রং অ্যানসার

যারা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানের ওয়েবসাইটে কেবল চর্চা করা শুরু করেছ, তাদের জন্য সবচেয়ে সাধারণ ব্যাপার হচ্ছে এই রং অ্যানসার (Wrong Answer)। “স্যাম্পল ইনপুট-আউটপুটের সাথে তো আমার মিলে, তাহলে অনলাইন জাজ কেন রং অ্যানসার দিচ্ছে”?

58306615নমুনা ইনপুট-আউটপুট (Sample Input-Output) মিললেই হবে না। ধরা যাক, কোনো একটা প্রাইম নাম্বার বের করার প্রোগ্রামে নমুনা ইনপুট দেওয়া আছে 3, 5, 7 যার জন্য আউটপুট হচ্ছে প্রাইম। এখন এটা দেখে কেউ যদি এমন প্রোগ্রাম লেখে যে বিজোড় সংখ্যা মাত্রই প্রাইম, তাহলে তো হবে না, তাই না? তাই নিজে নিজে টেস্ট কেইস তৈরি করে আগে নিজে বের করতে হবে যে আউটপুট কী হবে। তারপরে প্রোগ্রামের আউটপুটের সাথে মিলিয়ে দেখবে।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে আউটপুট ফরম্যাটিং। প্রতিটা টেস্ট কেইসের শেষে নিউলাইন (“\n”) দিতে হবে, যেটা আসল বলে দেওয়া থাকে না। আর দেখতে হবে নমুনা আউটপুটের সাথে যেন হুবুহু মিলে। ছোটহাত-বড়হাতের অক্ষর (Uppercase / lowerse) এবং স্পেস ক্যারেক্টার ঠিকমতো মিলতে হবে। যেমন প্রবলেমের আউটপুটে যদি Case লিখতে বলে আর তুমি case লিখ, তাহলে হবে না। আবার Case 1: লিখতে বললে তুমি যদি Case 1 : লিখ (: এর আগে একটি স্পেস), তাহলেও রং অ্যানসার।

কর্ণার কেস টেস্ট করতে হবে। ধরা যাক তোমাকে বলা হল, a ^ n -এর মান বের করতে। এখন তুমি চট করে প্রোগ্রাম লিখে ফেললে যেটা খুব সহজেই কাজটি করে দেয়। স্যাম্পল আউটপুট তো মিলেই, তুমি নিজেও যেসব ইনপুট-আউটপুট তৈরি করে টেস্ট করলে, সেগুলোও মিলে যায়। কিন্তু এখানে n-এর মান 0 হলে কী হবে? আর ঋণাত্মক হলেই বা কী হবে? এগুলোও কিন্তু তোমার প্রোগ্রামে ঠিকঠাক আউটপুট দিতে হবে।

আরেকটি কারণ হচ্ছে সমস্যার বর্ণনা ঠিকমতো বুঝতে না পারা। আমরা অনেক সময় একবার বা দুবার পড়ে ঠিকঠাক বুঝতে পারি না। তাই রং অ্যানসার হলে সমস্যার বর্ণনা আবার মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। অনেক সময় দেখবে তখন তুমি উপলব্ধি করবে যে প্রোগ্রাম লেখার সময় তুমি সমস্যাটি ঠিকঠাক বুঝতে পারো নি।

অনেক সময় ফ্লোটিং পয়েন্ট নাম্বার নিয়ে ক্যালকুলেশনের সময় ঝামেলা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ফ্লোটিং পয়েন্ট ক্যালকুলেশনের কারণে তুমি রং অ্যানসার পেতে পার। তাই এই কাজটি ঠিকঠাক করতে হবে। নিচে একটি উদাহরণ দিচ্ছি (পাইথন কোড) :

>>> 2.1 – 1.9
0.20000000000000018

তাই ফ্লোটিং পয়েন্ট নিয়ে কাজ করার সময় সাবধান।

আরেকটা কারণ হচ্ছে ভুল অ্যালগরিদমের ব্যবহার। এটাও আসলে সমস্যার বর্ণনা ঠিকভাবে বুঝতে না পারার ফলেই ঘটে থাকে।
এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হচ্ছে রং অ্যানসার খেলে সেটা যে তোমারই ভুল, এটা স্বীকার করে নেওয়া (মাঝে-মধ্যে জাজেরও ভুল হতে পারে, তবে সেটা খুবই কম ঘটে)। নিজে আরো চিন্তাভাবনা করা, না পারলে বন্ধুদের সাথে সেটা নিয়ে আলাপ করা। তাতেও কাজ না হলে অনলাইন ফোরাম ঘেঁটে দেখা যে আগে কেউ এরকম সমস্যায় পরেছে কী না এবং সেটা কিভাবে সমাধান হয়েছে।

প্রোগ্রামিং কনটেস্ট

কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রোগ্রামিং, যা সফটওয়্যার নির্মাণ কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বিষয়টি অন্যান্য লেখাপড়ার মতো নয় যে বই পড়লাম, কিছু প্রশ্নের উত্তর শিখে ফেললাম, পরীক্ষা দিয়ে সব ভুলে গেলাম। প্রোগ্রামিং হচ্ছে একটি দক্ষতা (skill)। ব্যাপারটিকে সংগীতের সাথে তুলনা করা যায়। প্রোগ্রামিং চর্চার মাধ্যমেই ভালো প্রোগ্রামার হওয়া যায়, প্রোগ্রামিংয়ে উৎকর্ষ সাধন করা যায়।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং চর্চাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় আয়োজনের নাম হচ্ছে ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতার নাম আইসিপিসি (ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্ট)। আইসিপিসি’র মূল আয়োজক হচ্ছে এসিএম (ACM: এসোসিয়েশন অব কম্পিউটার মেশিনারিজ), তাই একসাথে একে এসিএম আইসিপিসি বলা হয়ে থাকে।

এসিএম আইসিপিসি মূলত দুইটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা (রিজিওনাল কনটেস্ট) ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ (ওয়ার্ল্ড ফাইনালস)। অনেক জায়গায় আবার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার আগে অনলাইনে একটি বাছাই প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। এসব প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বা একাধিক দল অংশ নিতে পারে। আর হ্যাঁ, প্রতিযোগিদের কিন্তু কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিভাগের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৯৮ সাল থেকে নিয়মিত এসিএম আইসিপিসি’র চূড়ান্ত পর্ব অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড ফাইনালসে অংশ নিয়ে আসছে। এবছরও রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালসে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে সাস্ট (শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ও বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে একটি করে দল। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ একবারই সেরা ২০টি দলের মধ্যে ঢুকতে পেরেছিল। ১৯৯৯ সালে বুয়েটের একটি দল সেটি সম্ভব করেছিল বিশ্বের বড় বড় অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে ১১তম স্থান অর্জন করে। অনেকদিন ধরে অংশ নিয়ে আসলেও বাংলাদেশে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা এখনও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে নি, সেটি প্রোগ্রামিং সম্পর্কে না জানার কারণেই হোক, কিংবা কষ্ট করে নতুন কিছু শেখার প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনীহার কারণেই। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় আসলে কী হয়? এসিএম আইসিপিসি বা এই ধরনের প্রতিযোগিতায় তিনজন প্রোগ্রামার মিলে একটি দল হিসেবে অংশগ্রহন করে। প্রতিটি দলকে দেওয়া হয় একটি কম্পিউটার, এক সেট প্রোগ্রামিং সমস্যা (৯ থেকে ১২ টি) এবং সেগুলো সমাধানের জন্য ৫ ঘণ্টা সময়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেই দল সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সমস্যার সমাধান করতে পারে, সেই দল বিজয়ী হয়। সমান সংখ্যক সমস্যার সমাধান করলে যারা কম সময়ে করেছে এবং পেনাল্টি কম (সমাধান ভুল হলে ২০ মিনিট পেনাল্টি হয়), তারা rank-list-এ ওপরে থাকে। সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি সমস্যা এমন দেওয়া হয় যেন সেটি সব দলই সমাধান করতে পারে, আরেকটি থাকে এমন যাতে কোনো দলই সমাধান করতে না পারে।

প্রোগ্রামিং সমস্যাগুলো তৈরি করেন কারা? যারা ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকেই কয়েকজন প্রোগ্রামিং সমস্যাগুলো তৈরি করেন এবং প্রতিযোগিতার বিচারক হন। আর আমাদের শাহ্‍‍রিয়ার মঞ্জুর তো এসিএম আইসিপিসি’র চূড়ান্ত পর্বের বিচারক, তাও গত ১২ বছর ধরে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। প্রোগ্রামিং সমস্যা তৈরি হওয়ার পরে যিনি সমস্যাটি তৈরি করেন, তিনি সেটির সমাধান করার জন্য প্রোগ্রাম লেখেন এবং ডাটা সেট তৈরি করেন, যেগুলো দিয়ে সমাধান পরীক্ষা করা হবে। তারপর জাজ প্যানেলের আরেকজন সেই সমস্যাটির একট বিকল্প সমাধান তৈরি করেন এবং সেটি জাজ ডাটা সেট দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক মতো হলেই সমস্যাটি প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করা হয়। এগুলো সবই করা প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে। প্রতিযোগিতার সময় কেউ যখন কোনো সমস্যা সমাধান করে জমা দেয়, তখন জাজ ডাটা দিয়ে সেটি পরীক্ষা করা হয়। প্রোগ্রামটি যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রান করে সঠিক আউটপুট দেয়, তবেই সেটি সমাধান হয়েছে বলে গ্রহন করা হয় এবং সাথে সাথে সেই দলকে সেটি জানিয়ে দেওয়া হয়। আবার সমাধান সঠিক না হলেও সেটি জানিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা আবার চেষ্টা করতে পারে। এসব কাজ করা হয় একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে।

প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কী জানা লাগবে? প্রথমেই একটি প্রোগ্রামিং ভাষায় উপর ভালো দখল প্রয়োজন। সি (C) বা সি প্লাস প্লাস (C++) এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো। কারণ এ দুটি ভাষা মোটামুটি সব ধরণের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হয়। অনেকক্ষেত্রে জাভাও ব্যবহার করা যায়, তবে কিছু কিছু সমস্যার সমাধান জাভা দিলে লেখা হলে সেগুলো রান করতে বেশি সময় লাগে। সি এর চেয়ে সি প্লাস প্লাস ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ এই জন্য যে সেখানে এসটিএল (STL : স্ট্যান্ডার্ড টেমপ্লেট লাইব্রেরি) বলে খুব কার্যকরী লাইব্রেরি আছে, যেটির ব্যবহার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সময় বাঁচিয়ে দেয়। তবে সি এবং সি প্লাস প্লাস-এর মধ্যে মিল অনেক বেশি এবং সি দিয়ে প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করলে সি প্লাস প্লাস শিখতে খুব একটা সময় লাগবে না। প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় যারা অংশগ্রহন করতে ইচ্ছুক, তাদের কথা মাথায় রেখে অনলাইনে একটি প্রোগ্রামিং কোর্স তৈরি করা হয়েছে, সেটিতে অংশ নেওয়ার জন্য যেতে হবে এখানে : http://dimikcomputing.com/course/introduction-to-programming-online-course/ , কোর্সটি সবার জন্য বিনামূল্যে দেওয়া আছে এবং নিজের সুবিধামতো সময়ে সেটি করা যাবে। তারপর কোর্সটি করা শেষ হলে কিংবা প্রোগ্রামিং ভাষা মোটামুটি শেখা হলে প্রবলেম সলভ করা শুরু করতে হবে। শুরুটা করার জন্য এখানে কিছু প্রোগ্রামিং সমস্যা আছে যেগুলোর বর্ণনা বাংলাতে লেখা : http://goo.gl/wsJPQV

প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ভালো করতে হলে দুটি জিনিস পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হয়, প্রবলেম সলভিং ও লেখাপড়া। প্রবলেম সলভ করার জন্য ভালো কিছু ওয়েবসাইট হচ্ছে :

CodeForces (http://codeforces.com/)
TopCoder (http://www.topcoder.com/)
CodeChef (https://www.codechef.com/)
SPOJ (http://www.spoj.com/)
LightOJ (http://lightoj.com)

এসব ওয়েবসাইটে প্রবলেম সলভিংয়ের চর্চা তো করা যায়ই, সেই সাথে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া যায়। অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে সব লেখাপড়া শেষ করে তারপরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু করবে, সেটি ঠিক নয়। দুটি কাজই একসাথে চালিয়ে যেতে হবে।

বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবলেম সলভ করার সময় অনেকে একই রকম অনেক প্রবলেম সলভ করে। সেটি না করে বিভিন্ন রকম প্রবলেম সলভ করার পেছনে সময় দেওয়াটাই শ্রেয়। অনেক সময় কঠিন কিছু প্রবলেমের পেছনে বেশ কয়েকদিন লেগে থাকতে হয়। সমস্যা সমাধানের জন্য এই লেগে থাকার ব্যাপারটা বিরক্তিকর ঠেকালেও হতাশ হওয়া চলবে না।

প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শেখার পরে শিখতে হবে ডাটা স্ট্রাকচার আর অ্যালগরিদম। এগুলো ভালো বুঝার জন্য আবার ডিসক্রিট ম্যাথ বা বিচ্ছিন্ন গণিতের উপর ভালো দখল থাকা চাই। ডিসক্রিট ম্যাথ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সিলেবাসে আছে। আর নিজে নিজে শিখতে চাইলে বইয়ের সাহায্য নেওয়া যায় কিংবা অনলাইনে ডিসক্রিট ম্যাথের উপর একটি ফ্রি কোর্স আছে, সেটিতে অংশ নেওয়া যায় : http://dimikcomputing.com/course/discrete-mathematics-online-course/। ডাটা স্ট্রাকচার এবং  অ্যালগরিদম শেখার সময় বেশ কয়েকটি বই পড়তে হবে। আর প্রতিটি অ্যালগরিদম শেখার পরে সেই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কয়েকটি সমস্যা সমাধান করে ফেলতে হবে। ইন্টারনেটে এরকম কিছু তালিকা পাওয়া যায় যে একটি অ্যালগরিদম দিয়ে কোন কোন ওয়েবসাইটে কোন কোন সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। অ্যালগরিদম ছাড়াও গণিতের বেশ কিছু বিষয়ে ভালো দখল থাকতে হবে। যেমন : জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্ব, কম্বিনেটরিক্স। তবে এগুলো আলাদাভাবে না শিখে এই সংক্রান্ত প্রবলেম সলভ করতে করতে শেখাটাই বেশি কার্যকরি – এমন মতামত দিয়েছেন মীর ওয়াসি আহমেদ, যিনি বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র থাকাকালীন অংশ নিয়েছেন এসিএম আইসিপিসি’র চূড়ান্ত পর্বে (২০১২ সালে)। তাঁর মতে প্রথমে একটি সমস্যা নিয়ে সেটি নিজে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। যথেষ্ট সময় চেষ্টা করার পরে সেটি সমাধান করতে না পারলে, সেটির সমাধান দেখে শিখে নিতে হবে। নিজে কোড লেখার পাশাপাশি অন্যের লেখা কোড পড়ে বোঝাটাও অনের দরকারি।

অ্যালগরিদম শেখার ব্যাপারে একটি কথা। অ্যালগরিদমটি কীভাবে কাজ করে কেবল সেটি জানাই এখন যথেষ্ট নয়। অ্যালগরিদম সংক্রান্ত বইয়ের অনুশীলনীর সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে, যাতে সেটির গভীরে প্রবেশ করা যায়। আর তার সাথে প্রবলেম সলভিং তো চলবেই।

ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পরে নজর দিতে হবে দলীয় দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি। যেহেতু তিনজন মিলে একটি দল এবং সেই দলের জন্য একটি মাত্র কম্পিউটার ও একসেট প্রশ্ন, তাই দলের সদস্যদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া থাকা চাই। দল হিসেবে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে। সেখানে অংশ নেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে তিনজন মিলে যেন একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে। সমস্যাগুলোও একসেট প্রিন্ট করে সেটি ব্যবহার করা উচিত। দলের প্রত্যেক সদস্যের অপর সদস্যদের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে জানতে হবে। যেই বিষয়ের উপর যে দক্ষ, সেই বিষয়ের সমাধানের দায়িত্ব তার উপরই দেওয়া উচিত। আর অনেক সময় একটি প্রবলেম নিয়ে দুজন মিলে আলোচনা করলে দ্রুত সমাধান চলে আসে। প্রোগ্রামিং কনটেস্টের দলগত কৌশলের ব্যাপারে একটি চমৎকার লেখা আছে, টিমওয়ার্ক ইন প্রোগ্রামিং কনটেস্ট (লিঙ্ক : http://goo.gl/wBPBON)। এটি সবার পড়া আবশ্যক।

২০০৭ সালের আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালসে অংশগ্রহনকারী, বিগত সাত বছর ধরে এসিএম আইসিপিসির বিচারক ও মুক্তসফটের সিইও মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমান এর মতে – “প্রোগ্রামিং কনটেস্ট এমন একটি কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি যা থেকে শেখার আছে অনেক – দ্রুত ও নিখুত কোডিং, জটিল সমস্যার সমাধান করা, ধৈর্য্য, অধ্যবসায়, টিমওয়ার্ক, চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রাখা এরকম আরো অনেক কিছু। সবচেয়ে যেটা জরুরি, এটি এমন একটি ইভেন্ট যা কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই একজন শিক্ষার্থীকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়, নিজেকে চ্যালেঞ্জ করে দেখ​, তোমার পক্ষে যেকোন কিছু জয় করা সম্ভব। কনটেস্টে ভালো করতে হলে চাই পরিশ্রম, জেদ, আত্নবিশ্বাস। শুধুমাত্র গতবাধা কোডিং-এর চেয়ে অনেক চিন্তা করে একটি কঠিন প্রবলেম সলভ করা লাভজনক। ধাঁধাঁ বা গাণিতিক সমস্যা সমাধানের অভ্যাস কাজে আসবে অনেক। ইংরেজিতে দখল-ও জরুরি। সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, উপভোগ করতে হবে। কনটেস্টকে পরীক্ষা হিসেবে না নিয়ে খেলা হিসেবে চিন্তা করতে পারলে ভালো হয় – কম্পিটিটিভ লার্নিং-এর মূল কথা কিন্তু এটিই।”

প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভের জন্য যতটুকু না মেধার প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিশ্রম, চর্চা ও অধ্যাবসায়ের। বাইরে থেকে দেখলে অনেকর মনেই প্রশ্ন জাগবে, এরা একটা প্রতিযোগিতার জন্য এভাবে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে কেন? আর এমন করে আদৌ কোনো লাভ আছে? এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালসের বিচারক শাহ্‍‍রিয়ার মঞ্জুর এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন ও নিয়মিত চর্চা করলে সমস্যা সমাধানের একটা দক্ষতা তৈরি হয়, সেই সাথে নিজেকে অন্যদের চেয়ে বুদ্ধিমান ও উন্নত বলে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এটিই প্রোগ্রামারদের অনেক বড় পাওয়া। আর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হওয়ার ফলে তখন কেবল প্রোগ্রামিং সমস্যাই নয়, সমাজের অন্য অনেক সমস্যাও অনেক সহজ মনে হয়। যারা ছাত্রজীবনে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার সাথে যুক্ত থাকে, তারা কর্মক্ষেত্রেও অনেক সমস্যার সমাধান অন্যদের চেয়ে দ্রুত ও ভালোভাবে করতে পারে।” তাঁর একথা যে সত্যি, সেটি প্রমাণ হয় যে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট-এর মতো বিশ্বের বড় বড় কোম্পানীগুলোও সফটওয়্যার প্রকৌশলী নেওয়ার সময় যারা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় খুব ভালো করে, তাদেরকেই বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

সুশৃংখলভাবে প্রোগ্রামিং চর্চা এবং প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের ফলে কেবল প্রোগ্রামিং উৎকর্ষই বাড়বে না, মানুষ হিসেবে নিজেকে আরো উন্নত করে গড়ে তোলা যাবে। আর জাতি হিসেবেও আমদের এগিয়ে নেবে।

বি.দ্র. আমার এই লেখাটি প্রথম আলো’র প্রজন্ম ডট কম পাতায় প্রকাশিত হয় ২০ জুন ২০১৪ তারিখে।

প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য দ্বিমিক প্রকাশনীর তিনটি বই –