স্টিভ জবস্‌ (শেষ পর্ব )

(১ম পর্বে পড়তে হলে এখানে ক্লিক করুন)

আধ্যত্মিক জ্ঞান অর্জন শেষে আবারও সিলিকন ভ্যালির ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ভাগাড়ে ফিরে এলেন জবস। বন্ধু উজের সঙ্গে কম্পিউটার বোর্ড বানানোর কাজ শুরু করলেন। আশপাশের অনেকে সার্কিট বোর্ডটি বেশ পছন্দ করল। এরপর আর্কেড ভিডিও গেম ব্রেকআউটের জন্য সার্কিট বোর্ড তৈরির কাছে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। প্রত্যেক চিপের জন্য $১০০ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় অ্যাটারি। সার্কিট বোর্ড ডিজাইনে জবসের একটু বিশেষ জ্ঞান ছিল এবং তিনি ওজনিয়াকের সাথে সমানভাবে ফি ভাগ করে নেওয়ার চুক্তি করেন কিন্তু ওজনিয়াকের সাথে একটা শর্ত ছিল। আর তা হলো চিপের সংখ্যা কমাতে হবে। অ্যাটারি ইঞ্জিনিয়ারদের বিস্মিত করে ওজনিয়াক চিপের সংখ্যা ৫০-এ নামিয়ে আনেন। ডিজাইন এতটাই দূর্ভেদ্য ছিল যে অ্যাসেম্বলি লাইন নকল করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অ্যাটারি প্রস্তাবিত $৫,০০০ এর পরিবর্তে তাদেরকে মাত্র $৭০০ দিয়েছিল। এতে ওজনিয়াকের অংশ দাড়ায় $৩৫০। অবশ্য, ওজনিয়াক ১০ বছর পর আসল বোনাসের পরিমাণ জানতে পারেন। তবে তিনি বলেন যে যদি জবস তাকে এ সম্পর্কে জানাত এবং তার টাকাগুলোর প্রযোজনীয়তা সম্পর্কে বলত তাহলে তিনি তা তাকে দিয়ে দিতেন।

টেলিফোন নেটওয়ার্ককে নিপূনভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় টোন উত্‍পন্ন করতে,  দুই বন্ধু মিলে প্রথমে যে জিনিসটি তৈরি করেন সেটা হলো—একটা ব্লু বক্স। এই ব্লু বক্সটির সাহায্যে টেলিফোনকে বোকা বানিয়ে বিনামূল্য পৃথিবীর যে কোনো স্থানে কথা বলা যেত। এটা যদিও আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু মানুষ এটা পছন্দ করেছিল। এটা করে তারা ৬ হাজার ডলারের মতো যোগাড় করেছিল।

blue-box
স্টিভ জবস্‌ এবং ওজনিয়াকের প্রথম আবিষ্কার ব্লু বক্স

১৯৯৪ সালে একটি সাক্ষাত্‍কারে, জবস বলেন যে ব্লু বক্স কিভাবে তৈরি করতে হয় তা বুঝে উঠতে তাদের ছয় মাস সময় লেগেছিল। তিনি বলেন যে যদি ব্লু বক্সগুলো তৈরি না হত, তাহলে হয়ত অ্যাপলও থাকত না।

১৯৭৬ সালে, জবস এবং ওজনিয়াক নিজেদের ব্যবসা শুরু করেন। তারা তাদের কোম্পানির নাম দেন “অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানি”। প্রথম দিকে সার্কিট বোর্ড বিক্রয়ের মাধ্যমে তারা এই কোম্পানি চালু করেন।

অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক বেশি পরিচিত হলেও শুরুর দিকে কোম্পানিটির তিনজন প্রতিষ্ঠাতা ছিল। বাকি একজন হচ্ছেন রোনাল্ড ওয়েন, যিনি অ্যাপলের প্রথম লোগোটি এঁকেছিলেন। কিন্তু ঋণের দায়ে ওয়েন তার ১০% শেয়ার মাত্র ৮০০ ডলারে বিক্রি করে দেন, যার বর্তমান মূল্য ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি!

logo1
রোনাল্ড ওয়েনের ডিজাইন করা প্রথম অ্যাপল লোগো

১৯৭৬ সালে ওজনিয়াক একক প্রচেষ্টায় অ্যাপল-১ কম্পিউটার উদ্ভাবন করেন। ওজনিয়াক কম্পিউটারটি জবসকে দেখালে, জবস তা বিক্রয় করার পরামর্শ দেন। তখন তারা এটিকে বিক্রয়ের জন্য রোনাল্ড ওয়েনকে সাথে নিয়ে জবসের গ্যারেজে অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বছরই ৬৬৬.৬৬ ডলারে অ্যাপল ১ কম্পিউটার বিক্রি শুরু হয়। এই দামের পেছনে একটা কারণ আছে। ধারণা করা হয়, স্টিভ এবং ওজনিয়াক সংখ্যা পুনরাবৃত্তি করতে পছন্দ করতেন, কেননা ৫০০ বা ৬৬৭ থেকে ৬৬৬.৬৬ টাইপ করা সহজ! ওয়েন অল্প কিছু দিন ছিলেন। অতঃপর তিনি জবস এবং ওজনিয়াককে ছেড়ে চলে যান। তিনি ছিলেন অ্যাপলের প্রাথমিক সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

Apple1
অ্যাপল ১ কম্পিউটার

ওয়েন চলে যাওয়ার পরও জবসের উৎসাহে উজ কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ তৈরি ও অ্যাসম্বলিংয়ে মন দিলেন। ১৯৭৭ সালের কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাপল-১ এর চেয়ে উন্নতমানের একটা কম্পিউটার তৈরি করে ফেলেন। নাম দেওয়া হয় ‘অ্যাপল-২’। দুই বন্ধু আঁচ করতে পারলেন, অ্যাপল-২ বাজারের যেকোনো কম্পিউটারের চেয়ে গুণে-মানে সেরা হবে। হলোও তা-ই। কিন্তু ব্যবসা করতে হলে মূলধন লাগবে। আর তাই তারা ইন্টেলের তত্‍কালীন সাবেক পণ্য বিপণন ব্যবস্থাপক মাইক মার্ককুলা এর কাছে যান অর্থ প্রাপ্তির আশায়। মাইক মার্ককুলা তাদের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব  বুঝতে দেরি করেননি। এই দুই হীরার টুকরা বন্ধুকে ঠিকই চিনলেন প্রসেসর নির্মাতা ইন্টেল করপোরেশনের সাবেক এই কর্মকর্তা। প্রতিভাবান বন্ধুদ্বয়কে আড়াই লাখ ডলার পুঁজি দিলেন। এর ফলে ১৯৭৭ সালের ৫ জুন প্লাস্টিক কেসে রঙিন মনিটর সমৃদ্ধ অ্যাপল টু বাজারে আসে। দেখতে দেখতে দুই বছরের মাথায় ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেল। বিশ্বজুড়ে তখন পার্সোনাল কম্পিউটার কেনার হিড়িক। সেই জোয়ারে ১ নম্বর কাতারে সবার পছন্দের তালিকায় উঠে এল অ্যাপল-২। ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরের দিকে স্টিভ জবসের সম্পদের পরিমাণ ২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেল। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫।

অ্যাপল ২ কম্পিউটার

১৯৭৮ সালে, অ্যাপল মাইক স্কটকে প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়। ১৯৮৩ সালে, জবস পেপসি-কোলার জন স্কালীকে অ্যাপলের প্রধান নিবাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের জন্য প্রলুব্ধ করেন। জবস তাকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি তোমার জীবনের বাকিটা সময় চিনির পানীয় বিক্রয় করে কাটাতে চাও, নাকি আমার সাথে এসে বিশ্বকে বদলে দিতে চাও?”

ইন্টেলের কর্মকর্তারা জবস্‌-কে বলেন যে- “অ্যাপল কোথাও যাবে না। তুমি একটা মস্ত বড় ভুল করছো”। কম্পিউটার জগতের অন্যান্যদের সঙ্গে জবসের পার্থক্য তার শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত নিশ্চুপ থাকা। কাজের মাধ্যমেই অন্যের জবাব দেয়া। নিশ্চুপ জবসের মাথায় সব সময় নতুন নতুন প্রযুক্তি খেলা করত। আর তাই জবস পিএআরসি, জেরক্সের রিসার্চ সেন্টারে এমন কিছু বানানোর চেষ্টা করছিলো যা পরে মাউস নামে পরিচিত হয়। স্টিভের মাথায় আর্থিক লাভের কথা ছিল না। তার মাথায় ছিল “ সবার জন্য কম্পিউটার”।

জবস একজন প্ররোচনামূলক এবং সহজাত দক্ষতা সম্পন্ন পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও, সে সময়ের তার কিছু কর্মচারী তাকে মেজাজী হিসেবে দেখতেন। বাজারে সুবিধা করতে না পারায় জবসের সাথে স্কালীর কাজের সম্পর্কে অবনতি ঘটে, যা তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। জবস মধ্যরাতেও সভা চালিয়ে যান, লম্বা ফ্যাক্স পাঠান এবং সকাল ৭টায় নতুন সভা আহবান করেন।

স্কালী জানতে পারেন যে জবস পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের দ্বারা একটি অভ্যত্থান সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং মে ২৪, ১৯৮৪ তারিখে, সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি পরিচালনা পরিষধদের সভা আহবান করেন। অ্যাপলের পরিচালনা পরিষদ স্কালীর পক্ষ নেয় এবং জবসকে ম্যাকিন্টশ বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ফেলা দেওয়া হয়। জবস ধীরে ধীরে কাজে আসা বন্ধ করে দেন। মহাকাশচারী হিসেবে স্পেস শাটলে ওড়ার ব্যর্থ প্রয়াস এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে একটি নতুন কম্পিউটার কোম্পানি চালু করার কথা বিবেচনা করে, তিনি অ্যাপল থেকে পদত্যাগ করেন।

২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন যে অ্যাপল থেকে বহিষ্কারের ঐ ঘটনাটি ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। তিনি বলেন, “সফল হওয়ার ভার, নতুন করে শুরু করার আলোয় কেটে গিয়েছিল, সবকিছু সম্পর্কে কম নিশ্চিত ছিলাম। এটি আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল অংশে প্রবেশ করতে সহায়তা করে।” তিনি আরও বলেন, “আমি মোটামুটি নিশ্চিত এর কিছুই ঘটত না যদি না আমাকে অ্যাপল থেকে বহিষ্কার করা হত। এটি ছিল ভয়াবহ ওষুধের মত, তবে আমি মনে করি রোগীর এটি প্রয়োজন ছিল।”

অ্যাপল থেকে পদত্যাগের পর ১৯৮৫ সালে ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে জবস প্রতিষ্ঠা করেন নেক্সট ইনকর্পোরেটেড (NeXt Inc.)।এক বছর পর তার অর্থ সংকট দেখা দেয়, তার কোন পন্যও ছিলনা, ফলে তাকে বিনিয়োগকারীদের সরণাপন্ন হতে হয়। তিনি বিলিয়নিয়ার রস পেরটের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, যিনি কোম্পানিতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করেন। নেক্সট ওয়ার্কস্টেশন অবমুক্ত হয় ১৯৯০ সালে, এর মূল্য ছিল ৯,৯৯৯ মার্কিন ডলার।  শিক্ষাখাতের জন্য ডিজাইন করা হলেও, অধিক মূল্যের কারণে এটি বাজারে সুবিধা করতে পারেনি।

১৯৯৬ সালে, অ্যাপল নেক্সটকে ৪২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ক্রয়ের ঘোষণা দেয়। ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে লেনদেন চূড়ান্ত হয়। এর মাধ্যমে অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জবসের কোম্পানিটিতে প্রত্যাগমন ঘটে। ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে, অ্যাপলের তত্‍কালীন প্রধান নির্বাহী গিল আমেলিওকে উচ্ছেদ করা হলে জবস কার্যত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। সেপ্টেম্বরে তিনি অন্তবর্তীকালীন প্রধান নির্বাহীর পদ পেয়ে যান।১৯৯৮ সালের মার্চে, অ্যাপলকে পুনরায় লাভজনক কোম্পানিতে পরিণত করা প্রচেষ্টা হিসেবে জবস নিউটন, সাইবারডগ এবং ওপেনডকের মত কিছু প্রকল্প বন্ধ করে দেন। জবস ম্যাকিন্টস ক্লোনের লাইসেন্সকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনেন, তিনি এটিকে প্রস্তুতকারকদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল করে দেন।

জবস অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বছরে মাত্র ১ মার্কিন ডলার বেতন গ্রহন করতেন। জবস ঠাট্টস্বরূপ বলেন যে অ্যাপল থেকে তিনি বছরে যে ১ মার্কিন ডলার পান, তার ৫০ সেন্ট পান বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য এবং বাঁকি ৫০ সেন্ট পান নিজের কাজের জন্য।

স্টিভ জবসের গাড়িতে কখনোই নম্বর থাকত না। কারণ, ক্যালিফোর্নিয়ার ট্র্যাফিক আইন অনুযায়ী সেখানে একটি নতুন গাড়ি নম্বর প্লেট ছাড়া ছয় মাস চালানো যায়। আর জবস কখনোই একটি গাড়ি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করেননি!

স্টিভ জবস্‌ ১৯৯১ সালে লরেন পাওয়েলকে বিয়ে করেন। লরেন এবং তাঁর রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। এছাড়াও এক বান্ধবীর ঘরে আছে জবসের তরুণ বয়সের আরেকটি মেয়ে।

নেক্সটে কাজ করার সময় জবস্‌ বলেছিলেন, “আমি যখন বেঁচে থাকব না, তখন আমার সৃজনশীল কাজের জন্য সবাই বাহবা দেবে। কিন্তু কেউ জানবে না যে আমিও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাতে পারি।”

২০০৩ সালে জটিল প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের চিকিৎসা করান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী স্টিভ জবস এবং ওই সময় তাঁর অস্ত্রোপচারও করা হয়। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই আবার টিউমার হয় এবং ২০০৯ সালে তাঁর যকৃত প্রতিস্থাপন করতে হয়।

প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম দিকপাল ও এক সময়কার অ্যাপল সিইও স্টিভ জবস্‌ অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে শেষ শব্দটি ছিল “ওহ ওয়াও”। সাংবাদিক ব্রেন্ট স্লেনডার ও রিক টেটজেলি ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশ করেন স্টিভ জবস্‌ এর বায়োগ্রাফি “বিকামিং স্টিভ জবস্‌”।

 লেখক : তামান্না নিশাত রিনি

স্টিভ জবস্‌ (পর্ব ১)

তথ্য-প্রযুক্তির আজকের এই যুগে অ্যাপল কম্পিউটার, আইফোন, আইপ্যাড, অ্যাইপড  এই শব্দগুলোর সাথে আমরা সবাই পরিচিত। এইসব যুগান্তকারী জিনিসের উদ্ভাবক কলেজের গণ্ডি পেরুতে না পারা একজন। নাম তাঁর স্টিভেন পল জবস্‌, যিনি স্টিভ জবস্‌ নামে সুপরিচিত। তাঁর রয়েছে একক এবং যৌথভাবে ৩৪২টি পণ্যের পেটেন্ট! কিংবদন্তী এই উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবককে পারসোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়।

স্টিভেন পল জবস ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম জোন স্কিবল ও পিতা সিরিয়ান ইমিগ্র্যান্ট আবদুল ফাত্তাহ জান্দালি। অবিবাহিত এবং স্টুডেন্ট বাবা-মার সন্তান স্টিভ জবস্‌-কে জন্মের পরপরই দত্তক দিয়ে দেয়া হয় পল ও ক্লারা জবস দম্পতির কাছে। পরবর্তিতে দত্তক পিতা-মাতার দেয়া “স্টিভ জবস্‌” নাম নিয়ে তিনি হন জগৎবিখ্যাত।

cr
স্টিভ জবসের ছোটবেলার ছবি

তিনি বেড়ে উঠেছেন এমন এক জায়গায়, যেটি পরবর্তী সময়ে বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির তীর্থস্থান হয়ে ওঠে। জায়গাটি সিলিকন ভ্যালি। একটা সময় ক্যালিফোর্নিয়ার ওই স্থানটি ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ভাগাড় ছিল। অনেক প্রকৌশলী তাঁদের গ্যারেজ গড়ে তুলেছিলেন সেখানে। হয়ত তাঁদের দেখেই স্টিভ জবস্‌ স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজেও তাঁদের মত একজন হয়ে উঠার।

১৯৬৯ সালের দিকে স্টিফেন ওজনিয়াক নামের এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় জবসের। ইলেকট্রনিকসের প্রতি দুজনের গভীর আগ্রহ থাকায় বয়সে তাঁর চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ওজের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে জবসের।

wozniak-and-jobs
ওজনিয়াক এবং স্টিভ জবস্‌

স্টিভ জবস কুপারটিনো জুনিয়র হাই স্কুল এবং হোমস্টিড হাই স্কুলে পড়ার পর ১৯৭২ থ্রিস্টাব্দে তিনি হাই স্কুল শেষ করেন এবং রীড কলেজ়ে ভর্তি হন। কিন্তু রীড লিবারেল আর্টসের ওপর বেশ ব্যয়বহুল একটি কলেজ ছিল। অসচ্ছ্বল পল-ক্লারা দম্পতির পক্ষে সেই ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর ছিল। জবসের জন্মদাত্রী মাকে তাঁরা কথা দিয়েছিলেন, ছেলেটাকে ভালো কোথাও পড়াবেন। সেই কথা রক্ষা করতে রিড কলেজেই ভর্তি করালেন জবসকে। কিন্তু এক সেমিস্টারের বেশি আর এগোতে পারেননি জবস। ঝরে পড়েন। যদিও তিনি পরবর্তীতে কলেজ ছেড়ে দেন তার পরেও তিনি  ক্যালিগ্রাফীসহ আরো কিছু ক্লাসে যোগদান করেছিলেন।এই সম্পর্কে তার বক্তব্য ছিল “যদি আমি ওই কোর্সে না যেতাম তবে ম্যাকের কখনোই বিভিন্ন টাইপফেস বা সামঞ্জস্যপূর্ণ ফন্টগুলো থাকতো না।” ক্যালিগ্রাফিতে উৎসাহ থাকার জন্য তিনি তার বন্ধুদের সাথে থেকে সে ক্লাসগুলো করেন । এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কোন রুম ছিল না, বন্ধুদের রুমের ফ্লোরে আমি ঘুমাতাম। মানুষের ব্যবহৃত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে রোজগার করতাম, যেটা দিয়ে আমি খাবার কিনতাম। প্রতি রোববার রাতে আমি সাত মাইল হেঁটে হরেকৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধু একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য।’

১৯৭৪ সালে জবস ক্যালির্ফোনিয়াতে পুনরায় চলে আসেন। এ সময় তিনি নিয়মিত স্টিফেন ওজনিয়াকের সাথে হোমব্রিউ কম্পিউটার ক্লাবের সভাগুলোতে উপস্থিত থাকতেন এবং ভিডিও গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আটারিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি এসময় মূলত ভারতে যাবার জন্য অর্থ জমানোর চেষ্টা করছিলেন। আর তাই আলোকিত জীবন গড়তে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন স্টিভ জবস। চলে এসেছিলেন ভারতে। সেখানে নিম কারোলি বাবার সাথে সাক্ষাত্‍ করার জন্য জবস তার কৈঞ্চি আশ্রমে যান রিড কলেজের বন্ধু ড্যানিয়েল কোটকেকে সাথে নিয়ে। কিন্তু তা প্রায় জনশূন্য অবস্থায় ছিল, কারণ নিম কারোলি বাবা ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান। এরপর তারা চলে যান হরিয়াখান বাবার আশ্রমে।

78507.122173-Steve-Jobs-e-Daniel-Kottke
স্টিভ জবস্‌ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড্যানিয়েল কোটকে

ভারতে তারা কয়েকবার বাস ভ্রমণ করেন। দিল্লি থেকে উত্তর প্রদেশ, সেখান থেকে ফিরে হিমাচল প্রদেশ এরপর পুনরায় দিল্লি ফিরে আসেন।সাত মাস অবস্থানের পর জবস ভারত ত্যাগ করেন। ভারত থেকে ফেরার পর জবসের নতুন আবির্ভাব ঘটে। তার মস্তক মুন্ডিত ছিল এবং তিনি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। এছাড়া তিনি বৌদ্ধধর্মের অনুসারি হয়ে ওঠেন। তিনি রপ্ত করেছিলেন ভিন্ন ধারার জীবনযাপন। রীতিমতো উপবাস করতেন। ফলমূল খেয়ে কাটিয়ে দিতেন দিনের পর দিন।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি

২য় ও শেষ পর্ব