাত্রীর জন্য। খুব ভালো যারা তারা এমনিতেই ভালো রিসার্চ করে এবং তাদের পাব্লিকেশন থাকে। তৃতীয়ত, আমি বলব, জিআরই এবং টোফেলে ভালো স্কোর করার জন্য। অনেকেই আলসেমি করে অথবা সময়ের অভাবে এই দুইটি পরীক্ষা দিতে পারেনা। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কালচার নেই বলে তারা আমেরিকায় না গিয়ে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে যায়। আমেরিকার জন্য এই দুইটি পরীক্ষা ম্যান্ডেটরি। তাই আলসেমিটা ঝেড়ে ফেলে আন্ডারগ্রেডের শেষ বছর বা আন্ডারগ্রেড শেষ করে এর দুইটি পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশান নেওয়া উচিৎ। আমার আমেরিকায় পড়তে আসার জন্য এক বছর আগে থেকে প্ল্যান করতে হয়েছে।

সুবিন : তুমি কোন ভার্সটিগুলাতে অ্যপ্লাই করেছিলে?
সজীব : আমি প্রায় ৮ টি টপ স্কুলে এপ্লাই করেছি। মাঝারি মানের ৪ টি তে এপ্লাই করেছি। অফার পেয়েছি কার্নেগি ম্যালন (মাষ্টার্স ফলোড বাই পিএইচডি), স্টোনি ব্রুক (পিএইচডি উইথ ফেলোশীপ), ইউএমবিসি বাল্টিমোর (পিএইচডি) তে।

সুবিন : স্টোনি ব্রুকে কেন ভর্তি হলে?
সজীব : আমি যেখানেই এপ্লাই করেছি, সেখানে আমার রিলেটেড কাজ হয় কিনা সেই ব্যাপারটিতে প্রাধান্য দিয়েছি। স্টোনি ব্রুক এর সিএস অনেক বড় ডিপার্টমেন্ট। এখানে কমবেশী প্রায় সব কিছু নিয়েই কাজ হয়। আমার আগ্রহ ছিল এনএলপি (NLP), আইআর (IR) বা এলগরিদম নিয়ে।  স্টোনি ব্রুকে আমার পছন্দের কয়েকজন প্রফেসর ও আছেন। স্টিভেন স্কিইনা তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি মূলত স্টিভের ডাটা সায়েন্স ল্যাবের কথা মাথায় রেখে এপ্লাই করি। পাশাপাশি আমার আগ্রহের সাথে রিলেটেড আরো কয়েকটা ল্যাবের কথাও আমি আমার স্টেটমেন্ট অব পারপাসে উল্লেখ করি। যাই হোক, প্রথমত আমাকে এক্সেপ্ট করেন প্রফেসর মাইকেল কিফার। উনি নলেজ রিপ্রেজেন্টেশান নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্টেটমেন্ট অব পারপাস যাকে সংক্ষেপে SOP বলে, সেটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এটি লেখার ব্যাপার কোনো টিপস্ ?
সজীব : পিএইচডিতে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লিকেশনের জন্য SOP এর উপর অন্তত ৫০% গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই SOP অবশ্যই খুব ভালো করে লিখতে হবে। আমি SOP নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি। অনেকের অভিজ্ঞতা জেনেছি। তারপরে নিজের SOP লিখেছি।
এতে মূলত নিচের ব্যাপার গুলি থাকে :
১। আমি কি করতে চাই
২। আমার আগ্রহের কাজ করার জন্য আমি আন্ডারগ্রেডে কি পড়েছি, বা করেছি, আমার কোন অভিজ্ঞতা
৩। এই কাজ নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
৪। এবং আমার এই গবেষনা করার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করছি তার কি প্রয়োজন
এই সব নিয়েই সাধারণত একটি SOP লেখা হয়। এক কথায়, SOP তে নিজেকে কেউ আইন্সটাইন প্রমাণ করার থেকে নিজের যে পজটিভ দিকগুলো এবং অভিজ্ঞতা আছে এবং সেগুলো কিভাবে একজনের আগ্রহের বিষয়বস্তুতে গবেষণা করতে সাহায্য করতে পারবে তাই তুলে ধরতে হয়।

সুবিন : তুমি যেহেতু বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছ, নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে কর, ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করতে গিয়ে লেখাপড়া করার সময় পাই না, তাই ভালো রেজাল্ট করতে পারি না’। কিংবা ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করলে আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হয়, তাই প্রোগ্রামিং করি না।’ এদেরকে তুমি কী উত্তর দাও?
সজীব : আমি কখনোই মনে করিনা যে প্রোগ্রামিং একজনের পড়ালেখায় সময় নষ্ট করে। প্রোগ্রামিং করার সময়ে একজন মাথা খাটিয়ে, কাগজে আঁকিবুকি করে, বা একটি এলগরিদম ডিজাইন করার সময়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা যেকোন ধরনের বুকিস পড়ালেখার থেকে ভালো। সিএস (CS : Computer Science)-এ যেকোন ধরনের পড়ালেখার ৭০% কাজ হল প্রব্লেম সল্ভিং রিলেটেড। আর আমরা প্রব্লেম সল্ভ করি প্রোগ্রামিং করে। অতএব, আমি মনে করি প্রোগ্রামিং না জানলে সিএস এর বেশীরভাগ কাজ করা অনেক দূরহ হয়ে পরে।

সুবিন : তুমি তো এসিএম আইসিপিসি ও অন্যান্য Competitive প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে। সেগুলোর গুরুত্ব কেমন? তোমার কর্মজীবনেই বা সেগুলোর প্রভাব কেমন?
সজীব : আমাদের বাংলাদেশে বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রী সঠিক উপায়ে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু সিএস এর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এসিএম আইসিপিসি সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখানে যে কোন ছাত্র-ছাত্রী নিজে থেকে পড়ালেখা করে, কনসাল্ট করে, প্রবলেম সল্ভ করে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। তাই এসিএম ও অন্যান্য প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য সব থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই যে আমাদের দেশের সব ছাত্র-ছাত্রী যেন এসিএম এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রবলেম সল্ভিং করে। দেশের বাইরের যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেকোন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এসিএম প্রব্লেম সল্ভিং অভিজ্ঞতা বা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার ফলাফলের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

সুবিন : যদিও মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের সিজিপিএ জিজ্ঞাসা করতে হয় না, তবুও, তোমার সিজিপিএ কত ছিল? এটি হয়ত পাঠকদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সজীব : হা হা। আমার সিজিপিএ ৩.৯৬। এতে করে কেউ যেন আবার ভেবে না বসে যে এই জন্যই আমি উপরের অনেক বড় বড় কথা বলেছি। আমি যা বলেছি তা আমার নিজের এবং আশেপাশের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের অভিজ্ঞতার থেকেই বলেছি।

সুবিন : আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই কারণে যে তুমি তো প্রোগ্রামিংয়ের প্রচুর সময় দিতে, আবার ক্যাম্পাসের নানান কাজে (আসলে অকাজে) উপস্থিত থাকতে। তোমার স্কুল-কলেজ কোনগুলো ছিল?
সজীব : আমার স্কুল ছিল মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল, ঢাকা। কলেজ ছিল নটর ডেম কলেজ, ঢাকা।

সুবিন : সিএসই পড়লে কেন?
সজীব : আমি মোটেও সুপার ডুপার ছাত্র ছিলাম না। প্রথম দিকে সিএস নিয়ে তেমন কোন ফেসিনেশন ও ছিলনা। তবে সমসাময়িক অনেক কিছু নিয়ে পড়াশোনা করার সময় দেখেছি সিএস এর প্রোগ্রামিং ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। কিন্তু সত্য কথা হল, কলেজে থাকতে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ার সময় আমি প্রোগ্রামিং প্রায় কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু কম্পিউটারের বিবর্তন যেভাবে হচ্ছে, সেটা আমার কাছে অনেকটা সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের মনে হয়েছে সব সময়। তাই সাহস করে এই বিষয়ে পড়ার জন্যই মনস্থির করি। তারপরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে প্রোগ্রামিং শিখেছি (অনেক চেষ্টার পরে) এবং তা দিয়ে আসলেই সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের কিছু কাজ করি।

সুবিন : সাস্ট থেকে পাশ করার পর ক্যারিয়ার শুরু করলে কোথায়? সেখানে কী কাজ করতে?
সজীব : পাশ করার পরে আমি ক্যারিয়ার শুরু করেছি এসডিএসএলে। সেখানে আমি অনেক ধরনের কাজ করেছি। আমি প্রথম কাজ করেছি ফ্লেক্স এর উপর ম্যাপ সার্ভার টিমের ক্লায়েন্টের জন্য। এই টিমে আমি উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারিনি। তবে অনেক কোড ঘেটে কিছু বাগ বের করেছিলাম। তারপরে কাজ করি, জেটুএমই টিমে, লাইভ নামের একটি ভিডিও স্ট্রিমিং প্রজেক্টে। আমি এই টিমে কাজ করার সময় বুঝতে পারি আমার মূল আগ্রহ সব সময় নতুন ধরনের সমস্যা সমাধানে যেই গুলো করতে একটু গবেষনা লাগে। তারপরে আমি কাজ শুরু করি লাইভের সার্ভার ডিজাইনের। এর মাঝে আমি ছোট ছোট কয়েকটা আরএনডি করি এবং অন্য কয়েকটা প্রজেক্টের জন্য ডাটাবেইজ ডিজাইন করি। সেই সাথে গ্রিড প্রজেক্টের জন্য চ্যাটিং এপ্লিকেশন ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ শেষ করি। অতঃপর আমার হাতে কাজ আসে গ্রিডের ক্লাস্টার ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ করার। এই সময়ে সাউথ আফ্রিকার জন্য একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরীর কথা শুরু হয়। আমি এবং সিদকী (মানযুরুর রহমান খান) প্রথমে এই সার্চ ইঞ্জিনের জন্য ১৮ দিনের একটি গবেষণা শুরু করি। তারপরে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য টিম গঠন থেকে শুরু করে তার ডেভেলপম্যান্ট এ যুক্ত ছিলাম পরের এক বছর। এর মধ্যেই গ্রিডের লোকেশন বেইসড সার্চের কাজ শেষ করি। সার্চ প্রোডাক্ট ম্যাচিউর হলে পরে আমি এসডিএসএল থেকে সাস্টে সুইচ করি।

সুবিন : সেখানে সার্চ ইঞ্জিন প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতাই কি পরবর্তিতে সাস্টে এসে পিপীলিকা তৈরির মূল কারণ?
সজীব : পিপীলিকা তৈরীতে যে অভিজ্ঞতা লেগেছে সেটা এসেছে এসডিএসএল থেকেই। কারণ আমার সহকর্মীরা সবাই বেশ ভালো প্রবলেম সল্ভার এবং বন্ধু ছিল। আমি তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। তবে পিপীলিকা তৈরীর মূল কারন আসলে বাংলা কম্পিউটেশনের পথটিকে সুগম করা। আমি প্রথমে বুঝতেও পারিনি আমি শেষমেষ পিপীলিকা তৈরী করতে পারব।

সুবিন : বাংলা সার্চ ইঞ্জিন তৈরিতে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল, এবং সেটি কিভাবে অতিক্রম করেছ?
সজীব : প্রায় তিন বছরে আমি ৩০ জনেরও বেশী ছাত্রের সাথে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় টুলস নিয়ে কাজ করেছি। এর প্রায় সবই পরবর্তীতে এই ইঞ্জিন তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয়তা অভিজ্ঞতা যুগিয়েছে। আমি প্রথম যে থিসিস গ্রুপগুলির সাথে কাজ করার সুযোগ পাই, তারা সাস্ট ২০০৪ ব্যাচের। এদের মধ্যে দুইটি গ্রুপ ছিল যারা ওয়েব ক্রলার এবং লোকেশন বেসড সার্চ নিয়ে কাজ করে আমার সাথে। এই ব্যাচের এআই সাবজেক্ট আমি পড়িয়েছিলাম। এর ল্যাব প্রজেক্টে একটি গ্রুপ আমার সাথে এডাপ্টিভ স্পেল চেকার নিয়ে কাজ করে। সাস্ট ২০০৫ এর অনেকগুলি গ্রুপ পরবর্তীতে আই আর নিয়ে কাজ শুরু করে। একটি গ্রুপ ওয়েব ক্রলার কন্টিনিউ করে। একটি গ্রুপ বাংলা ডকুমেন্টের কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান নিয়ে কাজ করে। একটি গ্রুপ ওপেনসোর্স এর লুসিনি (lucene)-তে বাংলা ইউনিকোড সাকসেসফুলি সাপোর্ট দেয়। সেই সাথে ওয়েব ক্রলারের ক্রল করা ডাটা লুসিনিতে সার্চেবল করে। সেই সাথে তৈরী হয় পিপীলিকার ইউজার ইন্টারফেস। একই রকম ভাবে সাস্ট ২০০৬ ব্যাচের অনেকগুলি গ্রুপ আই আর নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা স্টেমিং, কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান, লোকেশান বেইসড সার্চের উপর কাজ শুরু করে। সাস্ট ২০০৭ ব্যাচ স্ট্যামিং এবং কি-ওয়ার্ড এর কাজে বেশ অগ্রগতি নিয়ে আসে। তারপরেই আমি বুঝতে পারি যে পিপীলিকা আমরা লাইভ করতে পারব। এর মধ্যে ২০০৫ ব্যাচ এর পিপীলিকার নামকরন সহ উইজার ইন্টারফেস এর মাধ্যমে বাংলা কন্টেন্ট সার্চ করার বেসিক টুলসটি আমি সব জায়গায় প্রেজেন্টেশনে দেখাই। এই টুলসটি পরে একটি সফটওয়্যার কম্পিটিশনে প্রথম হয় এবং জিপিআইটি এই প্রোডাক্ট এর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়, যার জন্য আমরা সবাই এখন পিপীলিকা ব্যাবহার করতে পারছি। যদিও আমি যতদূর ভেবে রেখেছি ততদূর পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য আমাদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হবে তবুও আমাদের হাতে স্মল স্কেলে একটি সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে তা মোটেও কম কথা নয়।

সুবিন : তার মানে আমরা বুঝতে পারছি, কেবল প্রযুক্তিই নয়, সাথে বাংলা ভাষার উপরও তোমারদের গবেষণা করতে হয়েছে।
সজীব : অবশ্যই। এখানে আই আর এর উপর কাজ সহ বেঙ্গলি এনএলপি, এবং লিঙ্গুইস্টিকের উপর অনেক বেসিক কাজ আমাদের করতে হয়েছে। শুধু মাত্র তাই নয়। এই কাজের জন্য আমাকে মেশিন লার্নিং নামক একটি কোর্স ডিপার্টমেন্টে পড়াতে হয়েছে, যাতে করে আমার ছাত্ররা এনাফ নলেজ গেইন করে পিপীলিকায় কাজ করতে পারে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, এমন কারো কারো ধারণা, সার্চ ইঞ্জিনে ওয়েবসাইট থেকে ডাটা ডাটাবেজে সেভ করা হয়, আর কোনো কিছু জানতে চাইলে ডাটাবেজের উপর কুয়েরি চালানো হয়, তাতেই একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টা হয়ত তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু ফেসবুকে আমি সেটি দেখেছি। তুমি কি ভবিষ্যতে আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য সার্চ ইঞ্জিনের আর্কিটেকচার নিয়ে একটা লেখা দিবে? এতে শিক্ষার্থীরা যেমন শিখতে পারবে, তেমনে সেসব ডেভেলাপারদেরও চোখ খুলবে বলে আমার ধারণা।
সজীব : অবশ্যই লিখব। আমি আমেরিকা চলে আসার কারনে পিপীলিকার কাজের উপর ডকুমেন্টেশান করে উঠতে পারিনি। তবে আশা করছি এবার শুরু করব।

সুবিন : পিপীলিকা ছাড়াও সাস্টে আরো প্রজেক্টে তুমি কাজ করেছ। সেগুলো সম্পর্কে একটু বলো।
সজীব : সাস্টে অনেকগুলি প্রজেক্টে আমি কাজ করার সু্যোগ পেয়েছি। তার মাঝে এডমিশন সিষ্টেম নিয়ে কিছু কাজ করেছি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য মঙ্গলদীপ আর সুবচন নিয়ে কাজ করেছি, এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর অটোমেশান এর কাজ করেছি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমি কী-ওয়ার্ডলেস ডাটাবেস ম্যাপিং এর এলগরিদম ডিজাইন করেছি।

সুবিন : তোমাদের এসব প্রজেক্টে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা কেমন ছিল?
সজীব : মঙ্গলদীপ সুবচনের জন্য আমার কাজ মূলত আর্কিটেকচার লেভেলের। এই দুইটি কাজের জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারের সায়েন্স এন্ড আইসিটির ফান্ড পেয়েছি। এই ফান্ড ব্যবহার করে আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সুবচন এবং মঙ্গলদীপ সফটওয়্যার হিসেবে প্রকাশ করি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরাই প্রথমবার সিষ্টেম ইমপ্লিমেন্ট করে। পরে আমরা প্রায় ৮ জন শিক্ষক মিলে একে প্রফেশনাল প্রোডাক্টে রুপ দেই। আর পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা ক্লাউড বেইসড এডমিশন সিস্টেম প্রবর্তন করি। যেখানে আপনিও আমাদের সাথে ছিলেন। তাছাড়া, বিআইডব্লিঊটিএ (BIWTA) এর প্রজেক্টেও আপনি ও আপনার কোম্পানী আমাদের সাথে কাজ করেছে। তাই আপনি ভালোই জানেন।

সুবিন : বিআইডব্লিউটএ-এর অটোমেশন প্রজেক্টের একটা অংশ ছিল ভেসেল ট্র্যাকিং ডিভাইস বানানো। যেই কাজটা অর্থায়ন করে আমার কোম্পানী, মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড। কাজটি তোমার তত্ত্বাবধানে দুজন ছাত্র সম্পন্ন করে। সেখানে আমি দেখেছি, গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের বেশিরভাগই তুমি তোমার ছাত্রদের দিয়ে দিয়েছ। সেটির কারণ কী?
সজীব : এটা সবসময়েই হয়েছে। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা সবসময় আমার থেকে বেশী আয় করেছে। আমি সবসময় সেটি বেশ এঞ্জয়ও করেছি। আমার প্রায় সবগুলো প্রজেক্টের মূল্যমান ছিল চার কোটি টাকা। এই প্রজেক্টে যারাই কাজ করেছে আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে ঢাকার সফটওয়্যার কোম্পানী গুলির কাছাকাছি সম্মানী দেওয়ার জন্য। আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে মনের দিক থেকে, মানের দিক থেকে এবং মূল্যায়নের দিক থেকে যথার্থ সম্মান দেওয়ার জন্য।

সুবিন : এবারে একটু অন্য আলাপে আসি। তোমার শিক্ষকতা পেশায় আসার কারণ কি?
সজীব : এসডিএসএলে আমি প্রায় সবকিছুই পেয়েছিলাম এই কথাটা সত্যি। কিন্তু তবুও, সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে আমি যতখানি কাজ করতে চেয়েছিলাম তা পারিনি। আমার মনে হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে আমি সেই সুযোগ পাব। কিন্তু শাবিপ্রবি এবং সিএসই ডিপার্টমেন্ট আমার এই ভাবনা কে কয়েকটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা দেয়। আমি ২০০৯ সালে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিএসই কার্নিভালে গিয়ে বুঝতে পারি সবাই মানে আমার শিক্ষক এবং জুনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা ধরেই নিয়েছে যে আমি সাস্টে যাব। এই ব্যাপারটি আমাকে সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্ট এনে দেয়। যেই কারনে আমি আমার তখনকার বেতনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ সেলারীতে জয়েন করি। আমি আমার ফ্যামিলির ব্যায়ভার বহন করি আমার পুরনো কোম্পানির সেলারী একাউন্ট থেকে। আমি কখনো ভাবিনি আমি কোনো প্রজেক্ট পাব। শুধুমাত্র সাস্ট এর ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আর সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্টের কারনেই আমি সিএসই তে জয়েন করে ফেলি।

সুবিন : তোমার কি মনে হয় যে  ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তি সময়ে শিক্ষক হিসেবে সাস্টের সিএসই বিভাগে থাকার কারণে তুমি বাড়তি অনেক সুবিধা পেয়েছ, যা অন্য জায়গায় হয়তো পাওয়া যেত না?
সজীব : অবশ্যই। আমি মনে করি ব্রিলিয়ান্ট বা জিনিয়াস শব্দগুলো আমার সাথে যায়না। তবে সাস্টে আমি খুব উদ্দীপনামূলক একটা পরিবেশ আমি পেয়েছিলাম যে কারনে খুব আগ্রহ নিয়ে পরিশ্রম করে নিজের মেরিটকে আমি একটু হলেও প্রকাশ করতে পেরেছি। ছাত্র জীবনে আমি অনেক পড়ালেখা করেছি আর অনেক বেশী জানার আগ্রহের সাথে এর একটি অন্যতম কারণ ছিল কম বুঝতে পারা। সাস্ট সবসময়ই আমাকে যেকোন শূণ্যস্থান পূরন করে নেওয়ার জন্য প্রেরণা দিয়েছে। যখন শিক্ষক হয়েছি তখনও আমি একই রকম অনুভূতি পেয়েছি। তবে এই কথাগুলি যেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীকে কষ্ট না দেয়। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের একটা নিজস্ব সুর আছে। সেই সুরে নিজেকে ঠিকমত টিউন করে নিলে আর নিজের আগ্রহ অনুযায়ী পরিশ্রম করতে পারলেই সবার উন্নতি আসবে। সাস্টে আমার শিক্ষকরা, আমার সিনিওর, বন্ধু এবং জুনিয়র সবাই আমাকে আমার নিজের মত করে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

সুবিন : তুমি যে মেশিন লার্নিং কোর্সের কথা বললে, আমাদের সময়ে তো সেই কোর্সটি ছিল না। পরে অবশ্য আমি Coursera থেকে প্রফেসর Andew Ng-এর মেশিন লার্নিংয়ের কোর্সটি করি। চমৎকার বিষয়। তোমার কি মনে হয় MOOC (Massive Open Online Course) থেকে আমাদের শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকরা উপকৃত হতে পারেন?
সজীব : অবশ্যই উপকৃত হতে পারবে। আমি নিজে মেশিন লার্নিং এর জন্য এই রকম কয়েকটা কোর্সের সাহায্য নিয়েছি। আমি যদি মেশিন লার্নিং এ পড়ার জন্য মাষ্টার্স বা পিএইচডি এর জন্য অপেক্ষা করতাম তবে তা কোনদিনও সম্ভব হতোনা। আমি ততটুকুই শিখেছি যতটুকু আমার প্রয়োজন এবং তারপরে আমি তা শিখিয়েছি। MOOC সবাইকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে। যে কেউ তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটা কোর্স করে, আনুষঙ্গিক হোম ওয়ার্ক করে নিজের জন্য দরকারী অভিজ্ঞতাটুকু নিয়ে নিবে। এটাই MOOC এর একটা শক্তিশালী দিক।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে যদিও তুমি খুব বেশিদিন সরাসরি কাজ করো নি, কিন্তু সাস্টের শিক্ষক থাকাকালীন তুমি বেশ কিছু সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করেছে। সেগুলোকে কাছ থেকে দেখেছ। দেশের সফটওয়্যার শিল্প নিয়ে তোমার মূল্যায়ন কী?
সজীব : মূল্যায়ন মিশ্র। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক মেধাবী লোকজন আছে। এটা শুধুমাত্র আমি নই সবাই জানে। কিন্তু এদেরকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে এগিয়ে আসতে রাজি না। অনেকেই মনে করে সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এই কারনে দেশে সত্যিকার অর্থে ব্যবসা করাটা কঠিন। তবে এত কিছুর পরেও অনেকে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং করে এখনো নিজের কোম্পানিটিকে টিকেয়ে রাখছেন। এতে করে আমাদের এখন পর্যন্ত কিছু সুনাম হয়েছে। আমি বলব এই সুনামটুকু নিয়ে আমাদের উচিৎ মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশে নিজেদের সফটওয়্যার বা সার্ভিস সেল করার জন্য সবার এক যোগে এগিয়ে আসা। এতে করে আমাদের বাজারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসবে।

সুবিন : তুমি যেহেতু বাংলা সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে নিজের উদ্যোগে কাজ করেছ, তাতে খানিকটা বোঝা যায় যে বাংলা ভাষার প্রতি টানটা তোমার একটু বেশিই। তো বাংলা ভাষা শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যাপারে তোমার কি অভিমত?
সজীব : আমার নিজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা অনেকটা ব্যক্তিগত। আমি বরং আমার জানামতে কয়েকটা গবেষণার কথা বলি। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবারই নিজের ভাষার প্রতি একটা দূর্বলতা থাকে। প্রায় সবাই মনে করে নিজের ভাষায় পড়তে পারলে কোন একটা কঠিন টপিক হয়তো আরেকটু সহজ মনে হতো। এজন্যই অনেক উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট গুলিকে তাদের মাতৃভাষায় পড়ানো হয়। আমাদের দেশেও একজন ছাত্র বা ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একটি বিষয়ে চার বছর ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করেও তার বিষয় সম্পর্কে ইংরেজীতে প্রায় কিছুই বলতে পারেনা। এদেরকে যদি অন্তত কয়েকটা বেসিক বিষয়ে বাংলায় পড়িয়ে তার সাথে ইংরেজীর টার্ম গুলিও পরিচয় করানো যেত তবে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেত। তাই আমি মনে করি মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ার সুযোগ করার জন্য আমাদের সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে আসা উচিৎ।

সুবিন : আমাদের দেশে অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা কারণে-অকারণে নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। আমি যদি তাদের মনে করিয়ে দেই যে সাস্টে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার সময় তোমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না, তারপরেও তুমি ছিলে ভার্সিটির সেরা প্রোগ্রামারদের একজন, আবার সেই সাথে তোমার ক্লাসের ফার্স্ট বয়, তাতে তুমি নিশ্চয়ই মাইন্ড করবে না। এ ব্যাপারে তোমার কী বক্তব্য?
সজীব : প্রথমত, আমি অবশ্যই মাইন্ড করবনা। আমি বরং খুশী মনেই এই কথাটা স্মরণ করি। এমনকি ৪র্থ সেমিষ্টার পরে আমার আর শাবিপ্রবিতে পড়ালেখা করারও কথা ছিল না। তবু সবকিছু কেমন করে মিলে যায়। যারা মনে করে তারা বঞ্চিত তাদেরকে এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আমি নিজেকে যখন এই অবস্থায় পেয়েছি তখন আমি কি করতে পারি তা নিয়ে অনেক ভেবেছি। কখনো খারাপ লেগেছে, আবার ঠিক তারপরেই ব্যাপারটিকে আমার নিজের কাছে এডভেঞ্চার মনে হয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটিং রিসোর্স ব্যাবহার করে বড় হয়েছি। বন্ধুরাও আমাকে সাহায্য করেছে। অনেক বড় ভাইদের কাছে আমি বই চেয়ে নিয়ে এসেছি। আমার প্রথম বড় প্রোগ্রামটি লিখি আমার খাতায়। সেটা ডিবাগ করি খাতায়। পড়ে তার একটা অংশ আমি কোড করে সঠিক উত্তর পেয়েছি। এতে করে আমি প্রোগ্রামিং পারব কিনা সেই ভূতটা চিরতরে বিদায় নিয়েছিল। যারা নিজেকে বঞ্চিত মনে করে তাদেরকেও আমি বলব নিজের আশেপাশের যতটুকু সুযোগ আছে ততটুকুই কাজে লাগানোর জন্য। একসময় এই অভিজ্ঞতাগুলি আসল কাজের ক্ষেত্রে বিশাল এক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। আমি শিক্ষক হওয়ার পরেও খুব একটা রিসোর্স পাইনি। কিন্তু আমি কখনোই অভিযোগ করিনি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে গবেষণার প্রপোজাল লিখে ফান্ড জোগাড় করার চেষ্টা করেছি। সেই ফান্ডের করা কাজ থেকে লভ্যাংশ আমার ডিপার্টমেন্টকে অনেকদিন সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। যে কেউ চাইলেই অভিযোগটুকু বাদ দিয়ে নিজের চারপাশের রিসোর্স দিয়ে একজনের প্রয়োজনীয়তাকে ধীরে ধীরে মেটাতে পারে। এতে হয়তো সময় লাগবে কিন্তু যেই অভিজ্ঞতাটুকু অর্জন হবে তা সারা জীবনের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : সজীব, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার ব্যস্ত জীবন থেকে তিন ঘণ্টা সময় দেওয়ার জন্য।
সজীব : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। এত ধৈর্য্য নিয়ে আমার কথা শোনার জন্য।

মারুফ মনিরুজ্জামান এর সাক্ষাৎকার

মারুফ মনিরুজ্জামান একজন সফটওয়্যার নির্মাতা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে লেখাপড়া করেছেন। তারপর ঢাকায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও, মাইক্রোসফটে চাকরি পেয়ে কানাডা চলে যান। এখন তাঁর বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। মনির ভাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আমার চেয়ে ২ ব্যাচ সিনিয়র। তাই তাঁর কাছ থেকে দুইঘণ্টা সময় বের করতে কোনো সমস্যা হলো না। আশা করি আমাদের দেশের উদীয়মান প্রোগ্রামাররা তাঁর কথা থেকে উপকৃত ও অনুপ্রাণিত হবে।

সুবিন : মনির ভাই, এখন কোথায় কাজ করছেন?
মনিরুজ্জামান : আমি এখন Caradigm নামে একটা কোম্পানিতে কাজ করি। এটা মাইক্রোসফট আর জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির হেলথ কেয়ার ভিত্তিক যৌথ উদ্যোগ।

সুবিন : এখানে আপনি কী ধরণের কাজ করেন? আপনার প্রজেক্ট সম্পর্কে একটু বলুন।
মনিরুজ্জামান : আমি যে প্রজেক্টে কাজ করি সেটা হেলথ কেয়ারের জন্য একটা প্লাটফর্ম। এটা বিভিন্ন উৎস এবং ডিভাইস থেকে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেসব প্রযুক্তি দরকার হয়, সেগুলোর জন্য একটা প্লাটফর্ম সরবরাহ করে। যেটার উপর ভিত্তি করে অন্য ছোটবড় কোম্পানি সফটওয়্যার লিখতে পারে। এখানে মূলতঃ মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। যেমন ল্যাংগুয়েজের জন্য C#, প্লটাফর্মের জন্য Windows Server, SQL Server, Windows Azure, এছাড়া Natural Language Processing ইত্যাদি ব্যবহার হয়।

সুবিন : Caradigm-এ কবে থেকে কাজ করছেন? এখানে চাকরি পেলেন কিভাবে?
মনিরুজ্জামান : Caradigm এ কাজ করি প্রায় দেড় বছর। এখানে কাজ পেয়েছি মূলতঃ আমার আগের মাইক্রোসফটে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায়। আমি এর আগে ২০০৮ সনে মাইক্রোসফট অফিসে (যারা Word, Excel, Exchange এই সফটওয়্যারগুলো বানায়) যোগ দেই। সেখানে কিভাবে কাজ পেলাম সেটা বলা যায়। আমি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাভা ভার্চুয়াল মেশিন বানিয়েছিলাম একটা প্রোজেক্টের অংশ হিসাবে। সেটা নিয়ে আমি ২০০৮ এ codeproject এ একটা আর্টিকেল লিখি। সেটা ওই মাসে সেরা আর্টিকেল হিসাবে প্রথম হয়। এরপর ওরা আর্টিকেলের লিংকটা ওদের প্রায় ৫০ লক্ষ (৫ মিলিয়ন) সদস্যের কাছে পাঠায়। তাদের মধ্যে একজন মাইক্রোসফটের রিক্রুটার ছিল। উনি আমাকে রিজিউমি পাঠাতে বলেন। এরপর হংকংএ আমার ইন্টারভিউ হয়। এরপর আমি মাইকোসফট থেকে অফার পাই।

সেই আর্টিকেলের লিঙ্ক : http://www.codeproject.com/Articles/24029/Home-Made-Java-Virtual-Machine

সুবিন : বাংলাদেশে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে কত বছর কাজ করেছেন?
মনিরুজ্জামান : আমি বাংলাদেশে কাজ করেছি প্রায় ৩ বছর। সাইক্রাফট সল্যুশন এবং কাজ সফটওয়্যার-এ।

সুবিন : এবারে একটু পেছনের দিকে যাই। প্রথম কম্পিউটারের সাথে পরিচয় কবে? প্রোগ্রামার হওয়ার সিদ্ধান্তটি কখন নিলেন?
মনিরুজ্জামান : কম্পিউটার প্রথম হাতে পাই শাহজালার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর, ১৯৯৮ সনে। তবে কম্পিউটার নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল স্কুলে পড়ার সময় থেকে। একটা কম্পিউটার হাতে পাওয়ার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি স্কুলে এবং কলেজে পড়ার সময়। তখন সি এন্ড ই জার্নাল নামে একটা পত্রিকা বের হত। সেটার ১৯৯৭ সংখ্যায় আমার একটা চিঠি ছাপা হয় যেটায় আমি জানতে চেয়েছিলাম Z80 কম্পিউটার বানানোর পার্টস কোথায় পেতে পারি। ওরা লিখেছিল এখন সেগুলো পাওয়া যাবে না। এর চেয়ে ১৫০০০ টাকা দিলে ওরা আমাকে একটা পুরোনো কম্পিউটার দিতে পারে। আর প্রথম প্রোগ্রামটা আমি “খাতায়” লিখেছিলাম সম্ভবত ১৯৯৪ সনে ক্লাস নাইনে পড়ার সময়। যেটা ছিল একটা কার্ড গেম। ১৯৯৮ সনে সেটা প্রথম কম্পিউটারে রান করে দেখি। প্রোগ্রামার হওয়ার সিদ্ধান্ত কবে নিলাম এটা বলা অনেক মুশকিল – তাই একটু ইতিহাস বলে দিলাম।

সুবিন : কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সিদ্ধান্তটি কি আপনার নিজের ছিল? নাকি বাবা-মা বলে দিয়েছে যে আপনাকে কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে হবে?
মনিরুজ্জামান : আমার নিজের অবশ্যই। আমার “একটা কম্পিউটার থাকা মানুষের জীবনে কত জরুরী” এইটার বিবরণ শুনতে শুনতে আমার বাবা মা মোটামুটি অতিষ্ঠ হয়ে ছিলেন প্রায় ৫ বছর। আমি কম্পিউটার সায়েন্সে না পড়লেও সম্ভবত প্রোগ্রামার হওয়ার চেষ্টা করতাম।

সুবিন : আপনার প্রথম স্কুল কোনটি ছিল? কত বছর সেখানে পড়েছেন?
মনিরুজ্জামান : আমার প্রথম স্কুল ছিল কাজীপুর, সিরাজগঞ্জের একটি গ্রামে। খুকশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে চার বছর লেখাপড়া করি।

সুবিন : তারপর আর কোন কোন স্কুলে পড়েছেন? কোন কলেজে পড়েছেন?
মনিরুজ্জামান : তারপর হৈমবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এসবি রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি। আমার কলেজ হচ্ছে রাজশাহীর নিউ গভ: ডিগ্রী কলেজ।

সুবিন : আমাদের দেশে অভিভাবকরা তো নামীধামী স্কুলে সন্তানকে পড়ানোর জন্য মরিয়া। সেখানে না পড়লে জীবন শেষ। এই ব্যাপারে আপনার কী মতামত?
মনিরুজ্জামান : আমি নামি-দামি স্কুলে পড়ি নাই। সেকারণে আমি কী হারিয়েছি এটা চিন্তা করা মুশকিল। তবে আমার যত মানুষের সাথে পরিচয়, তার বেশিরভাগই নামীদামী স্কুলে পড়ে নাই। শেষ পর্যন্ত মানসিক উন্নতিটাই আসল। ইচ্ছা থাকলে যেকোনো জায়গা থেকে শেখা যায় বলেই আমার ধারণা।

সুবিন : আমাদের যে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, এ নিয়ে আপনার কী মন্তব্য? কর্মজীবনে সিজিপিএ কতটা দরকারি?
মনিরুজ্জামান : পরীক্ষা তো থাকতেই হবে, নাহলে মূল্যায়ন করা মুশকিল। তবে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করাটা আমার কাছে সময়ের অপচয় মনে হয়। শেখার জন্য পড়া জরুরী আর কতটুকু শিখলাম, সেটার জন্য পরীক্ষা দরকার। যেন কতটুকু শেখা হলো সেটা অন্যদের সাথে তুলনা করা যায়। কর্মজীবনে এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে সিজিপিএ জানতে চায় নাই, সুতরাং আমার ধারণা খুব বেশি দরকারি না। পিএইচডি করতে চাইলে মনে হয় লাগে, কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নাই।

সুবিন : যেসকল কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ার হিসেবে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নিতে চায়? তাদের প্রতি আপনার কী পরামর্শ?
মনিরুজ্জামান : প্রথমে দেখতে হবে বিষয়টাতে আপনার উৎসাহ আছে কিনা। আমি মনে করি, কোন বিষয় ভাল না লাগলে সেটা করা উচিৎ নয়। আপনি যদি প্রোগ্রামিং আগ্রহী হন এবং এটাকে পেশা হিসাবে নিতে চান তাহলে প্রথমে সময় নিয়ে চর্চা করুন। ভালভাবে না শিখে কাজ শুরু করলে কখনওই আর শেখা নাও হতে পারে। প্রচুর চর্চা করলে চাকরি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি অনেক কষ্টে (আসলে সহজে, পড়াশোনাই করতাম না- কষ্ট হল কিভাবে?) কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রি পেয়েছি। কিন্তু আমি সারাদিন কম্পিউটারে বিভিন্ন কাজ করতাম। আমার কাজে লাগবে সেকারনে করতাম না। মজা লাগত বলে করতাম। কয়েকটি বিষয় ঠিক করুন কী কী করতে চান। একটা কার্টুন সফটওয়্যার বানান। নির্দোষ ভাইরাস বানিয়ে বন্ধুকে পাঠিয়ে দিন। কম্পিউটারকে ১ থেকে ১০০০ বিলিয়নের মধ্যে সবগুলো প্রাইম নাম্বার বের করতে লাগিয়ে দিন। দাবা খেলার প্রোগ্রাম লিখুন, যেটা ১০০০ লাইনের মধ্যে করা সম্ভব বা প্রেয়সীর ছবি দিয়ে গেম বানান, যেটা ছবির বিভিন্ন অংশ এলোমেলো ব্লকে রাখবে। আনন্দ আর কাজ একসাথে করা যাবে না কেন? তারপর একদিন দেখবেন মাইক্রোসফট রিক্রুটারের মেইল পেয়ে গেছেন। আমার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।

সুবিন : ভালো প্রোগ্রামার হতে গেলে অ্যালগরিদমভিত্তিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, যেমন এসিএম আইসিপিসি-তে অংশগ্রহন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মনিরুজ্জামান : ভালো প্রোগ্রামার হতে অবশ্যই ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম জানতে হবে। ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম না জেনে সফটওয়্যার বানালে সেটার  মধ্যে কাঠামোগত ত্রুটি থাকবে। এই ত্রুটিগুলোর কারণে সফটওয়্যারে নতুন ফিচার যোগ করা বা অধিক সংখ্যক ব্যবহারকারীর জন্য ব্যবহার উপযোগী করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারনভাবে জটিল ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম নিত্যদিনের কাজে দরকার হয় না। কিন্তু অনেক ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে হয় যেগুলোতে ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম জানা একজন প্রোগ্রামারের সিদ্ধান্ত অনেক উন্নতমানের হয়। একারনে মাইক্রোসফট, ফেসবুক, গুগলের মত কোম্পানি ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমের উপরই মূলতঃ ইন্টারভিউ নিয়ে থাকে। ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমে দক্ষ যে কেউ অন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সহজেই আয়ত্ব করতে পারে। এসিএম আইসিপিসি মূলতঃ কতটুকু ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমে শেখা হল সেটার একটা পরীক্ষা। এখানে ভাল করলে ধরে নেয়া যায় যে, শেখা হচ্ছে ঠিকমত। যাদের সুযোগ আছে তাদের এসিএম আইসিপিসি তে অংশগ্রহন করা উচিত এবং প্রতিযোগীতায় ভাল করার চেষ্টা করা উচিত। শেষ পর্যন্ত সবাই প্রথম স্থান পাবে না বা প্রথম ১০ এর মধ্যে থাকতে পারবে না। কিন্তু অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে অনেককিছু শেখা হবে যেটা পরবর্তীতে অবশ্যই কাজে লাগবে। তবে কেউ যদি ইচ্ছা করে তবে জীবনের যে কোনো পর্য়ায়েই যে কোনো কিছু শিখতে পারে। তাই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের সুযোগ না থাকলেও পূর্বের বিভিন্ন প্রতিযোগীতার প্রশ্নগুলো দেখা যেতে পারে। এই প্রশ্নগুলো বিভিন্ন বাউন্ডারি কেস নিয়ে চিন্তা করতে শেখায়। যেটা পরবর্তীতে উন্নতমানের সফটওয়ার তৈরির জন্য কাজে লাগবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে http://ace.delos.com/usacogate সাইটের প্রশ্নগুলো সমাধান করতাম। এখানে ১০০ এর মত প্রশ্ন আছে যেগুলো জানা একজন কম্পিউটার প্রকৌশলীর জন্য জরুরী।

সুবিন : কম্পিউটার সায়েন্সে না পড়ে কি সফটওয়্যার নির্মাতা হওয়া সম্ভব?
মনিরুজ্জামান : হ্যাঁ, সম্ভব। কম্পিউটার সায়েন্সে যে বিষয়গুলো পড়ায় তার মধ্যে বিভিন্ন ল্যাংগুয়েজ, কম্পিউটার আর্কিটেকচার সম্পর্কে ধারনা, সফটওয়্যার ডিজাইন, ডাটাবেজ সিস্টেমস, ডাটা স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম এই বিষয়গুলো সরাসরি কাজে লাগে। যে কেউ এগুলো নিজে নিজে শিখতে পারে যদি আগ্রহ থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে বিষয়গুলো কয়েক বছর ধরে পড়ানো হয়। তাই শর্টকাট খুঁজলে হবে না। সময় নিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো শিখতে হবে। মাইক্রোসফট অফিসে আমার একজন কলিগ ছিলেন যিনি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছেন। অল্প দিনেই প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাবেন সম্ভবত। মাইক্রোসফট অফিসে কেউ যদি কম্পিউটার সায়েন্সে না পড়ে কাজ করতে পারেন, তাহলে আমার ধারনা, যে কোনো যায়গাতেই সেটা সম্ভব।

সুবিন : একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কী কী দক্ষতা থাকা উচিত? দক্ষতা বলতে আমি টেকনিক্যাল স্কিল এবং সফট্ স্কিল দুটোই বুঝাচ্ছি।
মনিরুজ্জামান : প্রথমত, প্রচুর পরিমান অনুশীলন করতে হবে। বিষয়টা অনেকটা ব্যয়াম করার মত। কেউ যদি ১০ টা বুকডন (বা অন্য যে কোন ব্যায়াম) দিয়ে বলে আমি বুকডন দেয়া শিখে গেছি, আমার আর বুকডন দেয়ার দরকার নাই তাহলে যেমন শোনাবে – যখন কেউ বলে আমি এই ল্যাংগুয়েজ শিখে ফেলেছি সুতরাং আমার আর প্রোগ্রামিং করার দরকার নাই তাহলে সেরকমই শোনাবে। অনেক চর্চা করতে হবে। ব্যাপারটাকে ব্যায়ামের মত দেখতে হবে। কম্পিউটারের ভাষায় পুরোপুরি দক্ষতা থাকতে হবে। সফটওয়্যার তৈরি কবিতা লেখার মত। কবিতা লেখার সময় কবি কখনও ভাষা নিয়ে চিন্তা করেন না। ভাষা পুরোপুরি জানা না থাকলে কেউ কবিতা লেখার চেষ্টা করেন না।

আবার শুধু বুকডন চর্চা করলে যেমন ব্যায়ামের লক্ষ্য পূরন হয় না তেমনি শুধুমাত্র একটা বিষয় শিখলে ভাল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায় না। কয়েকটা বিভিন্ন ধরনের ভাষা জানা জরুরী। প্রত্যেকটা ভাষার কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যগুলো জানা থাকা দরকার। আমি Python, C, C# বা Java, Javascript, Erlang, Assembly অন্তত এই কয়েকটা ল্যাংগুয়েজ শেখার পরামর্শ দেব। প্রত্যেকটা ভাষারই কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে। এবং কেউ যদি শুরু করতে চান তাহলে প্রথমে পাইথন দিয়েই শুরু করুন। তারপর বাকিগুলো শেখা যেতে পারে। ভাষা শেখার জন্য ৫০০-১০০০ ঘন্টা ব্যায় করা হলে এরপর ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদমের দিকে সময় দেয়া দরকার। যদিও ১০০০ ঘন্টা চর্চা করলে কিছু ডাটা স্ট্রাকচার এবং অ্যালগরিদম শেখা হয়ে যাবে।

এরপর দরকার কাঠামো তৈরি শেখা। সেজন্য ডিজাইন প‌্যাটার্ন (http://en.wikipedia.org/wiki/Design_Patterns) শিখতে হবে। এটাও মূলতঃ অনেকদিন ধরে চর্চার মাধ্যমেই আয়ত্ব করতে হয়।

এরপর নেটওয়ার্কিং, প্যারালাল প্রসেসিং এবং সিকিউরিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে।

এছাড়া আর যে বিষয়গুলো লাগে সেগুলো হল বিভিন্ন ধরনের ডাটাবেজ সম্পর্কে ধারনা (SQL, NoSQL), বিভিন্ন ফ্রেমওয়ার্ক (ASP .NET, Angular JS ইত্যাদি) সম্পর্কে ধারনা, ক্লাউড কম্পিউটিং, সোর্স কোড কন্ট্রোল (Team Foundation Server, Git), Continuous Integration এবং বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট মেথড (যেমন agile) ইত্যাদি। এগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা থাকলে কাজ করতে করতে শিখে ফেলা যায়।

আর সফটওয়্যার তৈরি শুরু করার আগে মোটামুটি একটা খসড়া ডিজাইন ডকুমেন্ট বানাতে হয়। যেটা পরবর্তীতে পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু কাজ শুরু করার জন্য একটা থাকতেই হবে। এই বিষয়টা অভ্যাস করলে ভাল হয়।

একটা বিষয় যেটা বাংলাদেশে গুরুত্ব দেয়া হয় না সেটা হচ্ছে যোগাযোগ দক্ষতা। অন্য মানুষের সাথে কিভাবে সঠিকভাবে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে, বা কিভাবে কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলে সেটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে – এগুলো শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে কোনভাবে আক্রমন বা অসম্মান করলে তার থেকে ভবিষ্যতে কোন সহায়তা পাওয়া অসম্ভব।

আর সবশেষে আরকবার বলি শব্দটা হচ্ছে দক্ষতা – মেধা নয়। মাসে একদিন ৮ ঘন্টা ব্যায়ম করলে হবে না। প্রতিদিন করতে হবে। আর প্রতিদিন কতটুকু পেশি বাড়ল সেটাও মাপা যাবে না। একবছর পর মাপতে হবে কতটুকু উন্নতি হল। প্রোগ্রামিং বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রেও তাই। কাজটা অনেক মজার সুতরাং আশা করি সেটা আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হবে।

সুবিন : বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং শিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ?
মনিরুজ্জামান : পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ নিজের ভাষায় পড়াশোনা করে। আমাদের জন্য সেটা বাংলা ভাষা। প্রোগ্রামিং এর সাথে বাংলা বা ইংরেজি বা অন্য ভাষার সরাসরি কোন সম্পর্ক নাই। যদি ভাল মানের বই থাকে তবে নিজের ভাষায় যে কোন কিছু শেখা সহজ। সেটা প্রোগ্রামিং এর ক্ষেত্রেও সত্য। আর বাংলা ভাষায় বই অবশ্যই দরকার আছে। অনেকেই শুধু ইংরেজি ভাষায় দুর্বল থাকার কারনে প্রোগ্রামিং শেখার উৎসাহ পায় না।

সুবিন : আপনি তো প্রোগ্রামিং শিক্ষা নিয়েও কাজ করেন। শিক্ষক ডট কম-এ আপনার সি প্রোগ্রামিংয়ের একটি কোর্স আছে। এই কাজগুলো সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।
মনিরুজ্জামান : আমি যদি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার সুযোগ না পেতাম তাহলে নিজে নিজে শেখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেটা মোটেও সহজ হত না। সেকারনে আমি পরিকল্পনা করেছিলাম ১/২টা ভাষা, ডাটা স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম, কম্পিউটার আর্কিটেকচার ইত্যাদি কোর্স আকারে তৈরি করা। আমি মূলত ইউটিউবে ভিডিওগুলো আপলোড করা শুরু করেছিলাম। এরপর ডক্টর রাগিব হাসান ওনার শিক্ষক.কম সাইট চালু করেন এবং আমার ভিডিওগুলো সেখানে দিতে শুরু করি। যেহেতু শিক্ষক.কমে আর্টিকেলও দিতে হয় সেকারনে আমি আর্টিকেলও লিখতে থাকি। তবে আর্টিকেল লিখতে অনেক সময় লাগে। সেকারনে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর্টিকেল না লিখে এখন থেকে শুধু ভিডিও আপলোড করব আর আগের মত http://u.lekhoni.com সাইটে সেগুলো রাখব। এরপর লেখার কাজটা করা যাবে সময় পেলে। আমি এখন ডাটা স্ট্রাকচার আর অ্যালগরিদমের ভিডিওগুলো তৈরি করছি। আর বাংলায় এই বিষয়ে একটা বই লিখছি। তবে এই বিষয়ে আারো অনেকে এগিয়ে আসছেন যারা আমার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। এটা অনেক আশার কথা।

সুবিন : এবারে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। আপনি তো বাংলাদেশে একটি উদ্যোগের (iFeri.com) সাথে জড়িত? সেটি নিয়ে যদি একটু বিস্তারিত বলতেন।
মনিরুজ্জামান : iFeri.com আমরা তিন বন্ধু (আমি, শামস, নাসির) মিলে শুরু করেছি ২০১১ সনে। এটা একটা অনলাইন শপিং উদ্যোগ। ঢাকায় কোনকিছু কিনতে কোথাও যেতে হলে যত সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয় সেটা খুবই অসুবিধাজনক। কেউ যদি বাসায় জিনিসটা ডেলিভারি দিয়ে যায় তাহলে জীবনের অনেক মূল্যবান সময় বাঁচে । এটাই শুরু করার আগে আমাদের “আমরা কি সুবিধা দিতে পারি” এই প্রশ্নের উত্তর ছিল। এটা আসলে একটা ব্যবসা উদ্যোগ। সফটওয়ার উদ্যোগ নয়। একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কোন একটা কোম্পানিতে কাজ করলে, সেটা যত বড়বা ছোট কোম্পানিই হোক, সেটা নিজের দাবি করা যায় না। আর পুরোপুরি স্বাধীনতাও পাওয়া যায় না কখনও।

Wolfram এর তধ্য অনুযায়ী ঈদের মাসে ১৫ লক্ষ হিট হয়েছে আমাদের সাইটে। ১ লক্ষ এর বেশি মানুষ এসেছে। কম খরচে এইরকম লোড সাপোর্ট দেয়ার জন্য আমরা বেশকিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি। যেটা নিয়ে iFeri.com এ লেখার ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : ভবিষ্যতে কী বাংলাদেশে এসে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে?
মনিরুজ্জামান : বাংলাদেশে শারিরিক ভাবে উপস্থিত না থাকলেও এখনও আমি বিভিন্ন কাজ করছি বাংলাদেশে। ভবিষ্যতে পুরোপুরি অনলাইন ভিত্তিক একটা আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় করার ইচ্ছা আছে। যেটার জন্য আমি মূলতঃ উদ্যোক্তা হব। শিক্ষক হিসাবে যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ কাজ করবেন। সবাই বাসায় বসে পড়াশোনা করতে পারবে। কিভাবে পরীক্ষা নেয়া হবে, কি কি বিষয় থাকবে সেটা নিয়েও ভেবে দেখতে হবে। আর এটা হবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তবে এটা করতে অবশ্যই বেশ সময়ের প্রয়োজন।

উদ্যোক্তা বিষয়ক সাক্ষাৎকার – সুবিন

“দেশের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের গল্প”
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের অবদান অপরিহার্য, মূলত তরুণ প্রযুক্তিবিদদের চৌকস দক্ষতা ও অপরিসীম ধৈর্য্যের দ্বারা এই খাত এগিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত। বেশিরভাগ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত থাকলেও কিছু ব্যাতিক্রমও রয়েছেন। বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ অন্য জায়গায় চাকরি করার বদলে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান, চাকরি দিচ্ছেন অন্যদের, আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা, অণুপ্রেরণা হয়ে আছেন তাদের নবীনদের মধ্যে!
তাদের সফলতা, ব্যর্থতা, অর্জন আর পেছনের গল্প নিয়ে জানুয়ারি, ২০১৩ সংখ্যা থেকে “কম্পিউটার জগত” ম্যাগাজিনে প্রতি সংখ্যায় প্রকাশিত হবে একটি করে সাক্ষাৎকার। আশা করি এর মাধ্যমে নবীনরা অনূপ্রাণিত হবে তাদের অভীষ্ট স্বপ্ন “আইটি উদ্যোক্তাতা” হওয়ার লক্ষে। এই সিরিজ সাক্ষাৎকারগুলোর প্রথম পর্বে থাকছে দেশের একজন স্বনামধন্য  সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং সফল তরুণ আইটি উদ্যোক্তা তামিম শাহ্‍‍রিয়ার (সুবিন) এর, সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মৃণাল কান্তি রায় দীপ।

দীপঃ প্রথমে আপনি এবং আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন?
সুবিনঃ আমি তামিম শাহ্‍‍রিয়ার। তবে পরিচিতজনেরা আমাকে সুবিন (ডাকনাম) নামেই ডাকে। পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী। আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি ২০০৬ সালে। বর্তমানে আমি কাজ করছি আমার নিজের প্রতিষ্ঠান মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড-এ। মুক্ত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। আমার সাথে সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমান যিনি বর্তমানে মুক্ত সফটের চেয়্যারম্যান ও প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

দীপঃ আমাদের দেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষে চাকরি খুঁজতে ব্যস্ত থাকে সেক্ষেত্রে আপনি ভিন্ন হলেন কেন?
সুবিনঃ আসলে আমার উদ্যোক্তা হবার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে। সেখানে ২ সেমিস্টার কাটানোর পড়ে আমি বুঝতে পারি যে আমি আসলে কিছু শিখছি না, তাই চাকরী ছেড়ে দেই। তারপরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথমে দেশের খ্যাতনামা একটি কোম্পানীতে যোগ দেই। সেখানে দেড় বছর কাজ করার পরে আরো দেড় বছর কাজ করি প্লেডম বাংলাদেশে (তৎকালীন ট্রিপার্ট ল্যাবস)। চাকরী করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমার পুরোপুরি মেধা ও শ্রম আসলে কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলি যেখানে আমি আমার মেধা ও শ্রমের পর্যাপ্ত ব্যবহার করতে পারবো।

দীপঃ ব্যাক্তিগত ভাবে একজন ভালো প্রোগ্রামার হওয়ায় আপনার কাছে হয়ত বিদেশী প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রন ছিলো, সেটা উপেক্ষা করে নিজে কিছু করার উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা কেমন করে পেলেন?
সুবিনঃ হ্যাঁ, বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে আমি চাকরির ইন্টারভিউ অফার পেয়েছিলাম। ফেসবুক থেকে আমাকে চাকরির ইন্টারভিউ-র জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় ২০১০ সালের জুন মাসে, আর গুগল থেকে চাকরির ইন্টারভিউ অফার পাই ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তাদেরকে আমি তখন ইন্টারভিউ দিতে অপারগতা জানাই এবং আরো কয়েকবছর আমার নিজের দেশে কাটানোর ইচ্ছার কথা জানাই। সেগুলো উপেক্ষা করা আমার জন্য মোটেও কঠিন কিছু ছিল না। কারণ আমি দেশে থাকতে চেয়েছিলাম। আর দেশে থাকার অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রধান ছিল বাবা-মা’র সাথে থাকা।
আর এপিজে আবুল কালামের “উইসং অব ফায়ার” বইটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

দীপঃ শুরুটা কেমন? মূলধন কি রকম এবং কতজন পেশাদার নিয়ে শুরু হয়েছিলো “মুক্ত সফটওয়্যার”?
সুবিনঃ তখন রেন্টএকোডার ডট কম (rentacoder.com) নামের একটি সাইটে আমি মাঝে মাঝে কাজ করতাম। সেখানে আমার রেটিং বেশ ভালো ছিল। সেটাকেই মূলত আমাদের ব্যবসার মূলধন হিসেবে ধরতে পারেন। আর টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ছয়-সাত লাখের মতো। সেই টাকা এসেছিল আমাদের নিজেদের জমানো টাকা থেকে। এ ছাড়া আমি ব্যাংক থেকে পার্সোনাল লোন নিয়েছিলাম। শুরুর সময় আমি যেহেতু চাকরি করতাম, মাহমুদ-ই কোম্পানী দেখাশোনা করত। ২০১০ এর জুন মাসে আমি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নিজের প্রতিষ্ঠানে চলে আসি। ২০০৯ সাথে আমাদের কোম্পানিতে ফুলটাইম পেশাদার ছিল ৩ জন, আর ২০১২ সালে সেটি এসে দাঁড়ায় ১২ জনে।

দীপ: লোন পেতে কোনো সমস্যা হয় নি?
সুবিন: না, কারণ তখন আমি ভালো বেতনের চাকরি করতাম। তাই ব্যাংক খুশিমনেই আমাকে লোন দিয়েছে। তবে এখন মনে হয় দিবে না।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কি ধরনের সার্ভিস দেয়া হয়ে থাকে বা কি ধরনের প্রজেক্ট আপনারা নিয়ে থাকেন?
সুবিনঃ আমরা মূলত কাস্টমাইজড সফটওয়্যার তৈরি করি। আমাদের কাজের প্লাটফর্মে বেশ বৈচিত্র আছে। আমরা রিচ ইন্টারনেট অ্যাপ্লিকেশন (RIA – Rich Internet Application), সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও গেমস (আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড, ব্লাকবেরি ও জাভা এম ই) তৈরি করি। তবে সম্প্রতি আমরা ইআরপি (ERP – Enterprise Resource Planner) সফটওয়্যার তৈরি করছি এবং সেই সাথে বিগ ডাটা ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করছি।

দীপঃ গ্রাহক সংগ্রহ হয়ে থাকে কেমন করে?
সুবিনঃ শুরুর দিকে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ওয়েবসাইগুলো ছিল আমাদের ক্লায়েন্ট যোগাড় করার একমাত্র উপায়। তবে এখন রেফারেন্সের মাধ্যমেই বেশি ক্লায়েন্ট আসে।

দীপঃ বর্তমানে কতজন পেশাদার/কর্মী রয়েছে আপনার প্রতিষ্ঠানে?
সুবিনঃ বর্তমানে কোম্পানীতে ১২ জন সফটওয়্যার প্রকৌশলি কাজ করছেন। দেশের শীর্ষ প্রোগ্রামাররাই মুক্ত সফটে কাজ করে থাকেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ জন এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালিস্ট কাজ করেছেন মুক্ত সফটে – তাঁদের মধ্যে দুইজন এখন গুগলের মাউন্টেন ভিউ অফিসে কর্মরত, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। এছাড়াও গুগল সামার অব কোডে অংশগ্রহনকারি, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহনকারি ছেলেরা মুক্ত সফটওয়্যারে কাজ করছে। এক কথায় বলতে পারেন দেশের সেরা মেধাবী ও উদ্যমী তরুণদের আখড়া হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড।

দীপঃ প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থাপনা টিম/বিভাগ কি রয়েছে?
সুবিনঃ ব্যবস্থাপনার কাজ আমি আর মাহমুদ মিলেই করি। ভবিষ্যতে আলাদা ব্যবস্থাপনা বিভাগ খোলার পরিকল্পনা আছে।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠানের অর্জন?
সুবিনঃ ব্যাক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা রকম অর্জন রয়েছে। সেগুলোর বাইরে প্রতিষ্ঠানের অর্জনও কিছু আছে। vworker.com (পরে freelancer.com এটিকে কিনে নেয়) সাইটে আমরা এক নম্বর বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ইংল্যান্ডের একটি কোম্পানীর জন্য আমাদের বানানো একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন আন্তর্জাতিক একটি কেইস স্টাডি হিসেবে দেখানো হয় ২০১১ সালে। ২০১২ সালের বেসিস কোডওয়ারিয়র-এ আমাদের কোম্পানীর একটি দল অংশগ্রহন করে এবং পিএইচপি ট্র্যাকে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ডাটা মাইনিংয়ের উপর একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা সেরা ১০% এ ছিলাম।

দীপঃ আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একজন আইটি উদ্যোক্তা হওয়া কতটুকু গ্রহনযোগ্য?
সুবিনঃ এখানে আসলে গ্রহনযোগ্যতার কোনো প্রশ্ন আসে না। যেকোনো কাজ, যেখানে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সৎপথে উপার্জন করা যায়, তা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য। আপনি লক্ষ করে দেখবেন, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সরকারি চাকরির গ্রহনযোগ্যতা বেশ কম – কারণ সেখানে ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি বেশ জাকিয়ে বসেছে। আর তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতি-বিমুখ বলেই নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ সরকারি চাকরিতে যেতে চায় না। যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, তবে তা হাতেগোনা।

দীপঃ এক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য কি দেয়া হয় বা সহায়তা কি পাওয়া যায় ?
সুবিনঃ বর্তমানে সফটওয়্যার কোম্পানীগুলোর জন্য সরকার ট্যাক্স মওকুফ করেছে। আর রয়েছে ইইএফ ফান্ড তবে এখন পর্যন্ত সেটার ভালো ব্যবহারের পরিবর্তে লুটপাটের কাহিনীই বেশি শোনা যায়। এ ব্যাপারে আপনারাই (আইটি সাংবাদিকরা) ভালো জানার কথা। এছাড়া অন্য কোনো সরকারি সাহায্য বা সহায়তার কথা আমার জানা নাই। যদিও সরকারের অনেক পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, সেগুলো এখনও কল্পনাতেই আটকে আছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নতুন কোন পদক্ষেপ বা উদ্যোগ কি ব্যাক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আছে?
সুবিনঃ  সফটওয়্যার ডেভেলাপমেন্টের পাশাপাশি নানা রকম রিসার্চ করে মুক্ত সফটওয়্যারকে আমরা অন্য উচ্চতায় নিতে চাই। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সাথে আমাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যার অধীনে সাস্টের সাথে আমরা যৌথভাবে গবেষণা ও সফটওয়্যার ডেভলাপমেন্টের কাজে অংশ নিবো এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শেয়ার করবো। ভবিষ্যতে নিত্যনতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। এছাড়া দেশের বাইরেও অফিস খোলার পরিকল্পনা আছে। আর দেশের প্রোগ্রামিং সংস্কৃতির বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে চাই। ইতিমধ্যে আমি “কম্পিউটার প্রোগ্রামিং” নামে একটি প্রোগ্রামিংয়ের বই লিখেছি বাংলা ভাষায়। এটি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দীপঃ আইটি উদ্যোক্তা হতে কি কি প্রয়োজন?
সুবিনঃ

  • সাহস। যথেষ্ট সাহস না থাকলে কোম্পানী শুরু করা যায় না।
  • ধৈর্য়্য। যথেষ্ঠ ধৈর্য্য না থাকলে কোম্পানী টিকিয়ে রাখা যায় না।
  • প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস। নানা রকম বই পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে। সেটা যেকোনো রকম বই হতে পারে। অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যে ধারন করার সবচেয়ে সহজ উপায় বই।
  • পরিশ্রম এবং পরিশ্রম! পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয়।
  • যোগাযোগে ভালো হতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কথা বলা, পড়া ও লিখার দক্ষতা থাকতে হবে।
  • সর্বোপরি নিজের কাজকে উপভোগ করতে হবে।

——-আইটি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তামিম শাহরিয়ারের কিছু টিপস——–

  • যথেষ্ট পরিমান টাকা সঞ্চয় করতে হবে যেন নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো আয় ছাড়াই কমপক্ষে এক বছর চলা যায়
  •  ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছুর উপর ভালো দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
  •  নতুন কোম্পানীতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। কারণ ছোট অবস্থায় অনভিজ্ঞ কাউকে নিয়ে তার দক্ষতা বাড়ানোর পিছনে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
  •  ব্যাক্তিজীবনে ও প্রতিষ্ঠানের খরচের ব্যাপারে মিতব্যায়ি হতে হবে।
  • কোম্পানীর আয়-ব্যায়ের হিসাব (একাউন্টস) ঠিকভাবে রাখতে হবে।
  •  সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার চেষ্টা করতে হবে।

কম্পিউটার জগত  দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা কম্পিউটার ম্যাগাজিন। তারা ২০১৩ সাল থেকে দেশের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের উপর একটি নিয়মিত ফিচার শুরু করে। সেই ফিচার সিরিজের জন্য প্রথম ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন মৃণাল কান্তি রয় (দীপ)। সেটি ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়: http://www.comjagat.com/home/articles/morearticles/6654। 

মূল ইন্টারভিউ এখানে প্রকাশ করা হলো। আগামী দিনের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের হয়ত কিছুটা কাজে লাগলেও লাগতে পারে।