শেরিল স্যান্ডবার্গ

সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক। এই ফেসবুকের পরিচালনা পরিষদের প্রথম নারী সদস্যের নাম “শেরিল স্যান্ডবার্গ”, যিনি প্রযুক্তি দুনিয়ার প্রভাবশালী নারীদের মধ্যে অন্যতম। ২০১২ সালে তিনি প্রথম এবং একমাত্র নারী হিসেবে ফেসবুকের পরিচালনা পরিষদে যোগদান করেন।

শেরিল স্যান্ডবার্গ
শেরিল স্যান্ডবার্গ

শেরিল ক্যারা স্যান্ডবার্গ, ১৯৬৯ সালের ২৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ্যাডলি এবং জোয়েল স্যান্ডবার্গ দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শেরিলের বাবা জোয়েল স্যান্ডবার্গ ছিলেন একজন চুক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মা এ্যাডলি স্যান্ডবার্গ ছিলেন ফরাসী এবং ইংরেজি ভাষার শিক্ষিকা।

শেরিলদের পরিবারের ঐতিহ্য ছিল সোভিয়েত ইহুদিদের সাহায্য করা। সেই সময় সোভিয়েত ইহুদীদের ইসরাইলে অভিবাসনের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আন্দোলন চলছিল। শেরিলদের বাসায় সেসময় আন্দোলনকারীদের সভা বসতো এবং প্রতি সপ্তাহান্তে র‍্যালি বের করা হতো।

মা-বাবা, ভাইবোনের সাথে শেরিল স্যান্ডবার্গ (বামে)
মা-বাবা, ভাইবোনের সাথে শেরিল স্যান্ডবার্গ (বামে)

শেরিলের দুই বছর বয়সের সময় তাদের পরিবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লোরিডার নর্থ মায়ামী বিচ্‌ এ চলে আসে। সেখানকার নর্থ মায়ামী বিচ্‌ হাই স্কুলে শেরিলের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। তিনি বরাবরই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। স্কুলে সবসময় প্রথম স্থানটি ছিলো শেরিলের দখলে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৮০ সালে শেরিল যখন হাইস্কুলের ছাত্রী তখন তিনি তাঁর স্কুলে অ্যারোবিকস্‌ শেখাতেন। সেই সময় তিনি ন্যাশনাল অনার সোসাইটির সাথেও যুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে শেরিল নবম স্থান অধিকার করে ৪.৬৪৬ সিজিপিএ নিয়ে কলেজ গ্রাজুয়েট হন।

১৯৮৭ সালে শেরিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে বি.এ ভর্তি হন।সেখানে পড়াকালীন সময়ে তিনি এবং কয়েকজন মিলে “ওইমেন ইন ইকোনোমিক্স এ্যান্ড গভর্নমেন্ট” নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিলো সরকার এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনায় মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। ১৯৯১ সালে শেরিল গ্রাজুয়েট হন এবং গ্রাজুয়েটদের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করার পুরষ্কার স্বরূপ স্যার জন উইলিয়ামস্‌ পুরষ্কার অর্জন করেন।

শেরিল-হার্ভার্ড থেকে ডিগ্রী নেয়ার সময়।
শেরিল-হার্ভার্ড থেকে ডিগ্রী নেয়ার সময়।

হার্ভার্ডে শেরিলের থিসিস সুপারভাইজার এবং গুরু ছিলেন প্রফেসর ল্যারি সামার। ল্যারি সামারের গবেষণা-সহকারী হিসেবে হার্ভার্ডের পড়াশোনা শেষ করার পর বিশ্ব ব্যাংকে যোগদান করেন। বিশ্ব ব্যাঙ্কের অধীনে ভারতীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পে শেরিল এক বছরের মত কাজ করেন।

১৯৯৩ সালে শেরিল আবার হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে ভর্তি হন এমবিএ করার জন্য। সেখান থেকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধি নিয়ে তিনি ১৯৯৫ সালে এমবিএ ডিগ্রী লাভ করেন।

এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করার পর, ১৯৯৫ সালে শেরিল স্যান্ডবার্গ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে ম্যাককিংসি এ্যান্ড কোম্পানিতে যোগদান করেন । সেখানে একবছর চাকরি করার পর তিনি আবার প্রফেসর ল্যারি সামারের সাথে ইউনাইটেড স্টেটস্‌ অফ দ্যা ট্রেজারির অধীনে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের কোষাগারের দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন। সেখানে শেরিলের কাজ ছিল এশিয়ান অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় ঋণ গ্রহীতা দেশগুলো ঋণ মওকুফ করা। ২০০১ সালের জর্জ ডাব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত শেরিল এই ইউনাইটেড স্টেটস্‌ অফ দ্যা ট্রেজারির দায়িত্বে ছিলেন।

সরকারি চাকরী ছেড়ে দেবার পর শেরিল স্যান্ডবার্গ সিলিকন ভ্যালিতে চলে আসেন। তিনি চাচ্ছিলেন টেকনোলজিক্যাল কোন কোম্পানিতে যোগদান করতে। ২০০১ সালে শেরিল স্যান্ডবার্গ গুগল ইনকর্পোরেট-এ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। তিনি গুগলের মিশনকে বর্ণনা করেন “বিশ্বের সকল তথ্যকে সহজলভ্য করা। শেরিল গুগলের অনলাইন সেলস্‌ এ্যান্ড অপারেশন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

২০০৭ সালের শেষের দিকে বড়দিনের এক পার্টিতে শেরিলের সাথে মার্ক জাকারবার্গের দেখা হয়। জাকারবার্গ সেসময় ফেসবুকের জন্য কোন সিওও এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি, কিন্তু চিন্তা এই পদের জন্য যোগ্য হিসেবে শেরিলের কথাই তিনি চিন্তা করেছিলেন। ২০০৮ সালে, সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামে আবার শেরিল এবং জাকারবার্গের সাক্ষাৎ হয়। সেসময় মার্ক শেরিলকে ফেসবুকের একজন অভিভাবক হিসেবে যোগদান করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। জাকারবার্গের আমন্ত্রণকে শেরিল স্যান্ডবার্গ আনন্দের সাথে গ্রহণ করে ফেসবুকে যোগদান করেন।

শেরিল ফেসবুকে যোগদানের পর ফেসবুককে লাভজনক করার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেন। তিনি ফেসবুকের সেলস্‌, মার্কেটিং, ব্যবসায় উন্নয়ন, মানব সম্পদ, পাবলিক পলিসিসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি নজর দেন। ফলশ্রুতিতে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি ফেসবুককে লাভজনক অবস্থায় নিতে সক্ষম হন।

২০১২ সালে শেরিল ফেসবুক পরিচালনা পরিষদের অষ্টম  এবং প্রথম নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০১৩ সালের ১১ মার্চ শেরিল স্যান্ডবার্গের প্রথম বই “লিন ইনঃ উইমেন, ওয়ার্ক এ্যান্ড দ্যা উইল টু লিড” প্রকাশিত হয়। বইটি ২০১৩ সালের “বেষ্ট সেলার” যেটি ১ মিলিয়ন এর বেশি কপি বিক্রি হয়। বর্তমানে এই বইটির কাহিনীকে চলচিত্র করার চিন্তাভাবনা চলছে।  লিন ইন বইয়ে শেরিল বলেনঃ

“সত্যিকারের সমঅধিকারের বিশ্ব তখনই হবে যখন মেয়েরা দেশের এবং দেশের প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক দায়িত্ব নিয়ে নিবে ও পুরুষেরা নিবে সংসারের কাজের অর্ধেক দায়িত্ব।”

শেরিল স্যান্ডবার্গ ১৯৯১ সালে ব্রিয়ান ক্র্যাফ নামক এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করলেও একবছর পরেই তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। পরে ২০০৪ সালে তিনি তৎকালীন ইয়াহো! এক্সিকিউটিভ ডেভ গোল্ডবার্গকে (পরবর্তীতে সার্ভেমাঙ্কির সিইও) বিয়ে করেন। এই দম্পতির একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রয়েছে।

স্বামী ডেভের সাথে শেরিল
স্বামী ডেভের সাথে শেরিল

শেরিল লিন ইন বইটিতে তাঁর স্বামী ডেভ সম্পর্কে বলেনঃ

“একজন মেয়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে তাঁর জীবনসঙ্গী থাকবে কিনা এবং কে হবে সেই জীবনসঙ্গী। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত হলো ডেভকে বিয়ে করা।”

২০১৫ সালের ১ মে ডেভ গোল্ডবার্গ মেক্সিকোতে পারিবারিক ছুটি কাটাতে গিয়ে হঠাৎ করেই মারা যান ।

শেরিল স্যান্ডবার্গ ২০১২ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ জন প্রভাবশালীর তালিকায় আসেন । তিনি ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিদের মধ্যেও জায়গা করে নেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুসারে শেরিল বর্তমানে ১.০৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার সম্পত্তির মালিক। ফেসবুক ছাড়াও তিনি দ্যা ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি, উইমেন ফর উইমেন ইন্টারন্যাশনাল, সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট এবং ভি-ডে এর পরিচালনা পরিষদের সদস্য।

ঘরে বাইরে সবক্ষেত্রে সমান সফল হওয়া সত্ত্বেও শেরিলের সমালোচকের অভাব নেই। অনেক সমালোচকদের মতে তিনি অনেক অভিজাত জীবনযাপন করেন এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের সংগ্রাম করা ব্যাপারটি নিয়ে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিন শেরিল স্যান্ডবার্গকে তাদের প্রচ্ছদে স্থান দেয়। সেই টাইম ম্যাগজিনের শিরোনাম ছিলোঃ “তাকে ঘৃণা করো না, কারণ সে সফল”।

লেখক : তামান্না নিশাত রিনি।