আলফাগো বনাম লি সেডল – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষ

ডিপ ব্লু-এর পর এবার আলফাগো। আবারো কম্পিউটারের সঙ্গে খেলে মানুষের হার! ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে। গুগলের ডিপমাইন্ড ইউনিটের তৈরি “গো” খেলার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম “আলফাগো” পরপর তিনবার হারিয়ে দিলো ৩৩ বছর বয়সি পেশাদার কিংবদন্তী  “গো” খেলোয়ার লি সিডলকে। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চারটিতেই জিতেছে “আলফাগো”। পরপর তিনবার হারার পর চতুর্থ ম্যাচে এসে জয় পান লি সিডল। এই একটিমাত্র জয়কে তিনি “অমূল্য” হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রথম গেমটিতে হারার পর লি সাংবাদিকদের বলেনঃ “আমি খুবই অবাক হয়েছি। আমি হারবো এটা কখনো ভাবিনি। আলফাগো এত ভাল খেলবে এটা আশা করিনি।”

গো অথবা ষোলগুটি বা বাঘবন্দিঃ

“গো” নামক কয়েক হাজার বছরের পুরানো গেমের উদ্ভব হয় চীনে। খেলাটি অনেকটা আমাদের দেশের ষোলগুটি বা বাঘবন্দি খেলার মত। একটি নির্দিষ্ট বোর্ডে সাদা এবং কালো গুটি নিয়ে দুইপক্ষকে খেলতে হয়। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের গুটি আটকে বোর্ডের দখল নেয়া। যে বোর্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকা দখল করতে পারবে, সেই বিজয়ী। দাবা খেলার সাথে এই খেলার বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে অসংখ্য সম্ভাবনাময় চাল থাকে। কেবলমাত্র গাণিতিক হিসাব করে সম্ভাব্য চাল বের করা অসম্ভব।

“গো” খেলার জন্য গুগল ডিপমাইন্ড “আলফা-গো” কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে। এটির অ্যালগোরিদম মেশিন লার্নিং এবং ট্রি সার্চিং প্রযুক্তি সমন্বয়ে করা হয়েছে। এতে পলিসি এবং ভ্যালু নেটওয়ার্ক হিসেবে দুইটি নিউরাল নেটওয়ার্ক আছে। পলিসি নেটওয়ার্কটি সম্ভাব্য সেরা চালটি দ্রত হিসাব করতে পারে এবং ভ্যালু নেটওয়ার্কটি প্রতিটি চালের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় চালগুলো বাদ দিয়ে সম্ভাব্য চালের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে।মানুষের এই “অপ্রয়োজনীয়” চাল বাদ দেয়ার সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে অবশেষে ভাগ বসালো আলফাগো। আলফাগো-এর প্রাথমিক পর্যায়ে, একে বিভিন্ন এক্সপার্ট গেমারের ঐতিহাসিক গেমের চালগুলো মনে রাখতে বলা হয়েছিল, ৩০ মিলিয়ন চালের একটি ডাটাবেস থেকে। পরবর্তীতে একটি নির্ধারিত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের পর রি-ইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এর সাহায্যে আলফা-গো-এর সক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যে এটি নিজে নিজে খেলার দক্ষতা অর্জন করে।

আলফাগো বনাম লি সেডলঃ

আলফাগো বনাম লি সেডল-এর “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ ম্যাচ” সিওলে ৯ মার্চ-এ শুরু হয়ে ১৫ মার্চ শেষ হয়। প্রথম ম্যাচটিতে আলফাগো জয়লাভ করে যদিও পুরো ম্যাচের বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল লি-এর আধিপত্য। কিন্তু শেষ ২০ মিনিটে আলফাগো আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচ জিতে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খেলার প্রথমদিকে লি  আলফাগো-এর ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ বড়সড় একটি ভুল করে বসেন। সেই ভুলের উত্তরে আলফাগো-এর চালটি ছিল একেবারে নিখুঁত এবং কার্যকরী।

চতুর্থ ম্যাচ, যেটিতে লি জয়লাভ করে মানবজাতির মানসম্মান রক্ষা করে, সেখানেও ৭৮ নাম্বার চাল পর্যন্ত আলফাগো-এর জিতে যাওয়ার সম্ভবনা ছিল ৭০%। কিন্তু ৭৯ নাম্বার চালে ভুল করে ফেলার কারণে আলফাগো বঞ্চিত হয় লি সেডলকে হোয়াইটওয়াশ করার সুযোগ থেকে।

১৮টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী পেশাদার গো খেলোয়ার লি সেডল ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন যে শুরুর দিকে তিনি আলফাগো-এর খেলোয়াড়ি দক্ষতাকে অবজ্ঞা করেছিলেন। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস বলেন, এ পরাজয় মূল্যবান। কারণ, এ থেকে আমরাও আমাদের প্রোগ্রামের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারবো। “গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ”-এর বিজেতা হিসেবে আলফাগো এক মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার জিতে নিয়েছে। ডিপমাইন্ড-এর বিবৃতি অনুযায়ি এই পুরষ্কারের অর্থ ইউনিসেফ, গো অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। ম্যাচ শেষে “সাউথ কোরিয়া গো অ্যাসোসিয়েশন” আলফাগো-কে “গো গ্র্যান্ডমাস্টার” পদবী প্রদান করে।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং

রজনীকান্তের “রোবট” সিনেমাটার কথা মনে আছে? যেখানে চিট্টি নামের এক রোবট ছিল যাকে বলা হয়েছিল টিভি খুলার জন্য আর সে মাটিতে টিভিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, “আমাকে তো খুলতে বলা হয়েছে টিভি অন করতে তো বলা হয় নাই”।

আমরা কম্পিউটার বা মেশিন যাই বলি না কেন এদের নিজেদের কোন বোধশক্তি নেই। এদের যা নির্দেশনা দেয়া হয় এরা সেই নির্দেশনা (command) মত কাজ করে শুধু। আমরা মানুষরা সাধারণত  যে ভাষায় কথা বলি তা এরা বুঝতে পারে না। কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা ঠিকমত বোঝানোর জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে চলেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্গত এই শাখাটির নাম হলো ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, সংক্ষেপে এনএলপি।

কম্পিউটার ও মানুষের যোগাযোগ
কম্পিউটার ও মানুষের যোগাযোগ

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং কী
ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)-এর একটি শাখা যা মানুষের ভাষার বিশ্লেষণ করে সেটা বুঝে মানুষ এবং কম্পিউটারের সাথে মিথস্ক্রিয়া (Interaction) করে। এর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কম্পিউটারকে শেখানো যে কিভাবে মানুষ শিখে এবং ভাষার ব্যবহার করে। বিষয়টা কিন্তু অভিধান ব্যবহার করার মত সহজ-সরল কাজ নয়। অনেকসময় দেখা যায় একটি শব্দ ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
যেমনঃ
অরুনা ‘ভাল’ রান্না করে (বিশেষণ)।
আপন ‘ভাল’ সবাই চায় (বিশেষ্য)।
এই দুটি বাক্যতে ভাল শব্দটা আছে কিন্তু বাক্য দুটিতে শব্দটির পদ (Parts of speech) ভিন্ন।
এখন কথা হচ্ছে আমরা তো জানি এবং বুঝি বিশেষ্য কী জিনিস, বিশেষণ কী জিনিস। কিন্তু কম্পিউটার তো বুঝে না। তাই কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা বোঝানোর জন্য ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং-এর উদ্ভব।

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর টুলস
স্টানফোর্ড ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং গ্রুপ (The Stanford Natural Language Processing Group) ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর জন্য অনেক সফট্‌ওয়্যার তৈরি করেছে যেগুলো সবার জন্য সহজলভ্য। এর একটি উল্লেখযোগ্য সফট্‌ওয়্যারের নাম কোর এনএলপি (Stanford CoreNLP). এর মধ্যে ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং চাইনিজ ভাষার প্রসেসিং এর টুলস্ (tools) রয়েছে। স্টানফোর্ড এনএলপি (Stanford NLP) সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এই লিঙ্কে

এনএলপি কেন প্রয়োজন
অনেকের মনে এই পর্যায়ে মনে হতে পারে, কম্পিউটারকে মানুষের ভাষা বোঝানোর দরকার কী? সে থাকুক না প্রোগ্রামিং করা আর গেমস খেলা নিয়ে। কিন্তু, এমন যদি হতো যে কম্পিউটারকে কোডের ইন্সট্রাকশন বলা মাত্র সে ঘটঘট করে কোডটা নিজেই লিখে ফেলতো! মজার ব্যাপার হচ্ছে স্পীচ রিকগনিশন (speech recognition) টেকনিকের এর মাধ্যমে কম্পিউটার এই কাজটা কিছুটা করতে পারে। IBM VoiceType হচ্ছে প্রায় এমনই একটা সিস্টেম। যেটা মানুষের বলা শব্দগুলোকে বিশ্লেষণ করে সাথে সাথে কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখায়।

আমাদের কাছে বর্তমানে Google Translate একটা জনপ্রিয় নাম। এটাও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর একটা খুবই সুন্দর অ্যাপ্লিকেশন। খুব দ্রুত কোন শব্দের যে কোন ভাষার অনুবাদ এটি খুব সহজে করে দেয়।

তথ্য খোঁজার চিরুনি অভিযান
ইনফরমেশন রিট্রাইভাল (Information Retrieval) নামক ন্যাচারাল  ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর আরেকটি টেকনিক আছে, যার মাধ্যমে বিশাল একটা তথ্য ভান্ডার থেকে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে আনা হয়। এই ধরনের সিস্টেমের কাজ শুরু করে যখন ইউজার সিস্টেমে একটা কুয়েরি (query) দেয়। সেই  কুয়েরি (query)-এর উপর ভিত্তি করে সিস্টেম শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক তথ্যসমূহ প্রদান করে থাকে। যেমনঃ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন।

বাংলা ভাষা এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং
বর্তমানে ইংরেজিতে ন্যাচারাল লাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর কাজ অনেক এগিয়ে গেলেও বাংলা ভাষায় এর কাজ ইংরেজির তুলনায় অনেক কম। বাংলা ভাষার জন্য গবেষণার কাজটি তো বিদেশীরা এসে করে দিবে না, বাংলাদেশের মানুষকেই সেটা করতে হবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার গবেষণার জন্য গবেষণাগার আছে। যেখানে বাংলা ভাষার প্রসেসিং নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশের সার্চ ইঞ্জিন “পিপীলিকা” বাংলা ভাষার প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র সার্চ ইঞ্জিন। পিপীলিকা তৈরি করার সময় ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং নিয়ে বেশ কিছু কাজ করতে হয়েছে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ গ্রামীণফোন আইটি  লিমিটেডের সহায়তায় তৈরি করেছে এই বাংলা সার্চ ইঞ্জিন। এটির উন্নয়ন কার্যক্রম এখনও চলছে।

ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্র
যদিও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর অনেক অ্যাপ্লিকেশন বর্তমানে আছে, কিন্তু সেসব অ্যাপ্লিকেশনের এর ফলাফল খুব একটা সন্তোষজনক নয়। মানুষ সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেসব কথা কোন NLP যন্ত্রের পক্ষে বিশ্লেষণ করে সঠিক অর্থ প্রকাশ করা যথেষ্ট কঠিন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের মানুষের ভাষা ভিন্ন, কথা বলার স্টাইল ভিন্ন। তবে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। হয়ত ভবিষ্যতে আমরা শতভাগ সঠিক কোন ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং সিস্টেম দেখতে পারবো। যা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্যের একটি মাইলফলক।

লেখকঃ তামান্না নিশাত রিনি।

ট্যুরিং টেস্ট – মানুষ বনাম কম্পিউটার

ছোটবেলায় কমিকস্‌ পড়ার সময় প্রায়ই একটা লেখা চোখে পরত, “চাচা চৌধুরীর মগজ কম্পিউটারের চেয়েও প্রখর” । চোর-ডাকু, বড় বড় ক্রিমিনাল সবাই উনার বুদ্ধির কাছে কাবু। তখন মনে করতাম, হ্যাঁ চাচাজীর তো আসলেই অনেক বুদ্ধি! কিন্তু  কম্পিউটার কি আসলেই মানুষের থেকে বুদ্ধিমান? অথবা আদৌ কি তার কোন বুদ্ধি আছে? একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।

১৯৯৭ সালের কথা। ডিপ ব্লু (Deep Blue) নামের এক সুপার কম্পিউটার দাবা খেলায় হারিয়ে দিয়েছিল বিশ্বসেরা দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভ (Garry Kasparov) সাহেবকে। মানব মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের যুদ্ধে কম্পিউটার জয়ী। তাহলে কি এখন আমরা বলবো, যে মানুষের থেকে কম্পিউটারের বুদ্ধি বেশি?

বুদ্ধির দাঁড়িপাল্লাঃ
মানুষের বুদ্ধিমত্তা মাপার জন্য যেমন আইকিউ (IQ) পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, তেমনি কোন যন্ত্রের চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিমত্তা আছে কিনা, সেটা মাপার জন্য রয়েছে ট্যুরিং টেস্ট (Turing Test) নামক একটি পদ্ধতি। এক কথায় ট্যুরিং টেস্ট হচ্ছে এমন একটি পরীক্ষা যার মাধ্যমে জানা যায় কোন যন্ত্রের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে কিনা। যদি কোন যন্ত্র এই পরীক্ষায় পাশ করে যায়, তাহলে বলা যায় যন্ত্রটির চিন্তাশক্তি আছে বা বুদ্ধিমত্তা আছে।

অনেক আগে থেকেই মানুষের মনে কৌতুহল ছিল যে কোনো যন্ত্র কি পারবে মানুষের মত চিন্তা করতে এবং সেই চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে?

১৬৩৭ সালে রেনে ডে কার্তে নামক একজন বিজ্ঞানী বলেছিলেন যে মানুষ হয়ত বুদ্ধিমান ঘুর্ণন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবে, কিন্তু মানুষের মত বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এটির পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না।
কিন্তু বিজ্ঞান তো মানুষের কথা শুনে বসে থাকার জিনিস না। বিজ্ঞানীরা শুরু করলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশেষে ইংরেজ গণিতবিদ এবং গবেষক অ্যালান ট্যুরিং (Alan Turing) যন্ত্রের চিন্তাশক্তি নির্ণয়ের এক পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন যার নাম হল ট্যুরিং টেস্ট।

Alan_Turing_photo১৯৫০ সালে অ্যালান ট্যুরিং তাঁর গবেষণাপত্র “Computer Machinery & Intelligence”-এ প্রথম Turing Test এর কথা বলেন। তাঁর এই গবেষণাপত্রটি মূলত Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল-এর প্রধান সম্মাননা “ট্যুরিং পুরষ্কার” তাঁর নামে। এই পুরষ্কারকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কারও বলা হয়ে থাকে।

অ্যালান ট্যুরিং-এর মজার পরীক্ষাঃ
আলান ট্যুরিং তাঁর গবেষণা পত্রে একটি মজার পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। সেই পরীক্ষাটির নাম ছিল ইমিটেশন গেম (Imitation Game)। গেমটিতে মনে করা যাক, দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বদ্ধ ঘরে একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে আছে। একজন তৃতীয় ব্যক্তিকে বের করতে হবে কোন ঘরে ছেলে আছে এবং কোন ঘরে মেয়ে।

মেয়ে নাকি ছেলে?
মেয়ে নাকি ছেলে?

অনেকের মনে হতে পারে, ধুর এটা কোন ব্যাপার হলো নাকি। কণ্ঠস্বর শুনেই তো বলে দেয়া যাবে কে ছেলে আর কে মেয়ে। কিন্তু ট্যুরিং স্যারের শর্ত ছিল তৃতীয় ব্যক্তিকে ছেলেটি এবং মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে লিখিত আকারে এবং ছেলেটিকে এবং মেয়েটিকেও তৃতীয় ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করতে হবে লিখিত আকারে। তৃতীয় ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করবে লিখিত আকারে এবং ছেলে ও মেয়েটি লিখিত আকারে সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিবে। প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করে তৃতীয় ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিবে কোন ঘরে ছেলে আছে এবং কোন ঘরে মেয়ে। যেহেতু এখানে তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার আছে, তাই এখানে বাহ্যিক বুদ্ধিমত্তার দরকার। এটি মূলত ট্যুরিং টেস্ট এর প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপে তৃতীয় ব্যক্তিকে একই পদ্ধতিতে যন্ত্র এবং মানুষকে আলাদা করতে হয়। যদি পরীক্ষার্থী যন্ত্রটি গ্রহণযোগ্য যুক্তি দিয়ে মানুষ এবং যন্ত্রকে আলাদা করতে পারে তাহলেই বলা যাবে যন্ত্রটির বুদ্ধিমত্তা আছে।

যন্ত্র নাকি মানুষ?
যন্ত্র নাকি মানুষ?

ট্যুরিং টেস্টের ফলাফলঃ
কিছুদিন আগে রাশিয়ার তৈরি Eugene Goostman সুপার কম্পিউটার ট্যুরিং টেস্টে একজন ১৩ বছরের বালকের সমান বুদ্ধির প্রমাণ দেয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় এই সুপার কম্পিউটার ‘ট্যুরিং টেস্টে’ ৩৩ শতাংশ সময় বিচারকদের কাছে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়৷ ট্যুরিং টেস্টে কোন যন্ত্রের সাফল্য এই প্রথম।বিজ্ঞানীরা এই সাফল্যকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।

এদিকে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার স্টিফেন হকিং বলছেন ভিন্ন কথা। উনার ধারণা মতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ঘটানোর তৎপরতা মানবজীবনের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বুদ্ধিমান যন্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষকে। জৈব বিবর্তনের দিক থেকে ধীর গতির মানুষ এ সব যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত যন্ত্র মানুষকে অতিক্রম করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা সত্যি কী না, তার জন্য আমাদের আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।

– তামান্না নিশাত রিনি