কেন সিএসই পড়বা না

এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ফলও বেরিয়ে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পালা। আর বাংলাদেশে যেহেতু তথ্য প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয়, তাই নিজের ইচ্ছায় হোক বা অন্যের প্রভাবে, অনেকেই কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে চায়। অনেক জায়গায় কম্পিউটার সায়েন্স, কোথাও আবার কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং, কোথাও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং – কিন্তু সিলেবাস কাছাকাছিই। আর দেশের মোটামুটি সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিভাগটি রয়েছে। এখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। সেজন্যই আমার এই লেখা।

কম্পিউটার সায়েন্স একটা অদ্ভুত বিষয়। বাংলাদেশে এই বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পরে কেউ কেউ সরাসরি গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন, মাইক্রোসফটে চলে যায়। এছাড়াও এশিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন কোম্পানীতেও যায়। এসব জায়গায় একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটের বেতন হয় জায়গাভেদে তিন থেকে সাত লক্ষ টাকা! তাহলে তো সবারই সিএসই পড়া উচিত। কিন্তু আসলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পাশ করার পরে দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি জোটাতেই হিমশিম খায়, গুগল-ফেসবুক তো অনেক দূরের কথা। দেশের মধ্যেও যারা চাকরি পায়, তাদের কারো কারো বেতন শুরুতে ৫০-৬০ হাজার টাকা। আর কারো কারো বেতন ১০-১৫ হাজার টাকা। এর কারণ কী? এত বৈষম্য কেন? সবই কি মামা-চাচার জোর?

কারণটা হচ্ছে দক্ষতা। কম্পিউটার সায়েন্স পড়ে যারা খুব শীর্ষস্থানীয় ছাত্রছাত্রী, তারা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যায়, কিন্তু এরকম তো হাতে গোণা। বাকীদের জন্য কিন্তু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া ছাড়া আর খুব ভালো অপশন নাই। যদিও আরো কিছু ক্যারিয়ার রয়েছে, কিন্তু এটাই প্রধান অপশন। তো এই কাজ করার জন্য প্রোগ্রামিং জানা লাগে। আর প্রোগ্রামিংটা ঠিক অন্য লেখাপড়ার মতো নয়, যে খালি পড়ে গেলাম, শিখে ফেললাম। এটা হচ্ছে একটা দক্ষতা, যেটা শিখতে হয়, করতে পারতে হয়। আবার এটা ঠিক ইট ভাঙ্গার মতো দক্ষতাও নয়, এখানে লেখাপড়া লাগে, যুক্তি-বুদ্ধি-বিশ্লেষণ লাগে। তো অসুবিধা কী? আমরা প্রোগ্রামিং শিখে ফেলবো। কিন্তু শিখতে পারবা না, কেন, সেটা বলছি।

প্রোগ্রামিং শিখতে পরিশ্রম করা লাগে – পড়া এবং প্র্যাকটিস করা। আর এই প্র্যাকটিস করার জন্য আবার মাথাও খাটাতে হয়, এটা কিন্তু দেখে দেখে টাইপ করা ধরণের প্র্যাকটিস না। মাঝে-মধ্যে অজানা সমস্যা চিন্তা করে সমাধান করতে হয়। প্রোগ্রামিং শেখার সময় একটা ছোট সমস্যার সমাধান করতে ৪-৫ ঘণ্টা লেগে যায়। তো আমরা কিন্তু ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে এইচএসসি পর্যন্ত মোটামুটি মুখস্থ করেই পার করে এসেছি। বড়জোর কিছু অঙ্ক হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছি। আমাদের কখনওই একটা প্রবলেম করার জন্য ৪-৫ ঘণ্টা সময় দেয়া লাগে নাই। আশা করি, বিষয়টা পরিষ্কার। এখন কথা হচ্ছে, সময় দেওয়া লাগলে দিবো, যত পরিশ্রম করার দরকার করবো, টিচারের সাহায্য নিবো। কথা কিন্তু এখানেই।

প্রথমত, টিচারের সাহায্যের আশা ছেড়ে দাও। বেশিরভাগ জায়গাতেই ভালো টিচার নাই। কারণ প্রোগ্রামিংয়ে যারা খুব ভালো, হাতোগোণা কয়েকজন বাদে কেউ আসলে বাংলাদেশে শিক্ষকতা করে না। তাই আমি অনেকের কাছেই শুনি, ক্লাসে টিচার ঠিকমতো প্রোগ্রামিং বুঝাতে পারে না। চাকরির ইন্টারভিউ যে নিবে, সে তো এটা শুনে বলবে, “তাতে আমার কী?” এখন তুমি ভাবতে পারো, প্রোগ্রামিং তো নিজের চেষ্টাতেও শেখা যায়। আমি নিজে চেষ্টা করে শিখবো। সেটাও হবে না, কেন, জানতে হলে এই লেখার বাকী অংশ পড়।

আসলে, প্রোগ্রামিংয়ের পেছনে তুমি সময় দিতে পারবা না। তোমার ভার্সিটির ক্লাস করা লাগে, আর ঢাকায় থাকলে তো আবার রাস্তা-ঘাটেও অনেক সময় ব্যায় হয়। এছাড়া আমরা সামাজিক জীব, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন আছে। কত রকমের প্রোগ্রামে যাওয়া লাগে। এদিকে আবার রাতের বেলায় প্রিমিয়ার লীগ, লা লিগা, উয়েফা – কতকিছু। আর ক্রিকেট খেলা তো আছেই – না দেখলে পাপ হয়। তারপরে আছে কত রকমের সিরিয়াল, গেম অব থ্রোনস, হেন-তেন, না দেখলে সমাজে মান থাকে না। এত কিছুর পরে আবার আছে মোবাইল, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি। আমি তো নোটিফিকেশনের কাছে যাই না, নোটিফিকেশন আমার কাছে আসে! এজন্যই বলি, সময় দিতে পারবা না। আর পরিশ্রমও করতে পারবা না, সময় দিতে পারলেই না পরিশ্রম করবা। সুতরাং সময় থাকতে নিজের ভালো বুঝে নাও। কম্পিউটার সায়েন্স পড়ে বেকার থাকার চেয়ে অন্য কিছু কর।

আর কম্পিউটার সায়েন্স কিন্তু অনেক বোঝার বিষয়। যাদের গণিতের সাধারণ বিষয়গুলো বুঝতেই সমস্যা হয়, তাদের আসলে এই দিকে না আসাই ভালো।

যারা আমার কথায় এখনও একমত হও নাই, তারা আমার লেখা প্রোগ্রামিং শেখার একটা বই আছে, (http://cpbook.subeen.com-এ গিয়ে ফ্রি-তে বইটা পড়া যায়)। সেই বইটা কিছুদিন পড়। যদি মনে হয়, এই জিনিস নিয়া আগামী চার বছর ব্যাপক খাটাখাটনি করতে পারবা এবং আগামী ২০-৩০ বছর এইরকম বিদঘুটে জিনিসকেই নিজের পেশা হিসেবে নিতে পারবা, তাহলে কম্পিউটার সায়েন্স পড়লেও পড়তে পারো।

শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যান্ড্রুর উপদেশ

অ্যান্ড্রু এংগ (Andrew Ng) আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক। আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে তাঁর মেশিন লার্নিংয়ের ওপর অনলাইন কোর্সটি আমি করেছিলাম। সাস্টে জাফর ইকবাল স্যার যেভাবে ডিসক্রিট ম্যাথ কিংবা ফাইবার অপটিকস্ পড়ান, অ্যান্ড্রুও মেশিন লার্নিংয়ের কোর্স অনেকটা সেভাবেই পড়িয়েছেন। তিনি কোর্সেরা (Coursera)-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে চীনা সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট বাইডুর রিসার্চ সেকশনের প্রধান বিজ্ঞানী। এছাড়া তিনি বিশ্ববিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সম্প্রতি কোরা (Quora)-তে তিনি কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্য একটি উত্তর আমি অনুবাদ করে দিলাম। আশাকরি এটা অনেকের কাজে লাগবে।

n-ANDREW-NG-628x314

প্রশ্ন: শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার উপদেশ কী?
কোন জিনিসের পেছনে ছুটবে, কী কাজে তোমার মূল্যবান সময় ব্যায় করবে – এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমি তোমাকে দুটো জিনিস বিবেচনা করতে বলব –
১) তুমি যেটা করছ বা করতে যাচ্ছ, সেটা সমাজে, কিংবা মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনবে কী না।
২) কাজটি করে তুমি কতটুকু শিখতে পারবে।

এমনকী এখনও আমি কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই দুটো জিনিস বিবেচনা করি।
আমাদের সমাজে অসংখ্য সমস্যা রয়েছে আর তাই সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য অনেক কিছু করার আছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক সহজে কোনো আইডিয়া কিংবা পন্য অনেকের কাছে পৌঁছানো যায়। সঠিক পরিকল্পনা ও সেটার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে একজন মানুষের পক্ষে অনেক অনেক মানুষকে সাহায্য করা সম্ভব। আর এখন তো গণ্ডিটা কেবল নিজের গ্রাম, শহর বা দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব।

তাই নিজেকে প্রশ্ন কর: তুমি যা করার চিন্তা করছ কিংবা স্বপ্ন দেখছ, সেটি যদি সত্যিই সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, এটি কি অনেক মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে? অনেক মানুষকে সাহায্য করবে? উত্তর যদি না হয়, তবে অন্য কিছু করার চিন্তা কর। নয়ত তুমি তোমার মাঝে যে অমিত সম্ভাবনা আছে, তার সঠিক ব্যবহার করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, যখন তুমি তরুণ, নিজের শিক্ষার ব্যাপারে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। আর হ্যাঁ, আমার কাছে “তরুণ”-এর সংজ্ঞা হচ্ছে যার বয়স ১০০ বছরের কম।

যা কিছুই তুমি আজকে শিখবে, সেটা বাকী জীবনে তোমার অনেক কাজে আসবে। কিন্তু এটি খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে তুমি যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তখন কোনো কিছু শেখার পেছনে সময় ব্যায় করে খুব দ্রুত কোনো ফল পাবে না। তোমার সামনে কোনো পরীক্ষা থাকবে না কিংবা কোনো শিক্ষকও তোমাকে পড়ার জন্য তাড়া দেবে না। কিন্তু তুমি যদি নিজেই নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে পার, পড়ার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাও, নতুন আইডিয়া নিয়ে চিন্তা কর, অন্য মানুষদের সাথে আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহন কর (যাদের কাছ থেকে তুমি কিছু শিখতে পার), তাহলে তুমি যে বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছ, কয়েক বছরের মধ্যেই সে বিষয়ে তুমি দক্ষ হতে পারবে। লক্ষ কর, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস নয়, কয়েক বছর।
আমার নিজের কথা যদি বলি, আমি পড়তে পছন্দ করি। আমার কিন্ডেলে (ইবুক পড়ার যন্ত্র) এক হাজারেরও বেশি বই আছে। আমি প্রতি রাতে এবং সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে বই পড়ার পেছনে প্রচুর সময় দেই। একাডেমিক রিসার্চ পেপার, ব্যবসা পরিকল্পনা, ইনোভেশন, জীবনী – আরো অনেক রকমের বই পড়ি। মাঝে মাঝে অনলাইন কোর্স করি। এছাড়া পুরনো কিংবা নতুন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেও অনেক ভালোবাসি এবং তাদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারি।

শিক্ষা গ্রহনের প্রক্রিয়াটাও তোমাকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে সাহায্য করবে যে কী নিয়ে তুমি কাজ করবে। যখন তুমি এমন অনেক উদাহরণ দেখবে যে অন্যরা কীভাবে সমাজ বদলাচ্ছে, তুমি নিজেও অনেক আইডিয়া পাবে যে তুমি কীভাবে দিন বদলের সংগ্রামে যোগ দিতে পার।

আমার বক্তব্যের সারকথা যদি বলি: নিজের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে (সেটা সময় বিনিয়োগ হতে পারে কিংবা অর্থ), এমনকী কষ্ট হলেও সেটা করতে হবে। আর সবসময় সুযোগের সন্ধান করতে হবে যে কীভাবে তুমি এমন কাজ করতে পার যা অন্যকে সাহায্য করবে, সমাজকে বদলে দিবে, পৃথিবীকে বদলে দিবে।

ইন্টারভিউ | গোলাম কাওসার বিলাশ

বিলাশ ভাইয়ের পুরো নাম গোলাম হাক্কানী কাওসার। উনি সাস্টে আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। তবে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার কারণে আমাদের মাঝে বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। উনি সাস্টের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই দারুণ প্রোগ্রামার ছিলেন। পরে উনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মাস্টার্স করেন, তারপর মাইক্রোসফটে যোগ দেন। বিলাশ ভাইয়ের সাথে আমার দুই ঘণ্টার আলাপচারিতা, আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য।

bilash_bhai

Tamim Shahriar
বিলাশ ভাই, কেমন আছেন?
Golam Kawsar
ভালো আছি। অনেকেই অবশ্য আমার নাম যে তালব্য শ দিয়ে লিখি সেটা জানে না।
Tamim Shahriar
আমি আবার সবার নামের ব্যাপারে সচেতন, এই যেমন শেহাব, সিহান ভাই, এই বানানগুলো আমি সচেতনভাবেই ঠিকঠাক লিখি।
Golam Kawsar
মানুষের নামের বানান ঠিক করে করলে তাদের সুদৃষ্টিতে পরার প্রথম অংশটা হয়ে যায়। 🙂
Tamim Shahriar
আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
Golam Kawsar
আমি এখন Selerity নামের একটা স্টার্টআপ কোম্পানিতে কাজ করছি। ওয়েবসাইট : http://www.seleritycorp.com/
Tamim Shahriar
এটা কী ধরণের কোম্পানী? কী কাজ হয়?
Golam Kawsar
এটা একটা সফটওয়ার কোম্পানি। আমরা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কম্পিউটারকে দিয়ে নিউজ পড়াই। এরপর নিউজ পার্সিং করে যে মেটাডেটা পাই সেটা বিভিন্ন কম্পানীর কাছে বিক্রি করি। প্লাস আমরা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে নিউজ পার্সিং করি, অন্য কোনো কম্পানী আমাদের আগে নিউজ পার্সিং করে মেটাডেটা বের করে ক্লায়েন্টদের কাছে দিতে পারেনা।
Golam Kawsar
সরি আমি এতক্ষন আমার নতুন কেনা ম্যাক ব্যবহার করছিলাম।
এখন উইন্ডজে ফিরে আসছি।
ম্যাকে বাংলা ঠিক মতো আসছিলোনা।
Tamim Shahriar
আপনার নতুন ম্যাকের কনফিগারেশনটা কী পাঠকদের জন্য বলবেন? আমি অবশ্য জানি। 🙂
Golam Kawsar
হাহা।
আমি বিগ ডেটা নিয়ে কাজ করি। আমার অনেক স্পিড আর মেমরি দরকার হয়ঃ ৮ কোর আই ৭, ৩২ গিগা র‍্যাম, ১ টেরা হার্ড ডিস্ক।
Tamim Shahriar
বিগ ডেটার কথা প্রায়ই শুনি। আসলে কাজটা কী?
Golam Kawsar
বিগ ডেটা এক ধরণের বাজওয়ার্ড বলতে পারো। বেসিক্যালি যখন কেউ অনেক ডেটা নিয়ে কাজ করে তখনি তাকে বিগ ডেটা বলে। এই বিগ ডেটা সাধারণত আনস্ট্রাকচার্ড ডেটার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।
অর্থ্যাৎ, ডেটা এমনভাবে আছে যে সরাসরি ব্যবহার করার উপায় নাই।
তখন বিভিন্ন এলগরিদম ব্যবহার করে সেই ডেটা থেকে নানা তথ্য উপাত্ত বের করা হয়।
Tamim Shahriar
এই অ্যালগরিদমগুলো কি মেশিন লার্নিং ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের সাথে সম্পর্কিত?
Golam Kawsar
বেশির ভাগ সময় মেশিন লার্নিং আর ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এগুলো ছাড়াও শুধু পরিসংখ্যান, লিনিয়ার এলজেবরা, কিংবা স্ট্রিং প্রসেসিং করেও অনেক তথ্য উপাত্ত বের করে ফেলা যায়।
তবে হ্যাঁ, মেশিন লার্নিং প্রায় সব ডেটা সায়েন্সের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।
Tamim Shahriar
আপনি এর আগে কোথায় কাজ করতেন?
Golam Kawsar
এটা আসলে আমার ৪ নম্বর চাকুরী আমেরিকাতে 🙂 আমার চাকুরী জীবন শুরু হয় মাইক্রোসফটে। এরপর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক গোল্ডম্যান স্যাক্স, এবং তারপর ফ্যাক্টসেট নামের আরেকটা কম্পানী। এবং সর্বশেষ সেলেরিটিতে।
Tamim Shahriar
আপনি তো আমেরিকাতে মাস্টার্স করেছেন? সেটা কি আপনাকে মাইক্রোসফটের চাকরি পেতে সাহায্য করেছে? কিংবা অন্যান্য চাকরিগুলোর ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে?
Golam Kawsar
হ্যাঁ এখানে এসে মাস্টার্স করেছি। মাস্টার্স থাকায় ইম্প্রেশন কিছুটা ভালো হয়েছে মনে হয়। কিন্তু আমি আসলে মাইক্রোসফটের চাকুরী পেয়েছি মাস্টার্স শেষ করার প্রায় এক বছর আগে! বলতে পারো আমার সাস্ট এর ব্যাচেলর ডিগ্রির উপর ভিত্তি করেই আমি মাইক্রোসফটে চাকুরী পেয়েছি।
ডিগ্রির কথা যখন বলছো, মাইক্রোসফটে আমার প্রথম বস সম্ভবত ব্যাচেলরও কমপ্লিট করেনি!
Tamim Shahriar
প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আমাকে প্রশ্ন করে, বিশেষ করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সময়। অমুক ভার্সিটিতে সিএসই পড়লে চাকরি বেশি নাকি তমুক ভার্সিটিতে? মানে ক্যারিয়ারের জন্য কোনটা ভালো? আপনি এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবেন?
Golam Kawsar
অনেকদিন দেশে না থাকায় দেশের চাকুরীদাতাদের বর্তমান মনোভাব খুব একটা জানিনা। তবে আমার মনে হয় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকুরী পাবার ক্ষেত্রে স্কিল সেট হচ্ছে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। প্রোগ্রামিং এবং সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিলস ভালো থাকলে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই পড়লেও চাকুরী পেতে তো অসুবিধা হবার কথা না। তবে তুলনামূলকভাবে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে একটা ভালো প্রাথমিক ইম্প্রেশন হতেই পারে। কিন্তু এই ইম্প্রেশনের পর ইন্টারভিউতে ভালো না করলে সেই একই ইম্প্রেশন আবার তার বিরুদ্ধে যাবে! কারণ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বাজে ইন্টারভিউ দেওয়া মানে তুমি তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টাকে কোনো কাজে লাগাওনি।

Tamim Shahriar
আপনি ক্যারিয়ার শুরু করেছেন মাইক্রোসফটের মতো বিশাল এবং বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। আর এখন কাজ করছেন স্টার্টআপে। মাঝখানে গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর মতো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে। এগুলোতে কাজের ধরন, পরিবেশ ও সংস্কৃতির যদি একটু তুলনা করতেন।
Golam Kawsar
বড় কম্পানী এবং ছোট স্টার্ট-আপ কম্পানীর কালচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আর টেক কম্পানী এবং ফাইনানশিয়াল কম্পানীর কালচারও অনেক ভিন্ন।
মাইক্রোসফট হচ্ছে সফটওয়ার নিয়ে যারা কাজ করতে চায় তাদের জন্যে স্বর্গ রাজ্য। সফটওয়ারের এমন কোনো দিক নাই যেটা নিয়ে তারা কাজ করেনা। প্লাস ওখানে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কেউ বেশি কাজ করতে চাইলে অসুবিধা নাই, কিন্তু কেউ বেশি এবং দ্রুত কার করার জন্যে চাপাচাপি করবে না। সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টের নানান দিক শেখার জন্যে মাইক্রোসফট একটা চমৎকার জায়গা।
গোল্ডম্যান স্যাক্স হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নামকরা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক। ওরা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার হ্যান্ডল করে। ওখানে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়াররা হচ্ছে এক ধরণের টুল। ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ হচ্ছে ফাইনানশিয়াল ডিপার্টমেন্টগুলোকে সাপোর্ট দেওয়া। যদিও ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ওরা একদিনও চলতে পারবেনা, তবুও ট্রেডিং এর সাথে জড়িত ইঞ্জিনিয়াররা ছাড়া বাকি সবাইকে কস্ট সেন্টার ধরা হয়। মানে লস খাত। প্লাস কাজের অনেক প্রেশার। ওরা মনে করে সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার!
এবার আসি স্টার্ট-আপ কালচারে। আজকে যে গুগল বা ফেইসবুক দেখছো, এগুলো কিছুদিন আগেও স্টার্ট-আপ ছিলো।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই কোম্পানীগুলো কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বিশ্বখ্যাত কোম্পানীতে পরিণত হয়েছে!
স্টার্ট-আপ কোম্পানীর মূল বিষয় হচ্ছে এটাকে তুমি নিজের কোম্পানীর মতো ট্রিট করবা। এরপর নিজের সব মেধা এবং শ্রম দিয়ে এটাকে আস্তে আস্তে বড়ো করতে থাকবা।
ওদের কাজের একটা মন্ত্র প্রায়ই থাকে “break fast, fix fast”। অর্থাৎ, দরকার হলে সিস্টেম এর একটু ক্ষতি হোক, কিন্তু নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকো!
Tamim Shahriar
নিয়মিত চাকরির কাজের বাইরে আপনি আর কী কী করেন?
Golam Kawsar
করার তো ইচ্ছা অনেক কিছু, কিন্তু আমাদের ছেলে হওয়ার পর থেকে আর খুব বেশি কিছু করা হয় না। আমি নিজে নিজে কিছু সফটওয়ার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করি। আশা করছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে একটা/দুইটা সফটওয়ার রিলিজ করতে পারবো। মাঝে মাঝে github এ কিছু কোড আপলোড করি। মাঝে মাঝে প্রোগ্রামিং ব্লগ লিখি। কখনো কখনো বাংলা ব্লগ লিখি। জিম করি। আমার চৌদ্দ মাস বয়সী ছেলের সাথে খেলি। এবং সবচেয়ে বেশি যেটা করি সেটা হচ্ছে প্রচুর পড়ি!
Tamim Shahriar
আমি আপনাকে প্রায়ই শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিভিন্ন আর্টিকেল শেয়ার করতে দেখি। এমনকী আপনি নিজেও মাঝে মাঝে লিখেন এসব নিয়ে। বিষয়টা কী এতই গুরত্বপূর্ণ?
Golam Kawsar
হ্যাঁ। বিষয়টা অসম্ভব গুরুত্মপূর্ণ!
Tamim Shahriar
কেন? আমরা তো এসব কিছু করি না। ভালোই তো আছি। 🙂
Golam Kawsar
তুমি কখনো শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা দূর্বল মানুষকে জীবনে সফল হতে দেখেছো?
আসলে কি আমরা সবাই ভালো আছি? আমি আমার কাছাকাছি বয়সের অনেক বন্ধুবান্ধবকে দেখি একটা নধর ভূড়ি নিয়ে ঘুরতে। আরেকটু বয়স হলে এদের অনেকের ডায়াবেটিস ধরা পড়বে (আল্লাহ না করুক), কিংবা স্বাস্থগত অন্যান্য জটিলতা ধরা পড়বে। তখন কি এরা ইয়াং বয়সের মতো কাজে কর্মে প্রোডাক্টিভ থাকতে পারবে?
আর একটা বয়সের ভারে দূর্বল জনগোষ্ঠিকে বসে বসে খাওয়ানো বা পরানোর মতো অবস্থা কি আমাদের দেশের আছে?
আমেরিকাতে আমি দেখি আশি নব্বই বছর বয়সের মানুষেরা নিজের কাজ নিজে করে, বাড়ির সামনের লনের ঘাস কাটে, ড্রাইভ করে, রান্না করে।
শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলেই তারা এগুলো করতে পারে।
শরীর সুস্থ আর শক্ত থাকলে আমাদের ব্রেইনও সুস্থ আর শক্ত থাকে। আর ব্রেইন হচ্ছে আমাদের প্রডাক্টিভিটি সেন্টার! ব্রেইন সুস্থ না থাকা মানে হচ্ছে মানসিক ব্যাধি!
আরো অনেক কিছু বলা যায়। ইন ফ্যাক্ট আমার একটা বই লেখার ইচ্ছা আছে এটা নিয়ে। 🙂
Tamim Shahriar
কিন্তু আমরা তো সময় পাই না, এগুলো নিয়ে ভাবার কিংবা কিছু করার। আপনারা এত সময় পান কীভাবে?
Golam Kawsar
হাহা, শুধু ফেইসবুকের নিইজফিডের দিকে তাকিয়ে থাকলেই দেখবা আমাদের কতো সময় আছে 🙂
সিরিয়াসলি বললে, সময় বের করে নিতে হবে। আমি সারাদিন অফিস শেষ করে জিমে যাই। জিমে যেয়ে আড়াইশ পাউন্ড ওজনের ডেডলিফট করি। জিম শেষ করার পর আমার শরীরে সব ভালো ভালো হরমোন কাজ করা শুরু করে দেয়। আর তাতে আমার সারা দিনের সব ক্লান্তি চলে যেয়ে শরীর মন সতেজ হয়ে যায়। এটা যেকোনো মানুষের জন্যেই সত্যি! পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাগের নাম হচ্ছে ব্যায়াম। মানুষের জৈবিক এবং সভ্যতাগত বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখবা  চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করার ব্যাপারটি একেবারেই নতুন। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা ঘর থেকে বের হয়ে সারা দিন কাজ করতো, দৌড়াদৌড়ি করে খাবার সংগ্রহ করতো। আমাদের শরীর বসে থাকার মতো করে তৈরি হয়নি। ব্যায়াম আমাদেরকে আমাদের সত্যিকারের জৈবিক ফর্মে নিয়ে যায় এবং শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখে।
Tamim Shahriar
সকালে ব্যায়াম করা ভালো নাকি সন্ধ্যায়?
Golam Kawsar
যে কোনো সময় ব্যায়াম করা একই ফল দেয়। আমি আগে সকালে করতাম অফিসে যাওয়ার আগে। কিন্তু আমার ছেলে সকালে আমাকে আটকে রাখে বলে বিকেলে/সন্ধ্যায় যাওয়া শুরু করেছি।
Tamim Shahriar
আপনি আরেকটা বিষয় বললেন যে প্রচুর বই পড়েন? কী ধরণের বই?
ইবুক বেশি পড়েন নাকি হার্ডকপি?
Golam Kawsar
আসলে আমি বলেছি আমি প্রচুর পড়ি – সেটা বই হতে পারে আবার নানা ধরণের আর্টিকল হতে পারে। আগে হার্ড কপি পড়তাম বেশি। এখন ইবুক/পিডিএফ বেশি পড়ি। আমার অফিসে যাওয়া আসা ট্রেইনে, তাই ওই সময় পড়ার জন্যে একটা দারুণ সময়!
আমি সাধারনত নন-ফিকশন বেশি পড়ি। সায়েন্স, টেকনলজি, ইত্যাদি বিষয়ে আমার চরম কৌতুহল। পলিটিক্স, অর্থনীতি, ধর্ম, দর্শনও বাদ যায় না।
Tamim Shahriar
আমি নিজেও প্রচুর আর্টিকেল পড়ি। তবে আমি লক্ষ্য করেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্টিকেল পড়লে নিজের তথ্যাভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, কিন্তু deep insight তৈরির ক্ষেত্রে মনে হয় বই পড়ার বিকল্প নাই। আপনার কী এরকম কিছু মনে হয়?
Golam Kawsar
কিছুটা ঠিক। কিন্তু আমি যখন কোনো বিষয়ে আর্টিকেল পড়ি তখন সাধারণত অনেক লেখকের অনেকগুলো আর্টিকেল পড়ি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। তবে বই যেহেতু অনেক দীর্ঘ, সেটাতে insight অবশ্যই বেশি হবে।
Tamim Shahriar
এবারে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি কোন কোন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন?
Golam Kawsar
আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি নোয়াখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম বললে কেউ চিনবেনা। স্কুলের নাম হরি কৃষ্ণপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটা নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নে অবস্থিত। হাই স্কুলে পড়েছি ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। কলেজ নটর ডেম।
Tamim Shahriar
ভার্সিটিতে পড়ার সময় এবং পরবর্তি সময়ের কর্মজীবনে স্কুলের লেখাপড়ার প্রভাব কেমন?
Golam Kawsar
স্কুলের লেখাপড়ার প্রভাব বলার চেয়ে স্কুলজীবনের প্রভাব বলাটা মনে হয় বেশি যুক্তিসঙ্গত। স্কুলজীবনে ছেলেমেয়েদের কৌতুহল তৈরি হয়, বাবা-মা এবং বন্ধুবান্ধব থেকে তারা সেই কৌতুহল মেটায়। শুধু পড়ালেখার প্রভাব আমার মনে হয় খুব বেশি না।
Tamim Shahriar
কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার কারণ কী?
Golam Kawsar
এক কথায় বললে কারণ এটা আমাদের সময় একটা হট সাবজেক্ট ছিলো ।:-) কিন্তু পড়তে শুরু করার পর অবশ্য আমি কম্পিউটার সায়েন্সকে ভালোবাসতে শুরু করি। যদিও আমার আসলে পদার্থবিজ্ঞান পড়ার ইচ্ছা ছিলো।
Tamim Shahriar
ভার্সিটিতে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তার নিয়মিত লেখাপড়ার বাইরে আর কী কী করতে পারে?
Golam Kawsar
কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে যে তার সাবজেক্টে কাজ করার জন্যে শুধু একটা কম্পিউটার হলেই যথেষ্ট।
আর যাদের থিওরেটিকাল দিক নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা তারা বাদের প্রায় সবারই প্রোগ্রামিং করে খেতে হবে। তাই প্রোগ্রামিং এ খুব ভালো হবার জন্যে প্র্যাকটিস করে যেতে হবে।
আর পড়ালেখার বাইরে যেকেনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রেম করা উচিৎ। যে কারণেই হোক, বিপরীত লিঙ্গের মানুষের কাছে থাকলে আমরা কাজে কর্মে একটু বেশি উদ্দীপ্ত হই। 🙂 ভালোবাসার মানুষটির কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্যেও অনেকে অনেক অসম্ভব কাজ করে ফেলে!
Tamim Shahriar
কোনো সন্দেহ নাই যে আপনার সাফল্যের রহস্য কোথায়। 🙂 আচ্ছা, প্র্যাকটিস কীভাবে করা যায়? আর ভালো সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়ার জন্য কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিংয়ের গুরুত্ব কতটুকু (যাকে আমরা এসিএম প্রোগ্রামিং বলে থাকি)?
Golam Kawsar
প্র্যাকটিস করার জন্যে কয়েক লক্ষ আইডিয়া আছে। 🙂 নিজে নিজে একটা ছোট ফেইসবুক এর মতো সোশাল নেটওয়ার্ক সাইট বানাতে পারে, একটা ছোট সার্চ ইঞ্জিন বানাতে পারে, একটা ই-কমার্সের ওয়েবসাইট বানাতে পারে, কতো রকম অ্যাপ বানানো যায়!
এসিএম প্রোগ্রামিং এর ব্যাপারটা এভাবে বলা যায়ঃ এসিএম প্রোগ্রামিং এ ভালো হলে প্রায় সব সময়েই ভালো সফটওয়ার প্রকৌশলী হওয়া যায়, কিন্তু ভালো সফটওয়ার প্রকৌশলী হওয়ার জন্যে সব সময় এসিএম প্রোগ্রামিং লাগে না!
Tamim Shahriar
বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে মুক (MOOC) একটি বাজওয়ার্ড। মুক বিষয়ে আপনার মতামত কী?
Golam Kawsar
MOOC আমার মনে হয় একটা চমৎকার জিনিস। আমি নিজে কোর্সেরা থেকে কয়েকটি কোর্স করেছি। আমি কখনো স্ট্যানফোর্ডে চান্স পাই নাই, কিন্তু MOOC এর কল্যাণে স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসরদের ক্লাস বিনামূল্যে করার সুযোগ পেয়েছি!
Tamim Shahriar
অনলাইন কোর্স থেকে আসলে কতটুকু শেখা যায়?
Golam Kawsar
সত্যি কথা বলতে কি শেখার ব্যাপারটা অনেকটাই শিক্ষার্থীর কাছে। আমি নিজে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খুব কম ক্লাশই খুব মনোযোগ দিয়ে করেছি। যা শেখার পরে নিজে বাসায় এসে পড়েছি! ক্লাশে ভালো শিক্ষক পাওয়া এবং তার সাথে ইন্টারএকশন করে ভালো করে কিছু শেখা আসলে সবসময় হয়ে ওঠেনা।
কিন্তু যারা অনলাইনে কিছু শিখতে যাবে তারা আগ্রহ আছে বলেই যাবে। সেই আগ্রহ থেকেই শেখার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।
তাই শেখার সম্ভাবনাটাও বেশি।
Tamim Shahriar
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও এর সম্ভাবনা নিয়ে আপনার কী মনে হয়? প্রশ্নটা একটু সুনির্দিষ্ট করে বলি। বাংলাদেশে কম্পিউটার সায়েন্স এডুকেশন, সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের সুযোগ, বিভিন্ন সেক্টরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এসব বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?
Golam Kawsar
সত্যি কথা বলতে কি গতো বিশ বছর ধরে তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে যেরকম উৎসাহ-উদ্দীপনা বিভিন্ন ভাবে তৈরি হয়েছে সেভাবে এটা এখনো একটা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেনি আমাদের দেশে। বিশ বছর একটা বড় সময়। বিশ বছর ধরেই এই খাত এখনো “উদীয়মান” খাত হিসেবে রয়ে গেছে। এখনো একটা পরিপূর্ণ শিল্প হয়ে উঠেনি।
আমার মনে হয় এর একটা বড় কারণ আমাদের কম্পিটার সায়েন্স শিক্ষা ব্যবস্থা। আমি নিজের চোখে আমার বন্ধুদের প্রোগ্রাম মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পেতে দেখেছি! কম্পিউটার বিজ্ঞান একটা ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট, এখানে ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার দিয়ে কাজ করানো শিখতে হয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়ই ছেলেমেয়েরা শুধু ভালো গ্রেইডের জন্যে পড়ালেখা করে। অনেকেই আসলে জানেনা একটা কম্পিউটার ঠিক কিভাবে কাজ করে।
দ্বিতীয় কারণ আমাদের দেশে সফটওয়ারের ব্যবহার খুবই কম। এটা ঠিক সফটওয়ারের আন্তর্জাতিক বাজার অনেক বড়, কিন্তু একটা মোটামুটি সাইজের দেশীয় বাজার থাকলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা সহজেই দেশীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সফটওয়ার লেখার সুযোগ পেতো। যেটার জন্যে তারা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ইন্ডিয়া, চায়না, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতাদি দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
এরপর আছে সরকার। দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সরকার। সরকার যদি বিপুলভাবে সফটওয়ার ব্যবহার করতো তাহলেও আমাদের দেশে একটা দেশীয় সফটওয়ার বানানোর উদ্দ্যোগ শুরু হতো।
আর একটা ব্যাপার হচ্ছে আমাদের ইংরেজী জ্ঞান। ইংরেজীতে ভালো না হলে সফটওয়ার কেনো কোনো কিছুতেই আন্তর্জাতিক বাজার ধরা যায়না। আজকে যদি আমাদের গার্মেন্টস কর্মীদের ইংরেজী জানতে হতো তাহলে আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কোনোভাবেই এতো ভালো পর্যায়ে আসতে পারতো না।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

Tamim Shahriar
প্রযুক্তির প্রাথমিক পাঠ যদি আমরা বাংলায় নিতাম, তাহলে কি আমরা আরো বেশি সংখ্যক প্রযুক্তি কর্মী তৈরি করতে পারতাম না? কিংবা প্রথমবার প্রোগ্রামিং বা ডাটা স্ট্রাকচার শেখার সময় আমরা যদি বাংলা বইয়ের সাহায্য নেই, তাহলে কি সেটা আমাদের জন্য ভালো ব্যাপার হবে?
Golam Kawsar
সোজা কথায় বললে, না! উত্তরটা হ্যাঁ হতো যদি আমাদের প্রায় সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বই ইংরেজীতে হতো। যেমনটা চীনের ক্ষেত্রে ঘটছে। ওদের সবকিছু ওদের ভাষায়। আমাদের একটা দুইটা বই বাংলায় হলে উল্টো আমাদের ক্ষতি হবে। কয়েকটা কন্সেপ্ট বাংলায় আর বাকিগুলোর জন্যে ইংরেজী বই নিয়ে দৌড়াদৌড়ি খুব একটা ভালো জিনিস না নতুন জিনিস শেখার ক্ষেত্রে!
Tamim Shahriar
সবকিছু বাংলায় হলে কি ভালো হবে? মানে সবাইকে মোটামুটি মানের ইংরেজি শেখানো সহজ হবে নাকি প্রযুক্তির জ্ঞানকে বাংলা ভাষায় নিয়ে আসাটা বেশি সহজ হবে আমাদের জন্য?
Golam Kawsar
আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব বই বাংলায় থাকলে আমাদের তো আর ইংরেজী খুব বেশি জানার দরকার হবে না। শুধু বিদেশীদের সাথে কমিউনিকেশনের জন্যে যা দরকার সেটা লাগবে। লক্ষ করো আমি বলেছি সব বই। মানে সব ধরণের ইঞ্জিনিয়ারিং – ইলেক্ট্রিকাল, মেকানিকাল, সিভিল, সব ধরণের বিজ্ঞান – পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি। চীনারা ঠিক এটাই করে। ওদের এতো বেশি অধ্যাপক এবং গবেষক আছে যে ওরা অসংখ্য বই নিজেরা নিজেদের ভাষায় লিখে ফেলে। বাইরের বিখ্যাত বইগুলো চাইনিজ ভাষায় অনুবাদ করে নেয়। তায় ওদের প্রায় সব পড়ালেখাই চাইনিজ ভাষায়। আমাদের যেহেতু সেই রকম অবস্থা নাই, তাই আমার মনে হয় আমরা ইংরেজীতে সব করলেই আমাদের জন্যে ভালো হবে।
Tamim Shahriar
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এত সময় দেওয়ার জন্য।
Golam Kawsar
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ আমার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্যে!

সিএস, সিএসই, এসই নাকি আইসিটি?

তোমরা অনেকেই এখন উচ্চমাধ্যমিক পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছ। আর প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি ভালোলাগার কারণেই হোক, কিংবা পাশের বাসার বড় ভাইয়ের প্রভাবেই হোক, তোমাদের কেউ কেউ হয়ত কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে চাচ্ছ। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে বেশ কিছু বিভাগ আছে, যেগুলোর নাম দেখে তুমি দ্বিধাগ্রস্ত। যেমন : সিএস (কম্পিউটার সায়েন্স), সিএসই (কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং), এসই (সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং), আইসিটি (ইনফরমেশন ও কমিউনিকেশন টেকনোলজি) ইত্যাদি। তোমাদের প্রশ্নটি হচ্ছে কোন বিভাগে ভর্তি হলে ভালো প্রোগ্রামার হওয়া যায়? কিংবা, পাশ করার পরে যদি আমি সফটওয়্যার প্রকৌশলী বা নির্মাতা হিসেবে চাকরি করতে চাই, এসব বিভাগের মধ্যে কোনটি পড়া ভালো হবে?

আমি যেহেতু অনেক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, তাই আমি ‘প্রোগ্রামিং স্কুল'[১] গ্রুপে একটি পোস্ট দেই এবং সেখান থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস জোগাড় করি। বিভাগের নামগুলো ভিন্ন হলেও সিলেবাস কিন্তু খুব কাছাকাছি। এখন চল, একটু জেনে নিই, আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে কোন কোন বিষয়গুলো ভালোভাবে পড়লে সেটা একজনকে ভালো সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে?

প্রথমেই জানতে হবে কম্পিউটার সম্পর্কে মৌলিক ধারণা, আর সেটি পাওয়া যাবে Introduction to Computer নামক কোর্সে। তারপর Structure Programming (স্ট্রাকচার্ড প্রোগ্রামিং)। সাধারণত আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়টি পড়ানোর সময় সি ল্যাঙ্গুয়েজ শেখায়। আর সেই সাথে Discrete Mathematics (ডিসক্রিট ম্যাথমেটিক্স)। এটিও দেখবে সিলেবাসে আছে।

তারপরে আমাদের শিখতে হবে Object Oriented Programming (অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং), Data Strucutre (ডাটা স্ট্রাকচার) ও Digital Logic (ডিজিটাল লজিক)। সেগুলোও দেখবে সব বিষয়ের সিলেবাসেই আছে।

এর পরের ধাপ রয়েছে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং (Computer Networking), মাইক্রোপ্রসেসর ও অ্যাসেম্বলি ল্যাঙ্গুয়েজ (Microprocessor and Assembly Language), কম্পিউটার আর্কিটেকচার (Computer Architecture) ও অপারেটিং সিস্টেম (Operating System)। এগুলোও আবশ্যিক বিষয়, মানে জানতেই হবে। তাই তোমরা যদি ভার্সিটির সিলেবাসগুলো খেয়াল করো, দেখবে যে এই বিষয়গুলো আছেই, থাকতেই হবে।

আর বাকি রইল ডাটাবেজ (Database), অ্যালগরিদম (Algorithm), আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স (Artifical Intelligence) ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং (Software Engineering)। এই বিষয়গুলোও না জানলেই নয়।

এখন তুমি যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স সংশ্লিষ্ট কোনো বিভাগে ভর্তি হতে চাও, তাহলে সেই বিভাগের (মানে ডিপার্টমেন্টের) সিলেবাসটি দেখে নাও, যদি উপরে যেসব বিষয়ের কথা উল্লেখ করলাম, সেগুলো থাকে, তাহলে নিশ্চিন্তে ভর্তি হয়ে যাও।

তবে একটি বিষয়, তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অনেক বিষয় পড়তে হবে। আমি শুধু সেই বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করলাম যা তোমাকে ভালো সফটওয়্যার নির্মাতা হতে সাহায্য করবে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তুমি যেখানেই পড় না কেন, তোমার লেখাপড়ার দায়িত্বটা নিজের উপরই নিয়ে নাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ও শিক্ষকদের আশায় বসে থাকলে তোমার নিরাশ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আমি যেসব বিষয়ের কথা বলেছি, সেগুলো নিজে নিজে পড়ে আগেভাগেই একটু ধারণা নিয়ে রাখো। বিশেষ করে ক্লাস শুরুর আগেই প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজটা শিখে ফেলো, নইলে বিপদে পড়বে। বিভিন্ন রকমের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নাও। সারা পৃথিবীর খোঁজ খবর রাখো। প্রোগ্রামিংয়ের মাঝে আনন্দ খুঁজে নাও। পরিশ্রম করো। বিজয় সুনিশ্চিত।

আরো একটা কথা না বললেই নয়। ভার্সিটিতে পড়ার সময় দেখবে তোমার অমুক বন্ধু অনেক জানে, তমুক ক্লাসমেট প্রতি মাসে একটা নতুন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে ফেলে, আরেক বন্ধু বা বান্ধবী প্রতি মাসে ফ্রিল্যান্সিং করে ডলার ইনকাম করে। তাদেরকে অভিনন্দন জানাবে এবং তাদেরকে শ্রদ্ধা করবে। তবে কখনও তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করবে না। তোমার কাজ তুমি করবে। ভালো করে পড়বে, শিখবে, প্রোগ্রামিং চর্চা করবে, ফাইনাল ইয়ারে ভালো প্রজেক্ট ও ইন্টার্নশীপ করার চেষ্টা করবে। এছাড়া ঘুরে বেড়াবে, বিভিন্ন জায়গায় ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করবে, খেলাধূলা করবে, প্রেম করার চেষ্টাও করতে পারো। মোট কথা জীবনটা উপভোগ করো, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সময়, যা আর কখনও ফিরে আসবে না।

[১] https://www.facebook.com/groups/programming.school/

[২] https://www.facebook.com/DimikComputing (কম্পিউটার সায়েন্সের কিছু বিষয় সহজভাবে বোঝানের জন্য তৈরি করা হয়েছে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল। সেখানে ইতিমধ্যে প্রোগ্রামিংয়ে হাতেখড়ি, ওয়েব কনসেপ্টস ও ডিসক্রিট ম্যাথের উপর বাংলায় অনলাইন কোর্স আয়োজন করা হয়েছে। সামনে আরো কিছু কোর্স আসছে।)

সাক্ষাৎকার : রুহুল আমীন সজীব

রুহুল আমিন সজীব – শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের এসিস্টেন্ট প্রফেসর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। সাস্টে শিক্ষক থাকাকালীন কিছু আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব প্রজেক্ট সে হাতে নিয়েছে এবং সাফল্য লাভ করেছে। সজীব আমার ভার্সিটির এক ব্যাচ জুনিয়র। গুগল টকে নক করলাম, ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়ে গেলো। আশা করি তাঁর চিন্তা, কথা ও কাজ থেকে আমাদের তরুণরা অনুপ্রাণিত হবে।

সজীব (বামে)
সজীবের (ছবির দিকে তাকালে বামে) সাথে আমি, পিপীলিকা টিমের একটি অনুষ্ঠানে।

সুবিন : সজীব, কী খবর?
সজীব : এই তো সুবিন ভাই। খবর সব কিছু মিলিয়ে ভালই। আপনি কেমন আছেন?

সুবিন : আমি ভালো আছি। তুমি এখন কোথায় পড়াশোনা করছ? (যদিও আমি জানি, পাঠকরা তো জানে না।)
সজীব : আমি এখন স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি করছি। আমার পিএইচডি এর প্রথম দিকে আমি বায়োইনফরমেটিক্স নিয়ে কাজ করছি।

সুবিন : শুনলাম এক বিখ্যাত প্রফেসরের সাথে কাজ করছ?
সজীব : আমি কাজ করছি স্টিভেন স্কিইনা এর সাথে। উনি এলগরিদম আর ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্কিইনা তো আমাদের পরিচিত। মানে তাঁর Algorithm Design Manual বইটি আমরা অনেকেই পড়েছি। তিনি লোক কেমন?
সজীব : স্কিইনা খুবি মজার লোক। উনি এখানে এলগরিদম এর সেমিনার পরিচালনা করেন। স্টোনি ব্রুক সিএস এর এসিএম এর গ্রুপগুলি দেখাশোনা করেন।

সুবিন : স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে কিভাবে? আমাদের যেসব শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, তারা নিজেদের কিভাবে প্রস্তুত করবে?
সজীব : প্রথমত, বাইরে পড়াশোনা করার জন্য সব থেকে যেটা বেশী দরকার তা হল তা হল গবেষণা করার আগ্রহ, অথবা খুব ভালো অর্গানাইজেশনে কাজ করার আগ্রহ; যেমন সিলিকন ভ্যালির কোন কোম্পানি। দ্বিতীয়ত, আন্ডারগ্রেডে একটু ভালো করে প্রোগ্রামিং এবং ম্যাথ করাটা জরুরী। খুব ভালো গবেষনা অনেক সময় আমাদের দেশে হয় না তাই আমি এর উপর জোর দিব না। তবে সুযোগ মত প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট বা সফটওয়্যার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করার উপর জোর দিতে বলব। আমি এই কথা গুলি বলছি মূলত মাঝারি মানের ছাত্র-ছাত্রীর জন্য। খুব ভালো যারা তারা এমনিতেই ভালো রিসার্চ করে এবং তাদের পাব্লিকেশন থাকে। তৃতীয়ত, আমি বলব, জিআরই এবং টোফেলে ভালো স্কোর করার জন্য। অনেকেই আলসেমি করে অথবা সময়ের অভাবে এই দুইটি পরীক্ষা দিতে পারেনা। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কালচার নেই বলে তারা আমেরিকায় না গিয়ে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে যায়। আমেরিকার জন্য এই দুইটি পরীক্ষা ম্যান্ডেটরি। তাই আলসেমিটা ঝেড়ে ফেলে আন্ডারগ্রেডের শেষ বছর বা আন্ডারগ্রেড শেষ করে এর দুইটি পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশান নেওয়া উচিৎ। আমার আমেরিকায় পড়তে আসার জন্য এক বছর আগে থেকে প্ল্যান করতে হয়েছে।

সুবিন : তুমি কোন ভার্সটিগুলাতে অ্যপ্লাই করেছিলে?
সজীব : আমি প্রায় ৮ টি টপ স্কুলে এপ্লাই করেছি। মাঝারি মানের ৪ টি তে এপ্লাই করেছি। অফার পেয়েছি কার্নেগি ম্যালন (মাষ্টার্স ফলোড বাই পিএইচডি), স্টোনি ব্রুক (পিএইচডি উইথ ফেলোশীপ), ইউএমবিসি বাল্টিমোর (পিএইচডি) তে।

সুবিন : স্টোনি ব্রুকে কেন ভর্তি হলে?
সজীব : আমি যেখানেই এপ্লাই করেছি, সেখানে আমার রিলেটেড কাজ হয় কিনা সেই ব্যাপারটিতে প্রাধান্য দিয়েছি। স্টোনি ব্রুক এর সিএস অনেক বড় ডিপার্টমেন্ট। এখানে কমবেশী প্রায় সব কিছু নিয়েই কাজ হয়। আমার আগ্রহ ছিল এনএলপি (NLP), আইআর (IR) বা এলগরিদম নিয়ে।  স্টোনি ব্রুকে আমার পছন্দের কয়েকজন প্রফেসর ও আছেন। স্টিভেন স্কিইনা তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি মূলত স্টিভের ডাটা সায়েন্স ল্যাবের কথা মাথায় রেখে এপ্লাই করি। পাশাপাশি আমার আগ্রহের সাথে রিলেটেড আরো কয়েকটা ল্যাবের কথাও আমি আমার স্টেটমেন্ট অব পারপাসে উল্লেখ করি। যাই হোক, প্রথমত আমাকে এক্সেপ্ট করেন প্রফেসর মাইকেল কিফার। উনি নলেজ রিপ্রেজেন্টেশান নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্টেটমেন্ট অব পারপাস যাকে সংক্ষেপে SOP বলে, সেটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এটি লেখার ব্যাপার কোনো টিপস্ ?
সজীব : পিএইচডিতে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লিকেশনের জন্য SOP এর উপর অন্তত ৫০% গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই SOP অবশ্যই খুব ভালো করে লিখতে হবে। আমি SOP নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি। অনেকের অভিজ্ঞতা জেনেছি। তারপরে নিজের SOP লিখেছি।
এতে মূলত নিচের ব্যাপার গুলি থাকে :
১। আমি কি করতে চাই
২। আমার আগ্রহের কাজ করার জন্য আমি আন্ডারগ্রেডে কি পড়েছি, বা করেছি, আমার কোন অভিজ্ঞতা
৩। এই কাজ নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
৪। এবং আমার এই গবেষনা করার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করছি তার কি প্রয়োজন
এই সব নিয়েই সাধারণত একটি SOP লেখা হয়। এক কথায়, SOP তে নিজেকে কেউ আইন্সটাইন প্রমাণ করার থেকে নিজের যে পজটিভ দিকগুলো এবং অভিজ্ঞতা আছে এবং সেগুলো কিভাবে একজনের আগ্রহের বিষয়বস্তুতে গবেষণা করতে সাহায্য করতে পারবে তাই তুলে ধরতে হয়।

সুবিন : তুমি যেহেতু বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছ, নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে কর, ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করতে গিয়ে লেখাপড়া করার সময় পাই না, তাই ভালো রেজাল্ট করতে পারি না’। কিংবা ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করলে আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হয়, তাই প্রোগ্রামিং করি না।’ এদেরকে তুমি কী উত্তর দাও?
সজীব : আমি কখনোই মনে করিনা যে প্রোগ্রামিং একজনের পড়ালেখায় সময় নষ্ট করে। প্রোগ্রামিং করার সময়ে একজন মাথা খাটিয়ে, কাগজে আঁকিবুকি করে, বা একটি এলগরিদম ডিজাইন করার সময়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা যেকোন ধরনের বুকিস পড়ালেখার থেকে ভালো। সিএস (CS : Computer Science)-এ যেকোন ধরনের পড়ালেখার ৭০% কাজ হল প্রব্লেম সল্ভিং রিলেটেড। আর আমরা প্রব্লেম সল্ভ করি প্রোগ্রামিং করে। অতএব, আমি মনে করি প্রোগ্রামিং না জানলে সিএস এর বেশীরভাগ কাজ করা অনেক দূরহ হয়ে পরে।

সুবিন : তুমি তো এসিএম আইসিপিসি ও অন্যান্য Competitive প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে। সেগুলোর গুরুত্ব কেমন? তোমার কর্মজীবনেই বা সেগুলোর প্রভাব কেমন?
সজীব : আমাদের বাংলাদেশে বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রী সঠিক উপায়ে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু সিএস এর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এসিএম আইসিপিসি সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখানে যে কোন ছাত্র-ছাত্রী নিজে থেকে পড়ালেখা করে, কনসাল্ট করে, প্রবলেম সল্ভ করে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। তাই এসিএম ও অন্যান্য প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য সব থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই যে আমাদের দেশের সব ছাত্র-ছাত্রী যেন এসিএম এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রবলেম সল্ভিং করে। দেশের বাইরের যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেকোন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এসিএম প্রব্লেম সল্ভিং অভিজ্ঞতা বা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার ফলাফলের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

সুবিন : যদিও মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের সিজিপিএ জিজ্ঞাসা করতে হয় না, তবুও, তোমার সিজিপিএ কত ছিল? এটি হয়ত পাঠকদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সজীব : হা হা। আমার সিজিপিএ ৩.৯৬। এতে করে কেউ যেন আবার ভেবে না বসে যে এই জন্যই আমি উপরের অনেক বড় বড় কথা বলেছি। আমি যা বলেছি তা আমার নিজের এবং আশেপাশের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের অভিজ্ঞতার থেকেই বলেছি।

সুবিন : আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই কারণে যে তুমি তো প্রোগ্রামিংয়ের প্রচুর সময় দিতে, আবার ক্যাম্পাসের নানান কাজে (আসলে অকাজে) উপস্থিত থাকতে। তোমার স্কুল-কলেজ কোনগুলো ছিল?
সজীব : আমার স্কুল ছিল মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল, ঢাকা। কলেজ ছিল নটর ডেম কলেজ, ঢাকা।

সুবিন : সিএসই পড়লে কেন?
সজীব : আমি মোটেও সুপার ডুপার ছাত্র ছিলাম না। প্রথম দিকে সিএস নিয়ে তেমন কোন ফেসিনেশন ও ছিলনা। তবে সমসাময়িক অনেক কিছু নিয়ে পড়াশোনা করার সময় দেখেছি সিএস এর প্রোগ্রামিং ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। কিন্তু সত্য কথা হল, কলেজে থাকতে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ার সময় আমি প্রোগ্রামিং প্রায় কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু কম্পিউটারের বিবর্তন যেভাবে হচ্ছে, সেটা আমার কাছে অনেকটা সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের মনে হয়েছে সব সময়। তাই সাহস করে এই বিষয়ে পড়ার জন্যই মনস্থির করি। তারপরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে প্রোগ্রামিং শিখেছি (অনেক চেষ্টার পরে) এবং তা দিয়ে আসলেই সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের কিছু কাজ করি।

সুবিন : সাস্ট থেকে পাশ করার পর ক্যারিয়ার শুরু করলে কোথায়? সেখানে কী কাজ করতে?
সজীব : পাশ করার পরে আমি ক্যারিয়ার শুরু করেছি এসডিএসএলে। সেখানে আমি অনেক ধরনের কাজ করেছি। আমি প্রথম কাজ করেছি ফ্লেক্স এর উপর ম্যাপ সার্ভার টিমের ক্লায়েন্টের জন্য। এই টিমে আমি উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারিনি। তবে অনেক কোড ঘেটে কিছু বাগ বের করেছিলাম। তারপরে কাজ করি, জেটুএমই টিমে, লাইভ নামের একটি ভিডিও স্ট্রিমিং প্রজেক্টে। আমি এই টিমে কাজ করার সময় বুঝতে পারি আমার মূল আগ্রহ সব সময় নতুন ধরনের সমস্যা সমাধানে যেই গুলো করতে একটু গবেষনা লাগে। তারপরে আমি কাজ শুরু করি লাইভের সার্ভার ডিজাইনের। এর মাঝে আমি ছোট ছোট কয়েকটা আরএনডি করি এবং অন্য কয়েকটা প্রজেক্টের জন্য ডাটাবেইজ ডিজাইন করি। সেই সাথে গ্রিড প্রজেক্টের জন্য চ্যাটিং এপ্লিকেশন ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ শেষ করি। অতঃপর আমার হাতে কাজ আসে গ্রিডের ক্লাস্টার ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ করার। এই সময়ে সাউথ আফ্রিকার জন্য একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরীর কথা শুরু হয়। আমি এবং সিদকী (মানযুরুর রহমান খান) প্রথমে এই সার্চ ইঞ্জিনের জন্য ১৮ দিনের একটি গবেষণা শুরু করি। তারপরে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য টিম গঠন থেকে শুরু করে তার ডেভেলপম্যান্ট এ যুক্ত ছিলাম পরের এক বছর। এর মধ্যেই গ্রিডের লোকেশন বেইসড সার্চের কাজ শেষ করি। সার্চ প্রোডাক্ট ম্যাচিউর হলে পরে আমি এসডিএসএল থেকে সাস্টে সুইচ করি।

সুবিন : সেখানে সার্চ ইঞ্জিন প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতাই কি পরবর্তিতে সাস্টে এসে পিপীলিকা তৈরির মূল কারণ?
সজীব : পিপীলিকা তৈরীতে যে অভিজ্ঞতা লেগেছে সেটা এসেছে এসডিএসএল থেকেই। কারণ আমার সহকর্মীরা সবাই বেশ ভালো প্রবলেম সল্ভার এবং বন্ধু ছিল। আমি তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। তবে পিপীলিকা তৈরীর মূল কারন আসলে বাংলা কম্পিউটেশনের পথটিকে সুগম করা। আমি প্রথমে বুঝতেও পারিনি আমি শেষমেষ পিপীলিকা তৈরী করতে পারব।

সুবিন : বাংলা সার্চ ইঞ্জিন তৈরিতে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল, এবং সেটি কিভাবে অতিক্রম করেছ?
সজীব : প্রায় তিন বছরে আমি ৩০ জনেরও বেশী ছাত্রের সাথে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় টুলস নিয়ে কাজ করেছি। এর প্রায় সবই পরবর্তীতে এই ইঞ্জিন তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয়তা অভিজ্ঞতা যুগিয়েছে। আমি প্রথম যে থিসিস গ্রুপগুলির সাথে কাজ করার সুযোগ পাই, তারা সাস্ট ২০০৪ ব্যাচের। এদের মধ্যে দুইটি গ্রুপ ছিল যারা ওয়েব ক্রলার এবং লোকেশন বেসড সার্চ নিয়ে কাজ করে আমার সাথে। এই ব্যাচের এআই সাবজেক্ট আমি পড়িয়েছিলাম। এর ল্যাব প্রজেক্টে একটি গ্রুপ আমার সাথে এডাপ্টিভ স্পেল চেকার নিয়ে কাজ করে। সাস্ট ২০০৫ এর অনেকগুলি গ্রুপ পরবর্তীতে আই আর নিয়ে কাজ শুরু করে। একটি গ্রুপ ওয়েব ক্রলার কন্টিনিউ করে। একটি গ্রুপ বাংলা ডকুমেন্টের কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান নিয়ে কাজ করে। একটি গ্রুপ ওপেনসোর্স এর লুসিনি (lucene)-তে বাংলা ইউনিকোড সাকসেসফুলি সাপোর্ট দেয়। সেই সাথে ওয়েব ক্রলারের ক্রল করা ডাটা লুসিনিতে সার্চেবল করে। সেই সাথে তৈরী হয় পিপীলিকার ইউজার ইন্টারফেস। একই রকম ভাবে সাস্ট ২০০৬ ব্যাচের অনেকগুলি গ্রুপ আই আর নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা স্টেমিং, কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান, লোকেশান বেইসড সার্চের উপর কাজ শুরু করে। সাস্ট ২০০৭ ব্যাচ স্ট্যামিং এবং কি-ওয়ার্ড এর কাজে বেশ অগ্রগতি নিয়ে আসে। তারপরেই আমি বুঝতে পারি যে পিপীলিকা আমরা লাইভ করতে পারব। এর মধ্যে ২০০৫ ব্যাচ এর পিপীলিকার নামকরন সহ উইজার ইন্টারফেস এর মাধ্যমে বাংলা কন্টেন্ট সার্চ করার বেসিক টুলসটি আমি সব জায়গায় প্রেজেন্টেশনে দেখাই। এই টুলসটি পরে একটি সফটওয়্যার কম্পিটিশনে প্রথম হয় এবং জিপিআইটি এই প্রোডাক্ট এর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়, যার জন্য আমরা সবাই এখন পিপীলিকা ব্যাবহার করতে পারছি। যদিও আমি যতদূর ভেবে রেখেছি ততদূর পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য আমাদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হবে তবুও আমাদের হাতে স্মল স্কেলে একটি সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে তা মোটেও কম কথা নয়।

সুবিন : তার মানে আমরা বুঝতে পারছি, কেবল প্রযুক্তিই নয়, সাথে বাংলা ভাষার উপরও তোমারদের গবেষণা করতে হয়েছে।
সজীব : অবশ্যই। এখানে আই আর এর উপর কাজ সহ বেঙ্গলি এনএলপি, এবং লিঙ্গুইস্টিকের উপর অনেক বেসিক কাজ আমাদের করতে হয়েছে। শুধু মাত্র তাই নয়। এই কাজের জন্য আমাকে মেশিন লার্নিং নামক একটি কোর্স ডিপার্টমেন্টে পড়াতে হয়েছে, যাতে করে আমার ছাত্ররা এনাফ নলেজ গেইন করে পিপীলিকায় কাজ করতে পারে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, এমন কারো কারো ধারণা, সার্চ ইঞ্জিনে ওয়েবসাইট থেকে ডাটা ডাটাবেজে সেভ করা হয়, আর কোনো কিছু জানতে চাইলে ডাটাবেজের উপর কুয়েরি চালানো হয়, তাতেই একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টা হয়ত তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু ফেসবুকে আমি সেটি দেখেছি। তুমি কি ভবিষ্যতে আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য সার্চ ইঞ্জিনের আর্কিটেকচার নিয়ে একটা লেখা দিবে? এতে শিক্ষার্থীরা যেমন শিখতে পারবে, তেমনে সেসব ডেভেলাপারদেরও চোখ খুলবে বলে আমার ধারণা।
সজীব : অবশ্যই লিখব। আমি আমেরিকা চলে আসার কারনে পিপীলিকার কাজের উপর ডকুমেন্টেশান করে উঠতে পারিনি। তবে আশা করছি এবার শুরু করব।

সুবিন : পিপীলিকা ছাড়াও সাস্টে আরো প্রজেক্টে তুমি কাজ করেছ। সেগুলো সম্পর্কে একটু বলো।
সজীব : সাস্টে অনেকগুলি প্রজেক্টে আমি কাজ করার সু্যোগ পেয়েছি। তার মাঝে এডমিশন সিষ্টেম নিয়ে কিছু কাজ করেছি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য মঙ্গলদীপ আর সুবচন নিয়ে কাজ করেছি, এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর অটোমেশান এর কাজ করেছি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমি কী-ওয়ার্ডলেস ডাটাবেস ম্যাপিং এর এলগরিদম ডিজাইন করেছি।

সুবিন : তোমাদের এসব প্রজেক্টে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা কেমন ছিল?
সজীব : মঙ্গলদীপ সুবচনের জন্য আমার কাজ মূলত আর্কিটেকচার লেভেলের। এই দুইটি কাজের জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারের সায়েন্স এন্ড আইসিটির ফান্ড পেয়েছি। এই ফান্ড ব্যবহার করে আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সুবচন এবং মঙ্গলদীপ সফটওয়্যার হিসেবে প্রকাশ করি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরাই প্রথমবার সিষ্টেম ইমপ্লিমেন্ট করে। পরে আমরা প্রায় ৮ জন শিক্ষক মিলে একে প্রফেশনাল প্রোডাক্টে রুপ দেই। আর পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা ক্লাউড বেইসড এডমিশন সিস্টেম প্রবর্তন করি। যেখানে আপনিও আমাদের সাথে ছিলেন। তাছাড়া, বিআইডব্লিঊটিএ (BIWTA) এর প্রজেক্টেও আপনি ও আপনার কোম্পানী আমাদের সাথে কাজ করেছে। তাই আপনি ভালোই জানেন।

সুবিন : বিআইডব্লিউটএ-এর অটোমেশন প্রজেক্টের একটা অংশ ছিল ভেসেল ট্র্যাকিং ডিভাইস বানানো। যেই কাজটা অর্থায়ন করে আমার কোম্পানী, মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড। কাজটি তোমার তত্ত্বাবধানে দুজন ছাত্র সম্পন্ন করে। সেখানে আমি দেখেছি, গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের বেশিরভাগই তুমি তোমার ছাত্রদের দিয়ে দিয়েছ। সেটির কারণ কী?
সজীব : এটা সবসময়েই হয়েছে। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা সবসময় আমার থেকে বেশী আয় করেছে। আমি সবসময় সেটি বেশ এঞ্জয়ও করেছি। আমার প্রায় সবগুলো প্রজেক্টের মূল্যমান ছিল চার কোটি টাকা। এই প্রজেক্টে যারাই কাজ করেছে আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে ঢাকার সফটওয়্যার কোম্পানী গুলির কাছাকাছি সম্মানী দেওয়ার জন্য। আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে মনের দিক থেকে, মানের দিক থেকে এবং মূল্যায়নের দিক থেকে যথার্থ সম্মান দেওয়ার জন্য।

সুবিন : এবারে একটু অন্য আলাপে আসি। তোমার শিক্ষকতা পেশায় আসার কারণ কি?
সজীব : এসডিএসএলে আমি প্রায় সবকিছুই পেয়েছিলাম এই কথাটা সত্যি। কিন্তু তবুও, সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে আমি যতখানি কাজ করতে চেয়েছিলাম তা পারিনি। আমার মনে হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে আমি সেই সুযোগ পাব। কিন্তু শাবিপ্রবি এবং সিএসই ডিপার্টমেন্ট আমার এই ভাবনা কে কয়েকটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা দেয়। আমি ২০০৯ সালে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিএসই কার্নিভালে গিয়ে বুঝতে পারি সবাই মানে আমার শিক্ষক এবং জুনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা ধরেই নিয়েছে যে আমি সাস্টে যাব। এই ব্যাপারটি আমাকে সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্ট এনে দেয়। যেই কারনে আমি আমার তখনকার বেতনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ সেলারীতে জয়েন করি। আমি আমার ফ্যামিলির ব্যায়ভার বহন করি আমার পুরনো কোম্পানির সেলারী একাউন্ট থেকে। আমি কখনো ভাবিনি আমি কোনো প্রজেক্ট পাব। শুধুমাত্র সাস্ট এর ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আর সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্টের কারনেই আমি সিএসই তে জয়েন করে ফেলি।

সুবিন : তোমার কি মনে হয় যে  ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তি সময়ে শিক্ষক হিসেবে সাস্টের সিএসই বিভাগে থাকার কারণে তুমি বাড়তি অনেক সুবিধা পেয়েছ, যা অন্য জায়গায় হয়তো পাওয়া যেত না?
সজীব : অবশ্যই। আমি মনে করি ব্রিলিয়ান্ট বা জিনিয়াস শব্দগুলো আমার সাথে যায়না। তবে সাস্টে আমি খুব উদ্দীপনামূলক একটা পরিবেশ আমি পেয়েছিলাম যে কারনে খুব আগ্রহ নিয়ে পরিশ্রম করে নিজের মেরিটকে আমি একটু হলেও প্রকাশ করতে পেরেছি। ছাত্র জীবনে আমি অনেক পড়ালেখা করেছি আর অনেক বেশী জানার আগ্রহের সাথে এর একটি অন্যতম কারণ ছিল কম বুঝতে পারা। সাস্ট সবসময়ই আমাকে যেকোন শূণ্যস্থান পূরন করে নেওয়ার জন্য প্রেরণা দিয়েছে। যখন শিক্ষক হয়েছি তখনও আমি একই রকম অনুভূতি পেয়েছি। তবে এই কথাগুলি যেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীকে কষ্ট না দেয়। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের একটা নিজস্ব সুর আছে। সেই সুরে নিজেকে ঠিকমত টিউন করে নিলে আর নিজের আগ্রহ অনুযায়ী পরিশ্রম করতে পারলেই সবার উন্নতি আসবে। সাস্টে আমার শিক্ষকরা, আমার সিনিওর, বন্ধু এবং জুনিয়র সবাই আমাকে আমার নিজের মত করে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

সুবিন : তুমি যে মেশিন লার্নিং কোর্সের কথা বললে, আমাদের সময়ে তো সেই কোর্সটি ছিল না। পরে অবশ্য আমি Coursera থেকে প্রফেসর Andew Ng-এর মেশিন লার্নিংয়ের কোর্সটি করি। চমৎকার বিষয়। তোমার কি মনে হয় MOOC (Massive Open Online Course) থেকে আমাদের শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকরা উপকৃত হতে পারেন?
সজীব : অবশ্যই উপকৃত হতে পারবে। আমি নিজে মেশিন লার্নিং এর জন্য এই রকম কয়েকটা কোর্সের সাহায্য নিয়েছি। আমি যদি মেশিন লার্নিং এ পড়ার জন্য মাষ্টার্স বা পিএইচডি এর জন্য অপেক্ষা করতাম তবে তা কোনদিনও সম্ভব হতোনা। আমি ততটুকুই শিখেছি যতটুকু আমার প্রয়োজন এবং তারপরে আমি তা শিখিয়েছি। MOOC সবাইকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে। যে কেউ তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটা কোর্স করে, আনুষঙ্গিক হোম ওয়ার্ক করে নিজের জন্য দরকারী অভিজ্ঞতাটুকু নিয়ে নিবে। এটাই MOOC এর একটা শক্তিশালী দিক।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে যদিও তুমি খুব বেশিদিন সরাসরি কাজ করো নি, কিন্তু সাস্টের শিক্ষক থাকাকালীন তুমি বেশ কিছু সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করেছে। সেগুলোকে কাছ থেকে দেখেছ। দেশের সফটওয়্যার শিল্প নিয়ে তোমার মূল্যায়ন কী?
সজীব : মূল্যায়ন মিশ্র। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক মেধাবী লোকজন আছে। এটা শুধুমাত্র আমি নই সবাই জানে। কিন্তু এদেরকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে এগিয়ে আসতে রাজি না। অনেকেই মনে করে সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এই কারনে দেশে সত্যিকার অর্থে ব্যবসা করাটা কঠিন। তবে এত কিছুর পরেও অনেকে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং করে এখনো নিজের কোম্পানিটিকে টিকেয়ে রাখছেন। এতে করে আমাদের এখন পর্যন্ত কিছু সুনাম হয়েছে। আমি বলব এই সুনামটুকু নিয়ে আমাদের উচিৎ মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশে নিজেদের সফটওয়্যার বা সার্ভিস সেল করার জন্য সবার এক যোগে এগিয়ে আসা। এতে করে আমাদের বাজারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসবে।

সুবিন : তুমি যেহেতু বাংলা সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে নিজের উদ্যোগে কাজ করেছ, তাতে খানিকটা বোঝা যায় যে বাংলা ভাষার প্রতি টানটা তোমার একটু বেশিই। তো বাংলা ভাষা শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যাপারে তোমার কি অভিমত?
সজীব : আমার নিজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা অনেকটা ব্যক্তিগত। আমি বরং আমার জানামতে কয়েকটা গবেষণার কথা বলি। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবারই নিজের ভাষার প্রতি একটা দূর্বলতা থাকে। প্রায় সবাই মনে করে নিজের ভাষায় পড়তে পারলে কোন একটা কঠিন টপিক হয়তো আরেকটু সহজ মনে হতো। এজন্যই অনেক উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট গুলিকে তাদের মাতৃভাষায় পড়ানো হয়। আমাদের দেশেও একজন ছাত্র বা ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একটি বিষয়ে চার বছর ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করেও তার বিষয় সম্পর্কে ইংরেজীতে প্রায় কিছুই বলতে পারেনা। এদেরকে যদি অন্তত কয়েকটা বেসিক বিষয়ে বাংলায় পড়িয়ে তার সাথে ইংরেজীর টার্ম গুলিও পরিচয় করানো যেত তবে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেত। তাই আমি মনে করি মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ার সুযোগ করার জন্য আমাদের সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে আসা উচিৎ।

সুবিন : আমাদের দেশে অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা কারণে-অকারণে নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। আমি যদি তাদের মনে করিয়ে দেই যে সাস্টে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার সময় তোমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না, তারপরেও তুমি ছিলে ভার্সিটির সেরা প্রোগ্রামারদের একজন, আবার সেই সাথে তোমার ক্লাসের ফার্স্ট বয়, তাতে তুমি নিশ্চয়ই মাইন্ড করবে না। এ ব্যাপারে তোমার কী বক্তব্য?
সজীব : প্রথমত, আমি অবশ্যই মাইন্ড করবনা। আমি বরং খুশী মনেই এই কথাটা স্মরণ করি। এমনকি ৪র্থ সেমিষ্টার পরে আমার আর শাবিপ্রবিতে পড়ালেখা করারও কথা ছিল না। তবু সবকিছু কেমন করে মিলে যায়। যারা মনে করে তারা বঞ্চিত তাদেরকে এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আমি নিজেকে যখন এই অবস্থায় পেয়েছি তখন আমি কি করতে পারি তা নিয়ে অনেক ভেবেছি। কখনো খারাপ লেগেছে, আবার ঠিক তারপরেই ব্যাপারটিকে আমার নিজের কাছে এডভেঞ্চার মনে হয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটিং রিসোর্স ব্যাবহার করে বড় হয়েছি। বন্ধুরাও আমাকে সাহায্য করেছে। অনেক বড় ভাইদের কাছে আমি বই চেয়ে নিয়ে এসেছি। আমার প্রথম বড় প্রোগ্রামটি লিখি আমার খাতায়। সেটা ডিবাগ করি খাতায়। পড়ে তার একটা অংশ আমি কোড করে সঠিক উত্তর পেয়েছি। এতে করে আমি প্রোগ্রামিং পারব কিনা সেই ভূতটা চিরতরে বিদায় নিয়েছিল। যারা নিজেকে বঞ্চিত মনে করে তাদেরকেও আমি বলব নিজের আশেপাশের যতটুকু সুযোগ আছে ততটুকুই কাজে লাগানোর জন্য। একসময় এই অভিজ্ঞতাগুলি আসল কাজের ক্ষেত্রে বিশাল এক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। আমি শিক্ষক হওয়ার পরেও খুব একটা রিসোর্স পাইনি। কিন্তু আমি কখনোই অভিযোগ করিনি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে গবেষণার প্রপোজাল লিখে ফান্ড জোগাড় করার চেষ্টা করেছি। সেই ফান্ডের করা কাজ থেকে লভ্যাংশ আমার ডিপার্টমেন্টকে অনেকদিন সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। যে কেউ চাইলেই অভিযোগটুকু বাদ দিয়ে নিজের চারপাশের রিসোর্স দিয়ে একজনের প্রয়োজনীয়তাকে ধীরে ধীরে মেটাতে পারে। এতে হয়তো সময় লাগবে কিন্তু যেই অভিজ্ঞতাটুকু অর্জন হবে তা সারা জীবনের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : সজীব, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার ব্যস্ত জীবন থেকে তিন ঘণ্টা সময় দেওয়ার জন্য।
সজীব : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। এত ধৈর্য্য নিয়ে আমার কথা শোনার জন্য।

কোন ভার্সিটিতে সিএসই পড়ব ?

সিএসই পড়ব, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে কোনটা ভালো হবে? এই প্রশ্ন আমার ইনবক্সে, বইয়ের ফেসবুক পেজে, বিভিন্ন গ্রুপে দেখতে দেখতে আমি হয়রান। উত্তরটা লিখে দেই এখানে। উত্তর পছন্দ হলে কেউ এই প্রশ্নটা করলে তাকে উত্তরটা দিয়ে দিবেন। লক্ষ রাখতে হবে, আমার বক্তব্য কেবল সিএসই বা অনুরূপ বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য, আর এগুলো আমার ব্যক্তিগত মতামত।

বাংলাদেশে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার দুইটা উদ্দেশ্য থাকতে পারে, এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী হওয়া, দুই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। আরেকটা অবশ্য আছে, সার্টিফিকেট পাওয়া, তবে তারা আমার আলোচনার বিষয়বস্তু না।

যারা কম্পিউটার বিজ্ঞানী হবে, তারা যেকোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই হয়, কারণ আমাদের দেশের কোনো প্রাইভেট ভার্সিটিই বিদেশে খুব পরিচিত নয়। তাই এখানে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাবে না। যেখান থেকেই পড়, জিপিএ ভালো থাকলে এবং জিআরই-টোফেলে ভালো স্কোর থাকলে তোমার সুযোগ থাকবে।

এবার আসি যারা সফটওয়্যার তৈরির কাজ করতে চাও। ভালো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির সুযোগ অনেক (দেশে এবং বিদেশে) আর বেতনও ভালো। আমি যদ্দূর জানি, এই কারণেই পোলাপান সিএসই পড়তে চায়।

ধরা যাক, বাংলাদেশে ৮০টা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে, এবং সেগুলোর একটা ranking করা হলো। এখন সমান মেধার দুই বন্ধুর একজন ১ নম্বর ভার্সিটিতে পড়ল, আরেকজন পড়ল ৮০ নম্বর ভার্সিটিতে। ৮০ নম্বরেরটায় যে পড়বে, সে যদি ঠিকমতো প্রোগ্রামিং শেখে, চর্চা করে, সফটওয়্যার তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে, আর ১ নম্বর ভার্সিটিতে পড়ুয়া বন্ধু যদি কেবল গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রথম জন, যে ৮০ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, সে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কারণ সফটওয়্যার প্রকৌশলবিদ্যায় ভালো করতে হলে কাজ জানা প্রয়োজন এবং পরিশ্রমীরাই এখানে ভালো করে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে, শিক্ষকরা কেমন। কথা হচ্ছে, কম্পিউটার সায়েন্স কিন্তু অন্য বিষয়ের মতো নয়, যে অমুক ভার্সিটিতে ভালো পড়ায়, তাই সেখানের শিক্ষার্থীরা ভালো। বেশিরভাগই নিজে নিজে শিখতে হয়, শিক্ষক কেবল অনুপ্রেরণা দেন। এখানে একজন তরুণ শিক্ষকও অনেক অনুপ্রেরণা দিতে পারেন, আবার পিএচইডি করা শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়বস্তু বোরিং করে তুলতে পারেন। তাই ডিগ্রীর দিকে না তাকিয়ে খোঁজ নিতে হবে, কোন ভার্সিটিতে এমন শিক্ষক বেশি যারা মনমানসিকতায় তরুন, শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করেন – অনেকটা Dead Poets Soceity-এর মিস্টার কিটিংসের মতো। শিক্ষকরাই পারেন অন্যরকম একটি কালচার তৈরি করতে।

এছাড়া যেসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে :
খরচ : শুধু টিউশন ফি ছাড়াও ভার্সিটিতে আরো অনেক খরচ থাকে। তাই খুব ভালো করে খোঁজ নিতে হবে।
যাতায়াত : বাসা থেকে দূরত্বের ব্যাপারটিও হিসাবে আনতে হবে। ভার্সিটিতে যাতায়াত করতে প্রতিদিন রাস্তার তিনঘণ্টা সময় ব্যায় করা কোনো সৃজনশীল ছাত্রের কাজ হতে পারে না। ব্যপারটি অস্বাস্থ্যকরও বটে।
বন্ধু : তোমার ভালো বন্ধুরা কোথায় পড়বে, সেটাও একটা বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।

আর ভর্তি হওয়ার পরে ক্লাস শুরুর আগ পর্যন্ত যে সময়টা পাওয়া যায়, সেসময়ে একটা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে ফেললে সবচেয়ে ভালো হয়। তাহলে ক্লাস শুরু হলে কোনো চাপ পরে না, নইলে প্রোগ্রামিং নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। আর এই বিষয়গুলো শিক্ষক ক্লাসে পড়ান আর নাই পড়ান, নিজে নিজে পড়ে বা বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে আয়ত্বে আনতে হবে। এগুলো না শিখলে রেজাল্ট ভালো হলেও বিপদে পড়বে।

স্ট্রাকচার্ড প্রোগ্রামিং, অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং, ডিসক্রিট ম্যাথমেটিকস, ডাটা স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম, ডাটাবেজ, কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, ওয়েব প্রোগ্রামিং, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সফটওয়্যার অ্যানালাইসিস ও ডিজাইন। মোটামুটি সব ভার্সিটিতেই এগুলো পড়ায়। এসব বিষয়ে ওস্তাদ হয়ে যেতে হবে।

আর ক্যারিয়ার বিষয়ক এই লেখাটাও দেখতে পারো :  http://blog.subeen.com/?p=175

তোমাদের জীবন সুন্দর হোক, ভালো প্রোগ্রামার হও, পাশ করে ভালো চাকরি পাও, অনেক টেকাটুকা কামাও, এই দোয়া রইল। 🙂

প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গড়তে ৫টি টিপস্

ধরা যাক, তুমি প্রোগ্রামিং ভালোই পারো। তোমার হয়ত কম্পিউটার সায়েন্সের উপর কোনো ডিগ্রী নেই, কিন্তু তুমি প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী।  কিংবা ডিগ্রী নিচ্ছ কিন্তু বুঝতে পারছ না যে কিভাবে তুমি তোমার সিভিতে নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরতে পারবে যাতে কোম্পানীগুলো বুঝতে পারে যে তুমি আসলেই কাজ জানো। প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ারে কাজ করতে পারাটাই আসল, ডিগ্রী না থাকলেও চলে।

কিভাবে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করবে?

১) প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন : তুমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী হও, তাহলে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতাগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহন করতে পারো। এসিএম আইসিপিসি’র ঢাকা রিজিওনাল প্রতিযোগিতায় শীর্ষ দুই বা তিনটি দলের মধ্যে থাকলে তোমার গুগল বা ফেসবুকে ইন্টারভিউ দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়। তুমি কম্পিউটার সায়েন্সে পড় নাকি ফিজিক্সে পড়, এটি নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা থাকবে না। আরেকটি সুবিধা হবে, দেশের শীর্ষ প্রোগ্রামারদের সাথে তোমার জানাশোনা হবে।

২) প্রোগ্রামিং ব্লগ : তুমি প্রোগ্রামিং বিষয়ক ব্লগ লেখতে পারো। প্রতিদিন প্রোগ্রামিং করতে গিয়ে তুমি যা শেখো, সেগুলো লিখে রাখতে পারো নিজের ভাষায়। কোনো সমস্যায় পড়লে কিভাবে সেই সমস্যার সমাধান করলে, সেটিও লিখে রাখতে পারো। এতে অন্যরা যেমন উপকৃত হবে, তেমনি তোমার একটি পরিচিতি তৈরি হবে এবং সিভিতে তুমি তোমার ব্লগের লিঙ্ক দিয়ে দিবে। এতে যিনি তোমার ইন্টারভিউ নিবেন, তিনি সেটি দেখে তোমার দক্ষতা সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পাবেন। কিন্তু খবরদার, নিজের ব্লগে অন্যের লেখা চুরি করবে না।

৩) ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি : তুমি নিজে বিভিন্ন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে সেগুলো ইন্টারনেটে হোস্ট করে রাখতে পারো। আর নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে সবকিছু সাজিয়ে রাখো, এটাকে পোর্টফোলিও (Portfolio) বলে। তুমি কোন লেভেলের ওয়েব ডেভেলাপার, সেটা তোমার পোর্টফোলিওই বলে দেবে।

৪) মোবাইল অ্যাপ : তুমি যদি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করতে পারো, তাহলে নিজে নিজে কিছু আইডিয়া বের করে, বা অন্যের আইডিয়া দেখে কয়েকটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বানিয়ে ফেলো এবং হোস্ট করে রাখো। আর ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় একটি অ্যান্ড্রয়েড (বা আইফোন, তুমি যেই প্ল্যাটফর্মে কাজ করো) মোবাইল সাথে রাখবে যেখানে তোমার তৈরি অ্যাপগুলো ইনস্টল করা থাকবে।

৫) বিভিন্ন ফোরামে অংশগ্রহন : বিভিন্ন ফোরামে কিংবা গ্রুপে মাঝে-মধ্যে সময় দাও। সেখানে অন্যরা যেসব সমস্যা দিয়ে সাহায্য চেয়েছে, সেগুলো সমাধান করে দাও (ক্লাশের এসাইনমেন্ট করে দিবে না কিন্তু!)। এতে তোমার দক্ষতা যেমন বাড়তে, তেমনি অন্য প্রোগ্রামারদের নজরেও তুমি পড়ে যাবে!

তোমার জন্য শুভকামনা রইল।

বি.দ্র. আরো কোনো টিপস্ জানা থাকলে দয়া করে মন্তব্যে লিখুন। ধন্যবাদ।