আপনার সন্তানকে কীভাবে গণিতে দক্ষ করে গড়ে তুলবেন

গণিতের দক্ষতা নিঃসন্দেহে ভালো, তবে গণিতের দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

আমরা এশিয়ার মানুষরা, যারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকি তারা প্রায়ই গর্ব করি যে গণিতে আমাদের দক্ষতা আমেরিকানদের চেয়ে ভালো। গণিতের দক্ষতা নিঃসন্দেহে ভালো, তবে গণিতের দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। গত কয়েক বছরে আমি একটি জিনিস লক্ষ করেছি, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর জোর দেয় বেশি।

গণিতের দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার মধ্যে পার্থক্য কী?

আমি যদি বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শিশুকে জিজ্ঞাসা করি, ৩৬৫-কে ৭ দিয়ে ভাগ করলে কত হবে, শিশুটি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ভাগফল ও ভাগশেষ বলে দিতে পারে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করি যে, এক বছরে কয়টি সপ্তাহ আছে, তখন সে প্রশ্ন বুঝতে পারে না। যদিও সে জানে যে ৩৬৫ দিনে এক বছর এবং সাত দিনে এক সপ্তাহ হয়।

প্রথম প্রশ্নটির উত্তর দিতে গণিতের দক্ষতা লাগে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে লাগে সমস্যা সমাধানের দ্ক্ষতা। এটি একটি সাধারণ উদাহরণ, আশা করি এ থেকে গণিতের দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পার্থক্য পরিষ্কার হয়ে গেছে।

আমাদের কোনটায় জোর দেওয়া উচিত—গণিত নাকি সমস্যা সমাধানের দক্ষতায়?

এর উত্তর হচ্ছে ‘দুটোই’। গণিত হচ্ছে সমস্যা সমাধানের একটি টুল (tool) বা যন্ত্র। আপনি যখন আপনার সন্তানকে স্কুলে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ শেখান, সেই সময় তাকে সমস্যা সমাধানের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিন।

শিশুকে কীভাবে সমস্যা সমাধানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়?

সমস্যা সমাধানের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য খুব কৌশলী হওয়ার প্রয়োজন নেই, একটু মনযোগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে অনেকেই জানতে চাইবেন এর জন্য বাচ্চাকে কোন কোন বই পড়ানো যায়।

আমি মনে করি যে, বইপত্র কিংবা কোচিং সেন্টার ইত্যাদি বাচ্চাকে সমস্যা সমাধান শেখানোর ভালো উপায় নয়। জোর করে কিছু শেখাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বরং পারিবারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাচ্চাকে সমস্যা সমাধান করতে শেখানোই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

দৈনন্দিন কার্যক্রমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান শেখানোর উদাহরণ

আমি এখানে কিছু উদাহরণ দিলাম।

  • একটি কলার দাম ৪ টাকা ও একটি পেয়ারার দাম ৫ টাকা হলে ঝুড়ির কলা ও পেয়ারার দাম কত? [ঝুড়িতে সত্যি সত্যি ২টি কলা ও ৪টি পেয়ারা রেখে আপনার বাচ্চাকে প্রশ্নটি করতে পারেন। অবস্থাভেদে প্রশ্নটি পরিবর্তন করে নিন।]
  • বাচ্চার পছন্দের প্রাণিদের নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করুন। ধরা যাক, আমার বাচ্চা হাতি পছন্দ করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারি যে, রাঙামাটির বনে ৫০ সদস্যের একটি হাতির দল বসবাস করতো। সেখান থেকে অর্ধেক হাতি বান্দরবান চলে গেল। খাগড়াছড়ি থেকে ১০টি হাতি রাঙামাটি গেল। রাঙামাটিতে এখন কয়টি হাতি আছে?
  • খাদ্যের ক্যালরি গণনা করতে দেওয়া একটি ভালো সমস্যা হতে পারে। এটি গাণিতিক সমস্যা সমাধানকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সাথে যুক্ত করবে। যেমন: একবাটি ভাতে কতটুকু ক্যালরি রয়েছে, এ রকম সামান্য একটু গবেষণা বাচ্চার জন্য অনেক আনন্দদায়ক হতে পারে। বাচ্চাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে সে আজ কতটুকু ক্যালরি গ্রহণ করেছে।

ওপরের উদাহরণগুলো এই লেখার স্বার্থে আমি তৈরি করলাম। আপনারা আপনাদের পরিবেশ ও অবস্থা বুঝে শিশুকে সমস্যা সমাধান করতে দেবেন। আমাদের মনস্তত্ত্ব হতে হবে “আনন্দে আনন্দে শিক্ষা”। সব সময় সচেতনভাবেই শেখাতে হবে এমন নয়। বাচ্চাকে নিয়ে খাওয়ার সময়, বিকেলে খেলার সময় বা বাজারে যাওয়ার সময়ও শেখানো যায়। আপনার বাচ্চাকে কীভাবে সমস্যা সমাধান করা শেখাবেন তা আপনিই ভালো বলতে পারবেন। কোনো বই, শিক্ষক বা বিদ্যালয় আপনার বাচ্চাকে আপনার চেয়ে ভালো শেখাতে পারবে না।

সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা

সমস্যা সমাধান করা শেখানো যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ শেখানোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আবারো বলছি, গণিত হচ্ছে সমস্যা সমাধানের একটি টুল মাত্র। সমস্যা সমাধানের চর্চা আপনার বাচ্চাকে শেখাবে কোন পরিস্থিতিতে কোন টুল কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। মানে, আপনার বাচ্চার মধ্যে বিশ্লেষণী ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়বে।

শিশুর ভেতর যখন বিশ্লেষণী ক্ষমতা তৈরি হবে, তখন সে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির সমস্যাও মোকাবিলা করতে পারবে। অর্থাৎ যুক্তি-বুদ্ধি-গণিত প্রয়োগ করে সে তার অচেনা সমস্যারও সমাধান করে ফেলতে পারবে। অনেকটা এ রকম,“কাউকে একটা মাছ দিলে সে একদিন খেতে পারবে। মাছ ধরা শিখিয়ে দিলে সারাজীবন খেতে পারবে”।

প্রাথমিক গণিত-সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধানের ধাপ

সমস্যা সমাধানের অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানে ধাপগুলো অনেক বিস্তৃত। প্রাথমিক পর্যায়ের গণিত-সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি এ রকম বিস্তৃত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে আমাদের বাচ্চাদের কিছু ধাপের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আমি নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে বলব:

  • সমস্যাটিকে বিশ্লেষণ করা: সমস্যার বিশ্লেষণ সমস্যাটিকে বুঝতে সহায়তা করে। সমাধানের জটিলতা যেমনই হোক না কেন, সমস্যাটি শিশুর কাছে আকর্ষণীয় হতে হবে। সমস্যা না বুঝে সমাধান করতে গেলে সে সহজেই বিরক্ত হয়ে যাবে। প্রথম প্রথম আপনারা বাচ্চাকে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করতে পারেন, তবে একটা সময়ে তাকে নিজে নিজেই বিশ্লেষণ করতে সমর্থ হতে হবে।
  • সমাধানের রূপরেখা তৈরি: এ পর্যায়ে শিশুটি সমস্যাটিকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে গাণিতিক প্রক্রিয়ার (যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ) পরিকল্পনা করবে।
  • হিসাব করা: এ পর্যায়ে সে গাণিতিক হিসাবগুলো করবে। এ পর্যায়েই সে তার গাণিতিক দক্ষতা কাজে লাগাবে।
  • সমাধান যাচাই করা: এ পর্যায়টি প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। এ পর্যায়ে বাচ্চাটি তার ফলাফলকে যাচাই করে দেখবে। এটি নানাভাবে করা যায়। একটি পদ্ধতি হচ্ছে আগের ধাপগুলো পুনরায় করা। অন্য একটি পদ্ধতি হতে পারে বিপরীত হিসাবকরণ। এটি শুরুতে কঠিন মনে হতে পারে, তবে অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ব করা সম্ভব। যেমন: ৩০ থেকে ১০ বিয়োগ করে যদি সে ২০ উত্তর পায়, তাহলে সে ২০-এর সাথে ১০ যোগ করে দেখতে পারে যে উত্তর ৩০ হয় কি না। নিজের সমাধান যাচাই করা শিখতে পারলে শিশুর কাছে গণিতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

শিশুদের গণিত শেখানোর সময় সবচেয়ে বড় যে ভুলটি আমরা করি

এ পর্যন্ত পড়ে নিশ্চয়ই এই লেখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জেনে গেছেন। এটি কেবল শিশুদের গণিত শেখানো নিয়ে নয়। আমি তাদেরকে সমস্যা সমাধান করা শেখানোর পক্ষে। গণিত শেখানোর সময় আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি তা হলো আমরা সমস্যা সমাধানের দিকটি যোগ করতে ভুলে যাই। আমরা যখন সমস্যা সমাধানকে বাদ দিই, তখন বাচ্চারা পদ্ধতিগত গণিত শিখে অভ্যস্ত হয়। তারা ধীরে ধীরে বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, ক্যালকুলাস সবই শেখে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে না। 

শিশুর ভেতরে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরির জন্য কিছু টিপস

  • সমস্যা সমাধানের জন্য পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা।
  • বাস্তব জীবনভিত্তিক গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে বলা।
  • শিশুর আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে সমস্যা তৈরি করে দেওযা (হাতির সমস্যাটির মতো)।
  • সমস্যা সমাধানকে একটি আনন্দদায়ক পারিবারিক কার্যক্রমে পরিণত করা।
  • সমস্যা সমাধান যে কেবল শিশুদের দক্ষতা বাড়াবে তাই নয়, এটি তাদের জন্য চমৎকার স্মৃতি হয়ে থাকবে। বাচ্চারা বাবা-মার সঙ্গ চায়। সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে আপনি তাদের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটাতে পারেন। কোনো শিক্ষকই এক্ষত্রে আপনার বিকল্প হতে পারে না (হওয়া উচিতও নয়)।

—ড. শাহরিয়ার হোসেন

মূল লেখা – https://computing4all.com/education/the-biggest-mistake-while-teaching-kids-math/, অনুবাদ করেছেন মোশারফ হোসেন।

গণিতে দুর্বল?

অনেকেই আমার কাছে বা বিভিন্ন ফোরামে এরকম একটা প্রশ্ন করে, “ভাই, আমি তো গণিতে দুর্বল, আমি কি প্রোগ্রামিং শিখতে পারব?” প্রশ্নটা যারা করে, বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এখন কথা হচ্ছে গণিতে দুর্বলতা কোনো স্থায়ী জন্মগত সমস্যা নয় যে সেটা ঠিক করা যাবে না। তাই প্রোগ্রামিং শেখার আগে সেই সমস্যাটা ঠিক করে ফেলাই ভালো নয় কি? তো কীভাবে কী করা যায়, সেটা নিয়ে আমার দীর্ঘদিন গণিত পড়ানোর অভিজ্ঞতার আলোকে তোমাদের জন্য এই লেখা।

Image Source : http://blogs.discovermagazine.com/inkfish/2012/11/02/math-phobes-experience-arithmetic-like-bodily-pain/

প্রথম কথা হচ্ছে তোমার ম্যাথ জিনিয়াস হওয়ার দরকার নাই। তুমি তো আর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাচ্ছ না, কিংবা এসিএম আইসিপিসির ওয়ার্ল্ড ফাইনালসে প্রতিযোগিতা করতে যাচ্ছে না। তোমার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রোগ্রামিং শেখা এবং ভালো লাগলে সেটার উপর ক্যারিয়ার গড়া। এবং তুমি গণিতে নিজেকে দুর্বল মনে করছ, তাই আমার এই আর্টিকেলটি পড়ছ। তুমি গণিতে দূর্বল মানে তোমার বেসিক যথেষ্ট শক্ত নয়, তুমি স্কুলে ফাঁকিবাজি করেছ। অথবা জীবনে কখনও ভালো গণিত শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয় নাই। তো এখন স্কুলজীবন শেষ, তার মানে এই না যে স্কুলের বইগুলো আবার পড়া যাবে না। তুমি প্রথমে অষ্টম শ্রেণীর গণিত বই পড়া শুরু কর। বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলবে। সাথে সাথে উদাহরণের অঙ্কগুলো নিজে নিজে করবে। অনুশীলনী করার দরকার নাই। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই বইটা শেষ করতে পারা উচিত। তুমি স্কুলের বই পড়ছ দেখে বাসায় লোকজন হাসাহাসি করতে পারে, পাত্তা দিও না।

এরপর নিজেকে প্রশ্ন করবে? ক্লাস এইটের বই পড়ার সময় কী সবকিছু ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছ নাকি কোথাও কোথাও একটু সমস্যা হয়েছে? যদি সমস্যা হয়, তাহলে ক্লাস ফাইভের বই থেকে শুরু কর। তারপর ক্লাস সিক্স ও সেভেনের বই। প্রতিটা বই পড়তে এক সপ্তাহের মত সময় লাগবে। পড়ার সাথে সাথে উদাহরণগুলো করতে ভুলবে না।

ক্লাস এইট পর্যন্ত গণিতের বেসিক শক্ত করার পরে তুমি জাফর ইকবাল স্যারের লেখা “গণিত এবং আরো গণিত” বইটা পড়তে পার। বইটা আসলে ইংলিশ মিডিয়ামের (ও লেভেলের) গণিত বই অবলম্বনে লেখা। পড়তে এক মাসের মতো সময় লাগবে।

উপরের কাজগুলো করার পরে তুমি প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করে দাও। আর প্রোগ্রামিং শেখার সময়, প্রোগ্রামিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে ডিসক্রিট ম্যাথ শিখে ফেলো। এর জন্য বাংলায় কোনো ভালো বই নাই। তবে হাম্মাদ আলী স্যারের অনলাইন কোর্স আছে, সবার জন্য ফ্রি।

পৃথিবীর ৯৫% প্রফেশনাল প্রোগ্রামারই জীবনে এমন কিছু করবে না, যার জন্য এর চেয়ে বেশি গণিত শেখার দরকার হবে। বাকী ৫% এর অনেক কিছু শিখতে হবে। সেগুলো কী কী, এটা তাদের আলাদাভাবে বলে দেওয়া লাগবে না, তারা সামনে এগুতে থাকলে এমনিতেই জানতে পারবে। আর ৯৫%, যাদের মধ্যে তোমার থাকার সম্ভাবনা বেশি, তুমি নিশ্চিন্তে প্রোগ্রামিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে পার, যদি প্রোগ্রামিং ভালো লাগে। তোমার জন্য শুভকামনা।

যারা আসলেই স্কুলে গণিত শেখায় ফাঁকি দিয়েছ, তারা গণিত করব জয় বইটি পড়তে পারো। বইটি আমি ও তাহমিদ রাফি মিলে লিখেছি।