সোহেল তাসলিম – সাক্ষাৎকার

আমার ইন্টারভিউ প্রজেক্টের নতুন শিকার হচ্ছেন সোহেল তাসলিম – যিনি বর্তমানে জাপানে কর্মরত। উনার সাথে পরিচয়ের কথা এখানে বিস্তারিত লিখলাম না (ইন্টারভিউ নিয়ে যেই বইটি তৈরি করছি, সেখানে থাকবে)। তবে কীভাবে কীভাবে জানি অসাধারণ ও উদ্যমী সব মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়ে যায়। 🙂

taslim-sohel

সুবিন : সোহেল ভাই, আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
সোহেল : আমি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ইফিউশন এ কাজ করছি। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই কোম্পানির সঙ্গে আছি।

সুবিন : ইফিউশন সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলুন।
সোহেল : এটি জাপান অবস্থিত একটি আইটি কোম্পানী। স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, হোস্টিং, বই এবং গেইম প্রকাশনাসহ একটি পরিচিত স্মার্টফোন কোম্পানির গবেষণার কাজ এবং preinstalled অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টএর কাজ করে থাকে। নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকার কারনে স্মার্টফোন কোম্পানির নাম প্রকাশ করলামনা। আমি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট এর ডিভিসন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছি।

সুবিন : আপনার টিম-সাইজ কেমন? আপনাকে কী কী কাজ করতে হয়?
সোহেল : আমি দশ জনের কম একটি ছোট দল নিয়ে কাজকরি। প্রত্যেকেরই tech savvy, challenger, problem solver এবং cooperative। আমার দায়িত্ব ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং টিম ম্যানেজমেন্ট। আমি এমন একটি টিম তৈরি করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এর জন্য আমাকে বিগত ৩ বছর অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।

সুবিন : সম্প্রতি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে অফিসে বসে আর কাজ করবেন না। এরকম সিদ্ধান্তের কারণ কী?
সোহেল : ২০১১ এর সুনামির পরে আমাদের কোম্পানী বাসা থেকে রিমোটএ কাজ করার একটি নিয়ম শুরু করে।
বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এটি উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করে দেয়। সর্বত্র উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন যোগাযোগকে আরো সহজ করে দেয়াতে রিমোটে কাজ করা সহজ হয়ে এসেছে। তাই আমি আমার কাজের স্টাইলে একটু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। “Internet is my office not a physical place. So, I am at office at least when smartphone in my pocket.” যা আমার ভবিষ্যত ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে দিতে পারে এবং আমাদের কোম্পানীর নিজস্ব product development এ বিশেষ প্রভাব ফেলবে।

সুবিন : জাপানে আপনার মোট কত বছর কাজ করা হল? জাপানীদের কাজের সংস্কৃতি সম্পর্কে যদি পাঠকদের একটু ধারণা দিতেন।
সোহেল : আমি জাপানে কাজ করছি প্রায় 9 বছর হল।

জাপানি মানুষ খুব punctual এবং নিজ নিজ কাজ সম্পর্কে সিরিয়াস। প্রত্যেকের নিজ নিজ লক্ষ্যের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা রয়েছে। জাপানি কোম্পানি খুবই প্রফেশনাল হয় এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। যা প্রফেশনালিজমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সুতরাং, মানিয়ে নিতে পারলে কর্মজীবন এখানে ঝামেলামুক্ত ও নিরাপদ।

আপনার দক্ষতা কম হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানি আপনার পেছনে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে যদি আপনার ভাল কাজ করার আগ্রহ থাকে। তাই হয়ত সহজে কেউ চাকরি পরিবতন করেনা। সুতরাং, আপনি একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে এখানে বেড়ে উঠতে পারবেন শুরু থেকেই।

কিন্তু, আপনার যদি একটি ভাল ব্যবসায়িক আইডিয়া থাকে এবং বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন সেক্ষেত্রে জাপান ঠিক আপনার জন্য পারফেক্ট জায়গা নয়।

সুবিন : বাংলাদেশী সফটওয়্যার ডেভেলাপার আর জাপানী সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের মধ্যে টেকনিক্যাল স্কিল ও প্রফেশনালিজমের ব্যাপারে কোনো পার্থক্য কি আপনার চোখে পড়ে?
সোহেল : অন্য অন্য দেশের মত বাংলাদেশেও অনেক মেধাবী রযেছে। যেহেতু আমাদের জনসংখা অনেক বেশী সে হিসেবে মেধাবীর সংখাও আনুপাতিক হারে বেশী বলে আমি বিশ্বাস করি। এদের ভেতর থেকে যারা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসে তাদের টেকনিকাল স্কিল কোনো অংশে কম নয়। তবে জাপানী ডেভেলপারদের কিছু এটিচুড চোখে পড়ার মত। যেমন, “I want to do it.”। পারব কি পারবনা তা নিয়ে কখনই ভাবেনা। কার ব্যাকগ্রাউন্ড কি তা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নাই। আর কারো ফলাফলের অপেক্ষা করেনা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মনোভাবটা কম। সবসময় নিজে কতটুক আউটপুট দিল তা দেখে।

আমাদের প্রফেশনালিজমের যথেষ্ট কমতি রযেছে। এটা সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের একার সমস্যা নয়। এটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। এ চক্র থেকে বের হতে হলে আজ যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে তাকে গড়ে তোলার ভেতর দিয়ে শুরু করতে হবে। সুতরাং এটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা।

সুবিন : জাপানে তো বিশাল একটা সফটওয়্যার বাজার রয়েছে। আপনার কোম্পানী তো কিছু ছোট স্কেলের প্রজেক্ট বাংলাদেশে আউটসোর্স করে। বড় স্কেলের প্রজেক্ট আউটসোর্সিং করতে সমস্যা কোথায়? আর জাপানের আউটসোর্সিং বাজার ধরতে চাইলে বাংলাদেশি কোম্পানীগুলোর কী করা উচিত?
সোহেল : বড় স্কেলের প্রজেক্ট আউটসোর্স করতে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় কমুনিকেশন এবং কালচারাল ব্যবধান। ছোট প্রজেক্টের বেলাতেও একই সমস্যা রযেছে কিন্তু রিস্ক একটু কম যা রিকভারের সুযোগ রযেছে।

জাপানের আউটসোসিং বাজার ধরতে চাইলে, জাপানিজ পড়তে এবং লিখতে পারে এমন একজনকে নিযোগ দিয়ে শুরু করতে হবে। যে কিনা Bridge Engineer হিসেবে কাজকরবে। জাপানিজরা ইংরেজিতে কমুনিকেট করতে চায়না। যেহেতু এটা তার মাতৃভাষা নয় সেহেতু মিসকমুনিকেশানের কারণে কাজে ভুল হয়ে সময় ও শ্রম দুই নষ্ট হতে পারে, যা তারা খুবই অপছন্দ করে। যেটাকে আমি কমুনিকেশন সমস্যা বলেছি।

আর কাজের সাথে সংস্লিষ্ঠ কালচারাল ব্যবধান বলতে আমার কাছে মনেহয় প্রফেশনালিজমের অভাব। যেহেতু বহির বিশ্বের কাছে আমরা কর্ম দিয়ে পরিচিত নই সেহেতু ছোটো ছোটো প্রজেক্ট এর কাজ করে আমরা সে আস্থা তৈরী করতে পারি।

সুবিন : আরে যেসব সফটওয়্যার প্রকৌশলী কাজ করার জন্য জাপান যেতে চায়, তারা কিভাবে যেতে পারে?
সোহেল : বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে জাপানে দুবছরের “জাপানিস ভাষা শিক্ষা” কোর্স করতে অাসতে পারে। অথবা স্কলারশিপ নিয়ে এম.এস./পিএইচডি করতে আসতে পারে। কোর্স শেষ হবার আগেই অনেকে চাকরি পেয়ে যায়। সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের এখানে বেশ চাহিদা আছে। এখানে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীর সর্বনিম্ন প্রতি মাসে বেতন বাংলাদেশী দেড় লক্ষ টাকা!

সুবিন : আপনি তো নিজ উদ্যোগেও অ্যাপল স্টোরে আইওএস (iOS) অ্যাপ তৈরি করে পাবলিশ করেছেন। এবং বেশ সফলও হয়েছেন। সেই অ্যাপগুলোর ব্যাপারে একটু বলুন।
সোহেল : ২০০৯ থেকে আমি iOS অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের সাথে জড়িত। আমার যে অ্যাপটি আমাকে সব থেকে বেশী সফলতা এনে দিয়েছে তার নাম হচ্ছে “SYSTEM UTIL Dashboard”। এটি ২০১৩ সনের মার্চ মাসে Apple এর Overall Rank এ ৭৫ টি দেশে ১ নাম্বার ডাউনলোডেড এপ্লিকেশন হয়। Utilities বিভাগে ৯৮ টি দেশে ১ নাম্বার স্থান দখল করে। এছাড়া ২০১০ এ SYSTEM নামের অ্যাপটি জাপানিস App স্টোরে “Top ১০ Paid” অ্যাপ হিসেবে নির্বাচিত হয়। এবং ২০১১,২০১২ তে আমার ২টি করে ২০১৩ তে ১ টি এপ্লিকেশন “App Store BEST OF” হিসেবে নির্বাচিত হয়. যা আমাকে সবসময় উত্সাহিত করেছে পরবর্তী কাজের জন্য। আমার তৈরী একটি অ্যাপ নিয়ে ২০১৩ জানুয়ারীর ২৪ তারিখে “The New York Times” এ প্রতিবেদন ছাপা হয়।

system-util-ss

সুবিন : বাংলাদেশে বসে কেউ যদি নিজে নিজে অ্যাপল স্টোর বা প্লে স্টোরে অ্যাপ পাবলিশ করতে চায়, তাহলে তার সফল হবার সম্ভাবনা কতটুকু? অ্যাপগুলো কি লোকাল মার্কেটের কথা চিন্তা করে বানানো উচিত নাকি গ্লোবাল মার্কেট?
সোহেল : যদিও এ মার্কেট এখন অনেকটা পুরোনো হয়ে গেছে এবং বড় বড় কোম্পানি গুলোর সাথে কম্পিট করতে হচ্ছে তবুও যথেষ্ট সুযোগ রযেছে। Creative এবং Innovative টেক পিপলদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ যে তারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে সরাসরি বিশ্বের অনেক গুলো দেশের ক্রেতার কাছে তাদের কাজ পৌঁছে দিতে পারছে। আর ভালো অ্যাপস এর কদর সবসময়ই আছে। ভালো অ্যাপস তৈরীর পাশাপাশি তা পরিচিত করার জন্য প্রচারণার কাজটিও করতে হবে সমান গুরত্ব দিয়ে। লেগে থাকলে সফলতা বেশীদিন পালিয়ে থাকতে পারেনা। অ্যাপ এর প্রচারের অনেক টিপস এবং টিউটোরিয়াল রযেছে ইন্টারনেটে।

আর এমন একটা বড় সুযোগ থাকতে গ্লোবাল মার্কেটকে চিন্তা করে অ্যাপগুলো না বানানোর কোনো কারণ দেখিনা। US, Japan, Germany, Italy এর মত দেশে পেইড অ্যাপএর ক্রেতা এখনও অনেক বেশী। আবার ইন্টারনেটের ব্যবহার সর্বত্র থাকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ও এসব দেশ থেকে সর্বাধিক লাভবান হওয়া সম্ভব।


সুবিন : এবারে একটু পেছনে ফিরে যাই। ছোটবেলায় কোন কোন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন?
সোহেল : আমার স্কুল জীবন কাটে বাংলাদেশ রাইফেলসে।

সুবিন : কোন ভার্সিটিতে পড়েছেন? আপনার দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার পেছনে ভার্সিটির ভূমিকা কতটুকু?
সোহেল : ইনস্টিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনলজি (IST)। বিশেষ ভুমিকা রেখেছে বলে আমার মনেহয়না। তবে আমাকে একটা পরিবেশ দিয়েছে যেখানে আমি আমাকে তুলনা করার সুযোগ পেয়েছি এবং শিক্ষক ও বড় ভাইদের কাছ থেকে অনেক এডভাইস পেয়েছি।

সুবিন : যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ছে, তারা যদি দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে চায়, তবে করণীয় কী?
সোহেল : দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে দরকার প্রচুর অনুশীলন। তাই প্রথম সেমিস্টার থেকেই তা শুরু করতে হবে। পাঠ্যক্রমে যা আছে শুধু তার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকা যাবেনা। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের সাথে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপারের কোনো সম্পর্ক নাই। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য লেখা পড়া করার বাইরে অতিরিক্ত সময় বের করে প্রোগ্রামিং অনুশীলন করতে হবে।

সুবিন : অনেক শিক্ষার্থীই ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটে কাজ করছে, বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
সোহেল : পজেটিভে ভাবে দেখছি। যেহেতু তারা উন্নত দেশের কাজগুলো করছে সেহেতু মার্কেটে টিকে থাকতে তাদেরকে প্রফেশনাল হতে বাধ্য করছে। বিশ্ববাজার এ নিজের অবস্থানকে তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছে। যা তাদের এবং বাংলাদেশের ভবিষৎতের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনেকরি।

সুবিন : বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কী মনে হয় আপনার কাছে?
সোহেল : এক কথায় বললে অবকাঠামোর অভাব।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : আমরা কিভাবে সেটি অতিক্রম করতে পারি?
সোহেল : যেহেতু আমি ভালো বক্তা নই তাই সুন্দর করে বলতে পারছিনা। তবে আমার সহজসরল ভাষায়, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব। যার গুরুদায়িত্ব হলো সরকারের হাতে। যদিও এ সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে এ শিল্প কে অগ্রাধিকার দিয়ে। যথাযথ অবকাঠামো পেলে মেধাবী এবং entrepreneur রা তার সঠিক ব্যবহার করে থাকে। সফটওয়্যার শিল্পের বেলায় ও তাই। অবকাঠামো উন্নয়নে যে দুই-তিনটি বিষয় এ এখন খুব বেশী গুরুত্ব দেয়া দরকার বলে আমার মনে হয় :
১. সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎত নিশ্চিত করা
২. বিভাগীয় সহর গুলোর সর্বত্র সার্বক্ষণিক উচ্চগতীর ইন্টারনেট নিশ্চিত করা (ভুলে যেতে হবে ইন্টারনেট সংযোগ নাই বলে কোনো বিষয় আছে)
৩. কপিরাইট আইনের সঠিক বাস্তবায়ন (পাইরেসি)
৪. ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কিং কে আরো সহজ করা
৫. বড় বড় IT কোম্পানিগুলোর জন্য IT পার্ক করা এবং শহরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা

হয়ত সবই হবে, তবে যত তাড়াতাড়ি হবে তত আমরা তাড়াতাড়ি এগোব। আমি আমার দেশকে একটা সুন্দর জায়গায় দেখতে চাই। চাই আমার সন্তানরা যেন একটা শান্তির উন্নত দেশ পায়।

অনুপম শ্যাম : সাক্ষাৎকার (১)

অনুপম শ্যাম হচ্ছেন আমি যাদের সাথে সরাসরি কাজ করেছি, তাদের মধ্যে সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের অন্যতম। ট্রিপার্ট ল্যাবে আমরা সহকর্মী ছিলাম। বর্তমানে অনুপম সিলিকন ভ্যালীতে থাকেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে অনুপমদা’র একটি ইন্টাভিউ যদি নেওয়া যায়, তাহলে আমাদের দেশের তরুন শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারবে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ইন্টারভিউটি থেকে আমি নিজেই অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আরেকটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে উনি একটু লাজুক স্বভাবের হওয়ায় ইন্টারভিউ’র জন্য রাজি করাতে আমার পাঁচ মিনিট সময় খরচ করতে হয়েছে। ইন্টারভিউটা একটু বড়, তাই দুটি অংশে ভাগ করেছি। আজকে প্রথম অংশ প্রকাশ করলাম।

anupom

সুবিন : আপনি এখন কোথায় কাজ করছেন?
অনুপম : আমি এখন কাজ করছি এভারনোট নামের একটা স্টার্টআপ এ। এভারনোট একটি ক্লাউড বেসড ওয়ার্কস্পেস এপ্লিকেশন/সার্ভিস।

সুবিন : কোন টেকনোলজিতে কাজ করছেন?
অনুপম : আমি কাজ করি প্লাটফর্ম টীম এ, আমাদের কাজ হচ্ছে এভারনোট এর ব্যাকএন্ড প্লাটফর্ম এর স্ক্যালাবিলিটি, স্টাবিলিটি, সিকিউরিটি, আর পারফর্মেন্স নিয়ে। টেকনোলজি মূলত জাভা, কাউচবেস, মাইসিকুয়েল, লুসিন, হাডুপ।

সুবিন : প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করলেন কবে?
অনুপম : ১৯৯৮ সালে । ক্লাস ৭/৮ এ থাকতে মামার বাসায় কিছু কম্পিউটার সম্পর্কিত বই/ম্যাগাজিন পাই, তখন যা হাতের কাছে পেতাম তাই পড়তাম। ওখান থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে আগ্রহের শুরু। পরে এস.এস.সি পরীক্ষার পর কম্পিউটার ক্লাস এ ভর্তি হই, “সি” এর বই কিনি (Teach Yourself C – Herbert Schildt) আর নিজে নিজেই শখের বশে বই পরে প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি।

সুবিন : প্রফেশনাল প্রোগ্রামিংয়ে কবে থেকে যুক্ত হলেন?
অনুপম : ২০০৪ এর দিকে কিছু ছোট খাটো ফ্রিল্যান্স কাজ দিয়ে। তখন আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে স্ফুরণ টেক নামএ একটা স্টার্টআপ শুরু করি। আমরা শুরুতে মোবাইল এর জন্য এপ্লিকেশন/গেম বানাতাম। ওই সময় আমরা বাংলা তে এস.এম.এস. করার জন্য ও একটা সফটওয়্যার বানাই।

সুবিন : ওইসময়ে স্টার্টআপ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অনুপম : আমাদের কে কেউ পাত্তা দিত না। এই পিচ্চি রা আবার কি করবে এই রকম অবস্থা। আর তখন সবার এত তথ্যপ্রযুক্তি/স্টার্টআপ এই বিষয়ে ধারণা ও ছিল না। তো একবার আমরা ২০০৪ এ একটা সফটওয়্যার বিক্রি করার জন্য প্রেজেন্টেশন দিতে যাই তখনকার সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি তে। প্রথম দিকে সবাই তো অবাক এত ছোট ছোট ছেলেপেলেরা কি করতে আসছে এইখানে। পরিচালক পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন ওই মিটিং এ। মনে আছে প্রেজেন্টেশন শেষে কোনো এক উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হাত তালি দিয়ে বলেছিলেন “You guys are young guns, I am really impressed” । এক ধাক্কায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক উপরে উঠে যায় উনার ওই কথায়। তো ভালো খারাপ মিলিয়ে খুবই এক কথায় খুবই দু: সাহসিক ছিল পুরো ব্যাপারটা সেই সময়ের জন্যে।

সুবিন : সফটওয়্যার ডেভেলাপার হতে হলে কি কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে?
অনুপম : ছোট উত্তর: সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হলে কম্পিউটার সাইন্স পড়তে হবে না। বড় উত্তর : কেউ যদি জানে যে সে সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে চায় তাহলে অন্য কোনো সাবজেক্ট না পড়ে কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে পড়তে পারলেই ভালো। তাতে সময় এর ভালো ব্যবহার হবে, অন্য বিষয়ে পড়লে সেই শেখাটা যদি বাস্তবিক ভাবে কোনো কাজে লাগানো না হয় তাহলে তো সেটার খুব একটা অর্থপূর্ণ প্রয়োগ হলো না। কেউ যদি অন্য কোনো বিষয় এ পড়ে তাহলে তাকে কষ্ট অনেক বেশি করতে হবে, যদিও প্রচন্ড আগ্রহ থাকলে সেটা কোনো ব্যাপার না। নিজে থেকে কোনো কিছু শেখা টা খুবই অনানুষ্ঠানিক আর অসংঘটিত, যে কারনে শেখার মাঝখানে ফাঁক থেকে যেতে পারে। এখন অনেক কোর্স ই অনলাইন এ সুলভ, কেউ যদি চায় তাহলে নিজেই কোনো একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এর সিলেবাস অনুসরণ করে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। শুধু প্রোগ্রামিং লেঙ্গুয়েজ শিখেই কিন্তু সফটওয়্যার ডেভেলপ করা যায়। কিন্তু এলগরিদম , ডাটা স্ট্রাকচার, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটার আর্কিটেকচার, নেটওয়ার্কিং, ডাটাবেস, বিচ্ছিন্ন গণিত এগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে যেতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে কম্পিউটার সাইন্স এর ডিগ্রীধারী মনেও যে সে ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার তা না। প্রবল ইচ্ছা আর আগ্রহ থাকা টাই জরুরী। মানে আগ্রহ থাকলে ডিগ্রী না থাকলেও চলবে, কিন্তু উল্টো টা সত্য না। আমার দেখা ভালো সফটওয়্যার ডেভেলপার এর মধ্যে কয়েকজন আছে যাদের কম্পিউটার সাইন্স এ কোনো আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই। কিন্তু এই ব্যাপারটা যে কোনো সাধারণ প্রবণতা না সেটা মনে রাখতে হবে।

সুবিন : ট্রিপার্ট ল্যাবের ঢাকা অফিস প্রতিষ্ঠার গল্পটি শুনতে চাই।
অনুপম : গল্পটা একদম শুরু থেকে বলি। আমি তখন প্রোগ্রামিং বিষয়ক ব্লগিং করতাম মোটামোটি নিয়মিত ভাবে। ২০০৭ এর জানুয়ারী এর দিকে ব্লগ এর মাধ্যমে একটা মেসেজ পাই, সিলিকন ভ্যালি এর মেনলো পার্ক এর একটা স্টার্টআপ থেকে, ওরা তখন ওদের সদ্য শুরু করা স্টার্টআপ এর জন্য ডেভেলপার খুজছিল, অনলাইনে সার্চ এ কোনো ভাবে আমার ব্লগ পায়, ব্লগ পড়ে ওদের মনে হয় যে আমি কাজ করতে পারব। তো ওরা আমাকে বলে আমি আগ্রহী কিনা, তখন আমার পকেট এর অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, বাসা থেকে remotely কাজ করতে পারব, মার্কিন স্টার্টআপ টাকা পয়সা ভালোই দিবে, আমার দিক থেকে আগ্রহ না থাকার কোনো কারণ ই ছিল না, আমি জানাই সেটা। ওরা তখনই একটা ইন্টারভিউ দিতে বলে তো, আমার তখন বাজে রাত ১ টার মতো। যাই হউক ওদের সিটিও ইন্টারভিউ নেয়, আমি ঘুমকাতুরে অবস্থায় মশার কামর খেতে খেতে কিছু একটা ইন্টারভিউ দেই। এরপর ওরা ওই দিনই আমাকে কাজ শুরু করতে বলে, আমি ওই স্টার্টআপ এর প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এর পরদিন থেকেই কাজ শুরু করে দেই। প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ এ এটাকে বড় করার – প্রাথমিক ভাবে আরো কয়েকজন কে সাথে নেয়া আর দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ওখানে একটা অফিস প্রতিষ্ঠা করা। আমার শুরু করার মাস কয়েক পরেই বাংলাদেশ থেকে আমার সাথে যোগ দেয় আহসান ভাই, তার পরে হাসিন ভাই, মানজিল ভাই, তপু ভাই । শুরু তে আমাদের কোনো অফিস স্পেস ছিল না, আমরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে, কফি শপে মিটিং করতাম। ২০০৭ এর শেষ দিকে অথবা ২০০৮ এর শুরুর দিকে আমরা প্রথম অফিস স্পেস নেই উত্তরা তে, একটা ২ বেডরুম এর এপার্টমেন্ট, মনে আছে হাসিন ভাই আর অন্যরা খুব খেটেছিল ওই অফিস নেয়ার সময় । তখন বাংলাদেশ থেকে ট্রিপার্ট এ কাজ করে প্রায় ৭/৮ জন। এক বছর এর মধ্যেই সেই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৮ জনে, আমরা তখন পুরনো ছোট অফিস ছেড়ে আরেকটু বড় অফিস মানে বড় বাসায় উঠি। ব্যবসার দিক দিয়ে তখন ট্রিপার্ট ভালো করছিল, ওয়েব আর মোবাইল গেমস আর এপস গুলো মোটামোটি ভাবে সফল। ২০০৯ এর শুরুর দিকে আমরা আবার অফিস বদলাই, এবার প্রথম বারের মত সত্যিকারের অফিস স্পেসে উঠলাম। এই অফিস সেটআপ এর সময় মনে আছে আমি ডেইলি স্ক্রাম করতাম বাথরুম এর মিস্ত্রী, ইলেকট্রিসিয়ান, রং এর মিস্ত্রী এদের সাথে, সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ওই সময়কার অনেক মজার গল্প আছে যেগুলো অন্য সময় বলা যাবে। যাই হোক বাংলাদেশ থেকে তখন ট্রিপার্ট এ কাজ করে ৩২ জন এর মত। নতুন কাউকে নেয়ার ব্যাপারে আমরা খুবই খুঁতখুঁতে ছিলাম। আমাদের ইন্টারভিউ প্রসেস ও ছিল অন্যরকম , ওটার গল্পও আরেকদিন হবে। কালচারিলি ট্রিপার্ট ছিল অনন্য – ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক সিডিউল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অল হ্যান্ডস মিটিং, যত খুশি তত ছুটি, ওপেন ওয়ার্কিং স্পেস, আউটিং – আরো অনেক কিছু যেগুলো তখনকার বাংলাদেশের কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির জন্য ছিলো অকল্পনীয়। যেকারণে আমরা তখন আরো বেশ ভালো কিছু মানুষ কেও পেয়ে যাই আমাদের সাথে। সুবিন ভাই (যিনি এখন আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন) তিনিও ছিলেন তখন আমাদের সাথে, উনার একটি বিশেষ নাম আছে এবং সেই নামের সার্থকতার কাহিনী উনার কাছ থেকেই আগ্রহীরা জেনে নিবেন । আমরা সবাই মিলেই আসলে একটা কালচার তৈরি করতে পেরেছিলাম যেখানে আমরা নিজেরা প্রত্যেক দিন কাজ করতে যেতে চাবো। সব কিছুর উপরে আমরা মনে রাখতাম যে আমরা আমাদের দেশ কে প্রতিনিধিত্ব করছি, অনেক রাজনৈতিক আর অবকাঠামোগত বাধা বিপত্তি ছিল, কিন্তু আমরা কখনো ওগুলো কে সমস্যা হিসেবে দেখাতাম না। ট্রিপার্ট ছিল একটা বড় পরিবারের মতো, এখনো আমরা আছি, যদিও এক এক জন একেক জায়গায়। ২০০৯ এর নভেম্বরে ট্রিপার্ট ল্যাব্স কে কেনে ফেলে প্লেডম নামের আরেকটি কোম্পানি। আসলে যখন কিছু ভালো লোক কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একসাথে কাজ করে তাহলে ভালো কিছুই হবে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলাপার এবং সিলিকন ভ্যালির সফটওয়্যার ডেভেলাপারদের স্কিল ও প্রফেশনালিজমের মধ্যে তুলনা করলে আমরা কি পিছিয়ে আছি? যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে কীভাবে কাজ করলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব?
অনুপম : প্রোগ্রামিং স্কিলে আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই। আমরা কিছুটা “Tunnel vision” এ আক্রান্ত, সাধারণত একটু দূরদৃষ্টিহীন এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Myopic and short-term goal driven), যে কারণে অনেক সময়ই আমরা বড় ছবিটা (Big picture) দেখতে পাই না। আমার মনে হয় আমাদের কে বেশি করে “কেনো ?” এই প্রশ্ন টা করতে হবে এবং এর উত্তরটা জানতে হবে, তাহলেই হবে । সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এ আসলে প্রোগ্রামিং স্কিল ছাড়াও আরো অনেক সফট স্কিলস এর দরকার হয়, যেগুলোতে আমরা আসলে খুব একটা জোর দেই না। আমরা যদি এর গুরুত্ব টা বুঝতে পারি তাহলেই অনেক দূর এগিয়ে যাব ।
প্রফেশনালিজমে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এটা আসলে আমাদের কে সম্মিলিতভাবে উন্নত করতে হবে। আমেরিকা তে প্রত্যেক বছর সামার এ ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কোম্পানি তে ইন্টার্নশীপ করে, এর বদলে ক্রেডিট পায় । আমার মনে হয় আমাদের দেশেও এটা চালু করা দরকার, এর জন্য সফটওয়্যার কোম্পানি গুলোরই প্রথমে এগিয়ে আসা উচিত, তাতে এদেরই লাভ বেশি । এতে চাকরি জীবন শুরু করার আগেই প্রফেশনাল এনভায়রনমেন্ট সম্পর্কে সবার একটা ধারণা হবে, অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দের কাছ থেকে পরামর্শ আর প্রশিক্ষণ পাবে । প্রাথমিক ভাবে হয়ত সবাই কে স্থান সঙ্কুলান করা সম্ভব হবে না, আমাদের হয়ত এত বেশি সফটওয়্যার কোম্পানি নেই, যত টুকু হবে তাতেই লাভ। তাছাড়াও আমার মনে হয় প্রফেশনালিজমের সজ্ঞাও আমাদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার না। প্রফেশনালিজম নিয়ে আমরা বেশি বেশি করে কথা বলতে পারি তাতে হয়ত সবার কাছে বেপারটা পরিষ্কার হবে। ট্রিপার্ট এ আমরা একটা কথা প্রায়ই বলতাম “নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড”, এটা দিয়ে আসলে আমরা Accountability, Efficiency, Ownership, Communicativeness এই গুলোই বোঝাতাম।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সিলিকন ভ্যালির সবাই যে বাংলাদেশ এর ডেভেলপারদের চেয়ে ভালো তা না। কিন্তু ওদের টপ ২০% আমাদের টপ ১০% থেকে গড়পরতায় ভালো। আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই, আমাদের গন্তব্য টা কে একটু উপরে তুলতে হবে, যেখানে আছি সেখানে বসে পড়লে হবে না।

পরবর্তি অংশ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করতে হবে।

সাক্ষাৎকার : রুহুল আমীন সজীব

রুহুল আমিন সজীব – শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের এসিস্টেন্ট প্রফেসর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। সাস্টে শিক্ষক থাকাকালীন কিছু আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব প্রজেক্ট সে হাতে নিয়েছে এবং সাফল্য লাভ করেছে। সজীব আমার ভার্সিটির এক ব্যাচ জুনিয়র। গুগল টকে নক করলাম, ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়ে গেলো। আশা করি তাঁর চিন্তা, কথা ও কাজ থেকে আমাদের তরুণরা অনুপ্রাণিত হবে।

সজীব (বামে)
সজীবের (ছবির দিকে তাকালে বামে) সাথে আমি, পিপীলিকা টিমের একটি অনুষ্ঠানে।

সুবিন : সজীব, কী খবর?
সজীব : এই তো সুবিন ভাই। খবর সব কিছু মিলিয়ে ভালই। আপনি কেমন আছেন?

সুবিন : আমি ভালো আছি। তুমি এখন কোথায় পড়াশোনা করছ? (যদিও আমি জানি, পাঠকরা তো জানে না।)
সজীব : আমি এখন স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি করছি। আমার পিএইচডি এর প্রথম দিকে আমি বায়োইনফরমেটিক্স নিয়ে কাজ করছি।

সুবিন : শুনলাম এক বিখ্যাত প্রফেসরের সাথে কাজ করছ?
সজীব : আমি কাজ করছি স্টিভেন স্কিইনা এর সাথে। উনি এলগরিদম আর ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্কিইনা তো আমাদের পরিচিত। মানে তাঁর Algorithm Design Manual বইটি আমরা অনেকেই পড়েছি। তিনি লোক কেমন?
সজীব : স্কিইনা খুবি মজার লোক। উনি এখানে এলগরিদম এর সেমিনার পরিচালনা করেন। স্টোনি ব্রুক সিএস এর এসিএম এর গ্রুপগুলি দেখাশোনা করেন।

সুবিন : স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে কিভাবে? আমাদের যেসব শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, তারা নিজেদের কিভাবে প্রস্তুত করবে?
সজীব : প্রথমত, বাইরে পড়াশোনা করার জন্য সব থেকে যেটা বেশী দরকার তা হল তা হল গবেষণা করার আগ্রহ, অথবা খুব ভালো অর্গানাইজেশনে কাজ করার আগ্রহ; যেমন সিলিকন ভ্যালির কোন কোম্পানি। দ্বিতীয়ত, আন্ডারগ্রেডে একটু ভালো করে প্রোগ্রামিং এবং ম্যাথ করাটা জরুরী। খুব ভালো গবেষনা অনেক সময় আমাদের দেশে হয় না তাই আমি এর উপর জোর দিব না। তবে সুযোগ মত প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট বা সফটওয়্যার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করার উপর জোর দিতে বলব। আমি এই কথা গুলি বলছি মূলত মাঝারি মানের ছাত্র-ছাত্রীর জন্য। খুব ভালো যারা তারা এমনিতেই ভালো রিসার্চ করে এবং তাদের পাব্লিকেশন থাকে। তৃতীয়ত, আমি বলব, জিআরই এবং টোফেলে ভালো স্কোর করার জন্য। অনেকেই আলসেমি করে অথবা সময়ের অভাবে এই দুইটি পরীক্ষা দিতে পারেনা। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কালচার নেই বলে তারা আমেরিকায় না গিয়ে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে যায়। আমেরিকার জন্য এই দুইটি পরীক্ষা ম্যান্ডেটরি। তাই আলসেমিটা ঝেড়ে ফেলে আন্ডারগ্রেডের শেষ বছর বা আন্ডারগ্রেড শেষ করে এর দুইটি পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশান নেওয়া উচিৎ। আমার আমেরিকায় পড়তে আসার জন্য এক বছর আগে থেকে প্ল্যান করতে হয়েছে।

সুবিন : তুমি কোন ভার্সটিগুলাতে অ্যপ্লাই করেছিলে?
সজীব : আমি প্রায় ৮ টি টপ স্কুলে এপ্লাই করেছি। মাঝারি মানের ৪ টি তে এপ্লাই করেছি। অফার পেয়েছি কার্নেগি ম্যালন (মাষ্টার্স ফলোড বাই পিএইচডি), স্টোনি ব্রুক (পিএইচডি উইথ ফেলোশীপ), ইউএমবিসি বাল্টিমোর (পিএইচডি) তে।

সুবিন : স্টোনি ব্রুকে কেন ভর্তি হলে?
সজীব : আমি যেখানেই এপ্লাই করেছি, সেখানে আমার রিলেটেড কাজ হয় কিনা সেই ব্যাপারটিতে প্রাধান্য দিয়েছি। স্টোনি ব্রুক এর সিএস অনেক বড় ডিপার্টমেন্ট। এখানে কমবেশী প্রায় সব কিছু নিয়েই কাজ হয়। আমার আগ্রহ ছিল এনএলপি (NLP), আইআর (IR) বা এলগরিদম নিয়ে।  স্টোনি ব্রুকে আমার পছন্দের কয়েকজন প্রফেসর ও আছেন। স্টিভেন স্কিইনা তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি মূলত স্টিভের ডাটা সায়েন্স ল্যাবের কথা মাথায় রেখে এপ্লাই করি। পাশাপাশি আমার আগ্রহের সাথে রিলেটেড আরো কয়েকটা ল্যাবের কথাও আমি আমার স্টেটমেন্ট অব পারপাসে উল্লেখ করি। যাই হোক, প্রথমত আমাকে এক্সেপ্ট করেন প্রফেসর মাইকেল কিফার। উনি নলেজ রিপ্রেজেন্টেশান নিয়ে কাজ করেন।

সুবিন : স্টেটমেন্ট অব পারপাস যাকে সংক্ষেপে SOP বলে, সেটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এটি লেখার ব্যাপার কোনো টিপস্ ?
সজীব : পিএইচডিতে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লিকেশনের জন্য SOP এর উপর অন্তত ৫০% গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই SOP অবশ্যই খুব ভালো করে লিখতে হবে। আমি SOP নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি। অনেকের অভিজ্ঞতা জেনেছি। তারপরে নিজের SOP লিখেছি।
এতে মূলত নিচের ব্যাপার গুলি থাকে :
১। আমি কি করতে চাই
২। আমার আগ্রহের কাজ করার জন্য আমি আন্ডারগ্রেডে কি পড়েছি, বা করেছি, আমার কোন অভিজ্ঞতা
৩। এই কাজ নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
৪। এবং আমার এই গবেষনা করার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করছি তার কি প্রয়োজন
এই সব নিয়েই সাধারণত একটি SOP লেখা হয়। এক কথায়, SOP তে নিজেকে কেউ আইন্সটাইন প্রমাণ করার থেকে নিজের যে পজটিভ দিকগুলো এবং অভিজ্ঞতা আছে এবং সেগুলো কিভাবে একজনের আগ্রহের বিষয়বস্তুতে গবেষণা করতে সাহায্য করতে পারবে তাই তুলে ধরতে হয়।

সুবিন : তুমি যেহেতু বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছ, নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে কর, ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করতে গিয়ে লেখাপড়া করার সময় পাই না, তাই ভালো রেজাল্ট করতে পারি না’। কিংবা ‘স্যার, প্রোগ্রামিং করলে আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হয়, তাই প্রোগ্রামিং করি না।’ এদেরকে তুমি কী উত্তর দাও?
সজীব : আমি কখনোই মনে করিনা যে প্রোগ্রামিং একজনের পড়ালেখায় সময় নষ্ট করে। প্রোগ্রামিং করার সময়ে একজন মাথা খাটিয়ে, কাগজে আঁকিবুকি করে, বা একটি এলগরিদম ডিজাইন করার সময়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা যেকোন ধরনের বুকিস পড়ালেখার থেকে ভালো। সিএস (CS : Computer Science)-এ যেকোন ধরনের পড়ালেখার ৭০% কাজ হল প্রব্লেম সল্ভিং রিলেটেড। আর আমরা প্রব্লেম সল্ভ করি প্রোগ্রামিং করে। অতএব, আমি মনে করি প্রোগ্রামিং না জানলে সিএস এর বেশীরভাগ কাজ করা অনেক দূরহ হয়ে পরে।

সুবিন : তুমি তো এসিএম আইসিপিসি ও অন্যান্য Competitive প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে। সেগুলোর গুরুত্ব কেমন? তোমার কর্মজীবনেই বা সেগুলোর প্রভাব কেমন?
সজীব : আমাদের বাংলাদেশে বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রী সঠিক উপায়ে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু সিএস এর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এসিএম আইসিপিসি সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখানে যে কোন ছাত্র-ছাত্রী নিজে থেকে পড়ালেখা করে, কনসাল্ট করে, প্রবলেম সল্ভ করে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। তাই এসিএম ও অন্যান্য প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য সব থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই যে আমাদের দেশের সব ছাত্র-ছাত্রী যেন এসিএম এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রবলেম সল্ভিং করে। দেশের বাইরের যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেকোন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এসিএম প্রব্লেম সল্ভিং অভিজ্ঞতা বা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার ফলাফলের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

সুবিন : যদিও মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের সিজিপিএ জিজ্ঞাসা করতে হয় না, তবুও, তোমার সিজিপিএ কত ছিল? এটি হয়ত পাঠকদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সজীব : হা হা। আমার সিজিপিএ ৩.৯৬। এতে করে কেউ যেন আবার ভেবে না বসে যে এই জন্যই আমি উপরের অনেক বড় বড় কথা বলেছি। আমি যা বলেছি তা আমার নিজের এবং আশেপাশের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের অভিজ্ঞতার থেকেই বলেছি।

সুবিন : আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই কারণে যে তুমি তো প্রোগ্রামিংয়ের প্রচুর সময় দিতে, আবার ক্যাম্পাসের নানান কাজে (আসলে অকাজে) উপস্থিত থাকতে। তোমার স্কুল-কলেজ কোনগুলো ছিল?
সজীব : আমার স্কুল ছিল মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল, ঢাকা। কলেজ ছিল নটর ডেম কলেজ, ঢাকা।

সুবিন : সিএসই পড়লে কেন?
সজীব : আমি মোটেও সুপার ডুপার ছাত্র ছিলাম না। প্রথম দিকে সিএস নিয়ে তেমন কোন ফেসিনেশন ও ছিলনা। তবে সমসাময়িক অনেক কিছু নিয়ে পড়াশোনা করার সময় দেখেছি সিএস এর প্রোগ্রামিং ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। কিন্তু সত্য কথা হল, কলেজে থাকতে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ার সময় আমি প্রোগ্রামিং প্রায় কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু কম্পিউটারের বিবর্তন যেভাবে হচ্ছে, সেটা আমার কাছে অনেকটা সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের মনে হয়েছে সব সময়। তাই সাহস করে এই বিষয়ে পড়ার জন্যই মনস্থির করি। তারপরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে প্রোগ্রামিং শিখেছি (অনেক চেষ্টার পরে) এবং তা দিয়ে আসলেই সায়েন্স ফিকশান পর্যায়ের কিছু কাজ করি।

সুবিন : সাস্ট থেকে পাশ করার পর ক্যারিয়ার শুরু করলে কোথায়? সেখানে কী কাজ করতে?
সজীব : পাশ করার পরে আমি ক্যারিয়ার শুরু করেছি এসডিএসএলে। সেখানে আমি অনেক ধরনের কাজ করেছি। আমি প্রথম কাজ করেছি ফ্লেক্স এর উপর ম্যাপ সার্ভার টিমের ক্লায়েন্টের জন্য। এই টিমে আমি উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারিনি। তবে অনেক কোড ঘেটে কিছু বাগ বের করেছিলাম। তারপরে কাজ করি, জেটুএমই টিমে, লাইভ নামের একটি ভিডিও স্ট্রিমিং প্রজেক্টে। আমি এই টিমে কাজ করার সময় বুঝতে পারি আমার মূল আগ্রহ সব সময় নতুন ধরনের সমস্যা সমাধানে যেই গুলো করতে একটু গবেষনা লাগে। তারপরে আমি কাজ শুরু করি লাইভের সার্ভার ডিজাইনের। এর মাঝে আমি ছোট ছোট কয়েকটা আরএনডি করি এবং অন্য কয়েকটা প্রজেক্টের জন্য ডাটাবেইজ ডিজাইন করি। সেই সাথে গ্রিড প্রজেক্টের জন্য চ্যাটিং এপ্লিকেশন ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ শেষ করি। অতঃপর আমার হাতে কাজ আসে গ্রিডের ক্লাস্টার ডিজাইন এন্ড ডেভেলপ করার। এই সময়ে সাউথ আফ্রিকার জন্য একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরীর কথা শুরু হয়। আমি এবং সিদকী (মানযুরুর রহমান খান) প্রথমে এই সার্চ ইঞ্জিনের জন্য ১৮ দিনের একটি গবেষণা শুরু করি। তারপরে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য টিম গঠন থেকে শুরু করে তার ডেভেলপম্যান্ট এ যুক্ত ছিলাম পরের এক বছর। এর মধ্যেই গ্রিডের লোকেশন বেইসড সার্চের কাজ শেষ করি। সার্চ প্রোডাক্ট ম্যাচিউর হলে পরে আমি এসডিএসএল থেকে সাস্টে সুইচ করি।

সুবিন : সেখানে সার্চ ইঞ্জিন প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতাই কি পরবর্তিতে সাস্টে এসে পিপীলিকা তৈরির মূল কারণ?
সজীব : পিপীলিকা তৈরীতে যে অভিজ্ঞতা লেগেছে সেটা এসেছে এসডিএসএল থেকেই। কারণ আমার সহকর্মীরা সবাই বেশ ভালো প্রবলেম সল্ভার এবং বন্ধু ছিল। আমি তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। তবে পিপীলিকা তৈরীর মূল কারন আসলে বাংলা কম্পিউটেশনের পথটিকে সুগম করা। আমি প্রথমে বুঝতেও পারিনি আমি শেষমেষ পিপীলিকা তৈরী করতে পারব।

সুবিন : বাংলা সার্চ ইঞ্জিন তৈরিতে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল, এবং সেটি কিভাবে অতিক্রম করেছ?
সজীব : প্রায় তিন বছরে আমি ৩০ জনেরও বেশী ছাত্রের সাথে সার্চ ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় টুলস নিয়ে কাজ করেছি। এর প্রায় সবই পরবর্তীতে এই ইঞ্জিন তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয়তা অভিজ্ঞতা যুগিয়েছে। আমি প্রথম যে থিসিস গ্রুপগুলির সাথে কাজ করার সুযোগ পাই, তারা সাস্ট ২০০৪ ব্যাচের। এদের মধ্যে দুইটি গ্রুপ ছিল যারা ওয়েব ক্রলার এবং লোকেশন বেসড সার্চ নিয়ে কাজ করে আমার সাথে। এই ব্যাচের এআই সাবজেক্ট আমি পড়িয়েছিলাম। এর ল্যাব প্রজেক্টে একটি গ্রুপ আমার সাথে এডাপ্টিভ স্পেল চেকার নিয়ে কাজ করে। সাস্ট ২০০৫ এর অনেকগুলি গ্রুপ পরবর্তীতে আই আর নিয়ে কাজ শুরু করে। একটি গ্রুপ ওয়েব ক্রলার কন্টিনিউ করে। একটি গ্রুপ বাংলা ডকুমেন্টের কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান নিয়ে কাজ করে। একটি গ্রুপ ওপেনসোর্স এর লুসিনি (lucene)-তে বাংলা ইউনিকোড সাকসেসফুলি সাপোর্ট দেয়। সেই সাথে ওয়েব ক্রলারের ক্রল করা ডাটা লুসিনিতে সার্চেবল করে। সেই সাথে তৈরী হয় পিপীলিকার ইউজার ইন্টারফেস। একই রকম ভাবে সাস্ট ২০০৬ ব্যাচের অনেকগুলি গ্রুপ আই আর নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা স্টেমিং, কি-ওয়ার্ড ডিটেকশান, লোকেশান বেইসড সার্চের উপর কাজ শুরু করে। সাস্ট ২০০৭ ব্যাচ স্ট্যামিং এবং কি-ওয়ার্ড এর কাজে বেশ অগ্রগতি নিয়ে আসে। তারপরেই আমি বুঝতে পারি যে পিপীলিকা আমরা লাইভ করতে পারব। এর মধ্যে ২০০৫ ব্যাচ এর পিপীলিকার নামকরন সহ উইজার ইন্টারফেস এর মাধ্যমে বাংলা কন্টেন্ট সার্চ করার বেসিক টুলসটি আমি সব জায়গায় প্রেজেন্টেশনে দেখাই। এই টুলসটি পরে একটি সফটওয়্যার কম্পিটিশনে প্রথম হয় এবং জিপিআইটি এই প্রোডাক্ট এর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়, যার জন্য আমরা সবাই এখন পিপীলিকা ব্যাবহার করতে পারছি। যদিও আমি যতদূর ভেবে রেখেছি ততদূর পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য আমাদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হবে তবুও আমাদের হাতে স্মল স্কেলে একটি সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে তা মোটেও কম কথা নয়।

সুবিন : তার মানে আমরা বুঝতে পারছি, কেবল প্রযুক্তিই নয়, সাথে বাংলা ভাষার উপরও তোমারদের গবেষণা করতে হয়েছে।
সজীব : অবশ্যই। এখানে আই আর এর উপর কাজ সহ বেঙ্গলি এনএলপি, এবং লিঙ্গুইস্টিকের উপর অনেক বেসিক কাজ আমাদের করতে হয়েছে। শুধু মাত্র তাই নয়। এই কাজের জন্য আমাকে মেশিন লার্নিং নামক একটি কোর্স ডিপার্টমেন্টে পড়াতে হয়েছে, যাতে করে আমার ছাত্ররা এনাফ নলেজ গেইন করে পিপীলিকায় কাজ করতে পারে।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, এমন কারো কারো ধারণা, সার্চ ইঞ্জিনে ওয়েবসাইট থেকে ডাটা ডাটাবেজে সেভ করা হয়, আর কোনো কিছু জানতে চাইলে ডাটাবেজের উপর কুয়েরি চালানো হয়, তাতেই একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টা হয়ত তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু ফেসবুকে আমি সেটি দেখেছি। তুমি কি ভবিষ্যতে আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য সার্চ ইঞ্জিনের আর্কিটেকচার নিয়ে একটা লেখা দিবে? এতে শিক্ষার্থীরা যেমন শিখতে পারবে, তেমনে সেসব ডেভেলাপারদেরও চোখ খুলবে বলে আমার ধারণা।
সজীব : অবশ্যই লিখব। আমি আমেরিকা চলে আসার কারনে পিপীলিকার কাজের উপর ডকুমেন্টেশান করে উঠতে পারিনি। তবে আশা করছি এবার শুরু করব।

সুবিন : পিপীলিকা ছাড়াও সাস্টে আরো প্রজেক্টে তুমি কাজ করেছ। সেগুলো সম্পর্কে একটু বলো।
সজীব : সাস্টে অনেকগুলি প্রজেক্টে আমি কাজ করার সু্যোগ পেয়েছি। তার মাঝে এডমিশন সিষ্টেম নিয়ে কিছু কাজ করেছি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য মঙ্গলদীপ আর সুবচন নিয়ে কাজ করেছি, এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর অটোমেশান এর কাজ করেছি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমি কী-ওয়ার্ডলেস ডাটাবেস ম্যাপিং এর এলগরিদম ডিজাইন করেছি।

সুবিন : তোমাদের এসব প্রজেক্টে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা কেমন ছিল?
সজীব : মঙ্গলদীপ সুবচনের জন্য আমার কাজ মূলত আর্কিটেকচার লেভেলের। এই দুইটি কাজের জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারের সায়েন্স এন্ড আইসিটির ফান্ড পেয়েছি। এই ফান্ড ব্যবহার করে আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সুবচন এবং মঙ্গলদীপ সফটওয়্যার হিসেবে প্রকাশ করি। এডমিশন সিষ্টেমের জন্য আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরাই প্রথমবার সিষ্টেম ইমপ্লিমেন্ট করে। পরে আমরা প্রায় ৮ জন শিক্ষক মিলে একে প্রফেশনাল প্রোডাক্টে রুপ দেই। আর পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা ক্লাউড বেইসড এডমিশন সিস্টেম প্রবর্তন করি। যেখানে আপনিও আমাদের সাথে ছিলেন। তাছাড়া, বিআইডব্লিঊটিএ (BIWTA) এর প্রজেক্টেও আপনি ও আপনার কোম্পানী আমাদের সাথে কাজ করেছে। তাই আপনি ভালোই জানেন।

সুবিন : বিআইডব্লিউটএ-এর অটোমেশন প্রজেক্টের একটা অংশ ছিল ভেসেল ট্র্যাকিং ডিভাইস বানানো। যেই কাজটা অর্থায়ন করে আমার কোম্পানী, মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড। কাজটি তোমার তত্ত্বাবধানে দুজন ছাত্র সম্পন্ন করে। সেখানে আমি দেখেছি, গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের বেশিরভাগই তুমি তোমার ছাত্রদের দিয়ে দিয়েছ। সেটির কারণ কী?
সজীব : এটা সবসময়েই হয়েছে। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা সবসময় আমার থেকে বেশী আয় করেছে। আমি সবসময় সেটি বেশ এঞ্জয়ও করেছি। আমার প্রায় সবগুলো প্রজেক্টের মূল্যমান ছিল চার কোটি টাকা। এই প্রজেক্টে যারাই কাজ করেছে আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে ঢাকার সফটওয়্যার কোম্পানী গুলির কাছাকাছি সম্মানী দেওয়ার জন্য। আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে মনের দিক থেকে, মানের দিক থেকে এবং মূল্যায়নের দিক থেকে যথার্থ সম্মান দেওয়ার জন্য।

সুবিন : এবারে একটু অন্য আলাপে আসি। তোমার শিক্ষকতা পেশায় আসার কারণ কি?
সজীব : এসডিএসএলে আমি প্রায় সবকিছুই পেয়েছিলাম এই কথাটা সত্যি। কিন্তু তবুও, সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে আমি যতখানি কাজ করতে চেয়েছিলাম তা পারিনি। আমার মনে হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে আমি সেই সুযোগ পাব। কিন্তু শাবিপ্রবি এবং সিএসই ডিপার্টমেন্ট আমার এই ভাবনা কে কয়েকটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা দেয়। আমি ২০০৯ সালে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিএসই কার্নিভালে গিয়ে বুঝতে পারি সবাই মানে আমার শিক্ষক এবং জুনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা ধরেই নিয়েছে যে আমি সাস্টে যাব। এই ব্যাপারটি আমাকে সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্ট এনে দেয়। যেই কারনে আমি আমার তখনকার বেতনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ সেলারীতে জয়েন করি। আমি আমার ফ্যামিলির ব্যায়ভার বহন করি আমার পুরনো কোম্পানির সেলারী একাউন্ট থেকে। আমি কখনো ভাবিনি আমি কোনো প্রজেক্ট পাব। শুধুমাত্র সাস্ট এর ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আর সাস্টের সাথে ইমোশনাল এটাচমেন্টের কারনেই আমি সিএসই তে জয়েন করে ফেলি।

সুবিন : তোমার কি মনে হয় যে  ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তি সময়ে শিক্ষক হিসেবে সাস্টের সিএসই বিভাগে থাকার কারণে তুমি বাড়তি অনেক সুবিধা পেয়েছ, যা অন্য জায়গায় হয়তো পাওয়া যেত না?
সজীব : অবশ্যই। আমি মনে করি ব্রিলিয়ান্ট বা জিনিয়াস শব্দগুলো আমার সাথে যায়না। তবে সাস্টে আমি খুব উদ্দীপনামূলক একটা পরিবেশ আমি পেয়েছিলাম যে কারনে খুব আগ্রহ নিয়ে পরিশ্রম করে নিজের মেরিটকে আমি একটু হলেও প্রকাশ করতে পেরেছি। ছাত্র জীবনে আমি অনেক পড়ালেখা করেছি আর অনেক বেশী জানার আগ্রহের সাথে এর একটি অন্যতম কারণ ছিল কম বুঝতে পারা। সাস্ট সবসময়ই আমাকে যেকোন শূণ্যস্থান পূরন করে নেওয়ার জন্য প্রেরণা দিয়েছে। যখন শিক্ষক হয়েছি তখনও আমি একই রকম অনুভূতি পেয়েছি। তবে এই কথাগুলি যেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীকে কষ্ট না দেয়। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের একটা নিজস্ব সুর আছে। সেই সুরে নিজেকে ঠিকমত টিউন করে নিলে আর নিজের আগ্রহ অনুযায়ী পরিশ্রম করতে পারলেই সবার উন্নতি আসবে। সাস্টে আমার শিক্ষকরা, আমার সিনিওর, বন্ধু এবং জুনিয়র সবাই আমাকে আমার নিজের মত করে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

সুবিন : তুমি যে মেশিন লার্নিং কোর্সের কথা বললে, আমাদের সময়ে তো সেই কোর্সটি ছিল না। পরে অবশ্য আমি Coursera থেকে প্রফেসর Andew Ng-এর মেশিন লার্নিংয়ের কোর্সটি করি। চমৎকার বিষয়। তোমার কি মনে হয় MOOC (Massive Open Online Course) থেকে আমাদের শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকরা উপকৃত হতে পারেন?
সজীব : অবশ্যই উপকৃত হতে পারবে। আমি নিজে মেশিন লার্নিং এর জন্য এই রকম কয়েকটা কোর্সের সাহায্য নিয়েছি। আমি যদি মেশিন লার্নিং এ পড়ার জন্য মাষ্টার্স বা পিএইচডি এর জন্য অপেক্ষা করতাম তবে তা কোনদিনও সম্ভব হতোনা। আমি ততটুকুই শিখেছি যতটুকু আমার প্রয়োজন এবং তারপরে আমি তা শিখিয়েছি। MOOC সবাইকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে। যে কেউ তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটা কোর্স করে, আনুষঙ্গিক হোম ওয়ার্ক করে নিজের জন্য দরকারী অভিজ্ঞতাটুকু নিয়ে নিবে। এটাই MOOC এর একটা শক্তিশালী দিক।

সুবিন : বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে যদিও তুমি খুব বেশিদিন সরাসরি কাজ করো নি, কিন্তু সাস্টের শিক্ষক থাকাকালীন তুমি বেশ কিছু সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করেছে। সেগুলোকে কাছ থেকে দেখেছ। দেশের সফটওয়্যার শিল্প নিয়ে তোমার মূল্যায়ন কী?
সজীব : মূল্যায়ন মিশ্র। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক মেধাবী লোকজন আছে। এটা শুধুমাত্র আমি নই সবাই জানে। কিন্তু এদেরকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে এগিয়ে আসতে রাজি না। অনেকেই মনে করে সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এই কারনে দেশে সত্যিকার অর্থে ব্যবসা করাটা কঠিন। তবে এত কিছুর পরেও অনেকে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং করে এখনো নিজের কোম্পানিটিকে টিকেয়ে রাখছেন। এতে করে আমাদের এখন পর্যন্ত কিছু সুনাম হয়েছে। আমি বলব এই সুনামটুকু নিয়ে আমাদের উচিৎ মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশে নিজেদের সফটওয়্যার বা সার্ভিস সেল করার জন্য সবার এক যোগে এগিয়ে আসা। এতে করে আমাদের বাজারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসবে।

সুবিন : তুমি যেহেতু বাংলা সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে নিজের উদ্যোগে কাজ করেছ, তাতে খানিকটা বোঝা যায় যে বাংলা ভাষার প্রতি টানটা তোমার একটু বেশিই। তো বাংলা ভাষা শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যাপারে তোমার কি অভিমত?
সজীব : আমার নিজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা অনেকটা ব্যক্তিগত। আমি বরং আমার জানামতে কয়েকটা গবেষণার কথা বলি। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবারই নিজের ভাষার প্রতি একটা দূর্বলতা থাকে। প্রায় সবাই মনে করে নিজের ভাষায় পড়তে পারলে কোন একটা কঠিন টপিক হয়তো আরেকটু সহজ মনে হতো। এজন্যই অনেক উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট গুলিকে তাদের মাতৃভাষায় পড়ানো হয়। আমাদের দেশেও একজন ছাত্র বা ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একটি বিষয়ে চার বছর ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করেও তার বিষয় সম্পর্কে ইংরেজীতে প্রায় কিছুই বলতে পারেনা। এদেরকে যদি অন্তত কয়েকটা বেসিক বিষয়ে বাংলায় পড়িয়ে তার সাথে ইংরেজীর টার্ম গুলিও পরিচয় করানো যেত তবে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেত। তাই আমি মনে করি মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ার সুযোগ করার জন্য আমাদের সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে আসা উচিৎ।

সুবিন : আমাদের দেশে অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা কারণে-অকারণে নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। আমি যদি তাদের মনে করিয়ে দেই যে সাস্টে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার সময় তোমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না, তারপরেও তুমি ছিলে ভার্সিটির সেরা প্রোগ্রামারদের একজন, আবার সেই সাথে তোমার ক্লাসের ফার্স্ট বয়, তাতে তুমি নিশ্চয়ই মাইন্ড করবে না। এ ব্যাপারে তোমার কী বক্তব্য?
সজীব : প্রথমত, আমি অবশ্যই মাইন্ড করবনা। আমি বরং খুশী মনেই এই কথাটা স্মরণ করি। এমনকি ৪র্থ সেমিষ্টার পরে আমার আর শাবিপ্রবিতে পড়ালেখা করারও কথা ছিল না। তবু সবকিছু কেমন করে মিলে যায়। যারা মনে করে তারা বঞ্চিত তাদেরকে এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আমি নিজেকে যখন এই অবস্থায় পেয়েছি তখন আমি কি করতে পারি তা নিয়ে অনেক ভেবেছি। কখনো খারাপ লেগেছে, আবার ঠিক তারপরেই ব্যাপারটিকে আমার নিজের কাছে এডভেঞ্চার মনে হয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটিং রিসোর্স ব্যাবহার করে বড় হয়েছি। বন্ধুরাও আমাকে সাহায্য করেছে। অনেক বড় ভাইদের কাছে আমি বই চেয়ে নিয়ে এসেছি। আমার প্রথম বড় প্রোগ্রামটি লিখি আমার খাতায়। সেটা ডিবাগ করি খাতায়। পড়ে তার একটা অংশ আমি কোড করে সঠিক উত্তর পেয়েছি। এতে করে আমি প্রোগ্রামিং পারব কিনা সেই ভূতটা চিরতরে বিদায় নিয়েছিল। যারা নিজেকে বঞ্চিত মনে করে তাদেরকেও আমি বলব নিজের আশেপাশের যতটুকু সুযোগ আছে ততটুকুই কাজে লাগানোর জন্য। একসময় এই অভিজ্ঞতাগুলি আসল কাজের ক্ষেত্রে বিশাল এক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। আমি শিক্ষক হওয়ার পরেও খুব একটা রিসোর্স পাইনি। কিন্তু আমি কখনোই অভিযোগ করিনি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে গবেষণার প্রপোজাল লিখে ফান্ড জোগাড় করার চেষ্টা করেছি। সেই ফান্ডের করা কাজ থেকে লভ্যাংশ আমার ডিপার্টমেন্টকে অনেকদিন সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। যে কেউ চাইলেই অভিযোগটুকু বাদ দিয়ে নিজের চারপাশের রিসোর্স দিয়ে একজনের প্রয়োজনীয়তাকে ধীরে ধীরে মেটাতে পারে। এতে হয়তো সময় লাগবে কিন্তু যেই অভিজ্ঞতাটুকু অর্জন হবে তা সারা জীবনের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

এরকম ১২টি সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ার গাইডলাইন : এক ডজন প্রোগ্রামারের কথা”। বইটি পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের হক লাইব্রেরি ও রকমারি ডট কম-এ। বিস্তারিত জানতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন।

সুবিন : সজীব, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার ব্যস্ত জীবন থেকে তিন ঘণ্টা সময় দেওয়ার জন্য।
সজীব : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। এত ধৈর্য্য নিয়ে আমার কথা শোনার জন্য।

উদ্যোক্তা বিষয়ক সাক্ষাৎকার – সুবিন

“দেশের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের গল্প”
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের অবদান অপরিহার্য, মূলত তরুণ প্রযুক্তিবিদদের চৌকস দক্ষতা ও অপরিসীম ধৈর্য্যের দ্বারা এই খাত এগিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত। বেশিরভাগ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত থাকলেও কিছু ব্যাতিক্রমও রয়েছেন। বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ অন্য জায়গায় চাকরি করার বদলে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান, চাকরি দিচ্ছেন অন্যদের, আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা, অণুপ্রেরণা হয়ে আছেন তাদের নবীনদের মধ্যে!
তাদের সফলতা, ব্যর্থতা, অর্জন আর পেছনের গল্প নিয়ে জানুয়ারি, ২০১৩ সংখ্যা থেকে “কম্পিউটার জগত” ম্যাগাজিনে প্রতি সংখ্যায় প্রকাশিত হবে একটি করে সাক্ষাৎকার। আশা করি এর মাধ্যমে নবীনরা অনূপ্রাণিত হবে তাদের অভীষ্ট স্বপ্ন “আইটি উদ্যোক্তাতা” হওয়ার লক্ষে। এই সিরিজ সাক্ষাৎকারগুলোর প্রথম পর্বে থাকছে দেশের একজন স্বনামধন্য  সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং সফল তরুণ আইটি উদ্যোক্তা তামিম শাহ্‍‍রিয়ার (সুবিন) এর, সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মৃণাল কান্তি রায় দীপ।

দীপঃ প্রথমে আপনি এবং আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন?
সুবিনঃ আমি তামিম শাহ্‍‍রিয়ার। তবে পরিচিতজনেরা আমাকে সুবিন (ডাকনাম) নামেই ডাকে। পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী। আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি ২০০৬ সালে। বর্তমানে আমি কাজ করছি আমার নিজের প্রতিষ্ঠান মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড-এ। মুক্ত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। আমার সাথে সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমান যিনি বর্তমানে মুক্ত সফটের চেয়্যারম্যান ও প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

দীপঃ আমাদের দেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষে চাকরি খুঁজতে ব্যস্ত থাকে সেক্ষেত্রে আপনি ভিন্ন হলেন কেন?
সুবিনঃ আসলে আমার উদ্যোক্তা হবার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে। সেখানে ২ সেমিস্টার কাটানোর পড়ে আমি বুঝতে পারি যে আমি আসলে কিছু শিখছি না, তাই চাকরী ছেড়ে দেই। তারপরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথমে দেশের খ্যাতনামা একটি কোম্পানীতে যোগ দেই। সেখানে দেড় বছর কাজ করার পরে আরো দেড় বছর কাজ করি প্লেডম বাংলাদেশে (তৎকালীন ট্রিপার্ট ল্যাবস)। চাকরী করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমার পুরোপুরি মেধা ও শ্রম আসলে কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলি যেখানে আমি আমার মেধা ও শ্রমের পর্যাপ্ত ব্যবহার করতে পারবো।

দীপঃ ব্যাক্তিগত ভাবে একজন ভালো প্রোগ্রামার হওয়ায় আপনার কাছে হয়ত বিদেশী প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রন ছিলো, সেটা উপেক্ষা করে নিজে কিছু করার উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা কেমন করে পেলেন?
সুবিনঃ হ্যাঁ, বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে আমি চাকরির ইন্টারভিউ অফার পেয়েছিলাম। ফেসবুক থেকে আমাকে চাকরির ইন্টারভিউ-র জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় ২০১০ সালের জুন মাসে, আর গুগল থেকে চাকরির ইন্টারভিউ অফার পাই ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তাদেরকে আমি তখন ইন্টারভিউ দিতে অপারগতা জানাই এবং আরো কয়েকবছর আমার নিজের দেশে কাটানোর ইচ্ছার কথা জানাই। সেগুলো উপেক্ষা করা আমার জন্য মোটেও কঠিন কিছু ছিল না। কারণ আমি দেশে থাকতে চেয়েছিলাম। আর দেশে থাকার অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রধান ছিল বাবা-মা’র সাথে থাকা।
আর এপিজে আবুল কালামের “উইসং অব ফায়ার” বইটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

দীপঃ শুরুটা কেমন? মূলধন কি রকম এবং কতজন পেশাদার নিয়ে শুরু হয়েছিলো “মুক্ত সফটওয়্যার”?
সুবিনঃ তখন রেন্টএকোডার ডট কম (rentacoder.com) নামের একটি সাইটে আমি মাঝে মাঝে কাজ করতাম। সেখানে আমার রেটিং বেশ ভালো ছিল। সেটাকেই মূলত আমাদের ব্যবসার মূলধন হিসেবে ধরতে পারেন। আর টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ছয়-সাত লাখের মতো। সেই টাকা এসেছিল আমাদের নিজেদের জমানো টাকা থেকে। এ ছাড়া আমি ব্যাংক থেকে পার্সোনাল লোন নিয়েছিলাম। শুরুর সময় আমি যেহেতু চাকরি করতাম, মাহমুদ-ই কোম্পানী দেখাশোনা করত। ২০১০ এর জুন মাসে আমি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নিজের প্রতিষ্ঠানে চলে আসি। ২০০৯ সাথে আমাদের কোম্পানিতে ফুলটাইম পেশাদার ছিল ৩ জন, আর ২০১২ সালে সেটি এসে দাঁড়ায় ১২ জনে।

দীপ: লোন পেতে কোনো সমস্যা হয় নি?
সুবিন: না, কারণ তখন আমি ভালো বেতনের চাকরি করতাম। তাই ব্যাংক খুশিমনেই আমাকে লোন দিয়েছে। তবে এখন মনে হয় দিবে না।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কি ধরনের সার্ভিস দেয়া হয়ে থাকে বা কি ধরনের প্রজেক্ট আপনারা নিয়ে থাকেন?
সুবিনঃ আমরা মূলত কাস্টমাইজড সফটওয়্যার তৈরি করি। আমাদের কাজের প্লাটফর্মে বেশ বৈচিত্র আছে। আমরা রিচ ইন্টারনেট অ্যাপ্লিকেশন (RIA – Rich Internet Application), সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও গেমস (আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড, ব্লাকবেরি ও জাভা এম ই) তৈরি করি। তবে সম্প্রতি আমরা ইআরপি (ERP – Enterprise Resource Planner) সফটওয়্যার তৈরি করছি এবং সেই সাথে বিগ ডাটা ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করছি।

দীপঃ গ্রাহক সংগ্রহ হয়ে থাকে কেমন করে?
সুবিনঃ শুরুর দিকে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ওয়েবসাইগুলো ছিল আমাদের ক্লায়েন্ট যোগাড় করার একমাত্র উপায়। তবে এখন রেফারেন্সের মাধ্যমেই বেশি ক্লায়েন্ট আসে।

দীপঃ বর্তমানে কতজন পেশাদার/কর্মী রয়েছে আপনার প্রতিষ্ঠানে?
সুবিনঃ বর্তমানে কোম্পানীতে ১২ জন সফটওয়্যার প্রকৌশলি কাজ করছেন। দেশের শীর্ষ প্রোগ্রামাররাই মুক্ত সফটে কাজ করে থাকেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ জন এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালিস্ট কাজ করেছেন মুক্ত সফটে – তাঁদের মধ্যে দুইজন এখন গুগলের মাউন্টেন ভিউ অফিসে কর্মরত, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। এছাড়াও গুগল সামার অব কোডে অংশগ্রহনকারি, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহনকারি ছেলেরা মুক্ত সফটওয়্যারে কাজ করছে। এক কথায় বলতে পারেন দেশের সেরা মেধাবী ও উদ্যমী তরুণদের আখড়া হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড।

দীপঃ প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থাপনা টিম/বিভাগ কি রয়েছে?
সুবিনঃ ব্যবস্থাপনার কাজ আমি আর মাহমুদ মিলেই করি। ভবিষ্যতে আলাদা ব্যবস্থাপনা বিভাগ খোলার পরিকল্পনা আছে।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠানের অর্জন?
সুবিনঃ ব্যাক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা রকম অর্জন রয়েছে। সেগুলোর বাইরে প্রতিষ্ঠানের অর্জনও কিছু আছে। vworker.com (পরে freelancer.com এটিকে কিনে নেয়) সাইটে আমরা এক নম্বর বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ইংল্যান্ডের একটি কোম্পানীর জন্য আমাদের বানানো একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন আন্তর্জাতিক একটি কেইস স্টাডি হিসেবে দেখানো হয় ২০১১ সালে। ২০১২ সালের বেসিস কোডওয়ারিয়র-এ আমাদের কোম্পানীর একটি দল অংশগ্রহন করে এবং পিএইচপি ট্র্যাকে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ডাটা মাইনিংয়ের উপর একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা সেরা ১০% এ ছিলাম।

দীপঃ আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একজন আইটি উদ্যোক্তা হওয়া কতটুকু গ্রহনযোগ্য?
সুবিনঃ এখানে আসলে গ্রহনযোগ্যতার কোনো প্রশ্ন আসে না। যেকোনো কাজ, যেখানে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সৎপথে উপার্জন করা যায়, তা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য। আপনি লক্ষ করে দেখবেন, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সরকারি চাকরির গ্রহনযোগ্যতা বেশ কম – কারণ সেখানে ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি বেশ জাকিয়ে বসেছে। আর তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতি-বিমুখ বলেই নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ সরকারি চাকরিতে যেতে চায় না। যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, তবে তা হাতেগোনা।

দীপঃ এক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য কি দেয়া হয় বা সহায়তা কি পাওয়া যায় ?
সুবিনঃ বর্তমানে সফটওয়্যার কোম্পানীগুলোর জন্য সরকার ট্যাক্স মওকুফ করেছে। আর রয়েছে ইইএফ ফান্ড তবে এখন পর্যন্ত সেটার ভালো ব্যবহারের পরিবর্তে লুটপাটের কাহিনীই বেশি শোনা যায়। এ ব্যাপারে আপনারাই (আইটি সাংবাদিকরা) ভালো জানার কথা। এছাড়া অন্য কোনো সরকারি সাহায্য বা সহায়তার কথা আমার জানা নাই। যদিও সরকারের অনেক পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, সেগুলো এখনও কল্পনাতেই আটকে আছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

দীপঃ আপনার প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নতুন কোন পদক্ষেপ বা উদ্যোগ কি ব্যাক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আছে?
সুবিনঃ  সফটওয়্যার ডেভেলাপমেন্টের পাশাপাশি নানা রকম রিসার্চ করে মুক্ত সফটওয়্যারকে আমরা অন্য উচ্চতায় নিতে চাই। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সাথে আমাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যার অধীনে সাস্টের সাথে আমরা যৌথভাবে গবেষণা ও সফটওয়্যার ডেভলাপমেন্টের কাজে অংশ নিবো এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শেয়ার করবো। ভবিষ্যতে নিত্যনতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। এছাড়া দেশের বাইরেও অফিস খোলার পরিকল্পনা আছে। আর দেশের প্রোগ্রামিং সংস্কৃতির বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে চাই। ইতিমধ্যে আমি “কম্পিউটার প্রোগ্রামিং” নামে একটি প্রোগ্রামিংয়ের বই লিখেছি বাংলা ভাষায়। এটি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দীপঃ আইটি উদ্যোক্তা হতে কি কি প্রয়োজন?
সুবিনঃ

  • সাহস। যথেষ্ট সাহস না থাকলে কোম্পানী শুরু করা যায় না।
  • ধৈর্য়্য। যথেষ্ঠ ধৈর্য্য না থাকলে কোম্পানী টিকিয়ে রাখা যায় না।
  • প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস। নানা রকম বই পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে। সেটা যেকোনো রকম বই হতে পারে। অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যে ধারন করার সবচেয়ে সহজ উপায় বই।
  • পরিশ্রম এবং পরিশ্রম! পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয়।
  • যোগাযোগে ভালো হতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কথা বলা, পড়া ও লিখার দক্ষতা থাকতে হবে।
  • সর্বোপরি নিজের কাজকে উপভোগ করতে হবে।

——-আইটি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তামিম শাহরিয়ারের কিছু টিপস——–

  • যথেষ্ট পরিমান টাকা সঞ্চয় করতে হবে যেন নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো আয় ছাড়াই কমপক্ষে এক বছর চলা যায়
  •  ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছুর উপর ভালো দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
  •  নতুন কোম্পানীতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। কারণ ছোট অবস্থায় অনভিজ্ঞ কাউকে নিয়ে তার দক্ষতা বাড়ানোর পিছনে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
  •  ব্যাক্তিজীবনে ও প্রতিষ্ঠানের খরচের ব্যাপারে মিতব্যায়ি হতে হবে।
  • কোম্পানীর আয়-ব্যায়ের হিসাব (একাউন্টস) ঠিকভাবে রাখতে হবে।
  •  সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার চেষ্টা করতে হবে।

কম্পিউটার জগত  দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা কম্পিউটার ম্যাগাজিন। তারা ২০১৩ সাল থেকে দেশের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের উপর একটি নিয়মিত ফিচার শুরু করে। সেই ফিচার সিরিজের জন্য প্রথম ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন মৃণাল কান্তি রয় (দীপ)। সেটি ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়: http://www.comjagat.com/home/articles/morearticles/6654। 

মূল ইন্টারভিউ এখানে প্রকাশ করা হলো। আগামী দিনের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের হয়ত কিছুটা কাজে লাগলেও লাগতে পারে।