Live Before You Die – স্টিভ জবস্‌

২০০৫ সালের ১২ জুন। অ্যাপল ইনকর্পোরেটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস্‌ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেন তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা “How To Live Before you Die”। তাঁর এই বক্তৃতায় তিনি বলেন তাঁর জীবনের তিনটি গল্পের কথা। স্টিভ জবসের জবানিতেই আমরা আজকে এই লেখায় জানবো তাঁর সেই তিনটি গল্প।

পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমাদের সামনে আজ আসতে পেরে আমি আনন্দিত এবং সম্মানিত। আমি কলেজের গন্ডি পেরুতে পারিনি। সত্যি বলতে, আজকেই প্রথম আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েশনের সবচেয়ে কাছে আসতে পেরেছি। আজকে আমি তোমাদের আমার জীবনের ছোট্ট তিনটি গল্প বলবো।

প্রথম গল্পটির নাম আমি দিবো এক সূতোয় গাঁথা।

আমি রিড কলেজ থেকে প্রথম ৬ মাসের মাথায় ড্রপ আউট হই। কলেজ ড্রপ করার পরেও সেখানে আমি ১৮ মাসের মত ছিলাম। কিন্তু কেন আমি কলেজ থেকে ড্রপ আউট হয়েছিলাম? এই প্রক্রিয়াটি আসলে শুরু হয়েছিল আমার জন্মের আগে থেকে। আমার মা একজন অবিবাহিত কলেজ গ্রাজুয়েট হওয়ার কারণে সে সময় আমাকে দত্তক দেয়ার পরিকল্পনা করেন। আমার মা চেয়েছিলেন একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাকে কোন শিক্ষিত পরিবারের কাছে দত্তক দিতে। সেজন্য তিনি পছন্দ করেছিলেন একজন নিঃসন্তান উকিল দম্পতিকে। কিন্তু সেই উকিল দম্পতি আসলে একটি মেয়ে সন্তানের বাবা-মা হতে চেয়েছিলেন। তাই আমার জন্মের পর তারা আর আমাকে নিতে চাননি। আমাকে নেয়ার জন্য অপেক্ষমান তালিকায় আরো এক দম্পতি ছিলেন। তাঁরা মধ্যরাতে একদিন একটা ফোনকল পান। আমার বায়োলজিক্যাল বাবা মা তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের একটি ছেলে হয়েছে। তোমরা কী তাকে দত্তক নিতে আগ্রহী?” আমার সেই বাবা-মা সানন্দে আমাকে তাঁদের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন। যদিও আমার গর্ভধারিণী মা পরে যখন জানতে পেরেছিলেন আমাকে দত্তক নেয়া বাবা-মার দুজনের একজনও গ্রাজুয়েট নন। এমনকি তাঁরা স্কুল পাশও ছিলেন না, তখন তিনি চূড়ান্ত চুক্তিপত্রে সই দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কয়েকমাস পরে, যখন আমার দত্তক নেয়া বাবা-মা আমার মার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁরা আমাকে অবশ্যই লেখাপড়া শিখাবেন এবং একদিন আমি অবশ্যই কলেজে যাবো।

এর ঠিক ১৭ বছর পরে আমি কলেজে ভর্তি হই। আমি যে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সেটি ছিলো এই স্ট্যানফোর্ডের মতই ব্যয়বহুল। আমার ছাপোষা চাকুরিজীবি বাবা-মা তাঁদের সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে যাচ্ছিলেন আমার কলেজের পড়াশোনার পিছনে। ছয়মাস পর এসব আমার কাছে একদম নিরর্থক মনে হলো। আমি জীবনে কী করতে চাই সে সম্পর্কিত কোন ধারণা আমার ছিলো না এবং সেই ধারণা পেতে কলেজ আমাকে কতটুকু সাহায্য করতে পারবে সেটিও আমি বুঝতে পারছিলাম না। অর্থহীনভাবে আমি আমার বাবা-মায়ের সঞ্চয়ের টাকা শেষ করে যাচ্ছিলাম। তখন আমি কলেজ ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং সেটি ছিল সঠিক একটি সিদ্ধান্ত। যদিও সে সময় এটি ছিল বেশ ভয়ঙ্কর একটি সিদ্ধান্ত, কিন্তু আজকে আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি পিছনে তাকালে বুঝতে পারি আমার এই কলেজ ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল আমার জীবনের নেয়া শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। যে মূহুর্ত থেকে আমি কলেজ ড্রপ আউট হই, সে মূহুর্ত থেকে যেসব বিষয় পড়তে আমার ভাল লাগতো না সেগুলোর ক্লাস করা বন্ধ করে দেই এবং যেসব বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিলো সেসব বিষয়ের ক্লাস করা শুরু করি।

অবশ্য ব্যাপারটা খুব একটা রোমান্টিক ছিলো না। সেসময় আমার কোন থাকার জায়গা ছিলো না। আমি আমার বন্ধুর ডরমেটরির রুমের মেঝেতে ঘুমাতাম। কোকের খালি বোতল কুড়িয়ে দোকানে জমা দিয়ে ৫ সেন্ট করে জোগাড় করতাম এবং সেটি দিয়ে আমার খাবার খরচ চালাতাম। প্রতি রবিবার ৭ মাইল হেঁটে হরেকৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধুমাত্র একবেলা ভালো খাবারের আশায়। এসব আমি খুব পছন্দ করতাম। আমি তখন আমার যেসব কাজ করতে ভালো লাগতো সেটাই করতাম এবং আস্তে আস্তে আমার কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গৌণ হয়ে গেল।

ছোট্ট একটা উদাহরণ দেইঃ
রিড কলেজে সেসময় দেশের সবচেয়ে ভালো ক্যালিগ্রাফি কোর্স চালু ছিল। ক্যাম্পাসের সব পোষ্টার, ড্রয়ার, শিরোনামে খুব সুন্দর সুন্দর হাতে তৈরি ক্যালিগ্রাফি শোভা পেত। যেহেতু আমি সেসময় কলেজ ড্রপআউট ছিলাম, রেগুলার কোর্সগুলো করার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিভাবে ক্যালিগ্রাফি করা হয় এই আগ্রহ থেকে আমি ক্যালিগ্রাফির কোর্সগুলো করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি Serif এবং San Serif ফন্ট দুইটি শিখি, অক্ষরগুলোর মাঝে স্পেসের ব্যবহার কিভাবে অপূর্ব টাইপফেসের সৃষ্টি করতে পারে সেটা বুঝতে পারি। সেটি ছিল অপূর্ব, ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক একটি বিষয় যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং আমি এতে মুগ্ধতা খুঁজে পাই।

আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার এই শিক্ষাগুলো কখনোই আমার ব্যক্তিগত জীবনে কোন কাজে আসবে না। কিন্তু ১০ বছর পর যখন আমরা প্রথম ম্যাকিনটস কম্পিউটার ডিজাইন করি, তখন সব ফিরে এসেছিলো। আমরা সেগুলোকে ম্যাকে ব্যবহার করি। এটা ছিল সুন্দর টাইপোগ্রাফি সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিউটার। আমি যদি তখন কলেজ ড্রপআউট না করতাম তাহলে ম্যাকিনটস কখনো এত বৈচিত্র্যময় টাইপফেস বা যথাযথ স্পেস সম্বলিত টাইপ ফন্ট পেত না। তখন থেকে উইন্ডোজ-ও এটা কপি করে আসছে, অর্থাৎ কোন পারসোনাল কম্পিউটারেই এত সুন্দর টাইপফেস আমরা পেতাম না। আমি যদি সেসময় কলেজ ড্রপ না করতাম, ক্যালিগ্রাফির সেইসব কোর্স গুলো না করতাম , তাহলে হয়ত আজকে এত সুন্দর ফন্ট আমরা কম্পিউটারে পেতাম না। অবশ্যই সামনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার বিন্দুর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করা আজ থেকে ১০ বছর আগে যখন আমি কলেজে পড়তাম তখন অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেই বিন্দুগুলোকে সংযুক্ত করা আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অনেক সহজ।

সামনের দিকে তাকিয়ে কখনোই বিন্দু সংযোগ দেয়া সম্ভব না, কিন্তু পিছন থেকে কাজটা করা অনেক সহজ। তোমাকে বিশ্বাস রাখতে হবে নিজের উপর যে, ভবিষ্যতে অবশ্যই কোন না কোনভাবে বিন্দুগুলো সংযুক্ত করা যাবেই। হতে পারে সেটা তোমার কর্মফল, তোমার ভাগ্য, তোমার পরিশ্রম, তোমার ক্ষমতা। আমার নিজের উপর এই বিশ্বাস কখনোই আমাকে পিছিয়ে পরতে দেয়নি এবং আমার এই সিদ্ধান্তই পাল্টে দিয়েছে আমার পুরো জীবনকে।

আমার দ্বিতীয় গল্পটা হচ্ছে ভালবাসা এবং হারিয়ে ফেলার গল্পঃ

আমি ভাগ্যবান ছিলাম – যা করতে ভালবাসতাম সেটি অল্প বয়সেই করতে পেরেছিলাম। ওজ এবং আমি অ্যাপল শুরু করেছিলাম আমাদের ব্যক্তিগত গ্যারেজে মাত্র ২০ বছর বয়সে। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম বলেই, গ্যারেজের দুইজনের কোম্পানি থেকে মাত্র ১০ বছরে অ্যাপল ২ বিলিয়ন ডলারের, ৪০০০ কর্মীর কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন আমাদের সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কার ম্যাকিনটস তৈরি করলাম তখন আমার বয়স মাত্র ৩০। তখন আমাকে অ্যাপল থেকে ছাটাই করা হয়। প্রশ্ন হতে পারে, যে কোম্পানির শুরু আমি নিজে করেছি সেখান থেকে আমাকে কিভাবে ছাঁটাই করা যায় ? ধীরে ধীরে যখন অ্যাপল বড় হতে থাকলো, তখন আমি খুব মেধাবী একজনকে খুঁজতে থাকি যে কিনা আমার সাথে অ্যাপলকে আরো সমৃদ্ধ করবে। প্রথম একবছর আমাদের কাজ ভালই চলেছিল, কিন্তু যখন আমাদের লক্ষ্য আলাদা হয়ে গেল তখন আমরা ব্যর্থ হলাম। সেসময় অ্যাপলের বোর্ড অফ ডাইরেক্টরস্‌ আমার পক্ষ না নিয়ে তাঁর পক্ষ নিলো এবং ৩০ বছর বয়সে নিজ কোম্পানি থেকে আমাকে ছাঁটাই করা হলো। আমি আমার সারা জীবন যেখানে মনোনিবেশ করেছিলাম, সেটি এক মুহুর্তে চলে গেল; যা ছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী।

সামনের কয়েকমাস কী করে আমার কাটবে, আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়েছিল আমি আমার পূর্ববর্তী প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের পিছনে ফেলে দিয়েছিলাম, সেটা ঠিক কাজ হয়নি। আমি বব নয়েস এবং ডেভিট পাকার্ডের সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁদের কাছে ক্ষমা চাই। যদিও এটা ছিল বড় ধরণের একটা ভুল এবং আমি একসময় সিলিকন ভ্যালি থেকে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তাও করেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি আমার আমিতে ফিরে এলাম এবং আবার নিজের কাজকে ভালবাসতে শুরু করলাম। আমার প্রস্থানে অ্যাপলে তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। যদিও আমাকে বাতিল করা হয়েছিল অ্যাপল থেকে আমি, কিন্তু আমি তখনো আমার কাজকে ভালবাসতাম। তাই আমি আবারো নতুন করে সবকিছু শুরু করার সিদ্ধান্ত নেই।

তখন বুঝতে না পারলেও আমি পরে বুঝেছিলাম যে, অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হওয়া আমার জীবনে ঘটা সর্বোত্তম একটি ঘটনা ছিল। সাফল্যের চূড়া থেকে হঠাৎ করেই ছিটকে যাওয়া এবং আবারো নিজেকে একদম তলানিতে আবিষ্কার করেছিলাম আমি; যেখানে নিশ্চিত ছিল না কোন কিছুই। এই ঘটনাটি আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়টিতে পৌঁছে দেবার রাস্তাটাকে সহজ করে দিয়েছিলো।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি NeXT এবং Pixar নামক দুইটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করি এবং অসাধারণ একজন নারীর প্রেমে পরি , যিনি পরবর্তীতে আমার স্ত্রী হন। পিক্সার তখন বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার এ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম Toy Story তৈরি করে এবং এখন পর্যন্ত এটি বিশ্বের সবচেয়ে সফল এ্যানিমেশন স্টুডিও। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে, অ্যাপল তখন NeXT-কে কিনে নেয়। আমি আবার অ্যাপলে ফিরে আসি। টেকনোলজি, যা NeXT এ তৈরি করা হয়েছিলো, এটি বর্তমান অ্যাপল যুগের প্রাণ। এবং লরেন্স ও আমি তখন একটি সুন্দর পরিবার গঠন করেছিলাম।

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এসবের কিছুই হতো না যদি না আমাকে অ্যাপল থেকে বের করে দেয়া হতো। তিক্ত ওষুধ খাওয়ার অভিজ্ঞতা কোন রোগীর জন্য সুখকর না হলেও, রোগীর জন্য সেটি আবশ্যক। কখনো কখনো জীবন ইট দিয়ে তোমার মাথায় আঘাত করবে। বিশ্বাস হারানো যাবে না। আমি বিশ্বাস করতাম যে, একটি জিনিসই আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা হলো নিজের কাজকে ভালবাসা। কী করতে তুমি ভালবাসো, সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। এটা যেমন তোমার কাজের জন্য সত্য, তেমনি সত্য তোমার ভালবাসার মানুষের জন্যও। তোমার কর্ম তোমার জীবনের বিরাট একটি অংশকে পূর্ণ করবে, তাই পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির জন্য তুমি যে কাজকে শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করো, সেটিকেই বেঁছে নাও। এবং শ্রেষ্ঠ কাজ করার সর্বোত্তম উপায় হলো নিজের বর্তমান কাজকে ভালবাসা। যদি তুমি এখনো সেটি খুঁজে না পাও, খুঁজতে থাকো। কখনো বসে পরো না। একসময় না একসময় তুমি ঠিকই তাকে খুঁজে পাবে। যেকোন সুন্দর সম্পর্কের মত যতদিন যাবে সেটি সুন্দর থেকে সুন্দরতর হতে থাকবে। তাই খুঁজে যাও তোমার তোমার ভালবাসার কাজটিকে, যতক্ষণ না পাও। হাল ছেড়ো না।

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।
যখন আমার বয়স ১৭, তখন আমি একটি বাণী শুনেছিলাম এমন যে, “তুমি যদি তোমার জীবনের প্রতিদিনকে তোমার জীবনের শেষ দিন মনে করে কাজ করো, তাহলে একদিন তুমি অবশ্যই সফল হবে।” এই কথাটি আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিলো যে, গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, “যদি আমি জানি যে আজকে আমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে কী আমি সেই কাজ করবো যা আমি আজকে করতে চাচ্ছি?” পরপর কয়েকদিন যদি উত্তর পেতাম “না”, তখন আমি মনে করতাম কিছু পরিবর্তন করা আবশ্যক।

আমি খুব তাড়াতাড়ি মারা যাবো, এই কথাটি ছিল আমার জীবনে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল চালিকাশক্তি। কারণ, বলতে গেলে প্রায় সব কিছুই – সব ধরণের চাওয়া-পাওয়া, অহম, ভয়-ভীতি, লজ্জা, ব্যর্থতা সব কিছুই মৃত্যুর কাছে তুচ্ছ; সব কিছুই মূল্যহীন শুধুমাত্র যা সত্যিকার অর্থেই যা দরকার সেটা ছাড়া। যখন তুমি মনে করবে তুমি মরে যাচ্ছো, তখন তোমার কাছে মনে হবে না, তোমার হারাবার কিছু আছে। যখন তুমি নিঃস্ব, তখন নিজের মনের কথা শোনা ছাড়া আর কোন উপায়ই তোমার নেই।

একবছর আগে, আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। সকাল ৭ঃ৩০ এ স্ক্যান করে আমার অগ্ন্যাশয়ে একটি টিউমারের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। তখন আমি জানতাম অগ্ন্যাশয় কী জিনিস। আমার চিকিৎসক আমাকে বললেন, এই ক্যান্সারটি অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি এবং আমার আয়ু বড় জোড় ৩-৬ মাসের মত। আমার ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন বাড়ি চলে যেতে এবং মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। প্রস্তুতি বলতে ছিলো নিজের সন্তানদের কয়েক মাসের মধ্যে সবকিছু বলা যা আমি গত ১০ বছরে তাঁদের বলতে পারিনি। এটা ছিলো মূলত নিজের পরিবারকে বুঝানো যে, সময় সন্নিকটে যেন সবকিছু গ্রহণ করা তাঁদের জন্য সহজ হয়। ব্যাপারটা আসলে ছিলো পরিবারকে চিরবিদায় জানানো।

ঐদিন সারাদিনই আমার নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। সন্ধ্যায় আমার একটি বায়োপসি করানো হয়। আমার অগ্ন্যাশয়ের টিউমার থেকে কিছু কোষ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। আমি সেসময় অচেতন ছিলাম। জ্ঞান ফেরার পরে আমার স্ত্রীর কাছ থেকে আমি জানতে পারি যে, যখন আমার টিউমারের কোষগুলো মাইক্রোস্কোপের নিচে ধরা হয়, তখন হঠাৎ করে ডাক্তার কাঁদতে শুরু করে। কারণ, ক্যান্সারটি ততদিনে অপারেশনের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য একটি বিরল ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। আমার অপারেশন করার ফলে এখন আমি সুস্থ।

সেসময় খুব কাছ থেকে আমি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। মৃত্যুর কাছাকাছি যেয়ে আমি বুঝতে পেরেছি এটা নিখাদ এবং একটি আধ্যত্নিক ভাবনা। কোন মানুষই মরতে চায় না। এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায়, তারাও মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্রহণ করে স্বর্গে যেতে চায় না। তারপরেও, এটি এমন একটি ঠিকানা, যেখানে আমরা সবাই একদিন পৌঁছে যাবো। কেউ সেখান থেকে পালাতে পারবে না। মৃত্যু জীবনের সুন্দরতম আবিষ্কারগুলোর একটি। পুরোনোকে মুছে ফেলে এটা নতুনদের জন্য পথকে পরিষ্কার করে। বর্তমানে নতুন হচ্ছো তোমরা, কিন্তু ধীরে ধীরে তোমরা বুড়ো এবং পুরোনো হতে থাকবে এবং একসময় মুছে যাবে। দার্শনিক মন্তব্য দেয়ার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটাই নিয়তি।

তোমার সময় সীমিত, সেসময়কে অন্যের জীবনের মত যাপন করে নষ্ট করো না। মানুষের চিন্তার ফলাফলের ফাঁদে নিজেকে আটকে রেখো না। অন্যের মতামতের চিৎকারে নিজের ভেতরকার আওয়াজকে থমকে যেতে দিও না। এবং অবশ্যই সাহস রাখো নিজের মনের কথা এবং অনুমানশক্তির উপর। কারণ, তারা সত্যিকার অর্থেই জানে তুমি কী হতে চাও। বাকিসব কিছুই সেখানে গৌণ।

আমার যুবক বয়সে একটি বই বেশ সাড়া ফেলেছিল। বইটির নাম দ্যা হোল আর্থ ক্যাটালগ (The Whole Earth Catalog), যাকে আমরা সেসময়ের তরুণ সমাজ বাইবেল জ্ঞান করতাম। স্টুয়ার্ড ব্রান্ড তাঁর কাব্যিক ছোয়ায় এটিকে মানুষের কাছে নিয়ে এসেছিল। এটা ১৯৬০ সালের ঘটনা, যখন পারসোনাল কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ আবিষ্কার হয়নি। তাই এই বইটিতে ছিল টাইপরাইটার, কাঁচি, পোলারয়েড ক্যামেরার ছোঁয়া। এটাকে বলা যায় “গ্রন্থাকৃতির গুগল”।

স্টুয়ার্ট এবং তাঁর দল বইটিতে নানা ধরণের বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন। বইটির শেষে তারা বলে গেছেন আসল কথা। এটা ৭০’ দশকের মাঝামাঝি সময়, তখন আমি তোমাদের বয়সী। তাঁদের বইয়ের শেষ পাতায় সকালের রাস্তার একটি সুন্দর আলোকচিত্র ছিল। তোমাদের মধ্যে যারা অভিযানপ্রিয় তারা এমন ছবি প্রায়ই দেখে থাকো। ছবির নিচে লেখা ছিল, “Stay Hungry. Stay Foolish.” এটা ছিল তাঁদের বিদায় সম্ভাষণ। Stay Hungry. Stay Foolish, যা আমি নিজে সবসময় নিজের জন্য কামনা করি। আজকে এখানে সবাই তোমরা প্রাজুয়েট হয়েছো। আজ আমি তোমাদের জন্যও বলছি, Stay Hungry. Stay Foolish

সবাইকে ধন্যবাদ।

[ Stay Hungry: কখনো তৃপ্ত হয়ো না এই ভেবে যে , তুমি সব জেনে গেছো। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাও।
Stay Foolish: কাজ করে যাও এবং চেষ্টা করতে থাকো সেসব কাজ করার যেসব ব্যাপারে মানুষ বলে “কখনো এটা হবে না” ]

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি


এইচটিএমএল কিভাবে শিখব?

এইচটিএমএল (html) একটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, যা তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহী যেকারো জানা উচিত। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য আমি বেশ কিছু ভিডিও লেকচার তৈরি করেছিলাম, যেগুলো ভালোভাবে দেখে নিলে (এবং সেই সঙ্গে প্র্যাকটিস করলে) এইচটিএমএল-এর বেসিক শেখা হয়ে যাবে।

এইচটিএমএল জানার আগে ওয়েবসাইট সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা প্রয়োজন। তাই প্রথম ভিডিওতে ওয়েব ডিজাইন সম্পর্কে আলোচনা করেছি।

দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ভিডিওতে এইচটিএমএল-এর বিভিন্ন জিনিস দেখানো হয়েছে।

আশা করি, ভিডিওগুলো অনেকের কাজে আসবে। কোনো মতামত থাকলে পোস্টের নিচে কমেন্টে জানানোর অনুরোধ রইল।

FAQ – পাইথন দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা

পাইথন দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা (লেখক তামিম শাহরিয়ার সুবিন) বই সম্পর্কে কিছু সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর –

১) কোন প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তরঃ দ্বিমিক প্রকাশনী (ওয়েবসাইট http://dimik.pub )

২) বইয়ের দাম কত?

উত্তরঃ গায়ের দাম ২০০ টাকা (দোকানে একটু কম রাখার কথা)।

৩) বইতে পাইথন ২ নাকি পাইথন ৩ ব্যবহার করা হয়েছে?

উত্তরঃ পাইথন ৩।

৪) আমি (তামিম শাহরিয়ার সুবিন-এর) কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ১ম ও ২য় খণ্ড বইটি পড়েছি, এখন কি পাইথন বইটি পড়ব?

উত্তরঃ পাইথন শেখার কোনো দরকার থাকলে পড়া যেতে পারে, নইলে পড়ার দরকার নাই।

৫) বইটা কাদের জন্য উপযোগি?

উত্তরঃ যারা প্রোগ্রামিংয়ে একেবারে নতুন, প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করবে, তাদের জন্য উপযোগি। এছাড়া যারা আগে প্রোগ্রামিং শিখতে গিয়ে শিখতে পারে নাই, এখন আরেকবার চেষ্টা করবে, বইটি তাদেরও কাজে লাগতে পারে। যারা অভিজ্ঞ প্রোগ্রামার, বইটি তাদের জন্য নয়।

৬) “পাইথন পরিচিতি” ও “পাইথন দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা” বই দুটির মধ্য পার্থক্য কী?

পাইথন পরিচিতি বইতে পাইথন 2.x ব্যবহার করা হয়েছে, আর পাইথন দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা বইটিতে 3.x। পাইথন পরিচিতি বইটি অভিজ্ঞ প্রোগ্রামার যারা পাইথন শিখতে চায়, তাদের জন্য, আর পাইথন দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা বইটি যারা নতুন প্রোগ্রামিং শিখতে চায়, তাদের জন্য।

৭) বইটি কোথায় পাওয়া যাবে?

নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি, মানিক লাইব্রেরি ও রানা বুক পাবলিশার্স-এ (ফোন নাম্বার দ্বিমিকের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে)। এছাড়া ঘরে বসে অনলাইনে অর্ডার করা যাবে রকমারি ডট কম-এ।

৮) ঢাকার বাইরে থেকে কিভাবে কিনব?

উত্তরঃ উপরে উল্লেখিত (নীলক্ষেতের) তিনটি বইয়ের দোকানে যোগাযোগ করতে হবে (ঠিকানা দ্বিমিকের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে)। এছাড়া rokomari.com বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় বই পৌঁছে দেয়।

৯) বাংলাদেশের বাইরে থেকে কিভাবে কিনব?

উত্তরঃ জানি না।

১০) বইতে কী কী বিষয় আলোচনা করা হয়েছে?

উত্তরঃ বইয়ের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত আছে ঃ http://dimik.pub/book/155/

১১) পাইথন সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ছিল, কোথায় জিজ্ঞাসা করবো?

উত্তরঃ পাইথন নিয়ে জিজ্ঞাসা থাকলে নিচের দুটি গ্রুপে কিংবা প্রোগ্রামাবাদে প্রশ্ন করতে হবে:

১২) আচ্ছা, পাইথন কী?

উত্তরঃ বিস্তারিত লিখেছি এই লেখায় : পাইথন কী?

একজন টিম বার্নার্স লী, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এবং একটি টুরিং পুরষ্কার

স্যার টিম বার্নার্স লী

সম্প্রতি স্যার টিম বার্নাস লী কম্পিউটার বিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার হিসেবে খ্যাত টুরিং পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই বছর ছিল টুরিং পুরষ্কারের ৫০ বছর পূর্তি। গত ৪ মে, বৃহস্পতিবার এ্যাসোশিয়েন অফ কম্পিউটিং মেসিনারিজ (ACM) ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www), প্রথম ওয়েব ব্রাওজার এবং ওয়েবকে মানসম্মত করার জন্য যে মৌলিক নিয়মনীতি ইত্যাদি তৈরির জন্য প্রফেসর স্যার টিম বার্নাস লী-কে টুরিং পুরষ্কারে ভূষিত করেন ( “inventing the World Wide Web, the first web browser, and the fundamental protocols and algorithms allowing the web to scale”)।

টুরিং পুরষ্কার কমিটি লী এর এই আবিষ্কারকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী কম্পিউটিং উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত করেছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব প্রতিদিন এক বিলিয়নের বেশি মানুষ যোগাযোগ, তথ্যের আদান-প্রদান, ব্যবসায়িক কাজের জন্য ব্যবহার করে থাকে।

টুরিং পুরষ্কার

১ মিলিয়ন ইউএস ডলার এসিএম টুরিং অ্যাওয়ার্ডের পুরষ্কার হিসেবে দেয়া হয়, যার আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে গুগল ইনকর্পোরেট। ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং এর নামানুসারে এই পুরষ্কার দেয়া হয়ে থাকে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই পুরষ্কার দেয়া হয়ে থাকে।

এসিএম প্রেসিডেন্ট ভিকি এল হ্যানসন টিম লী এর টুরিং পুরষ্কার প্রাপ্তি সম্পর্কে বলেন, “ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব সর্বপ্রথম অনলাইনে আসে ১৯৯১ সালে। যদিও খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, তারপরেও স্যার লী এর আবিষ্কারের আগের পৃথিবীর কথা ভাবাটা আমাদের জন্য কষ্টকর। বিভিন্ন দিক থেকে, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের অসামান্য প্রভাব সুস্পষ্ট। তারপরেও অনেকেই, WWW এর অন্তর্নিহিত প্রযুক্তিগত অবদানের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা করেন না। টিম বার্নাস লী, শুধুমাত্র ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের মূল অংশটুকু উদ্ভাবন করেননি, একই সাথে তিনি URI (Uniform Resource Identifier) এবং ওয়েব ব্রাউজারও উদ্ভাবন করেছেন, যার দ্বারা Web এর ব্যবহার আমাদের কাছে সহজতর হয়েছে। WWW এর সামগ্রিক অংশের প্রতিটি উপাদান কিভাবে আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করবে তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন স্যার টিম বার্নাস লী।”

গুগলের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, অ্যান্দ্রেই ব্রোডার বলেন, “আমরা যেভাবে আইডিয়া এবং তথ্যের আদান-প্রদান করি, সেটির আমূল পরিবর্তন এনেছে এই ওয়েব এবং সেইসাথে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সম্ভাবনার চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।” ভ্যানুভার বুশের একটি প্রবন্ধে ১৯৪৫ সালে ওয়েবের ধারণা পাওয়া গেলেও পরবর্তী কয়েক দশকে হাইপারটেক্সট, ইন্টারনেট, পারসোনাল কম্পিউটার ইত্যাদি নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। কিন্তু টিম বার্নাস লী যখন Unified User Interface এর ধারণা দেন, তখন থেকেই মূলত ওয়েবের বিস্ফোরক বিকাশের সূচনা হয়।

১৯৮৯ সালে টিম বার্নার্স লী একাধারে এমআইটির কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ল্যাব এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রিনিক্স প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত ছিলেন, তখন এই ওয়ার্ড ওয়াইড ওয়েবের চিন্তা তাঁর মাথায় আসে। তাঁর চিন্তা ছিল পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানীরা যেন সহজেই নিজেদের মধ্যে আইডিয়া এবং তথ্যের আদান প্রদান করতে পারে।

নিজের টুরিং পুরষ্কার পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে লী বলেন, “একজন কম্পিউটার অগ্রদূতের নামাঙ্কিত পুরষ্কার অর্জন করে নিজেকে আমি অত্যন্ত সম্মানিত মনে করছি, যিনি দেখিয়েছেন কম্পিউটার দিয়ে একজন প্রোগ্রামার কী করতে পারেন।” তিনি আরো বলেন যে, টুরিং পুরষ্কার, যা কিনা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মেধাবিদের দেয়া হয়ে থাকে, সেই পুরষ্কার অর্জন করার থেকে সম্মানের আর কিছুই হতে পারে না।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম বার্নার্স লী World Wide Web Consortium এর প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক, যা ওয়েব ডেভেলপমেন্টের প্রযুক্তিগত মানদণ্ড স্থাপনের জন্য কাজ করে। একই সাথে তিনি World Wide Web Foundation এর প্রতিষ্ঠাতা, যার মূল লক্ষ্য জনস্বার্থে ওয়েবের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ওয়েবের ব্যবহারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

CASIL এর ডিসেন্ট্রালাইজ ইনফরমেশন গ্রুপের পরিচালক, লী Http with Accountability (HTTPA) তৈরি করেন, যা Private-data এর ট্রান্সমিশন কিভাবে হচ্ছে সেটির উপর নজর রাখে এবং কিভাবে মানুষের দেয়া তথ্যের ব্যবহার হচ্ছে সেটি অনুসন্ধান করতে পারে। লী Solid (Social Linked Data) নামের একটি প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন, যেটি একজন ব্যক্তিকে তার নিজস্ব ডাটা নিয়ন্ত্রণের অনুমতি দেয় এবং পছন্দসই অ্যাপ্লিকেশনে সেসব ডাটা ব্যবহারের জন্য যোগ্য করে তোলে।

এমআইটির প্রেসিডেন্ট এল র‍্যাফেল রেইফ বলেন, “টিম বার্নাস লী এর বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার MIT এর মূল আসক্তি – প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যকেই ব্যাখ্যা করছে। আজ আমরা উদযাপন করছি আমাদের মানবজীবনের সর্বোৎকৃষ্ট প্রাপ্তি, যা টিম লী আমাদের জন্য করেছে এবং তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছি এই সুন্দর পুরষ্কার প্রাপ্তিতে যা কিনা সত্যিকার অর্থেই তাঁর প্রাপ্য ছিল।”

গনিতের প্রতি আগ্রহ থেকেই টিম বার্নার্স লী এর প্রোগ্রামিং এর প্রতি আগ্রহ জন্মায়। অবশ্য, এর সাথে পারিবারিক যোগসূত্রও ছিল; কারণ লী এর বাবা-মার ছিল পৃথিবীর প্রথম General Purpose কম্পিউটারে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এর পরের বছর, তিনি একটি প্রোগ্রাম লিখেন, যেটি বিভিন্ন আইডিয়া এবং প্রজেক্টের সাথে কীরূপ সম্পর্ক আছে সেটি চিহ্নিত করতে পারতো, যেটি কিনা পরোক্ষভাবে ওয়েবের প্রথম পদক্ষেপ ছিল।

CSAIL এর পরিচালক ড্যানিয়েলা রুস বলেন, “টিমের উদ্ভাবনী এবং স্বপ্লীল কাজগুলো আমাদের জীবনে এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের প্রভাব ছড়িয়ে গেছে যোগাযোগ এবং বিনোদন থেকে কেনাকাটা এবং ব্যবসা পর্যন্ত। তাঁর কাজ সারা বিশ্বের মানুষের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে, এজন্য আমরা CSAIL সকল সদস্য তাঁর কম্পিউটার বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মান টুরিং পুরষ্কার প্রাপ্তিতে অত্যন্ত গর্ববোধ করছি।”

টিম বার্নার্স লী তাঁর কাজের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তন্মধ্যে রানী এলিজাবেধের পক্ষ থেকে পাওয়া নাইট উপাধি অন্যতম। এছাড়াও টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে একবিংশ শতাব্দির ১০০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির একজন হিসেবে সম্মানিত করেছে। আসছে জুন মাসের ২৪ তারিখ ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্র্যান্সিসকোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ACM কর্তৃক টুরিং পুরষ্কার গ্রহণ করার মাধ্যমে টিম বার্নার্স লী এর মুকুটে যুক্ত হবে আরেকটি পালক।

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি।

অ্যারোস্পেসে ক্যারিয়ার গড়তে হলে

বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ (World Space Week) উপলক্ষে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। গতকাল (শুক্রবার) সেখানে যাই তানভীরুল ইসলামের একটা বক্তৃতা শোনার জন্য।

এমা লেম্যান
এমা লেম্যান

তানভীরের বক্তৃতার পরই “Building a Career in Aerospace” শিরোনামে আরেকটি বক্তৃতা শুনি। বক্তৃতা করেন এমা লেম্যান (Ms. Emma Lehman), যিনি বর্তমানে গুগলের একটি প্রতিষ্ঠান টেরাবেলা-তে ফ্লাইট অপারেশনস টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

সেখানে কী কাজ হয়, জানা যাবে নিচের ভিডিও থেকে:

সেখানে তিনি অ্যারোস্পেস-এ ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নয়টি পরামর্শ দেন এমা। যদিও এগুলো নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলেন, আমি কেবল বিষয়গুলোর নাম উল্লেখ করছি।

Jpeg
building a career in aerospace

১) লিখতে জানতে হবে: বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন রিসার্স পেপার, গ্র্যান্ট প্রপোজাল ইত্যাদি খুব ভালোভাবে লিখতে হয়। তাই লেখালেখি-তে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

২) লেগে থাকতে হবে: কোনো কিছুই সহজ নয়, লেগে থাকা চাই। শুরুতে কোনো কাজ ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু পরিশ্রম করে যেতে হবে। তাতে একসময় কাজটা সহজ হয়ে যাবে।

৩) নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে: কেউ যখন লেখাপড়া শেষ চাকরির জন্য তৈরি, তখন নিজের কানেকশন মানে পরিচিত মানুষদের কাজে লাগাতে হবে। চাকরির জন্য কারো কাছে সিভি পাঠানোতে লজ্জ্বার কিছু নেই।

৪) ঝুঁকি নিতে হবে: সবসময় নিরাপদ চাকরি বেছে নিলে সেটা ক্যারিয়ারের জন্য ভালো নাও হতে পারে।

৫) এমন একটি কাজ বা চাকরি খুঁজে নিতে হবে, যেটি তুমি উপভোগ করবে আর কাজ থেকে তুমি অনুপ্রেরণাও পাবে।

৬) সবসময় আরামের কাজ খুুঁজবে না। যেসব জিনিস তুমি জানো, সহজেই করতে পারো, এরকম কাজ বারবার করে কোনো লাভ নেই।

ওপরের পরার্মশগুলো কেবল অ্যারোস্পেস না, সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। নিচের তিনটি অ্যারোস্পেসে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের জন্য বিশেষভাবে বলা:

৭) অ্যারোস্পেস স্টার্টআপে কাজ নিলে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি পাওয়া যায়। তাই স্টার্টআপেই কাজ খুঁজে নেওয়া উচিত।

৮) অ্যারোস্পেসের জগতেই অনেক ধরণের কাজ আছে। আমি কেবল এরকম কাজ করবো, বা এরকম কোম্পানীতে কাজ করব, এরকম মানসিকতা না রেখে নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ব্যাপারে ফ্লেক্সিবল থাকতে হবে।

৯) পাইথন প্রোগ্রামিং শিখতে হবে।

এই ছিল এমার উপদেশের হাইলাইটস্। শেষ লাইনটিতে আমি বেশ মজা পেয়েছি কারণ গত কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশে পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছি। পাইথন কেবল যারা সফটওয়্যার বানাবে, তাদের জন্যই নয়, যারা গণিত ও বিজ্ঞানের নানান শাখায় কাজ করবে, তাদের জন্যও খুবই দরকারি একটি প্রোগ্রামিং ভাষা। নিচে আমার কাজের তিনটি লিঙ্ক দিলাম।

সফটওয়্যার টেস্টিংঃ White Box টেস্টিং ও Black Box টেস্টিং

গ্রিক মাইথোলজিতে “প্যান্ডোরার বাক্স” নামে একটি মিথ প্রচলিত আছে। প্যান্ডোরাকে জিউস একটা বাক্স দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায় এবং কড়া নির্দেশ দেয় সে যেন কখনো যেন বাক্সটি না খুলে। মানুষের যা হয় আর কি, নিষেধ অমান্য করার প্রবনতা থাকেই। প্যান্ডোরাও ব্যতিক্রম হবে কেন? সে যখন বাক্সটি খুলে ফেলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে রাগ, দুঃখ, কষ্ট , হতাশার মত সকল ঋণাত্মক আবেগ।

গ্রিক মাইথোলজি আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় না। আমাদের আজকে জানবো সফটওয়্যারের দুইটি টেস্টিং টেকনিক সম্পর্কে। যে টেকনিকগুলোর সাহায্যে একটি সফটওয়্যার থেকে বিভিন্ন ত্রুটি (যেমনঃ বাগ, errors) খুঁজে বের করা হয়।

সফটওয়্যার টেস্টিং কীঃ
টেস্ট (Test) শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। কোন কিছুর গুণগত মান যাচাই করার জন্য সেটিকে টেস্ট করার প্রয়োজন পরে। একটি সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও তাই। সফটওয়্যার তৈরি হওয়ার পর, সেটি থেকে বিভিন্ন বাগ(Bug), errors খুঁজে বের করার জন্য সফটওয়্যার টেস্টিং প্রসেসের সাহায্য নেয়া হয়।

সফটওয়্যার টেস্টিং -এর কলাকৌশল low-level টেস্ট থেকে high-level টেস্ট পর্যন্ত সমন্বয় করা হয়। Low-level টেস্টিং-এ যাচাই করা হয় যে ছোট কোড সেগমেন্ট-গুলো ঠিকঠাক মত implement হয়েছে কিনা এবং high-level টেস্টিং সফটওয়্যারটির মূল ফাংশন ঠিকঠাক আছে কিনা সেটা যাচাই করা হয়।

যেমনঃ আমাদের একটি প্রোগ্রামের বর্ণনা দেয়া হলো, যেটি কিনা একটি int প্যারামিটার নিয়ে সেখান থেকে আউটপুট হিসেবে প্রিন্ট করবে জোড় সংখ্যাগুলোকে। যদি জোড় সংখ্যা না হয় তাহলে int প্যারামিটারটির ভ্যালু অপরিবর্তিত থাকবে। ধরা যাক আমরা এই কাজের জন্য একটি ফাংশন লিখলাম এভাবেঃ

int fun(int param)
{
    int result;
    result = param/2;
    return result;
}

এখন এই ফাংশনটিকে আমরা দুইভাবে টেস্ট করতে পারি। আমরা দেখতে পারি এটার ফাংশনটি ঠিকমত কাজ করছে কিনা আর ফাংশনের বর্ণনা অনুযায়ী এটি আমাদের আউটপুট দিচ্ছে কিনা। প্রোগ্রামার মাত্রই বুঝতে পারবে এখানে কোড করা হয়েছে শুধুমাত্র জোড় সংখ্যার জন্য। বিজোড় সংখ্যার জন্য ভ্যালু অপরিবর্তিত রাখার কাজ এই ফাংশনে করা হয়নি। সফটওয়্যারের টেস্টিং এর দুইটি টেকনিক আছে। সে দুইটি হলোঃ

  1. White-Box Testing
  2. Black-Box Testing.

White-Box টেস্টিং:

 White Box টেস্টিং টেকনিক
White Box টেস্টিং টেকনিক

White-box টেস্টিং glass-box টেস্টিং বা structural টেস্টিং বা Clear box টেস্টিং নামেও পরিচিত। এই টেস্টিং টেকনিকে সফটওয়্যারের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো জানার প্রয়োজন পরে। অর্থাৎ, কিভাবে কোড করা হয়েছে, টেস্টারের সেই সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা থাকে। যে কোড লেখে, সাধারণত সেই-ই এই টেস্ট করতে পারে। কোডের বিস্তারিত ধারণার উপর ভিত্তি করে একজন সফটওয়্যার টেস্টার টেস্ট কেস তৈরি করেন। টেস্ট কেসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন সেগুলো দিয়ে কোডের ছোট ছোট অংশগুলো যাচাই করা যায়। যেমনঃ একটা ক্যালকুলেটরের সফটওয়্যার বানানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ফাংশন লেখার দরকার পরে। এখন আমি যদি যোগের ফাংশনটি লিখি আমি লিখবো এভাবেঃ

int sum(int a, int b)
{
    int sum;
    sum = a+b;
    return sum;
}

সাধারণভাবে একজন প্রোগ্রামারেই এইটুকু প্রোগ্রাম লেখার পর ইনপুট দিয়ে টেস্ট করে দেখবে যে কোডটি ঠিকমত কাজ করে কিনা। দুইটি পূর্ণ সংখ্যা ইনপুট নিয়ে তাদের যোগফল আউটপুট দেয় কিনা। আমরা যারা একটু হলেও প্রোগ্রামিং এর সাথে পরিচিত, তারা জানি এই ফাংশনটিতে যদি আমরা 2,2 দেই তাহলে আসবে 4, আবার যদি দশমিক সংখ্যা যেমনঃ 2.5 , 2.5 তখন প্রোগ্রামার মাত্রই জানে এই দুইটি সংখ্যার জন্য এই ফাংশনের আউটপুট আসবে 4, যেটা সঠিক না। White-Box টেস্টিং এ এভাবেই ছোট ছোট ভাগে টেস্ট করা হয়।
White-Box টেস্টিং-এর বেসিক তিনটি ধাপ হলোঃ

  • প্রিপারেশন স্টেজ বা প্রস্তুতি পর্বঃ প্রিপারেশন স্টেজ বা প্রস্তুতি পর্বে White-Box টেস্টিং এর সকল বেসিক ইনফরমেশনের গঠন বা নকশা প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। যেমনঃ কোডের ইনপুটের আলাদা আলাদা রিকোয়ারমেন্টস্‌, ফাংশনের বিবরণ বা functional specification, ডকুমেন্টের বিস্তারিত বর্ণনা, সঠিক সোর্স কোড ইত্যাদি।
  • প্রসেসিংঃ প্রসেসিং ধাপ মূলত টেস্ট কেস তৈরি করার ধাপ। এখানে টেস্ট কেস দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশনটি পরীক্ষা করা হয় এবং পরীক্ষার ফলাফল সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়।
  • আউটপুটঃ আউটপুট পর্যায়ে White-Box টেস্টিং-এর চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়, যেখানে প্রিপারেশন এবং প্রসেসিং স্টেজের সকল তথ্য এবং প্রাপ্ত ফলাফল সংরক্ষিত থাকে।

সুবিধাঃ

  • White box টেস্টিং-এ প্রোগ্রামের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো জানা থাকে, বিধায় এই টেস্টিং প্রসেস সফটওয়্যারের এরর এবং বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করতে বেশ কার্যকর।
  • যদি সফটওয়্যারে কোন প্রছন্ন এরর(Hidden Errors) থেকে থাকে, যেটা সরাসরি বুঝা যায় না, সেটি White-Box টেস্টিং -এর মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।
  • ভবিষ্যৎ-এ যদি সফটওয়্যারের সোর্স কোডে কোন ডেভেলপার কোন পরিবর্তন আনে, তাহলে এই টেস্টিং খুব সহজেই সেটা ধরে ফেলতে পারবে। (হুম, আলগা মাতব্বরি করার কোন সুযোগ নাই )।

অসুবিধাঃ

  • In-depth প্রোগ্রামিং জ্ঞানের দরকার হয় white-box টেস্টিং এর জন্য।
  • ইমপ্লিমেন্টেশন পরিবর্তনের সাথে সাথে টেস্ট কেসেরও পরিবর্তন হয়।

Black-Box টেস্টিংঃ

Black Box টেস্টিং টেকনিক
Black Box টেস্টিং টেকনিক

Black-Box টেস্টিং সফটওয়্যার টেস্টিং-এর আরেকটি method , যেখানে একটা অ্যাপ্লিকেশনকে পরীক্ষা করা হয় স্পেসিফিকেশনের উপর ভিত্তি করে। সম্পূর্ণ আলাদা একটি টিম এই টেস্টিং এর জন্য কাজ করে। ব্ল্যাক বক্স টেস্টিং -এ টেস্টারের সফটওয়্যারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন ধারণা থাকে না। এখানে শুধুমাত্র দেখা হয় সফটওয়্যারটি ইনপুট হিসেবে কী নিবে এবং সেই মোতাবেক কী আউটপুট দিবে। কিভাবে প্রোগ্রামের আউটপুট আসবে সেটা টেস্টারের মাথাব্যথার কোন বিষয় না। ব্ল্যাক বক্স টেস্টিং টেকনিক দিয়ে যেসব এরর আলাদা করা যায় সেগুলো হলোঃ

  • ফাংশনের ভুল শনাক্ত করা যায়
  • ইন্টারফেসের এরর শনাক্ত করা যায়
  • ডাটা স্ট্রাকচার এবং ডাটাবেস এক্সেসের কোন ভুল থাকলে সেটি শনাক্ত করা যায়
  • বিহেভিয়ারাল বা পারফর্মেন্সের কোন এরর থাকলে সেটি শনাক্ত করা যায়

যেমনঃ একটি ওয়েবসাইট যখন একজন টেস্টার টেস্ট করবেন, তিনি জানেন না ওয়েবসাইটটি কিভাবে কোড করে ডিজাইন করা হয়েছে অর্থাৎ এর ইন্টারনাল স্ট্রাকচার কেমন। ওয়েবসাইটি টেস্ট করার সময় তিনি একটি ব্রাউজারের সাহায্য নিবেন , বিভিন্ন ক্লিকস্‌ এবং কি-স্ট্রোকের সাহায্যে দেখবেন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাঙ্খিত আউটপুট দিচ্ছে কি না।

ব্ল্যাক বক্স টেস্টিং এর ধাপ হলো তিনটিঃ

  • ইকুইভ্যালেন্স পার্টিশনিং (Equivalence partitioning) এটি একটি সফটওয়্যারের টেস্ট ডিজাইন টেকনিক, যেখানে ইনপুটগুলোকে ভ্যালিড-আনভ্যালিড দুইটি পার্টিশনে ভাগ করা হয় এবং টেস্ট ডাটা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
  • বাউন্ডারি ভ্যালু এ্যানালাইসিস (Boundary Value Analysis) ইনপুট ভ্যালুর একটা বাউন্ডারি সেট করা থাকে। সফটওয়্যার টেস্ট করার সময় সেই বাউন্ডারির ভেতরের-বাইরের ইনপুটগুলো টেস্ট ডাটা হিসেবে দেয়া হয়।
  • কজ-এফেক্ট গ্রাফিং (Cause-Effect Graphing)  সফটওয়্যার টেস্টিং এ cause হিসেবে ধরা হয় ইনপুট কন্ডিশনকে এবং এর effect হিসেবে ধরা হয় আউটপুট কন্ডিশনকে। Cause-Effect graph-এর মাধ্যমে সঠিকভাবে টেস্ট ডাটা তৈরি করা হয়।

সুবিধাঃ

  • ইউজার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে সফটওয়্যারকে টেস্ট করা যায়, কারণ এর জন্য টেস্টারের প্রোগ্রামিং জ্ঞানের দরকার পরে না।
  • স্পেসিফিকেশনের উপর ভিত্তি করে সফটওয়্যার টেস্ট করা হয় বলে, স্পেসিফিকেশন জানার সাথে সাথে টেস্ট কেস তৈরি করা যায়।

অসুবিধাঃ

  • স্পেসিফিকেশনের উপর ভিত্তি করে টেস্ট করার কারণে, শুধুমাত্র ইনপুট এবং সংশ্লিষ্ট আউটপুটের উপর বেশি জোর দেয়া হয়। ফলে সফটওয়্যারের অনেক unimplemented অংশ টেস্টিং-এর আওতায় আনা সম্ভব হয় না।
  • স্পষ্ট স্পেসিফিকেশন ছাড়া, সঠিকভাবে টেস্ট কেস ডিজাইন করা যায় না।

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ২য় খণ্ড

আগামীকাল (শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৬) প্রকাশিত হতে যাচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং দ্বিতীয় খণ্ড। বইটি সম্পর্কে নানান জনের নানান জিজ্ঞাসার জবাবগুলো সব একসাথে রাখার জন্যই এই পোস্ট।

বইয়ের নামঃ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ২য় খণ্ড

প্রকাশকঃ দ্বিমিক প্রকাশনী

পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১৮০

মূল্যঃ (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) ২৫০ টাকা

বইতে কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করা হয়েছে? সি (C)

কোথায় পাওয়া যাবে? নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি (ফোনঃ 01820-157181)মানিক লাইব্রেরিতে (ফোনঃ 01735-742908)। ঈদের ছুটির পরে রকমারি ডট কম (rokomari.com) -এ পাওয়া যাবে। যারা ঢাকার বাইরে থাকে, তাদের জন্য রকমারি থেকে কিনলেই সুবিধা, কুরিয়ারে বই পৌঁছে দিবে। যারা দেশের বাইরে থাকে, তারা কিভাবে কিনবে আমি জানি না।

পিডিএফ ভার্শন আছে? নাই।

বইতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?

অধ্যায় ১ – কম্পিউটার মেমোরি (Computer Memory) 18
১.১ – বিট ও বাইট 19
১.২ – ভ্যারেয়িবলের অ্যাড্রেস বা ঠিকানা 21
১.৩ – বিভিন্ন প্রকারের মেমোরি 24
অধ্যায় ২ – পয়েন্টার 27
২.১ – নাল পয়েন্টার 35
২.২ – স্ট্রিং ও পয়েন্টার 37
২.৩ – পয়েন্টারের পয়েন্টার 39
অধ্যায় ৩ – ফাইল (File) 42
অধ্যায় ৪ – রিকার্শন (Recursion) 63
৪.১ – লোকাল ও গ্লোবাল ভ্যারিয়েবল 63
৪.২ – স্ট্যাটিক ভ্যারিয়েবল 65
৪.৩ – বিভিন্ন প্রকারের মেমোরি 67
৪.৪ – রিকার্শন 69
অধ্যায় ৫ – বিটওয়াইজ অপারেশন (Bitwise Operation) 85
অধ্যায় ৬ – স্ট্রাকচার (Structure) ও ইউনিয়ন (Union) 99
৬.১ – স্ট্রাকচার (Structure) 99
৬.২ – ইউনিয়ন (Union) 112
৬.৩ – স্ট্রাকচারের মেমোরি অ্যালাইনমেন্ট 114
অধ্যায় ৭ – আরও পয়েন্টার 119
৭.১ – পয়েন্টারের হিসাব-নিকাশ 126
৭.২ – ভয়েড পয়েন্টার (void pointer) 129
৭.৩ – ফাংশন পয়েন্টার 130
৭.৪ – qsort ও bsearch ফাংশন 133
অধ্যায় ৮ – মজার কিছু প্রোগ্রাম 137
৮.১ – সময় পরিমাপ 137
৮.২ – র‍্যানডম নম্বর (random number) তৈরি 138
৮.৩ – নিজে হেডার ফাইল তৈরি করা 140
অধ্যায় ৯ – বিবিধ 142
৯.১ – কনস্ট্যান্ট (constant) ও ম্যাক্রো (Macro) 142
কনস্ট্যান্ট (constant) 142
ম্যাক্রো 143
৯.২ – এনিউমারেশন (enumeration) 146
৯.৩ – কমান্ড লাইন আর্গুমেন্ট (Command Line Argument) 150
৯.৪ – প্রোগ্রাম কম্পাইল হওয়ার ধাপসমূহ 154
৯.৫ – #typedef ও #define নিয়ে কিছু কথা 156
৯.৬ – main() ফাংশন ও return 0 158
৯.৭ – lvalue এবং rvalue 160
অধ্যায় ১০ – প্রোগ্রাম ডিবাগিং 164
১০.১ – ডিবাগিং কী? 164
১০.২ – সাধারণ ডিবাগিং 164
১০.৩ – কোডব্লকসে ডিবাগিং 169

বইটি কাদের জন্য উপযোগি?

যেসব শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে আমার কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ১ম খণ্ড বইটি শেষ করেছে, এই বইটি মূলত তাদের জন্য। এছাড়া কেউ যদি ৫২টি প্রোগ্রামিং সমস্যা ও সমাধান বইটি পড়ে থাকে এবং সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করে থাকে, তাহলে তার জন্য বইটি পড়া সহজ হবে।

বইয়ের ভূমিকাঃ

আমার কম্পিউটার প্রোগ্রামিং (যেটি পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ১ম খণ্ড নামে প্রকাশ করা হয়) বইটি প্রকাশ হওয়ার পরে দেখতে দেখতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। এই সময়ে আরও বেশ কয়েকটি বই লিখলেও কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ২য় খণ্ড লেখার কাজ অনেক ধীরগতিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বইটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। আশা করি, ১ম খণ্ড পড়ার পরে এই বইটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের যেই প্রত্যাশা, সেটি পূরণে বইটি সক্ষম হবে।

আমি সবসময় মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের দিকে জোর দেই। কারণ কারও বেসিক খুব ভালো থাকলে সে বহুদূর যেতে পারবে। তাই এই বইতেও প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। ১ম খণ্ডের মতো, এই বইতেও প্রোগ্রামিং ভাষা হিসেবে সি ব্যবহার করেছি। এই বইটি পড়ার পরে শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক জ্ঞান যেমন বাড়বে, তেমনি সি প্রোগ্রামিং ভাষায় দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবেবাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামিংয়ের গড়পড়তা মান বৃদ্ধিতেও বইটি অবদান রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

বইটির জন্য অনেক ছেলেমেয়ে আমাকে তাড়া দিয়েছে, ইমেইল করে, ফেসবুকে পোস্ট করে। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। বইটি রিভিউ করেছেন শাহরিয়ার মঞ্জুর, শহীদুল ইসলাম (সুমন), মীর ওয়াসি আহমেদ ও তাহমিদ রাফি। তাদেরকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। তাহমিদ রাফি বইটির সম্পাদনা ও পেজ মেকাপের কাজটি করেছে। সেই সঙ্গে কিছু কিছু অংশে বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করেছে, আর ডিবাগিং অধ্যায়টিও তার লেখা। এজন্য সে বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য। আর বই লেখার সময়কালে আমার পুত্র আরাভের দেখাশোনার কাজটি পুরোপুরি নিজের কাঁধে নিয়ে আমার লেখার সময় বের করে দেওয়ার জন্য আমার স্ত্রী পারমিতাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

পাঠকের চোখে কোনো ভুলত্রুটি কিংবা অসঙ্গতি ধরা পড়লে আমাকে ইমেইল করার অনুরোধ রইল, পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করার চেষ্টা করব

তামিম শাহরিয়ার সুবিন,
 গ্র্যাব আর এন্ড ডি সেন্টার, সিঙ্গাপুর।
 আগষ্ট, ২০১৬।

https://fb.com/tamim.shahriar.subeen
https://twitter.com/subeen

আলফাগো বনাম লি সেডল – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষ

ডিপ ব্লু-এর পর এবার আলফাগো। আবারো কম্পিউটারের সঙ্গে খেলে মানুষের হার! ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে। গুগলের ডিপমাইন্ড ইউনিটের তৈরি “গো” খেলার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম “আলফাগো” পরপর তিনবার হারিয়ে দিলো ৩৩ বছর বয়সি পেশাদার কিংবদন্তী  “গো” খেলোয়ার লি সিডলকে। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চারটিতেই জিতেছে “আলফাগো”। পরপর তিনবার হারার পর চতুর্থ ম্যাচে এসে জয় পান লি সিডল। এই একটিমাত্র জয়কে তিনি “অমূল্য” হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রথম গেমটিতে হারার পর লি সাংবাদিকদের বলেনঃ “আমি খুবই অবাক হয়েছি। আমি হারবো এটা কখনো ভাবিনি। আলফাগো এত ভাল খেলবে এটা আশা করিনি।”

গো অথবা ষোলগুটি বা বাঘবন্দিঃ

“গো” নামক কয়েক হাজার বছরের পুরানো গেমের উদ্ভব হয় চীনে। খেলাটি অনেকটা আমাদের দেশের ষোলগুটি বা বাঘবন্দি খেলার মত। একটি নির্দিষ্ট বোর্ডে সাদা এবং কালো গুটি নিয়ে দুইপক্ষকে খেলতে হয়। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের গুটি আটকে বোর্ডের দখল নেয়া। যে বোর্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকা দখল করতে পারবে, সেই বিজয়ী। দাবা খেলার সাথে এই খেলার বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে অসংখ্য সম্ভাবনাময় চাল থাকে। কেবলমাত্র গাণিতিক হিসাব করে সম্ভাব্য চাল বের করা অসম্ভব।

“গো” খেলার জন্য গুগল ডিপমাইন্ড “আলফা-গো” কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে। এটির অ্যালগোরিদম মেশিন লার্নিং এবং ট্রি সার্চিং প্রযুক্তি সমন্বয়ে করা হয়েছে। এতে পলিসি এবং ভ্যালু নেটওয়ার্ক হিসেবে দুইটি নিউরাল নেটওয়ার্ক আছে। পলিসি নেটওয়ার্কটি সম্ভাব্য সেরা চালটি দ্রত হিসাব করতে পারে এবং ভ্যালু নেটওয়ার্কটি প্রতিটি চালের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় চালগুলো বাদ দিয়ে সম্ভাব্য চালের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে।মানুষের এই “অপ্রয়োজনীয়” চাল বাদ দেয়ার সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে অবশেষে ভাগ বসালো আলফাগো। আলফাগো-এর প্রাথমিক পর্যায়ে, একে বিভিন্ন এক্সপার্ট গেমারের ঐতিহাসিক গেমের চালগুলো মনে রাখতে বলা হয়েছিল, ৩০ মিলিয়ন চালের একটি ডাটাবেস থেকে। পরবর্তীতে একটি নির্ধারিত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের পর রি-ইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এর সাহায্যে আলফা-গো-এর সক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যে এটি নিজে নিজে খেলার দক্ষতা অর্জন করে।

আলফাগো বনাম লি সেডলঃ

আলফাগো বনাম লি সেডল-এর “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ ম্যাচ” সিওলে ৯ মার্চ-এ শুরু হয়ে ১৫ মার্চ শেষ হয়। প্রথম ম্যাচটিতে আলফাগো জয়লাভ করে যদিও পুরো ম্যাচের বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল লি-এর আধিপত্য। কিন্তু শেষ ২০ মিনিটে আলফাগো আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচ জিতে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খেলার প্রথমদিকে লি  আলফাগো-এর ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ বড়সড় একটি ভুল করে বসেন। সেই ভুলের উত্তরে আলফাগো-এর চালটি ছিল একেবারে নিখুঁত এবং কার্যকরী।

চতুর্থ ম্যাচ, যেটিতে লি জয়লাভ করে মানবজাতির মানসম্মান রক্ষা করে, সেখানেও ৭৮ নাম্বার চাল পর্যন্ত আলফাগো-এর জিতে যাওয়ার সম্ভবনা ছিল ৭০%। কিন্তু ৭৯ নাম্বার চালে ভুল করে ফেলার কারণে আলফাগো বঞ্চিত হয় লি সেডলকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ থেকে।

১৮টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী পেশাদার গো খেলোয়ার লি সেডল ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন যে শুরুর দিকে তিনি আলফাগো-এর খেলোয়াড়ি দক্ষতাকে অবজ্ঞা করেছিলেন। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস বলেন, এ পরাজয় মূল্যবান। কারণ, এ থেকে আমরাও আমাদের প্রোগ্রামের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারবো। “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ”-এর বিজেতা হিসেবে আলফাগো এক মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার জিতে নিয়েছে। ডিপমাইন্ড-এর বিবৃতি অনুযায়ি এই পুরষ্কারের অর্থ ইউনিসেফ, গো অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। ম্যাচ শেষে “সাউথ কোরিয়া গো অ্যাসোসিয়েশন” আলফাগো-কে “গো গ্র্যান্ডমাস্টার” পদবী প্রদান করে।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

সার্গেই ব্রিন

বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন “গুগল” এর নাম কে না জানে! “গুগল” ও সার্চ ইঞ্জিন আজ সমার্থক শব্দ। এই সার্চ ইঞ্জিন গুগলের অন্যতম কারিগর এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতার নাম সার্গেই ব্রিন। যাকে দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা “নবজাগরনের দূত (Enlightened Men)” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

googleio20111291_610x407

সার্গেই মিখাইলোভিচ্‌ ব্রিন ১৯৭৩ সালের ২১ আগস্ট রাশিয়ার মস্কো শহরে  ইহুদী দম্পতি মিখালি ব্রিন এবং ইউজেনিয়া ব্রিনের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। সার্গেই ব্রিনের বাবা মিখালি ব্রিন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক এবং মা ইউজেনিয়া ব্রিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসায় গবেষক হিসেবে কর্মরত।

সার্গেই ছোটবেলার কিছুসময় মস্কো শহরে বেড়ে উঠেন। রাশিয়া অর্থাৎ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ইহুদীদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়। ইহুদীদের উপর চলমান নির্যাতন এড়াতে ব্রিন পরিবার ১৯৭৯ সালে আমেরিকার মেরীল্যান্ডে চলে আসেন। যদিও আমেরিকায় আসার ব্যাপারে সার্গেই ব্রিনের মায়ের মত ছিলো না।

মেরিল্যান্ডের মন্টেসেরী স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষার সময় সার্গেই ছবি আঁকার শাখায় ভর্তি হন। স্কুলের পড়ার পাশাপাশি গণিতবিদ বাবার উৎসাহে তিনি বাসায় গণিত চর্চা চালিয়ে যান এবং পরিবারের অন্যান্যদের সহায়তায় নিজের মাতৃভাষা রাশিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার পর সার্গেই মেরিল্যান্ডের ইলেনর রুজভেল্ট হাই স্কুলে ভর্তি হন।

বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন
বাবার সাথে শিশু সার্গেই ব্রিন

হাই স্কুল পাশ করার পর ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সার্গেই ব্রিন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিত বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।

স্নাতক শেষ করার পর ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ নিয়ে  সার্গেই ব্রিন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৯৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সার্গেই এর সাথে পরিচয় হয় আরেক জিনিয়াস ল্যারি পেজ-এর। প্রথম প্রথম সার্গেই এবং ল্যারি দুজন কখনোই কোন বিষয়ে  একমত হতে পারতেন না, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেন। দুই বন্ধু মিলে পরবর্তীতে একটি পেপার লেখেন যার শিরোনাম ছিলঃ

“দ্যা এনাটমি অফ অ্যা লার্জ স্কেল হাইপার টেক্সচুয়্যাল ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন।”

এই পেপারটি আজও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তম একটি প্রকাশনা।

দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)
দুই বন্ধু ল্যারি পেজ(বামে) এবং সার্গেই ব্রিন (ডানে)

সার্গেই যখন স্ট্যানফোর্ডে পড়েছিলেন, তখনি ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ডাটা–মাইনিং এবং প্যাটার্ন–এক্সট্রাকসনের উপর তিনি একাধিক পেপার লিখে ফেলেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি সফটওয়ার তৈরী করেন যা টেক্স ফরম্যাটে লেখা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ওয়েব পেইজে রূপান্তর করতে পারে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের বিশাল লিংক ভান্ডার এবং কনটেন্ট নিয়ে পেজ এবং সার্গেই ব্রিন একটি গবেষণা প্রজেক্ট করেন যার নাম দেন ব্যাকরাব (BackRub)। তাঁরা দুইবন্ধু মিলে “পেজ র‍্যাঙ্ক” এ্যালগোরিদম উদ্ভাবন করেন এবং বুঝতে পারেন যে এই এ্যালগোরিদম ব্যবহার করে উচ্চতর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব।

সার্গেই ব্রিন বন্ধু ল্যারি পেজকে সাথে নিয়ে এর পর নেমে গেলেন স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা প্রকল্প হিসেবে সার্চ ইঞ্জিন তৈরির কাজে। ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগলো ল্যারি পেজের ডরমেটরী কক্ষটি। তাঁরা বিভিন্ন সস্তা কম্পিউটারের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ দিয়ে বিভিন্ন ডিভাইস তৈরি করা শুরু করেন। সেই ডিভাইসগুলো দিয়ে তাঁরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের সাথে তাঁদের সার্চ ইঞ্জিনের সংযোগ স্থাপন করেন।

যন্ত্রপাতি তৈরি করতে করতে একসময় ল্যারি পেজের ঘর যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি হয়ে গেল। তাই দুইবন্ধু পেজ এবং ব্রিন এবার চলে এলেন সার্গেই ব্রিনের ডরমেটরিতে। ব্রিনের ডরমেটরি পরিণত হয় তাঁদের অফিস এবং প্রোগ্রামিং সেন্টারে যেখানে তাঁরা তাঁদের সার্চ ইঞ্জিন ওয়েবে কেমন ফলাফল  দিচ্ছে সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিন স্ট্যানফোর্ডের ব্যবহারকারিদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

গাণিতিক ধারণা “গোগোল” এর নাম থেকে ব্রিন-পেজ তাঁদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিনের নাম দেন “গুগল”। ১৯৯৪ সালে তাঁদের এক বন্ধুর ব্যক্তিগত গ্যারেজে প্রতিষ্ঠিত হয় গুগলের সার্ভার। ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে “গুগল”-এর প্রাথমিক সংস্করণ সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হলেও নতুন একটি কোম্পানি শুরু করার মত অর্থ দুই বন্ধুর কাছে ছিলো না। ব্রিন এবং পেজ তখন নেমে গেলেন অর্থ যোগানের কাজে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ মিলিয়ন ডলার যোগার করে ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু মিলে তাঁদের কোম্পানি “গুগল ইনকর্পোরেট” শুরু করেন। গুগলের সার্চ রেজাল্ট ঐ সময়ের সার্চ ইঞ্জিনগুলোর চেয়ে ভাল অবস্থান করে ফেলে। সেই থেকে গুগল হয়ে উঠে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন যেটির গড় সার্চ রেট দিনপ্রতি এখন ৫.৯ বিলিয়ন।

গুগল ছাড়াও সার্গেই ব্রিন অন্যান্য কাজের সাথে যুক্ত থাকতে পছন্দ করেন। Google.org এর মাধ্যমে সার্গেই ব্রিন পৃথিবীর পরিবেশ এবং শক্তির রূপান্তর সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন গুগল গ্লাস এবং চালকবিহীন গুগল গাড়ি প্রকল্পের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

২০০৬ সালে সার্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজের গুগল কোম্পানি ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয়।

২০০৭ সালে সার্গেই ব্রিন বায়োটেক বিশেষজ্ঞ এবং উদ্যোক্তা অ্যান উজেকেকি-কে বিয়ে করেন। অ্যানের স্বাস্থ্য  সংক্রান্ত তথ্যের উপর বিশেষ আগ্রহ থাকায় তিনি এবং সার্গেই ব্রিন দুজনে মিলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এসব তথ্য ব্যবহার আরো সহজ করার জন্য কাজ করেন। “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট”-এ কাজ করা গবেষকদের মধ্যে ব্রিন এবং অ্যান এর নাম অন্যতম। জেনেটিক, কম্পিউটিং সমস্যা এবং ডাটাবেজে দুইজনের সমান আগ্রহ থাকায় এই দম্পতি “23AndMe” নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।

স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন
স্ত্রী অ্যান উজেকেকি-এর সাথে সার্গেই ব্রিন

অ্যান এবং ব্রিন দম্পতির সাত বছরের একটি ছেলে এবং চার বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে এই দম্পতি আলাদা বসবাস করছেন।

২০০৮ সালে সার্গেই মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন যেখানে তাঁর মা পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ব্রিন “23AndMe” এর সেবা গ্রহণ করে জানতে পারলেন পারকিনসন্স বংশগত কোন রোগ না হলেও তিনি এবং তাঁর মা ইউজেনিয়া LRRK2 জিনের একটি মিউটেশন বহন করছেন যেটার কারণে ভবিষ্যতে তাঁর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২০%-৮০% । দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকা তাঁদেরসম্পাদকীয়তে এ সম্পর্কে লিখেছিলঃ

“ব্রিন মনে করেন LRRK2 এর মিউটেশন হচ্ছে তাঁরব্যক্তিগত কোডের একটি বাগ এবং অন্যান্য কম্পিউটার প্রোগ্রামের বাগের মত একজন গুগল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি প্রতিদিনই এই বাগটি ঠিক করে যাচ্ছেন।”

সার্গেই ব্রিন যৌথভাবে ল্যারি পেজের সাথে দুইটি বোয়িং জেটের মালিক। বিমান দুটিতে পরীক্ষালব্ধ উপাত্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নাসা স্থাপন করে দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাটলসে বর্তমানে সার্গেই ব্রিন বসবাস করছেন। স্নাতকোত্তর পড়া শেষ হবার পর যদিও তিনি পিএইচডি করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু সেই পিএইচডি তাঁর শেষ করা হয়ে উঠেনি। ২০০৮ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে বিরতি গ্রহন করছেন। ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালে ফোর্বস্‌ সাময়িকী যৌথভাবে তাঁকে পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়াও সার্গেই ব্রিন এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ টিআর১০০ এর ঘোষণা অনুযায়ী ৩৫ বছরের কম বয়সী ১০০ জন আবিষ্কারকের তালিকায় আসেন। ২০১৪ সালে ব্যক্তিগত ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্পত্তির মালিক হিসেবে ফোর্বস্‌ সাময়িকি সার্গেই ব্রিনকে বিশ্বের ২০তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।