Live Before You Die – স্টিভ জবস্‌

২০০৫ সালের ১২ জুন। অ্যাপল ইনকর্পোরেটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস্‌ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেন তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা “How To Live Before you Die”। তাঁর এই বক্তৃতায় তিনি বলেন তাঁর জীবনের তিনটি গল্পের কথা। স্টিভ জবসের জবানিতেই আমরা আজকে এই লেখায় জানবো তাঁর সেই তিনটি গল্প।

পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমাদের সামনে আজ আসতে পেরে আমি আনন্দিত এবং সম্মানিত। আমি কলেজের গন্ডি পেরুতে পারিনি। সত্যি বলতে, আজকেই প্রথম আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েশনের সবচেয়ে কাছে আসতে পেরেছি। আজকে আমি তোমাদের আমার জীবনের ছোট্ট তিনটি গল্প বলবো।

প্রথম গল্পটির নাম আমি দিবো এক সূতোয় গাঁথা।

আমি রিড কলেজ থেকে প্রথম ৬ মাসের মাথায় ড্রপ আউট হই। কলেজ ড্রপ করার পরেও সেখানে আমি ১৮ মাসের মত ছিলাম। কিন্তু কেন আমি কলেজ থেকে ড্রপ আউট হয়েছিলাম? এই প্রক্রিয়াটি আসলে শুরু হয়েছিল আমার জন্মের আগে থেকে। আমার মা একজন অবিবাহিত কলেজ গ্রাজুয়েট হওয়ার কারণে সে সময় আমাকে দত্তক দেয়ার পরিকল্পনা করেন। আমার মা চেয়েছিলেন একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাকে কোন শিক্ষিত পরিবারের কাছে দত্তক দিতে। সেজন্য তিনি পছন্দ করেছিলেন একজন নিঃসন্তান উকিল দম্পতিকে। কিন্তু সেই উকিল দম্পতি আসলে একটি মেয়ে সন্তানের বাবা-মা হতে চেয়েছিলেন। তাই আমার জন্মের পর তারা আর আমাকে নিতে চাননি। আমাকে নেয়ার জন্য অপেক্ষমান তালিকায় আরো এক দম্পতি ছিলেন। তাঁরা মধ্যরাতে একদিন একটা ফোনকল পান। আমার বায়োলজিক্যাল বাবা মা তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের একটি ছেলে হয়েছে। তোমরা কী তাকে দত্তক নিতে আগ্রহী?” আমার সেই বাবা-মা সানন্দে আমাকে তাঁদের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন। যদিও আমার গর্ভধারিণী মা পরে যখন জানতে পেরেছিলেন আমাকে দত্তক নেয়া বাবা-মার দুজনের একজনও গ্রাজুয়েট নন। এমনকি তাঁরা স্কুল পাশও ছিলেন না, তখন তিনি চূড়ান্ত চুক্তিপত্রে সই দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কয়েকমাস পরে, যখন আমার দত্তক নেয়া বাবা-মা আমার মার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁরা আমাকে অবশ্যই লেখাপড়া শিখাবেন এবং একদিন আমি অবশ্যই কলেজে যাবো।

এর ঠিক ১৭ বছর পরে আমি কলেজে ভর্তি হই। আমি যে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সেটি ছিলো এই স্ট্যানফোর্ডের মতই ব্যয়বহুল। আমার ছাপোষা চাকুরিজীবি বাবা-মা তাঁদের সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে যাচ্ছিলেন আমার কলেজের পড়াশোনার পিছনে। ছয়মাস পর এসব আমার কাছে একদম নিরর্থক মনে হলো। আমি জীবনে কী করতে চাই সে সম্পর্কিত কোন ধারণা আমার ছিলো না এবং সেই ধারণা পেতে কলেজ আমাকে কতটুকু সাহায্য করতে পারবে সেটিও আমি বুঝতে পারছিলাম না। অর্থহীনভাবে আমি আমার বাবা-মায়ের সঞ্চয়ের টাকা শেষ করে যাচ্ছিলাম। তখন আমি কলেজ ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং সেটি ছিল সঠিক একটি সিদ্ধান্ত। যদিও সে সময় এটি ছিল বেশ ভয়ঙ্কর একটি সিদ্ধান্ত, কিন্তু আজকে আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি পিছনে তাকালে বুঝতে পারি আমার এই কলেজ ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল আমার জীবনের নেয়া শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। যে মূহুর্ত থেকে আমি কলেজ ড্রপ আউট হই, সে মূহুর্ত থেকে যেসব বিষয় পড়তে আমার ভাল লাগতো না সেগুলোর ক্লাস করা বন্ধ করে দেই এবং যেসব বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিলো সেসব বিষয়ের ক্লাস করা শুরু করি।

অবশ্য ব্যাপারটা খুব একটা রোমান্টিক ছিলো না। সেসময় আমার কোন থাকার জায়গা ছিলো না। আমি আমার বন্ধুর ডরমেটরির রুমের মেঝেতে ঘুমাতাম। কোকের খালি বোতল কুড়িয়ে দোকানে জমা দিয়ে ৫ সেন্ট করে জোগাড় করতাম এবং সেটি দিয়ে আমার খাবার খরচ চালাতাম। প্রতি রবিবার ৭ মাইল হেঁটে হরেকৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধুমাত্র একবেলা ভালো খাবারের আশায়। এসব আমি খুব পছন্দ করতাম। আমি তখন আমার যেসব কাজ করতে ভালো লাগতো সেটাই করতাম এবং আস্তে আস্তে আমার কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গৌণ হয়ে গেল।

ছোট্ট একটা উদাহরণ দেইঃ
রিড কলেজে সেসময় দেশের সবচেয়ে ভালো ক্যালিগ্রাফি কোর্স চালু ছিল। ক্যাম্পাসের সব পোষ্টার, ড্রয়ার, শিরোনামে খুব সুন্দর সুন্দর হাতে তৈরি ক্যালিগ্রাফি শোভা পেত। যেহেতু আমি সেসময় কলেজ ড্রপআউট ছিলাম, রেগুলার কোর্সগুলো করার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিভাবে ক্যালিগ্রাফি করা হয় এই আগ্রহ থেকে আমি ক্যালিগ্রাফির কোর্সগুলো করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি Serif এবং San Serif ফন্ট দুইটি শিখি, অক্ষরগুলোর মাঝে স্পেসের ব্যবহার কিভাবে অপূর্ব টাইপফেসের সৃষ্টি করতে পারে সেটা বুঝতে পারি। সেটি ছিল অপূর্ব, ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক একটি বিষয় যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং আমি এতে মুগ্ধতা খুঁজে পাই।

আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার এই শিক্ষাগুলো কখনোই আমার ব্যক্তিগত জীবনে কোন কাজে আসবে না। কিন্তু ১০ বছর পর যখন আমরা প্রথম ম্যাকিনটস কম্পিউটার ডিজাইন করি, তখন সব ফিরে এসেছিলো। আমরা সেগুলোকে ম্যাকে ব্যবহার করি। এটা ছিল সুন্দর টাইপোগ্রাফি সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিউটার। আমি যদি তখন কলেজ ড্রপআউট না করতাম তাহলে ম্যাকিনটস কখনো এত বৈচিত্র্যময় টাইপফেস বা যথাযথ স্পেস সম্বলিত টাইপ ফন্ট পেত না। তখন থেকে উইন্ডোজ-ও এটা কপি করে আসছে, অর্থাৎ কোন পারসোনাল কম্পিউটারেই এত সুন্দর টাইপফেস আমরা পেতাম না। আমি যদি সেসময় কলেজ ড্রপ না করতাম, ক্যালিগ্রাফির সেইসব কোর্স গুলো না করতাম , তাহলে হয়ত আজকে এত সুন্দর ফন্ট আমরা কম্পিউটারে পেতাম না। অবশ্যই সামনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার বিন্দুর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করা আজ থেকে ১০ বছর আগে যখন আমি কলেজে পড়তাম তখন অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেই বিন্দুগুলোকে সংযুক্ত করা আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অনেক সহজ।

সামনের দিকে তাকিয়ে কখনোই বিন্দু সংযোগ দেয়া সম্ভব না, কিন্তু পিছন থেকে কাজটা করা অনেক সহজ। তোমাকে বিশ্বাস রাখতে হবে নিজের উপর যে, ভবিষ্যতে অবশ্যই কোন না কোনভাবে বিন্দুগুলো সংযুক্ত করা যাবেই। হতে পারে সেটা তোমার কর্মফল, তোমার ভাগ্য, তোমার পরিশ্রম, তোমার ক্ষমতা। আমার নিজের উপর এই বিশ্বাস কখনোই আমাকে পিছিয়ে পরতে দেয়নি এবং আমার এই সিদ্ধান্তই পাল্টে দিয়েছে আমার পুরো জীবনকে।

আমার দ্বিতীয় গল্পটা হচ্ছে ভালবাসা এবং হারিয়ে ফেলার গল্পঃ

আমি ভাগ্যবান ছিলাম – যা করতে ভালবাসতাম সেটি অল্প বয়সেই করতে পেরেছিলাম। ওজ এবং আমি অ্যাপল শুরু করেছিলাম আমাদের ব্যক্তিগত গ্যারেজে মাত্র ২০ বছর বয়সে। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম বলেই, গ্যারেজের দুইজনের কোম্পানি থেকে মাত্র ১০ বছরে অ্যাপল ২ বিলিয়ন ডলারের, ৪০০০ কর্মীর কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন আমাদের সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কার ম্যাকিনটস তৈরি করলাম তখন আমার বয়স মাত্র ৩০। তখন আমাকে অ্যাপল থেকে ছাটাই করা হয়। প্রশ্ন হতে পারে, যে কোম্পানির শুরু আমি নিজে করেছি সেখান থেকে আমাকে কিভাবে ছাঁটাই করা যায় ? ধীরে ধীরে যখন অ্যাপল বড় হতে থাকলো, তখন আমি খুব মেধাবী একজনকে খুঁজতে থাকি যে কিনা আমার সাথে অ্যাপলকে আরো সমৃদ্ধ করবে। প্রথম একবছর আমাদের কাজ ভালই চলেছিল, কিন্তু যখন আমাদের লক্ষ্য আলাদা হয়ে গেল তখন আমরা ব্যর্থ হলাম। সেসময় অ্যাপলের বোর্ড অফ ডাইরেক্টরস্‌ আমার পক্ষ না নিয়ে তাঁর পক্ষ নিলো এবং ৩০ বছর বয়সে নিজ কোম্পানি থেকে আমাকে ছাঁটাই করা হলো। আমি আমার সারা জীবন যেখানে মনোনিবেশ করেছিলাম, সেটি এক মুহুর্তে চলে গেল; যা ছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী।

সামনের কয়েকমাস কী করে আমার কাটবে, আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়েছিল আমি আমার পূর্ববর্তী প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের পিছনে ফেলে দিয়েছিলাম, সেটা ঠিক কাজ হয়নি। আমি বব নয়েস এবং ডেভিট পাকার্ডের সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁদের কাছে ক্ষমা চাই। যদিও এটা ছিল বড় ধরণের একটা ভুল এবং আমি একসময় সিলিকন ভ্যালি থেকে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তাও করেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি আমার আমিতে ফিরে এলাম এবং আবার নিজের কাজকে ভালবাসতে শুরু করলাম। আমার প্রস্থানে অ্যাপলে তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। যদিও আমাকে বাতিল করা হয়েছিল অ্যাপল থেকে আমি, কিন্তু আমি তখনো আমার কাজকে ভালবাসতাম। তাই আমি আবারো নতুন করে সবকিছু শুরু করার সিদ্ধান্ত নেই।

তখন বুঝতে না পারলেও আমি পরে বুঝেছিলাম যে, অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হওয়া আমার জীবনে ঘটা সর্বোত্তম একটি ঘটনা ছিল। সাফল্যের চূড়া থেকে হঠাৎ করেই ছিটকে যাওয়া এবং আবারো নিজেকে একদম তলানিতে আবিষ্কার করেছিলাম আমি; যেখানে নিশ্চিত ছিল না কোন কিছুই। এই ঘটনাটি আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়টিতে পৌঁছে দেবার রাস্তাটাকে সহজ করে দিয়েছিলো।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি NeXT এবং Pixar নামক দুইটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করি এবং অসাধারণ একজন নারীর প্রেমে পরি , যিনি পরবর্তীতে আমার স্ত্রী হন। পিক্সার তখন বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার এ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম Toy Story তৈরি করে এবং এখন পর্যন্ত এটি বিশ্বের সবচেয়ে সফল এ্যানিমেশন স্টুডিও। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে, অ্যাপল তখন NeXT-কে কিনে নেয়। আমি আবার অ্যাপলে ফিরে আসি। টেকনোলজি, যা NeXT এ তৈরি করা হয়েছিলো, এটি বর্তমান অ্যাপল যুগের প্রাণ। এবং লরেন্স ও আমি তখন একটি সুন্দর পরিবার গঠন করেছিলাম।

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এসবের কিছুই হতো না যদি না আমাকে অ্যাপল থেকে বের করে দেয়া হতো। তিক্ত ওষুধ খাওয়ার অভিজ্ঞতা কোন রোগীর জন্য সুখকর না হলেও, রোগীর জন্য সেটি আবশ্যক। কখনো কখনো জীবন ইট দিয়ে তোমার মাথায় আঘাত করবে। বিশ্বাস হারানো যাবে না। আমি বিশ্বাস করতাম যে, একটি জিনিসই আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা হলো নিজের কাজকে ভালবাসা। কী করতে তুমি ভালবাসো, সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। এটা যেমন তোমার কাজের জন্য সত্য, তেমনি সত্য তোমার ভালবাসার মানুষের জন্যও। তোমার কর্ম তোমার জীবনের বিরাট একটি অংশকে পূর্ণ করবে, তাই পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির জন্য তুমি যে কাজকে শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করো, সেটিকেই বেঁছে নাও। এবং শ্রেষ্ঠ কাজ করার সর্বোত্তম উপায় হলো নিজের বর্তমান কাজকে ভালবাসা। যদি তুমি এখনো সেটি খুঁজে না পাও, খুঁজতে থাকো। কখনো বসে পরো না। একসময় না একসময় তুমি ঠিকই তাকে খুঁজে পাবে। যেকোন সুন্দর সম্পর্কের মত যতদিন যাবে সেটি সুন্দর থেকে সুন্দরতর হতে থাকবে। তাই খুঁজে যাও তোমার তোমার ভালবাসার কাজটিকে, যতক্ষণ না পাও। হাল ছেড়ো না।

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।
যখন আমার বয়স ১৭, তখন আমি একটি বাণী শুনেছিলাম এমন যে, “তুমি যদি তোমার জীবনের প্রতিদিনকে তোমার জীবনের শেষ দিন মনে করে কাজ করো, তাহলে একদিন তুমি অবশ্যই সফল হবে।” এই কথাটি আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিলো যে, গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, “যদি আমি জানি যে আজকে আমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে কী আমি সেই কাজ করবো যা আমি আজকে করতে চাচ্ছি?” পরপর কয়েকদিন যদি উত্তর পেতাম “না”, তখন আমি মনে করতাম কিছু পরিবর্তন করা আবশ্যক।

আমি খুব তাড়াতাড়ি মারা যাবো, এই কথাটি ছিল আমার জীবনে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল চালিকাশক্তি। কারণ, বলতে গেলে প্রায় সব কিছুই – সব ধরণের চাওয়া-পাওয়া, অহম, ভয়-ভীতি, লজ্জা, ব্যর্থতা সব কিছুই মৃত্যুর কাছে তুচ্ছ; সব কিছুই মূল্যহীন শুধুমাত্র যা সত্যিকার অর্থেই যা দরকার সেটা ছাড়া। যখন তুমি মনে করবে তুমি মরে যাচ্ছো, তখন তোমার কাছে মনে হবে না, তোমার হারাবার কিছু আছে। যখন তুমি নিঃস্ব, তখন নিজের মনের কথা শোনা ছাড়া আর কোন উপায়ই তোমার নেই।

একবছর আগে, আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। সকাল ৭ঃ৩০ এ স্ক্যান করে আমার অগ্ন্যাশয়ে একটি টিউমারের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। তখন আমি জানতাম অগ্ন্যাশয় কী জিনিস। আমার চিকিৎসক আমাকে বললেন, এই ক্যান্সারটি অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি এবং আমার আয়ু বড় জোড় ৩-৬ মাসের মত। আমার ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন বাড়ি চলে যেতে এবং মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। প্রস্তুতি বলতে ছিলো নিজের সন্তানদের কয়েক মাসের মধ্যে সবকিছু বলা যা আমি গত ১০ বছরে তাঁদের বলতে পারিনি। এটা ছিলো মূলত নিজের পরিবারকে বুঝানো যে, সময় সন্নিকটে যেন সবকিছু গ্রহণ করা তাঁদের জন্য সহজ হয়। ব্যাপারটা আসলে ছিলো পরিবারকে চিরবিদায় জানানো।

ঐদিন সারাদিনই আমার নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। সন্ধ্যায় আমার একটি বায়োপসি করানো হয়। আমার অগ্ন্যাশয়ের টিউমার থেকে কিছু কোষ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। আমি সেসময় অচেতন ছিলাম। জ্ঞান ফেরার পরে আমার স্ত্রীর কাছ থেকে আমি জানতে পারি যে, যখন আমার টিউমারের কোষগুলো মাইক্রোস্কোপের নিচে ধরা হয়, তখন হঠাৎ করে ডাক্তার কাঁদতে শুরু করে। কারণ, ক্যান্সারটি ততদিনে অপারেশনের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য একটি বিরল ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। আমার অপারেশন করার ফলে এখন আমি সুস্থ।

সেসময় খুব কাছ থেকে আমি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। মৃত্যুর কাছাকাছি যেয়ে আমি বুঝতে পেরেছি এটা নিখাদ এবং একটি আধ্যত্নিক ভাবনা। কোন মানুষই মরতে চায় না। এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায়, তারাও মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্রহণ করে স্বর্গে যেতে চায় না। তারপরেও, এটি এমন একটি ঠিকানা, যেখানে আমরা সবাই একদিন পৌঁছে যাবো। কেউ সেখান থেকে পালাতে পারবে না। মৃত্যু জীবনের সুন্দরতম আবিষ্কারগুলোর একটি। পুরোনোকে মুছে ফেলে এটা নতুনদের জন্য পথকে পরিষ্কার করে। বর্তমানে নতুন হচ্ছো তোমরা, কিন্তু ধীরে ধীরে তোমরা বুড়ো এবং পুরোনো হতে থাকবে এবং একসময় মুছে যাবে। দার্শনিক মন্তব্য দেয়ার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটাই নিয়তি।

তোমার সময় সীমিত, সেসময়কে অন্যের জীবনের মত যাপন করে নষ্ট করো না। মানুষের চিন্তার ফলাফলের ফাঁদে নিজেকে আটকে রেখো না। অন্যের মতামতের চিৎকারে নিজের ভেতরকার আওয়াজকে থমকে যেতে দিও না। এবং অবশ্যই সাহস রাখো নিজের মনের কথা এবং অনুমানশক্তির উপর। কারণ, তারা সত্যিকার অর্থেই জানে তুমি কী হতে চাও। বাকিসব কিছুই সেখানে গৌণ।

আমার যুবক বয়সে একটি বই বেশ সাড়া ফেলেছিল। বইটির নাম দ্যা হোল আর্থ ক্যাটালগ (The Whole Earth Catalog), যাকে আমরা সেসময়ের তরুণ সমাজ বাইবেল জ্ঞান করতাম। স্টুয়ার্ড ব্রান্ড তাঁর কাব্যিক ছোয়ায় এটিকে মানুষের কাছে নিয়ে এসেছিল। এটা ১৯৬০ সালের ঘটনা, যখন পারসোনাল কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ আবিষ্কার হয়নি। তাই এই বইটিতে ছিল টাইপরাইটার, কাঁচি, পোলারয়েড ক্যামেরার ছোঁয়া। এটাকে বলা যায় “গ্রন্থাকৃতির গুগল”।

স্টুয়ার্ট এবং তাঁর দল বইটিতে নানা ধরণের বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন। বইটির শেষে তারা বলে গেছেন আসল কথা। এটা ৭০’ দশকের মাঝামাঝি সময়, তখন আমি তোমাদের বয়সী। তাঁদের বইয়ের শেষ পাতায় সকালের রাস্তার একটি সুন্দর আলোকচিত্র ছিল। তোমাদের মধ্যে যারা অভিযানপ্রিয় তারা এমন ছবি প্রায়ই দেখে থাকো। ছবির নিচে লেখা ছিল, “Stay Hungry. Stay Foolish.” এটা ছিল তাঁদের বিদায় সম্ভাষণ। Stay Hungry. Stay Foolish, যা আমি নিজে সবসময় নিজের জন্য কামনা করি। আজকে এখানে সবাই তোমরা প্রাজুয়েট হয়েছো। আজ আমি তোমাদের জন্যও বলছি, Stay Hungry. Stay Foolish

সবাইকে ধন্যবাদ।

[ Stay Hungry: কখনো তৃপ্ত হয়ো না এই ভেবে যে , তুমি সব জেনে গেছো। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাও।
Stay Foolish: কাজ করে যাও এবং চেষ্টা করতে থাকো সেসব কাজ করার যেসব ব্যাপারে মানুষ বলে “কখনো এটা হবে না” ]

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি


Facebook Comments

Leave a Reply