আলফাগো বনাম লি সেডল – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষ

ডিপ ব্লু-এর পর এবার আলফাগো। আবারো কম্পিউটারের সঙ্গে খেলে মানুষের হার! ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে। গুগলের ডিপমাইন্ড ইউনিটের তৈরি “গো” খেলার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম “আলফাগো” পরপর তিনবার হারিয়ে দিলো ৩৩ বছর বয়সি পেশাদার কিংবদন্তী  “গো” খেলোয়ার লি সিডলকে। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চারটিতেই জিতেছে “আলফাগো”। পরপর তিনবার হারার পর চতুর্থ ম্যাচে এসে জয় পান লি সিডল। এই একটিমাত্র জয়কে তিনি “অমূল্য” হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রথম গেমটিতে হারার পর লি সাংবাদিকদের বলেনঃ “আমি খুবই অবাক হয়েছি। আমি হারবো এটা কখনো ভাবিনি। আলফাগো এত ভাল খেলবে এটা আশা করিনি।”

গো অথবা ষোলগুটি বা বাঘবন্দিঃ

“গো” নামক কয়েক হাজার বছরের পুরানো গেমের উদ্ভব হয় চীনে। খেলাটি অনেকটা আমাদের দেশের ষোলগুটি বা বাঘবন্দি খেলার মত। একটি নির্দিষ্ট বোর্ডে সাদা এবং কালো গুটি নিয়ে দুইপক্ষকে খেলতে হয়। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের গুটি আটকে বোর্ডের দখল নেয়া। যে বোর্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকা দখল করতে পারবে, সেই বিজয়ী। দাবা খেলার সাথে এই খেলার বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে অসংখ্য সম্ভাবনাময় চাল থাকে। কেবলমাত্র গাণিতিক হিসাব করে সম্ভাব্য চাল বের করা অসম্ভব।

“গো” খেলার জন্য গুগল ডিপমাইন্ড “আলফা-গো” কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে। এটির অ্যালগোরিদম মেশিন লার্নিং এবং ট্রি সার্চিং প্রযুক্তি সমন্বয়ে করা হয়েছে। এতে পলিসি এবং ভ্যালু নেটওয়ার্ক হিসেবে দুইটি নিউরাল নেটওয়ার্ক আছে। পলিসি নেটওয়ার্কটি সম্ভাব্য সেরা চালটি দ্রত হিসাব করতে পারে এবং ভ্যালু নেটওয়ার্কটি প্রতিটি চালের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় চালগুলো বাদ দিয়ে সম্ভাব্য চালের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে।মানুষের এই “অপ্রয়োজনীয়” চাল বাদ দেয়ার সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে অবশেষে ভাগ বসালো আলফাগো। আলফাগো-এর প্রাথমিক পর্যায়ে, একে বিভিন্ন এক্সপার্ট গেমারের ঐতিহাসিক গেমের চালগুলো মনে রাখতে বলা হয়েছিল, ৩০ মিলিয়ন চালের একটি ডাটাবেস থেকে। পরবর্তীতে একটি নির্ধারিত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের পর রি-ইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এর সাহায্যে আলফা-গো-এর সক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যে এটি নিজে নিজে খেলার দক্ষতা অর্জন করে।

আলফাগো বনাম লি সেডলঃ

আলফাগো বনাম লি সেডল-এর “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ ম্যাচ” সিওলে ৯ মার্চ-এ শুরু হয়ে ১৫ মার্চ শেষ হয়। প্রথম ম্যাচটিতে আলফাগো জয়লাভ করে যদিও পুরো ম্যাচের বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল লি-এর আধিপত্য। কিন্তু শেষ ২০ মিনিটে আলফাগো আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচ জিতে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খেলার প্রথমদিকে লি  আলফাগো-এর ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ বড়সড় একটি ভুল করে বসেন। সেই ভুলের উত্তরে আলফাগো-এর চালটি ছিল একেবারে নিখুঁত এবং কার্যকরী।

চতুর্থ ম্যাচ, যেটিতে লি জয়লাভ করে মানবজাতির মানসম্মান রক্ষা করে, সেখানেও ৭৮ নাম্বার চাল পর্যন্ত আলফাগো-এর জিতে যাওয়ার সম্ভবনা ছিল ৭০%। কিন্তু ৭৯ নাম্বার চালে ভুল করে ফেলার কারণে আলফাগো বঞ্চিত হয় লি সেডলকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ থেকে।

১৮টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী পেশাদার গো খেলোয়ার লি সেডল ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন যে শুরুর দিকে তিনি আলফাগো-এর খেলোয়াড়ি দক্ষতাকে অবজ্ঞা করেছিলেন। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস বলেন, এ পরাজয় মূল্যবান। কারণ, এ থেকে আমরাও আমাদের প্রোগ্রামের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারবো। “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ”-এর বিজেতা হিসেবে আলফাগো এক মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার জিতে নিয়েছে। ডিপমাইন্ড-এর বিবৃতি অনুযায়ি এই পুরষ্কারের অর্থ ইউনিসেফ, গো অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। ম্যাচ শেষে “সাউথ কোরিয়া গো অ্যাসোসিয়েশন” আলফাগো-কে “গো গ্র্যান্ডমাস্টার” পদবী প্রদান করে।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

রাস্পবেরি পাই

 

পাঠ্যবিষয়কে সহজবোধ্য এবং বাস্তবরূপে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য স্মার্ট ক্লাসরুমের ধারণা আজকাল খুব জনপ্রিয়। একটি স্মার্ট ক্লাসরুমে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে কাগুজে পাঠ্যবিষয়কে ডিজিটাল রূপে উপস্থাপন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্মার্ট ক্লাসরুম বহুল প্রচলিত হলেও স্কুল পর্যায়ে এটি আমাদের দেশে খুব একটা প্রচলিত না। একটি বিদ্যালয়ের জন্য আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাহলে কি আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোতে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করা সম্ভব না? এক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যুক্তরাজ্য ভিত্তিক Raspberry  Pi  Foundation  এর তৈরি মিনি কম্পিউটার Raspberry  Pi  এর কথা।

রাস্পবেরী পাই কীঃ

রাস্পবেরী পাই হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড আকৃতির সিঙ্গেল বোর্ড কম্পিউটার। যুক্তরাষ্ট্রের রাস্পবেরি পাই ফাউন্ডেশন কর্তৃক এই মিনি কম্পিউটারটি মূলত তৈরি করা হয় স্কুলের বাচ্চাদের বেসিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করার জন্য। ক্রেডিট কার্ড সাইজের এই কম্পিউটারকে মনিটর , মাউস এবং কি-বোর্ডের সাথে সহজেই যুক্ত করে কাজ করা যায়।

রাস্পবেরি পাই কম্পিউটার
রাস্পবেরি পাই কম্পিউটার

রাস্পবেরি পাই একটি সাধারণ ডেস্কটপ কম্পিউটারের মতোই, এটি দিয়ে ইন্টারনেট ব্রাউজ করা ছাড়াও গেম খেলা, ওয়ার্ড প্রসেসিং ইত্যাদি কাজ করা যায়। আর প্রোগ্রামিং শেখার জন্যও এটি বেশ উপযোগি, কারণ পাইথন, স্ক্রাচ, সি ইত্যাদি প্রোগ্রামিং ভাষায় এতে প্রোগ্রামিং করা যায়। রাস্পবেরি পাই কম্পিউটারের মূল আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, এর মূল্য সাধারণের একদম হাতের নাগালে, মাত্র ৩৫ ডলারে পাওয়া যায় ক্ষুদে এই কম্পিউটারকে।

ইতিহাসঃ

স্কুলের বাচ্চাদের জন্য ছোট্ট এবং স্বল্পমূল্যের কম্পিউটার তৈরির চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় ২০০৬ সালে। তখন ইবেন আপটন, রব মুলিন্স, জ্যাক ল্যাং এবং এ্যালান মাইক্রফট্‌ ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন যে “এ লেভেল” শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার আগ্রহ এবং কম্পিউটার সায়েন্সের দক্ষতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যেখানে নব্বই দশকের আবেদনকারী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল শখের অভিজ্ঞ প্রোগ্রামার , সে পরিস্থিতি বিবেচনার ২০০০ সালের দিকে ক্যামব্রিজে আবেদনকারীর অধিকাংশই সামান্য ওয়েব ডিজাইন ছাড়া কিছুই জানত না। তখন হোম কম্পিউটার জনপ্রিয় হওয়ায় এবং স্কুলের আইসিটি কারিকুলামের আমূল পরিবর্তন হওয়ায় বাচ্চারা গেমস, ওয়ার্ড, এক্সেল, টুকটাক ওয়েবপেজ ডিজাইনের দিকে বেশি ঝুঁকে পরে। ফলে কমোডোর 64, স্পেকট্রাম জেডএক্স, বিবিসি মাইক্রো ইত্যাদি যেসব মেশিন দিয়ে পূর্বে প্রোগ্রামিং এর চর্চা হতো সেগুলোর জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।

কম্পিউটার সায়েন্সের জনপ্রিয়তা স্কুল পর্যায়ে বৃদ্ধি করার জন্য ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাস্পবেরী পাই এর বিভিন্ন প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়। ২০০৮ সালে যখন মোবাইলে ডিভাইসের জন্য ব্যবহার উপযোগী প্রসেসর শক্তিশালী এবং সহজলভ্য হয়, তখন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবরেটরীর চার বিজ্ঞানী  ইবেন, রব, জ্যাক ও অ্যালান,  হার্ডওয়্যার প্রস্তুতকারক কোম্পানি নরকট টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটে লোমাস এবং বিবিসি মাইক্রো গেম এলিটের সহ প্রণেতা ডেভিড ব্রাবেন একসঙ্গে মিলে ২০০৮ রাস্পবেরী পাই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। রাস্পবেরী পাই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর রাস্পবেরি পাই মডেল বি ব্যাপকভাবে প্রস্তুত করা শুরু হয় এবং দুই বছরে রাস্পবেরি পাই এর এই মডেলটি দুই মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়।

রাস্পবেরি পাই বি মডেল
রাস্পবেরি পাই বি মডেল

বৈশিষ্ট্যঃ

রাস্পবেরি পাই এর প্রথম সংস্করণ রাস্পবেরি পাই বি এর ছিলো ৫১২ মেগাবাইট র‍্যাম, দুটি ইউএসবি পোর্ট এবং ১০০ মেগাবিট ইথারনেট পোর্ট। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে রাস্পবেরি পাই বি+ বাজারে আসে। যেটিতে রয়েছে আগের মডেলের থেকে অতিরিক্ত ইউএসবি পোর্ট, মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট, উন্নত শব্দ এবং ৩.৫ মিলিমিটার ভিডিও জ্যাক।

প্রয়োজনীয় সকল সংযোগসহ একটি রাস্পবেরি কম্পিউটার
প্রয়োজনীয় সকল সংযোগসহ একটি রাস্পবেরি কম্পিউটার

রাস্পবেরি পাই কম্পিউটারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর মোবিলিটি। কার্ড সাইজের আকৃতি হওয়ায় এই কম্পিউটারকে অনায়সে পকেটে করে বহন করা যায়। প্রয়োজনমত মনিটর, মাউস, কিবোর্ডের সাথে যুক্ত করলেই হয়ে যায় ডেস্কটপ কম্পিউটার। শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারের কার্যপদ্ধতি বোঝানোর জন্য রাস্পবেরি পাই তৈরি করা হলেও ইনপুট/আউটপুট  পোর্ট থাকার কারণে একে আরডুইনো উনোর বিকল্প হিসেবে রোবটিক্স এ ব্যবহার করা যায়।

একই সাথে একে পোর্টেবল পিসি ও প্রোগ্রামেবল আই সি হিসেবে ব্যাবহার  করা যায় বলে রাস্পবেরি পাই  হ্যাকারদের কাছে অসীম সম্ভবনার দরজা খুলে দেয়। লিনাক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম হওয়ায় এর অপারেটিং সিস্টেমের জন্য বাড়তি কোনো মূল্যও পরিশোধ করতে  হয় না, কারণ লিনাক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম একটি মুক্ত ও বিনামূল্যে প্রাপ্ত অপারেটিং সিস্টেম। আর অপারেটিং সিস্টেম মুক্ত হওয়ায় আমরা এর পরিবর্তন ও পরিমার্জনও করতে পারি সহজেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই রাস্পবেরি পাই-এর মনিটর হিসেবে টেলিভিশনও ব্যবহার করা যায়।

২০১৫ সালে বাজারে এসেছে রাস্পবেরি পাই ২। রাস্পবেরি পাই কম্পিউটারের  এই সংস্করণের কোয়াড কোর এআরএম প্রসেসর পূর্বের সংস্করণের চেয়ে ৬ গুন বেশি শক্তিশালী। রাস্পবেরি পাই এর আগের সংস্করণ রাস্পবেরি পাই বি+ এর কিছু ফিচার পরিবর্তনের পাশাপাশি এই সিরিজে পাওয়া যাবে চারটি ইউএসবি পোর্ট এবং মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট। এছাড়াও রাস্পবেরি পাই ২ সংস্করণ কিনলে সাথে বিনামূল্যে পাওয়া যাবে উইনডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেম।

 

রাস্পবেরি পাই মডেল বি এবং রাস্পবেরি পাই মডেল বি+
রাস্পবেরি পাই মডেল বি এবং রাস্পবেরি পাই মডেল বি+

 বাংলাদেশে রাস্পবেরি পাইঃ

বাংলা পাই প্রকল্পঃ

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগের বাংলাদেশি ছাত্র তারিক আদনান বাংলা পাই প্রকল্পের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বল্পমূল্যের কম্পিউটার তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে বাংলা পাই প্রকল্পের কম্পিউটারে রাস্পবেরি পাই ব্যবহার করা হয়েছে যেটির রয়েছে ৯০০ মেগাহার্টজ্‌ গতির প্রসেসর এবং ৫১২ মেগাবাইট র‍্যাম। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সকল কাজ এই বাংলা পাই কম্পিউটার দিয়ে করা সম্ভব। এতে রয়েছে লেখালেখির সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং শেখার স্ক্র্যাচ সিস্টেম, পাইথনের কম্পাইলার, গান ও ভিডিও চালানোর সফটওয়্যার, বেশ কযেকটি গেমস এবং ওয়েবসাইট দেখার সফটওয়্যারসহ নানা কিছু। বাংলা পাই কম্পিউটারের মনিটর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠের ফ্রেম ও ১০.১ ইঞ্চি এলসিডি প্যানেল। সমগ্র এই কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ৬,২০০ টাকা ।

রাস্পবেরি পাই ক্লাস্টার কম্পিউটারঃ

গত মাসে (মে ২০১৫) রাস্পবেরি পাই দিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ক্লাস্টার কম্পিউটার তৈরি করেছেন সিলেটের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী।

রাস্পবেরি পাই দিয়ে ক্লাস্টার কম্পিউটার তৈরি প্রকল্পের সুপারভাইজার ছিলেন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের লেকচারার সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিল।

মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলটি স্বল্প খরচে ক্লাস্টার কম্পিউটার তৈরি করেছে। এখানে ৪টি রাস্পবেরি পাই কম্পিউটার একত্রিত করে ক্লাস্টার কম্পিউটারটি বানানো হয়েছে। তবে চাইলে ৩২টি কম্পিউটার একসঙ্গে করা যাবে।

রাস্পবেরি পাই দিয়ে তৈরি ক্লাস্টার কম্পিউটার
রাস্পবেরি পাই দিয়ে তৈরি ক্লাস্টার কম্পিউটার

বর্তমানে রাস্পবেরি পাই দিয়ে তৈরি এই ক্লাস্টার কম্পিউটারটি মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন ল্যাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাস্পবেরি পাই সিঙ্গেল বোর্ড কম্পিউটারটি বাংলাদেশে এখন বেশ সহজলভ্য। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটে এটি পাওয়া যাচ্ছে । এছাড়াও ফেসবুকে রাস্পবেরি পাই নিয়ে উৎসাহী লোকজনদের জন্য রাস্পবেরি পাই বাংলাদেশ নামক একটি পেজ রয়েছে যেখানে রাস্পবেরি পাই কম্পিউটার সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে জানা যাবে সহজেই।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং

রজনীকান্তের “রোবট” সিনেমাটার কথা মনে আছে? যেখানে চিট্টি নামের এক রোবট ছিল যাকে বলা হয়েছিল টিভি খুলার জন্য আর সে মাটিতে টিভিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, “আমাকে তো খুলতে বলা হয়েছে টিভি অন করতে তো বলা হয় নাই”।

আমরা কম্পিউটার বা মেশিন যাই বলি না কেন এদের নিজেদের কোন বোধশক্তি নেই। এদের যা নির্দেশনা দেয়া হয় এরা সেই নির্দেশনা (command) মত কাজ করে শুধু। আমরা মানুষরা সাধারণত  যে ভাষায় কথা বলি তা এরা বুঝতে পারে না। কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা ঠিকমত বোঝানোর জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে চলেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্গত এই শাখাটির নাম হলো ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, সংক্ষেপে এনএলপি।

কম্পিউটার ও মানুষের যোগাযোগ
কম্পিউটার ও মানুষের যোগাযোগ

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং কী
ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)-এর একটি শাখা যা মানুষের ভাষার বিশ্লেষণ করে সেটা বুঝে মানুষ এবং কম্পিউটারের সাথে মিথস্ক্রিয়া (Interaction) করে। এর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কম্পিউটারকে শেখানো যে কিভাবে মানুষ শিখে এবং ভাষার ব্যবহার করে। বিষয়টা কিন্তু অভিধান ব্যবহার করার মত সহজ-সরল কাজ নয়। অনেকসময় দেখা যায় একটি শব্দ ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
যেমনঃ
অরুনা ‘ভাল’ রান্না করে (বিশেষণ)।
আপন ‘ভাল’ সবাই চায় (বিশেষ্য)।
এই দুটি বাক্যতে ভাল শব্দটা আছে কিন্তু বাক্য দুটিতে শব্দটির পদ (Parts of speech) ভিন্ন।
এখন কথা হচ্ছে আমরা তো জানি এবং বুঝি বিশেষ্য কী জিনিস, বিশেষণ কী জিনিস। কিন্তু কম্পিউটার তো বুঝে না। তাই কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা বোঝানোর জন্য ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং-এর উদ্ভব।

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর টুলস
স্টানফোর্ড ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং গ্রুপ (The Stanford Natural Language Processing Group) ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর জন্য অনেক সফট্‌ওয়্যার তৈরি করেছে যেগুলো সবার জন্য সহজলভ্য। এর একটি উল্লেখযোগ্য সফট্‌ওয়্যারের নাম কোর এনএলপি (Stanford CoreNLP). এর মধ্যে ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং চাইনিজ ভাষার প্রসেসিং এর টুলস্ (tools) রয়েছে। স্টানফোর্ড এনএলপি (Stanford NLP) সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এই লিঙ্কে

এনএলপি কেন প্রয়োজন
অনেকের মনে এই পর্যায়ে মনে হতে পারে, কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা বোঝানোর দরকার কী? সে থাকুক না প্রোগ্রামিং করা আর গেমস খেলা নিয়ে। কিন্তু, এমন যদি হতো যে কম্পিউটারকে কোডের ইন্সট্রাকশন বলা মাত্র সে ঘটঘট করে কোডটা নিজেই লিখে ফেলতো! মজার ব্যাপার হচ্ছে স্পীচ রিকগনিশন (speech recognition) টেকনিকের এর মাধ্যমে কম্পিউটার এই কাজটা কিছুটা করতে পারে। IBM VoiceType হচ্ছে প্রায় এমনই একটা সিস্টেম। যেটা মানুষের বলা শব্দগুলোকে বিশ্লেষণ করে সাথে সাথে কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখায়।

আমাদের কাছে বর্তমানে Google Translate একটা জনপ্রিয় নাম। এটাও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর একটা খুবই সুন্দর অ্যাপ্লিকেশন। খুব দ্রুত কোন শব্দের যে কোন ভাষার অনুবাদ এটি খুব সহজে করে দেয়।

তথ্য খোঁজার চিরুনি অভিযান
ইনফরমেশন রিট্রাইভাল (Information Retrieval) নামক ন্যাচারাল  ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর আরেকটি টেকনিক আছে, যার মাধ্যমে বিশাল একটা তথ্য ভান্ডার থেকে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে আনা হয়। এই ধরনের সিস্টেমের কাজ শুরু করে যখন ইউজার সিস্টেমে একটা কুয়েরি (query) দেয়। সেই  কুয়েরি (query)-এর উপর ভিত্তি করে সিস্টেম শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক তথ্যসমূহ প্রদান করে থাকে। যেমনঃ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন।

বাংলা ভাষা এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং
বর্তমানে ইংরেজিতে ন্যাচারাল লাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর কাজ অনেক এগিয়ে গেলেও বাংলা ভাষায় এর কাজ ইংরেজির তুলনায় অনেক কম। বাংলা ভাষার জন্য গবেষণার কাজটি তো বিদেশীরা এসে করে দিবে না, বাংলাদেশের মানুষকেই সেটা করতে হবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার গবেষণার জন্য গবেষণাগার আছে। যেখানে বাংলা ভাষার প্রসেসিং নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশের সার্চ ইঞ্জিন “পিপীলিকা” বাংলা ভাষার প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র সার্চ ইঞ্জিন। পিপীলিকা তৈরি করার সময় ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং নিয়ে বেশ কিছু কাজ করতে হয়েছে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ গ্রামীণফোন আইটি  লিমিটেডের সহায়তায় তৈরি করেছে এই বাংলা সার্চ ইঞ্জিন। এটির উন্নয়ন কার্যক্রম এখনও চলছে।

ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্র
যদিও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর অনেক অ্যাপ্লিকেশন বর্তমানে আছে, কিন্তু সেসব অ্যাপ্লিকেশনের এর ফলাফল খুব একটা সন্তোষজনক নয়। মানুষ সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেসব কথা কোন NLP যন্ত্রের পক্ষে বিশ্লেষণ করে সঠিক অর্থ প্রকাশ করা যথেষ্ট কঠিন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের মানুষের ভাষা ভিন্ন, কথা বলার স্টাইল ভিন্ন। তবে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। হয়ত ভবিষ্যতে আমরা শতভাগ সঠিক কোন ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং সিস্টেম দেখতে পারবো। যা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্যের একটি মাইলফলক।

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি।

প্রোগ্রামিং এর আশ্চর্য জগত!

প্রোগ্রামিংয়ের আশ্চর্য জগতে স্বাগত!

তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ ইংরেজি সিনেমা দেখো। আবার অনেকেই দেখো না। তোমরা যারা ইংরেজি সিনেমা দেখো, প্রোগ্রামার শব্দটা শুনলেই তোমাদের মনে ভেসে ওঠে উশকো-খুশকো চুলের পুরু চশমা পরিহিত কোনো তরুণ, যে কী না ঠাস ঠাস করে দ্রুতলয়ে কম্পিউটারের কিবোর্ডের কি চাপছে আর একের পর এক নিরাপত্তা ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে বিভিন্ন সিস্টেমে, মানে হ্যাকিং করছে আর কী। আবার তোমরা যারা সিনেমা তেমন একটা দেখো না, প্রোগ্রামার শব্দটা শুনলে তোমাদের মনে ভেসে উঠবে গোবেচারা ধরনের কোনো যুবক যে অফিসের কম্পিউটার টেবিলের সামনে বসে অনবরত টাইপ করে চলে, আর আশেপাশে বস না থাকলে ফেসবুক খুলে বসে থাকে! এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে কম্পিউটার বলতেই আমরা যেমন মনিটর-কীবোর্ড কিংবা ল্যাপটপ বুঝি সেটি কিন্তু ঠিক হয়। যেই যন্ত্র কম্পিউট অর্থাৎ গণনা করতে পারে, সেটিই কম্পিউটার। হ্যাঁ, তোমার মোবাইল ফোন কিংবা ক্যালকুলেটরও একটি ছোট্ট কম্পিউটার। আবার গাড়ী কিংবা ওভেন – এখানেও আছে কম্পিউটার। এবারে আরেকটি মজার তথ্য দেই। প্রোগ্রামার বলতেই বেশিরভাগ মানুষের সামনেই কোনো ছেলের অবয়ব ভেসে উঠে, যদিও পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার ছিল একটি মেয়ে, অ্যাডা লাভলেস তার নাম।

fractal-65474_640

প্রোগ্রামিং কী
তোমরা জানো, কম্পিউটারকে মোটা দাগে দুইটা অংশে পৃথক করা হয়, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। হার্ডওয়্যার হচ্ছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আর সফটওয়্যার হচ্ছে সেসব যন্ত্রাংশ চালাবার জন্য লেখা নির্দিষ্ট সংকেত বা কোড। হার্ডওয়্যার কীভাবে কী করবে, সেটি নির্ধারণ করে সফটওয়্যার, যাকে আমরা কম্পিউটার প্রোগ্রামও বলে থাকি। কম্পিউটার প্রোগ্রাম হচ্ছে এক বিশেষ ধরণের ভাষায় লেখা সংকেত, যেগুলো সাজানো থাকে এমনভাবে যাতে করে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার সহজেই বুঝতে পারে তাকে ঠিক কোন কাজটা কীভাবে করতে হবে। পৃথিবীতে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের জন্য যেমন অনেক ভাষা আছে, তেমনি কম্পিউটারের জগতেও অনেক ভাষা আছে, যেগুলোকে বলে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ। যেমন: সি, সি প্লাস প্লাস, জাভা, পাইথন, পিএইচপি ইত্যাদি। এসব ভাষার কোনো একটি বেছে নিয়ে সেই ভাষার নিয়মকানুন মেনে ঠিকমতো কোড লিখলে তৈরি হয়ে যাবে কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার। তবে ভাষার নিয়মকানুন ঠিক রেখে শুধু কোড লিখে গেলেই সেটি প্রোগ্রাম হবে না, যেমনটি বাংলা ভাষায় নিয়মকানুন মেনে হাবিজাবি লিখলেই সেটি কবিতা হবে না। হ্যাঁ, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ভালো হতে হলে কবিদের মতো সৃজনশীল হওয়া চাই। সাথে অবশ্য আরেকটি জিনিস চাই- যুক্তি বা লজিক।

programmer

প্রোগ্রামারের কাজ কী
প্রোগ্রামারের কাজ হচ্ছে প্রোগ্রাম লেখা। প্রোগ্রামগুলো বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার হতে পারে। যেমন, গেমস, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, সাধারণ কোনো ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুকের মতো বিশাল ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিন, কম্পিউটার ভাইরাস, অপারেটিং সিস্টেম বা পরীক্ষার রুটিন তৈরি করার মতো সফটওয়্যার। দুনিয়ায় যে কত রকমের সফটওয়্যার আর কত কাজে যে সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। প্রোগ্রামাররা নিত্য নতুন সফটওয়্যার তৈরি করে চলেছেন। এত এত সফটওয়্যার, তাহলে পৃথিবীর সব সফটওয়্যার তো বানানো হয়ে যাবে একদিন, এমন ভাবনা কি তোমার মনে আসছে? মানুষ তো কত শত বছর ধরে গান গাইছে-লিখছে। তাই বলে কি পৃথিবীর সব গান লেখা হয়ে গেছে?

প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার
বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠানে কমবেশি কাজের সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ প্রোগ্রামার কাজ করতে চায় সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠানে। একজন ভালো প্রোগ্রামারের জন্য দেশে-বিদেশে কাজ করার সুযোগ রয়েছে ঢের। দেশের সীমারেখা কখনও কাজের প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। প্রতি বছরই বাংলাদেশের শীর্ষ কয়েকজন প্রোগ্রামার চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুকের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া দেশের ভেতরেও কাজের সুযোগ ক্রমাগতই বাড়ছে। একজন ভালো প্রোগ্রামারের কাছে প্রোগ্রামিং হচ্ছে নেশার মতো। নেশাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সৌভাগ্য পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক মানুষ লাভ করে, আর সেই স্বল্পসংখ্যক মানুষদের মধ্যে প্রোগ্রামাররা অন্যতম।

উচ্চশিক্ষায় প্রোগ্রামিং
এ তো গেলো সেসব মানুষের কথা যারা প্রোগ্রামিংকে পেশা হিসেবে নেবে। কিন্তু তোমরা সবাই নিশ্চয়ই বড় হয়ে প্রোগ্রামার হবে না। বাংলাদেশের সব ছেলেমেয়ে প্রোগ্রামিং করা শুরু করলে আর সব কাজ করবে কে? হ্যাঁ, তোমরা এখন কিশোর, আর কবছর পরেই হয়ত তোমাদের অনেকেই পা দেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর তখনই তোমরা ঠিক করে নেবে তোমাদের ভবিষ্যত। তবে তুমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে চাও, তাহলে তোমার প্রোগ্রামিং কিন্তু জানাই লাগবে। গণিত-বিজ্ঞানের নানান বিষয়, এমনকি বায়োলজি নিয়ে লেখাপড়া করতেও প্রোগ্রামিং দক্ষতা কাজে লাগে। কম্পিউটারে কোড লিখে হরেক রকম সমস্যার সমাধান করতে হয়। তবে প্রোগ্রামিং কেবল বিজ্ঞান কিংবা প্রকৌশলের ছাত্র-ছাত্রীদেরই কাজে লাগে এমনটি নয়, অন্য অনেকেরও কাজে আসে। তাই তো এখন পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে স্কুল থেকেই প্রোগ্রামিং শেখার শুরু হয়। প্রোগ্রামিং তোমাকে অন্যভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, সমস্যার বিশ্লেষন ও সমাধান করার নতুন নতুন উপায় বাতলে দেবে। প্রোগ্রামিংয়ের চর্চা তোমার মস্তিষ্ককে সাহায্য করবে যেকোনো বড় সমস্যাকে ভয় না পেয়ে সেটিকে ছোট ছোট করে সমাধান করতে। তাই আধুনিক বিশ্বের বিশ্বনাগরিক হতে গেলে প্রোগ্রামিংটা কিন্তু জানা চাই।

প্রোগ্রামিং কিভাবে শিখব
তোমরা যারা গান শেখো, তারা যেমন নিয়মিত গানের চর্চা করো, প্রোগ্রামিংয়ের বেলাতেও তেমনি চর্চা করতে হয়। নিয়মিত লেখাপড়া আর চর্চার মাধ্যমেই তুমি হয়ে উঠতে পারবে একজন দক্ষ প্রোগ্রামিং শিল্পী। প্রোগ্রামিং শেখার জন্য শুরুতে প্রয়োজন একটি বই, যা তোমাকে প্রোগ্রামিংয়ের শুরুটা দেখিয়ে দেবে, প্রয়োজন একটি কম্পিউটার, সাথে ইন্টারনেট থাকলে ভালো হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সপ্তাহে গড়ে দশ-বারো ঘণ্টার মতো সময়। অবশ্যই পরীক্ষা চলাকালীন সময়টা ছাড়া।  প্রোগ্রামিংয়ের বই কোথায় পাবে? দেশের বড় শহরগুলোর বইয়ের দোকানে প্রোগ্রামিংয়ের বই পাওয়া যায়, তবে সেগুলো বেশিরভাগই ইংরেজিতে। ইংরেজি বই পড়া অবশ্য তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার নয়, একটু সাহস করে শুরু করে দিলেই হয়। আর বাংলা বই পড়তে চাইলে তোমরা http://cpbook.subeen.com ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারতে পারো। এখানে বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিংয়ের উপর একটি বই ফ্রি দেওয়া আছে, যেটি কী না স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবেই লেখা হয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেটে ইংরেজিতে অনেক বই আছে প্রোগ্রামিং শেখার। সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বই ফ্রি পাওয়া যায়। বই তো পেয়ে গেলে, তাহলে আর দেরি কেন? শুরু করে দাও। এ বিষয়ে আরো জানতে : প্রোগ্রামিং শেখা

প্রোগ্রামিং শেখার অনলাইন স্কুল
ছেলেবেলায় গান শেখার জন্য গানের স্কুল থাকে, নাচ শেখার জন্য নাচের স্কুল। ক্রিকেট খেলা শেখার জন্য ক্রিকেট একাডেমি। কী চমৎকারই না হতো বাংলাদেশে যদি প্রোগ্রামিং শেখার জন্য কোনো প্রোগ্রামিং স্কুল থাকতো! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কী, খুব ভালো প্রোগ্রামার না হলে অন্যকে প্রোগ্রামিং শেখানো যায় না। আর আমাদের দেশে খুব ভালো প্রোগ্রামাররা অনেক ব্যস্ত থাকেন বলে প্রোগ্রামিং শেখানোর বিষয়টি তাঁরা ভাবেন না। এই সমস্যার একটি সমাধান অবশ্য বের হয়েছে। প্রোগ্রামিং ও অন্যান্য বিষয় শেখার কিছু ওয়েবসাইট আছে, যেখানে অনলাইন কোর্স করা যায়। বেশিরভাগ কোর্সই বিনামূল্যে করা যায়। এরকম ওয়েবসাইগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে coursera.org, edx.org ও udacity.com। তবে বাংলা ভাষায়ও প্রোগ্রামিং, সফটওয়্যার ডেভেলাপমেন্ট, ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলাপমেন্ট শেখার জন্য অনলাইনে ভিডিও ও কোর্স পাওয়া যায়। এরকম একটি ওয়েবসাইট হচ্ছে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল : http://dimikcomputing.com। এর কোর্সগুলো ফ্রি কিন্তু তার জন্য তোমাদের থাকা চাই উচ্চ গতির ইন্টারনেট। আশার কথা এই যে, আমাদের দেশে ইন্টারনেট দিন দিন সহজলভ্য হচ্ছে। আর প্রতিটি কোর্স শেষেই ডিভিডি বের করছে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল (ফেসবুক পেজ : https://www.facebook.com/DimikComputing), যাতে করে যাদের ভালো ইন্টারনেট নেই, তারা ডিভিডি থেকে ভিডিও লেকচার দেখে শিখতে পারে। এছাড়া ইন্টারনেটে নানান ফোরাম ও ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে, যেখানে তুমি যোগ দিতে পারো ও প্রোগ্রামিং নিয়ে আলাপ করতে পারো।

অনলাইন জাজ
প্রোগ্রামিং শেখার শুরুটা তো হলো। চর্চাটা হবে কীভাবে? ইন্টারনেটে হাজার হাজার প্রোগ্রামিং সমস্যা পাওয়া যায়, যেগুলো সমাধান করে তোমার প্রোগ্রাম সেখানে জমা দিলে তুমি কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারবে যে তোমার সমাধানটি সঠিক হয়েছে কী না। যেসমস্ত ওয়েবসাইটে এই সুবিধাটা আছে, সেগুলোকে বলে অনলাইন জাজ বা সংক্ষেপে ওজে (OJ)। লাইটওজে (lightoj.com) একটি চমৎকার অনলাইন জাজ যেখানে তুমি প্রোগ্রামিং চর্চা শুরু করতে পারো। আর বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং সমস্যা পেতে চাইলে তোমাদের যেতে হবে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বইয়ের ওয়েবসাইটে। এই লেখাটি পড়তে পার : প্রোগ্রামিং চর্চার জন্য ১০টি অনলাইন জাজ

ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড
প্রোগ্রামিং প্রাকটিস করতে করতে তো ঝানু হয়ে গেলে। কিন্তু তোমার মেধাটা দেখাবে কোথায়? তোমার জন্য রয়েছে ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড। বাংলাদেশে প্রতি বছর ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয় যেখানে স্কুল ও কলেজ পর্য়ায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারে। সেখান থেকে বিজয়ীদের জন্য আয়োজন করা হয় বিশেষ ট্রেনিং ক্যাম্পের এবং সেই ক্যাম্প থেকে কয়েকজনকে নির্বাচিত করে পাঠানো হয় আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে যারা ভালো করে, তাদের ভর্তি করাতে বেশ আগ্রহী হয়। সুখবর হচ্ছে, বাংলাদেশেও এমনটি চালু হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যারা আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নেবে, তাদের কোনো ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে না। এইচএসসি পাশের পরে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে। বাংলাদেশ ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডের খোঁজখবর পেতে হলে ফেসবুকে একটি গ্রুপ আছে, সেখানে যোগ দিতে হবে। গ্রুপের ঠিকানা বের করার দায়িত্ব আমি তোমাদের উপর ছেড়ে দিলাম। ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড নিয়ে আরো জানতে এখানে ক্লিক করো

চর্চা করার আরো কিছু উপায়
কিন্তু প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা হচ্ছে অনেকগুলো উপায়ের মধ্যে একটি, যার মাধ্যমে তুমি তোমার প্রোগ্রামিং দক্ষতা বাড়াতে পার। এর মানে এই না যে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ না নিলে তুমি ভালো প্রোগ্রামার হতে পারবে না। তুমি হয়ত মজার কোনো গেম বানানোর চেষ্টা করতে পারো, কিংবা একটি ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন। আর তুমি যদি স্মার্টফোন ব্যবহার করো, তাহলে তোমার ফোনের জন্যও একটি অ্যাপ্লিকেশন বানিয়ে ফেলতে পার।

কম্পিউটার সায়েন্স
এইচএসসি তো পাশ করে ফেললে। প্রোগ্রামিংয়ে ওস্তাদ হয়ে গিয়েছো। এখন তুমি তোমার পছন্দমতো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। আর যদি তুমি প্রোগ্রামিংকে খুব গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলো তাহলে তোমার উচিত হবে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়া। সেখানে প্রোগ্রামিংয়ের পাশাপাশি কম্পিউটার বিজ্ঞান সম্পর্কে তোমার জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়বে। তবে এখানে বলে রাখি কম্পিউটার সায়েন্স মানেই শুধু প্রোগ্রামিং নয়। আরো নানান বিষয় পড়তে হয় সেখানে। তুমি কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হয়ে কেবল প্রোগ্রামিং করবে আর অন্য বিষয়গুলো পড়বে না, তা হবে না, তা হবে না।

এখনই সময় শুরু করার
আমি ছোট, আমি কি প্রোগ্রামিং শিখতে পারব? বিল গেটসের নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ, বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানী মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩ বছর বয়সে বিল গেটস তাঁর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেন, যেটি ছিল টিক-ট্যাক-টো গেম। তারপর তিনি যেই স্কুলে পড়তেন, সেখানে ক্লাস শিডিউল তৈরির সফটওয়্যারও বানিয়ে দেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গও স্কুলে পড়ার সময় প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেন। প্রথমে তাঁর বাবাই ছিলেন তাঁর প্রোগ্রামিং শিক্ষক। স্কুলে যখন তাঁর বন্ধুরা গেম খেলতে ব্যস্ত, সেই সময়টা জাকারবার্গ ব্যস্ত থাকতেন গেম বানানোর কাজে! এরকম আরো অনেক উদাহরণ আছে, আমি কেবল তোমাদের পরিচিত দুজন মানুষের কথা বললাম। বিল গেটস যদি সফটওয়্যার তৈরি করেই পৃথিবীর সেরা ধনী হতে পারে, মার্ক জাকারবার্গ যদি ফেসবুক তৈরি করে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করতে পারে, স্টিভ জবস যদি আইফোন তৈরি করে সারা পৃথিবীর মানুষকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে, তুমি কেন পারবে না? তোমাদের এখন কাজ হবে বাবা-মাকে বুঝিয়-সুঝিয়ে তাঁদের কাছ থেকে অনুমতি বের করা যেন তুমি সপ্তাহে ১০-১২ ঘণ্টা প্রোগ্রামিং করতে পারো। তাহলে আর তোমাকে ঠেকায় এমন সাধ্য কার?

তোমাদের জন্য গুরুত্বপূ্র্ণ দশটি ওয়েবসাইটের লিঙ্ক :

  1. http://scratch.mit.edu
  2. http://code.org
  3. http://edx.org
  4. http://coursera.org
  5. http://udacity.com
  6. http://dimikcomputing.com
  7. http://programabad.com
  8. http://dimik.pub
  9. http://cpbook.subeen.com
  10. http://www.khanacademy.org

 

ফ্রি প্রোগ্রামিং ডিভিডি

প্রতিটি ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনলে সাথে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল থেকে প্রকাশিত ‘প্রোগ্রামিংয়ে হাতে খড়ি’ অথবা ‘ওয়েব কনসেপ্টস্’ এর ডিভিডি ফ্রি দিবে প্যানারোমা কম্পিউটার্স। আজ সোমবার ঢাকার এলিফেন্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে এই ঘোষণা দেন প্যানারোমা কম্পিউটার্সের পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন এবং দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলের সিইও তাহমিদ রাফি।

প্যানারোমা কম্পিউটার্সের পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন জানান: “প্যানারোমা থেকে যারা কম্পিউটার কেনে, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। তাই শিক্ষার্থীদের যদি ডিভিডি দেওয়ার মাধ্যমে প্রোগ্রামিংয়ে আগ্রহী করা যায়, তাহলে সেটা দারুণ ব্যপার হবে।”

এই উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্যানারোমাকে ধন্যবাদ জানান দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলের সিইও তাহমিদ রাফি।

প্যানারোমা কম্পিউটার্সের ঠিকানা: লেভেল ৮, মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার,  নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
ওয়েবসাইট : http://www.panaromabd.com/