পাইথন – ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

প্রোগ্রামিং সম্পর্কে সামান্য ধারণা আছে, অথচ পাইথনের নাম শোনেনি এমন মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল প্রোগ্রামিং ভাষা হচ্ছে পাইথন। বাচ্চাদের প্রোগ্রামিং শেখা থেকে শুরু করে ব্যাকএন্ড ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জটিল তথ্য বিশ্লেষণ (Complex Data Analysis), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ইত্যাদিসহ আরো অনেক জায়গায় রয়েছে পাইথনের একচ্ছত্র আধিপত্য।

গিডো ফন রোসাম (Guido van Rossum) একটি ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম নিয়ে কাজ করতেন সিডাব্লিউআই-তে (Centrum Wiskunde & Informatica – CWI)। সেখানে তিনি সি ও ইউনিক্স শেল ব্যবহার করতেন। এগুলোর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে হতাশ ছিলেন তিনি। সি ভাষায় মেমোরি ব্যবস্থাপনার বিশাল ঝামেলা, প্রতি নতুন প্রজেক্টে কিছু নির্দিষ্ট কাজ বারবার করতে হতো, প্রয়োজনীয় লাইব্রেরির অভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। ইউনিক্স শেল সাধারণ কাজ-কর্মের জন্য চমৎকার হলেও জটিল লজিক্যাল সমস্যা নিয়ে কাজ করার উপযুক্ত ছিল না।

তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে নিজেই একটি প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি করবেন, যা হবে সহজে ব্যবহারযোগ্য, পাঠযোগ্য ও শক্তিশালী। সিডাব্লিউআই-তে তিনি তিন বছর একটি দলের সঙ্গে কাজ করেছিলেন যারা এবিসি (ABC) নামের একটি ইন্টারপ্রেটেড ভাষা তৈরি করেছে। সেই সুবাদে তিনি ইন্টারপ্রেটার তৈরির মৌলিক বিষয়াদি শিখেছিলেন। মৌলিক বিষয়াদি জানা থাকায় তিনি সরাসরি ভাষা তৈরি করা শুরু করে দেন। এবিসি তৈরি হতে মোটামুটি তিন বছর সময় লাগলেও রোসাম মাত্র তিন মাসে পাইথনের একটা কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফেলেন। এই তিন মাস তিনি পাইথনের পেছনে পূর্ণ সময় দিতে পারেননি। সিডাব্লিউআই-তে কাজের পাশাপাশি তিনি পাইথন প্রজেক্টে কাজ করেছেন। alt.sources নামের একটি নিউজগ্রুপে ১৯৯১ সালে তিনি প্রথম পাইথন উন্মুক্ত করেন।

পাইথনের ঐ সংস্করণে আধুনিক পাইথনের অনেক কিছুই ছিল। পরিপূর্ণ ইন্টারপ্রেটার, ডিকশনারি, টাপল, ইনডেন্টেশন সবই ছিল। অত্যাবশ্যক ইনডেন্টেশনের নিয়মটি পাইথনে যোগ করা হয়েছিল যাতে সোর্স কোড গোছানো থাকে, এর পাঠযোগ্যতা (readability) বাড়ে। অনেকেই বিষয়টির প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকে পছন্দ করেননি। ধীরে ধীরে পাইথন ব্যবহারকারী বাড়তে থাকে, রোসামও উৎসাহ পেতে থাকেন।

রোসাম বিশ্বাস করেন যে, পাইথনের সফলতার পেছনে ডেভেলপারদের সেই মানসিকতাই কাজ করেছে, যে কারণে তিনি পাইথন তৈরি করেছিলেন। ডেভেলপাররা একটি উচ্চস্তরের স্ক্রিপ্টিং ভাষা চাচ্ছিল যা ইউনিক্স শেলের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে পারে। মেমোরি ব্যবস্থাপনার জটিলতা ও একই কাজের জন্য বারবার কোড লেখার ঝামেলা এড়াতে ডেভেলপাররা সি ব্যবহার করতে চাইত না। তারা পার্ল (Perl) ও টিসিএল (বা টিকল – Tcl) ভাষা দুটি ব্যবহার করত।

পার্ল ও টিসিএল দুটি ভাষাই বেশ চমৎকার ছিল। কিন্তু রোসাম যে প্রজেক্টে কাজ করতেন সেখানে এ দুটি ভাষা ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। রোসাম তাই পাইথন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ছোটখাটো কাজের জন্য পার্ল চমৎকার। কিন্তু পার্লের বড় প্রজেক্ট রক্ষণাবেক্ষণ বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। অন্যদিকে পাইথনের সিনট্যাক্স অত্যন্ত পরিষ্কার, বেশ গোছানো। তার ওপর ইনডেন্টেশন অত্যাবশ্যক হওয়ায় কোডের পাঠযোগ্যতাও অনেক বেশি। ডেভেলপাররা তাই পার্লের পাশাপাশি, এবং একসময় সম্পূর্ণভাবে পাইথন ব্যবহার শুরু করে।

পাইথনের ব্যাপক বিস্তৃতির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, এতে অল্প কোড লিখে অধিক কাজ করা যায়। সি++ বা সি-র তুলনায় অনেক কম কোড লিখে সমপরিমাণ কাজ করা যায়। পাইথনে বড় বড় প্রজেক্টও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় সহজে। ডেভেলপাররা স্বল্প সময়ে বড় প্রজেক্ট করতে তাই পাইথনকে বেছে নেওয়া শুরু করলেন।

পাইথন স্ট্রাকচার্ড, অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড, ফাংশনাল, প্রসিজুরাল ইত্যাদি প্রায় সব ধরনের প্রোগ্রামিং প্যারাডাইম সমর্থন করে। নিজে নিজেই ডেটা টাইপ অনুমান করে নিতে পারে। পাইথন ইন্টারপ্রেটার আছে, এমন যেকোনো মেশিনে চলতে পারে, কোডে কোনো পরিবর্তন করার দরকার হয় না। পাইথনের সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, এর একটি বিশাল স্ট্যান্ডার্ড লাইব্রেরি রয়েছে। তৃতীয়পক্ষের লাইব্রেরিও অসংখ্য, যেগুলো অতি সহজেই যেকোনো প্রজেক্টে ব্যবহার করা যায়।

Tk, PyQt, PyGTK ইত্যাদি দিয়ে ডেস্কটপ অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট বেশ ভালোই চলছে। Kivy দিয়ে কিছু কাজ হলেও মোবাইল অ্যাপের বিশাল বাজারে পাইথনের দখল প্রায় নেই বললেই চলে। এটি পাইথনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে পাইথনের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ওয়েব প্রোগ্রামিং। তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ হওয়ায় শিশুদের প্রোগ্রামিংয়ের সাথে পরিচয় করাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাইথন ব্যবহার করা হয়। দৈনন্দিন বিভিন্ন বিরক্তিকর কাজ, যেগুলো বারবার করতে হয়, সেগুলো অটোমেট করতে পাইথন ব্যবহার করা হচ্ছে।

গুগল, ফেসবুক, নাসা, আইবিএম, ডিজনির মতো বড় বড় কোম্পানি পাইথন ব্যবহার করে। ড্রপবক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ইত্যাদি বিশাল বিশাল ওয়েবসাইটে পাইথন ব্যবহার করা হয়েছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, বিজ্ঞান ও গণিত-সংক্রান্ত গবেষণায় পাইথনের ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। গণিত, পরিসংখ্যান ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিগণ সাধারণত প্রোগ্রামিংয়ে এত বেশি সময় দিতে পারেন না। পাইথন খুব সহজ হওয়ায় তারা দ্রুত পাইথন শিখে তাদের কাজে লাগাতে পারেন। তাই যারা কম্পিউটার বিজ্ঞান বা তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেন না, তাদের বেশিরভাগ প্রোগ্রামিং ভাষা হিসেবে পাইথনকে পছন্দ করেন।

বর্তমানে পাইথনের ব্যবহার এত ব্যাপক যে, হঠাৎ এর হারিয়ে যাওয়ার বা নতুন কোনো ভাষা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা অন্তত নিকট ভবিষ্যতে নেই। তাই যাদের ইচ্ছা আছে, তারা নির্দ্বিধায় পাইথন দিয়ে কাজ করা শুরু করতে পারেন। পাইথনের ভবিষ্যত নিয়ে আপাতত চিন্তা করতে হবে না।

বাংলা ভাষায় পাইথন শেখার জন্য ইন্টারনেটে বেশ কিছু রিসোর্স রয়েছে – 

লেখক – মোশারফ হোসেন।

Facebook Comments

Leave a Reply