অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (২)

অনুপম শ্যাম -এর ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় (ও শেষ) অংশ।

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করতে হবে।

দ্বিতীয় পর্ব :

anupom

সুবিন : ডিজনীর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানীতে কাজ করেছেন, সেখানের অভিজ্ঞতা কেমন? আর স্টার্টআপে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
অনুপম : ডিজনী তে আমি গেমিং ডিভিশন এ কাজ করতাম। ডিজনী বড় কোম্পানি তাই সব কিছুই বড়, অনেক স্তর বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান । আমার ডিজনী তে সর্বশেষ প্রজেক্ট “Star Wars Commander” গেম এ একশ এর কাছাকাছি লোক কাজ করেছে। এভারনোটে মনে হয় প্রায় সব মিলিয়ে ৩৫০ জন কর্মী। আমি ডিজনীর সিইও কে কখনই সামনা সামনি দেখিনি। এভারনোটে আমি প্রায় প্রতিদিন ই সিইও কে দেখি, এমন কি মাঝে মাঝে সে আমাদের জন্য চা কফি ও বানায়।

সুবিন : বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপ তৈরি হচ্ছে, অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চাচ্ছে, যদিও হতে চাওয়া লোকদের তুলনায় হতে পারার লোক বেশ কম। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ কালচার কি ঢাকার তরুণদের প্রভাবিত করছে?
অনুপম : আমার মনে হয় না ব্যাপারটা খারাপ। হয়ত কাজ করার মত ভালো কোম্পানি কম, তাই সবাই নিজেরাই কোম্পানি খুলছে। আবার এখন বাংলাদেশে সবার কাছে ইন্টারনেট, সফটওয়্যার এর মাধ্যমে অনেক সমসার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে, তাই এখনই খুব ভালো সময় স্টার্টআপ এর জন্য। সমস্যা হচ্ছে স্টার্টআপ এর জন্য যে স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম এর প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো নেই। শুরুটা একটু এবড়ো-থেবড়ো হবেই, যেরকম হচ্ছে। যারা এর মধ্যেও যারা চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। দুই-একটা প্রাথমিক সাফল্য আসলে আমার মনে হয় আস্তে আস্তে ইকো সিস্টেমও হয়ে যাবে।
একটা বিষয় হচ্ছে যেটা আমার মনে হয় খুব একটা ভালো ফল নিয়ে আসবে না, তা হচ্ছে ফ্রীলান্সিং কে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্রীলান্সিং তো বড় মাত্রায় ইন্ডাস্ট্রি করার ব্যাপার না, এতে বরং হিতে বিপরীত হবে । বরং সরকারের উচিত হবে আই টি পার্ক, স্টার্টআপ ইকো সিস্টেম, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর এই গুলার জন্য কাজ করা।

সুবিন : আপনি তো বই লিখেছেন। বইটের নাম এবং বই লেখার অভিজ্ঞতা যদি পাঠকদের সাথে শেয়ার করতেন। ভবিষ্যতে আরো বই লেখার ইচ্ছা আছে?
অনুপম : বই এর নাম CakePHP Application Development, প্রকাশ হয় Packt Publication, UK থেকে ২০০৭ এ। বই লেখাটা যে এত কষ্টকর হবে তা জানলে হয়ত বই লেখা শুরু করতাম না। কিন্তু একবার যেহেতু বেল তলায় গেছি, ইচ্ছা আছে আরেকবার যাবার, তবে কম্পিউটার সম্পর্কিত বই নাও হতে পারে।

সুবিন : যেই ছেলেটি বা মেয়েটি সবে মাত্র কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে (বা কাছাকাছি কোনো বিষয়ে) ভর্তি হল, সে আপনার কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে আপনি কী বলবেন?
অনুপম : কম্পিউটার বিজ্ঞান অনেক বড় বিষয়, তার মধ্যে কিছু জিনিস আমাদের ভালো লাগবে, আর কিছু খুব বেশি ভালো লাগবে না। কিন্তু কোনো একটা বিষয়ে ভালো দখল রাখতে হলে গভীরতা এবং চত্তড়াই (Depth এন্ড Breadth) দুটোই দরকার। যে গুলো ভালো লাগবে ওগুলো তে পুরো গভীরে যাও, যা খুব একটা ভালো লাগবে না তাও ভালো করে জেনে রাখো, এক সময় দেখবে ওটাও কাজে লাগবে। সবগুলো বিষয়ই কিন্তু আসলে একই সুতোয় গাঁথা, এটা প্রথম দিকে খুব একটা স্পষ্ট নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই আসলে ভাবতে শুরু করা উচিত তুমি পাস করে কি করতে চাও, এটা জানা থাকলে নিজেকে তার জন্য তৈরি করাটা অনেক সহজ হবে। এই প্রশ্নের উত্তর বের করা টাও কিন্তু বেশ কঠিন, তার জন্য আসলে সবার আগে জানতে হবে তোমার সামনে কি কি করার মতো বিকল্প আছে। তুমি পাশ করে বাইরে এসে মাস্টার্স করতে পারো, তারপর চাইলে একাডেমিয়া তে রিসার্চ করতে পারো, দেশের কোন ভালো সফটওয়্যার কোম্পানিতেও চাকরি করতে পারো, আবার নিজেই কোন সফটওয়্যার ফার্ম দিতে পারো। অনেকে চাকরি নিয়ে সরাসরি বাইরের গুগল, মাইক্রোসফট এর মতো বড় বড় কোম্পানি তে চলে আসছে, সফটওয়্যারে চাকরির বাজার এখন পুরোই আন্তর্জাতিক, চাইলে সেটাও করতে পারো। এরকম আরও অনেক কিছুই করার মতো আছে। এটা ঠিক করে নিলে তুমি কোনটাকে প্রাধান্য দিবে সেটা বের করা সহজ হয়ে যায়।
আমি যখন পড়েছি তখন কিন্তু এতো কিছু বুঝিনি, পরে ঠেকে শিখেছি। Generalized পরামর্শ দেয়া টা আসলে কঠিন। এই পরামর্শ গুলো আমি তখনকার আমাকে ভেবেই দিলাম, হয়তো এখনকার কারো কাজে লাগবে।

সুবিন : ছোটবেলায় কোন কোন স্কুল ও কলেজে পড়েছেন?
অনুপম : ব্লু বার্ড হাই স্কুল সিলেট (প্রাইমারি), সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (এস.এস.সি. পর্যন্ত) তারপর এম.সি. কলেজ সিলেট ।

সুবিন : ভার্সিটিতে লেখাপড়া কেমন লাগত?
অনুপম : ভার্সিটিতে প্রথম দুই/তিন সেমিস্টার এর পর লেখাপড়া খুব একটা করা হয় নি । তৃতীয় সেমিস্টার থেকে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করা শুরু করি, তারপর থেকে পড়ালেখা পুরোটাই নিম্নগামি। পড়ালেখার বেপারে আরেকটু সিরিয়াস হলে মনে হয় ভালো হত।

সুবিন : প্রোগ্রামিং হচ্ছে করার জিনিস, মানে একটা স্কিল। যেটা শিখে করতে হয়। কিন্তু আমরা তো স্কুল-কলেজে আসলে তেমন কিছু শিখি না, বই মুখস্থ করা ছাড়া। এ বিষয়ে আপনার কী মন্তব্য?
অনুপম : বই মুখস্থ করে জিপিএ ফাইভ আর গোল্ডেন এ পাওয়া যায় কিন্তু আসলে দীর্ঘমেয়াদে এতে নিজেদের কোনো লাভ হচ্ছে না। পাঠক্রমের বাইরের বিষয়াদি তে ছেলেমেয়েদের উত্সাহী করলে হয়ত আমরা বড় ছবিটা ছোট থেকেই দেখতে শেখবো । স্কুল-কলেজের সমান্তরালে যে ম্যাথ/ফিজিক্স অলিম্পিয়াড হচ্ছে, সেগুলো খুব ভালো উদ্যোগ। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মত প্রতিষ্ঠান ও এই ক্ষেত্রে খুব ভালো ভুমিকা রাখছে। আমাদের এই ভালো জিনিস গুলো আরো ছড়িয়ে দিতে হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটাই তরুণ। এদের একটা ক্ষুদ্র অংশকেও যদি আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আকৃষ্ট করতে পারি, আমরা অনেকদূর এগিয়ে যাব। সেটা কিভাবে সম্ভব?

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

অনুপম : আমার মনে হয় আমাদের সহজ পথ না খুঁজে লং টার্ম প্ল্যান করতে হবে। আরো বেশি বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে হবে। শুধু quantity বৃদ্ধি করে আসলে খুব একটা লাভ হবে না, আমাদের high quality resource তৈরী করতে হবে large scale এ। এর জন্য মনে হয় ভালো বিশ্ব মানের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের বিকল্প নেই। তিন – চার মাসের ট্রেনিং দিয়ে সেটা করা সম্ভব না। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা এমনিতেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উত্সাহী , আমেরিকার মত না। ঠিক মত প্লাটফর্ম পেলে আমরা অনেক দূর যাব।